মা! ছোট্ট একটি শব্দ। একটি পৃথিবী। শুধু পৃথিবী নয়, ত্রিভুবন, স্বর্গাদপী গরীয়সী। শুধু একবার মা বলে ডাকলেই এক স্বর্গীয় পুণ্যে হৃদয়-মন অমিয় সুধায় প্লাবিত হয়। মা, ত্রিভুবনের সবচেয়ে মধুরতম শব্দ। তাই মা-ই বসুন্ধরা, মা-ই ছায়া, মা-ই মায়া। মা এক মমতার আধার। মা মানেই নিশ্চয়তা, মা মানেই নিরাপত্তা, মা মানেই অস্তিত্ব, মা মানেই আশ্রয়, মা মানেই অন্ধকারে এক বুক ভালোবাসা, স্নেহের অফুরান ভান্ডার। মা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়, আপনজন। আসলে কোনো উপমাই মায়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কোনো কিছুর তুলনা হতে পারে না মা। মা তো মা-ই , মায়ের তুলনা শুধুই মা।

মায়ের মধ্যেই সন্তানের অস্তিত্ব নিহিত। মা আছে তো সন্তান আছে। গর্ভজাত হোক অথবা দত্তকই হোক। সেখানে মা মানেই একটা মায়াবী স্নেহময়ী অবস্থান। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই অতুলনীয় এ মাকে নিয়ে সাহিত্য রচনা হয়েছে। অতীতে মাকে নিয়ে সাহিত্য রচনা হয়েছে। বর্তমানে হচ্ছে,ভবিষ্যতেও মাকে নিয়ে সাহিত্য রচনা হবে। কী গল্প, উপন্যাস, কবিতা বা সিনেমা। মা ও সন্তান সম্পর্কে প্রবচন ও সাহিত্যে একটি কথা প্রচলিত সমগ্র বাংলায় ‘কুপুত্র যদি বা হয়, কুমাতা কখনো নয়’ অর্থাৎ মায়ের অবস্থানটি অত্যন্ত সহনশীল ও স্নেহময়ী। সন্তানেরা মায়ের সাথে অসদাচরণ করলেও মা কখনো সন্তানের অমঙ্গল কামনা করে না। এটা শুধু বাংলা ভাষাভাষীদের জন্যই নয়, মাকে নিয়ে সাহিত্য রচনা হয়েছে বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে।

ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস ‘মা’ যা বিশ্বসাহিত্যে সবচেয়ে পঠিত উপন্যাস। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এ মা উপন্যাসটি অনূদিত হয়েছে । ১৯০৫ সালে রাশিয়ার বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে এক শ্রমিক পরিবারের নারী চরিত্রের বিশ্লেষণ মা, ছেলে প্যাভেল, প্যাভেলের বন্ধুদের আপন মনে করেন এ মহিলা। তাই ছেলে ও ছেলের বন্ধুদের সংগ্রামকে সমর্থন করেন। ছেলে প্যাভেল কারারুদ্ধ হন। মা আন্দোলন চাঙ্গা রাখতে রুটির সাথে বিলি করতেন আন্দোলনের ইশতেহার। এক সাধারণ মা হয়ে ওঠেন নির্যাতিত মানুষের বাঁচার এক আশ্রয়স্থল। সর্বজনীন মা হয়ে ওঠেন তিনি।

বিশ্বসাহিত্যে আরো এক মা উপহার দেন বের্টোলেট ব্রেশট। তিনি অ্যানা ফিয়েলিং। যার ব্যাপক পরিচিতি মাদার কারেঞ্জ ‘যুদ্ধের গতি অনুসরণ করে চলে তার খাবারের গাড়িটি’। এ খাবারের গাড়িটি তার জীবিকার একমাত্র সম্বল। এটির আয় দিয়ে চালাতে হবে তার সংসার। যেখানে বাস করে একটি রোগা মেয়ে আর দুই ছেলে। আসলে সে সাহসী নয়। তবুও বেঁচে থাকতে হবে। বাঁচার লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে হবে তাকে। যুদ্ধের এ সময় পার করতে হবে মাদার কারেঞ্জকে। মাদার কারেঞ্জকে কলকাতার প্রাবন্ধিক সুমিতা চক্রবর্তী হিম্মৎমাই হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একটি মজার ব্যাপার হলো, তার তিনটি সন্তানেরই বাবা তিনজন। আর এ তিনজনকে বাঁচাতে মরিয়া তিনি। তিনিও হলেন একজন সর্বজনীন মা।

বাংলা সাহিত্যে মা জননী নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। তবে মনে দাগ কেটেছে দু’টি উপন্যাস। একটি আমাদের বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের ‘জননী’, অন্যটির রচয়িতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। শওকত ওসমানের জননী ট্র্যাডিশনাল উপন্যাস। নিরুপায় জননী শত চেষ্টা করেও ধনীর লালসার শিকার এড়াতে পারেনি। সন্তান বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আত্মহত্যা করে। জননীর ঘর ভেঙে যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে শ্যামা-মায়ের চরিত্রে। সে যতটা না মা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তার চেয়ে ঢের বেশি জননী। সে গর্ভে ধারণ করতে চায় একটি সন্তান। তীব্রভাবে বাঁচতে ইচ্ছা হয় তার সন্তানের মধ্য দিয়ে। একজন শরীর মন সন্তান জন্মদানের জন্য সৃষ্টি। সেটা যেন তার অস্তিত্বের শক্তি ও স্বীকৃতি।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্প ‘আহবান’-এ আহ্বান গল্পে জমির করাতির বউ অসাম্প্রদায়িক মা হিসেবে আবির্ভূত। বিভূতিভূষণ দু’সম্প্রদায়ের দু’জনকে চিত্রায়িত করেছেন। কিন্তু জমির করাতির বৃদ্ধ বউকে একজন মমতাময়ী মা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন সার্থকভাবে। যার মৃত্যুর সময় মমতাবোধই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সমতার বন্ধনই সৃষ্টি হয়েছে জমির করাতির বউয়ের মধ্য দিয়ে। বাংলা উপন্যাসের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’, যা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনন্য সৃষ্টি। এ উপন্যাসের একটি মনে রাখার মতো চরিত্র হলো সর্বজয়া। এক পয়সার সঙ্গতী নেই সেই সংসার চালানোর। কত কষ্টে অপু আর দুর্গার খাদ্য জোগাড়। তবে সর্বজয়ার কাছে দুর্গার চেয়ে অপুর কদর বেশি। কষ্ট করে জমানো টাকা দিয়ে অপুকে কলকাতায় পাঠায়। অপু আর মায়ের কোলে ফিরে আসেনি। তার পরও অপু আর দুর্গার সর্বজনীন মা সর্বজয়া। বাংলা সাহিত্যে গর্ভধারিণী মায়ের চেয়ে পালিত মায়ের স্নেহ-মায়া-মমতা কোনো অংশে কম নয়।

অনুরূপা দেবীর ‘মা’ উপন্যাসে এমনই এক মাকে দেখা যায়। অরবিন্দের দুই স্ত্রী মনোরমা ও ব্রজরানী। অরবিন্দ মনোরমাকে দূরে রেখে বাবার আদেশে ব্রজরানীকে বিয়ে করে। উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে ক্ষুব্ধ ব্রজরানীর হৃদয় শান্ত হলো মনোরমার পুত্রের মা বলে ডাকায়। শরৎচন্দ্র কিন্তু সবচেয়ে এগিয়ে এ ব্যাপারে। গর্ভধারিণী নয় কিন্তু মা চরিত্র অঙ্কনে বিখ্যাত তিনি। বিন্দুর ছেলে [বিন্দু/কাকিমা] রামের সুমতি [বড় ভাবী] মেজদিদি [দিদির জা]

বনফুলের মজার একটি গল্প ‘গণেশ জননী’। এটি বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রমধর্মী গল্প। কোনো এক কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের দম্পতি একটি বাচ্চা হাতি পুষেছিলেন। ঘটনাচক্রে সে এক ঝুড়ি আম খেয়ে ফেলে। যিনি কেবল বলেছিলেন- ‘আমাদের জন্য দুটোও রাখনি’। মায়ের বকুনিতে বাচ্চা হাতিটি খাওয়া দাওয়া একেবারে ছেড়ে দিলো। মানুষরূপী মা লেবুর রস করে বাচ্চা হাতিকে অনুনয় করে বললেন, একটুখানি খাও না লক্ষ্মীটি। এখানে ব্যতিক্রমী এক মাকে পেলাম বনফুলের হাত দিয়ে।

মা কনসেপ্টকে বিষয় করে অনেক সিনেমা হয়েছে। সিনেমা হয়েছে এশিয়া, ইউরোপেও ‘সারগেট মাদার’ নামে একটি কোরিয়ান ছবি আর হলিউডের ‘স্টেপ মম’। সৎমা হয়ে ওঠেন এক মমতাময়ী মা। হলিউডের ১৯৩৭ সালের ছবি ‘স্টেলা ভালাস’ এখানেও মায়ের মমতা দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের ছবি ‘সত্যমিথ্যা’ অথবা ‘সবার ওপরে মা’ একটি অনবদ্ধ অবস্থান মায়ের। বোম্বের ‘মাদার অব ইন্ডিয়া’ টালিগঞ্জের ছবি ১৯ এপ্রিল-এ ছবিগুলোতে মায়ের সাথে সন্তানের গুরুত্ব বন্ধনে আধুনিকতার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই ব্যতিক্রমী এক মা চিত্রায়ন করেন চোখের বালিতে। মায়ের পছন্দের পাত্রীকে প্রত্যাখ্যান করে মহেন্দ্র নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছিল বলে ক্ষুব্ধ রাজলক্ষ্মী বিনোদিনীকে এগিয়ে দিয়েছিলেন মহেন্দ্রের সম্মুখে। তবে আমাদের আলোচন্য বিষয় হলো স্নেহময়ী, মমতাময়ী মায়ের। যিনি সর্বজনীন মা, যার আঁচলের নিচে সন্তানের আশ্রয়স্থল। তাই কবির ভাষায় বলতে হবে- মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভূবনে নাই।