আমার বহু দিনের চারণ ভূমি এই রাস্তা এই পথে আমি বহুবার এসেছি।আসলে বাড়ির কাছাকাছি গ্রামের আস্বাদ বলতে এই জোকা জুলপিয়া আম তলা বোরোকাচারি,বারুই পুর, সোনার পুর, জয়নগর খুব বেশি হলে ডায়মন্ড-হারবার।কতবার যে গেছি এসেছি।ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত আমি সাইকেল চালিয়ে চলে গেছি বহুবার।গঙ্গার পাড়ে ঘুরে বেড়িয়ে আপন মনে।কখনো বা নতুন লোক খুঁজে তার সাথে খোস-গপ্প করে কত ঘণ্টা যে কেটে গেছে এভাবে তার হিসাব নেই।এসবের ভেতরে মাথার ভিতরে পোকা কামড়েছে ভাবনার।আর সেই সব ভাবনার জারণ বিজারণে জন্মেছে কতক গল্প কতক জন্মাতে পারেনি আজো; হয়তো জন্মাবে না কোনদিন ;আবার হয়তো আমাকে একদিন এমন তাড়না দেবে আমি লিখতে বাধ্য হবো।পথে আমার সাথে অপরিচিত যাদের ভাব খাতির জমে তাদের নিরানব্বই শতাংশই আমার মত অশিক্ষিত,চাষা ভূষা,মুঠে মজুর।যাদের কোন কৃত্রিমতা নেই মুখে আর মনে আলাদা ভাব প্রকাশ করেনা।শিক্ষিত লোকেরা সর্বদা যাকে পায় তার সাথে ভেতরে ভেতরে নিজের তুল্যমূল্য বিচার শুরু করে দেয়; বৈষম্য গড়ে তোলে সহজে।
এটাই শিক্ষিত লোকের বড় সমস্যা।সে ক্রমে ক্রমে একটি জটিল পিণ্ড হয়ে ওঠে।কি করেন জানতে চেয়েই অবকাশ না দিয়ে জেনে নিতে চাইবে কেমন রোজগার পাতি হয়। বিয়ে করেছেন জিজ্ঞেস করেই জেনে নিতে চাইবে বাচ্চা কাচ্চা কটা।বাচ্চা থাকলে কোন স্কুলে যাচ্ছে।
যাকগে সে সব কথা।তিন দিন টানা আমি বিকালে একটু বের হচ্ছি।গতকাল বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমি সাইকেল টা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি জুলপিয়ার দিকে।যদিও নগরের থাবায় গ্রাম নিশ্চিহ্ন হবার পথে;তবুও এখানে এখনো গ্রাম অবশিষ্ট আছে কিছু।এদিকে এলে সাধারণত আমি একটু বেলা বেলিই বরই।সূর্য ডোবার আগে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করি।নিজের জন্য নয়।মা খুবি চিন্তায় থাকে আমার খামখেয়ালিপনা গুলোকে নিয়ে।আর আমার এক বন্ধু সে তো মাথা খারাপ করে ছাড়ে।বারবার ফোন এবং প্রতি মিনিটের আপডেট দিতে হয় তাকে আমি বাইরে বেরুলে।এই কারণে ফোন সাথে নেওয়া ছেড়ে দিয়েছি।যাই হোক গতকাল ঝিঝির ডাক শুনতে শুনতে অন্ধকার গ্রামের রাস্তা দিয়ে এক মায়াবী স্বপ্ন লোকের ভেতর দিয়ে কিছুটা সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরব এমন ইচ্ছেই ছিল।কাম্য যেহেতু সন্ধ্যা তাই দেরি করে বেরোনো।নেপাল গঞ্জের হাট ডিঙ্গলে একটা পেট্রলপাম্প পড়ে আর তারপরেই পড়ে রাস্তার একটি বাঁক।এই বাঁকেই মোটা খাবার জলের পাইপ থেকে দুটো সরু পাইপ লাইন করা আছে।যার মুখে কোন কল লাগানো নেই।গ্রামের লোক হাঁড়িকুঁড়ি ডেয় ঢাকনা ভরে একখান থেকে জল নেয়।কতবার এখান থেকে যাবার সময় জল নষ্ট হতে দেখে আফসোস হয়েছে।গতকাল জায়গাটা ফাঁকা ছিল।কেবল ছিল বুড়িটা।সাতশো পঞ্চাশ মিলি লিটার থামসআপ এর ফাঁকা বোতলে বুড়িটা রাস্তার কলের জল ভরছিল।আর আমি থেমে ছিলাম! সাইকেলের সামনের চাকার রিং টা ব্রেকে ঘসা খেয়ে আওয়াজ করছিল সেটা ঠিক করতে চাকায় হাত দিতে হল।পড়ে নষ্ট হওয়া জলে যখন হাত ধুতে গেলাম বুড়িটা বলল; -জল খাবি বাবা?
মোটা পাইপের উপর বসে বুড়িটা হাঁপাচ্ছে।আমার মায়ের থেকেও সে বয়সে অনেক বড়।ভারী চেহারা বেশ শক্তপোক্ত।
আমি বললাম; একা বেড়িয়েছেন কেনও।
মহিলাটি বললেন; আজকালকার দিনে কেউ কারো নয়রে বাবা।বৌমারা সব পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে।
আমি বললাম;-কটা ছেলে আপনার।
মহিলা বললেন; পাঁচ পাঁচটি ছেলে কিন্তু কেউ কারো নয়।যে যার মত থাকে।তাতেও রাতদিন চুলোচুলি অশান্তি।
বুঝতে পারলাম। ঘর ঘর কি কাহানী।কেউ কারো ভালো সহ্য করতে পারেনা।ফলে কারোই নিজের ভাল কিছু হয়না।বুড়িটা বাংলার ঘরে ঘরে রয়েছে আমার মা ও সেই বুড়িটা।বুড়িটার প্রতি আমার করুণা হল।জিজ্ঞাসা করলাম;কোন দিকে যাবেন আপনি।
বুড়ি বললেন; জুলপিয়া র দিকে।
আমি ওই দিকেই যাচ্ছিলাম।ওখান থেকে প্রায় তিন কিলো মিটারেও বেশি হবে জুলপিয়া।তবু বললাম;
-সাইকেলের ক্যারিয়ারে যদি বসতে পারেন আমি পৌঁছে দিতে পারি।
বুড়ি মা রাস্তার পাশে মোটা লোহার গার্ড ওয়াল একটি ধরে কোন ক্রমে উঠে বসলেন।সাইকেল চালাতেই তিনি টলমল করে খামচে ধরলেন আমার গেঞ্জিটা পেছন থেকে।বোঝাই যাচ্ছে যৌবনেও এনার সাইকেল চড়ার অভ্যাস হয়নি।সাইকেল টি দাঁড় করিয়ে আমার বসার সিটের তলার লোহার পেঁচানো অংশটি শক্ত করে ধরতে বললাম।সাইকেল চালিয়ে চললাম অতি সাবধানে।কিছুটা দূরে দূরেই বাম্পার।বাম্পারের কাছে গিয়ে সাইকেল খানা আস্তে করে দিতে থাকলাম।হু হু করে দুই দিক থেকে গাড়ি আসছে বুড়ি যদি পড়ে যান তবে আর রক্ষে নেই।কিছুক্ষণের মধ্যে মনে হল তিনি যুতসই হয়ে গেছে।গল্প জুড়লেন।
-হাটবার তাই নেপাল-গঞ্জের হাটে এসে ছিলাম।বড় রাস্তা থেকে ইটের কাঁচা রাস্তা নেমে গেছে অটোতে পাঁচ টাকা ভাড়া নেয়।ছেলেরা কেউ দেখেনা বাবা একা থাকি।সেজ ছেলেটা দুইবেলা দুটো ভাত রুটি দিয়ে যায় বটে।তবে আমারোওত সাধ আহ্লাদ বলে কিছু আছে নাকি।তাই যখন যেটা খেতে মন চায় নিজেই রেঁধে নিই।হাটে তাই একটু আসতেই হয় বাবা।এই দেখনারে বাবা আমার বড় ছেলেটা শিক্ষিত চারুচন্দ্র কলেজে পড়াশোনা করছে বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ওর বৌটা ওকে ছেঁড়ে চলে গেল।আর সে আসেনা।এমন মাগী পেটের মেয়েটার ওপরেও টান নেই।পাটি করে থানা পুলিশ করে আমার ছেলেটাকে মার খাওয়াল।খোরপোষের টাকা কান মুলে আদায় করে নেয় অথচ সংসার করেনা।ছেলেদের কথা কেউ শোনে না বাবা।মেয়েরা যা বলবে পুলিশ আদালত সব মেনে-নেবে।
এবার আমি নিজেই একটু ভয় পেলাম।উনিও তো একজন মহিলা।অপরিচিত মহিলা।অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে এসেছি।কথা বলতে বলতে জুলপিয়া পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ।উনি বলেছিলেন ঝাঁজরা স্কুল তাও পেরিয়ে গিয়েছে।দিনের আলো ফিকে হতে হতে সন্ধ্যা গাড় হয়ে আসছে।আর কতটা।
বুড়ি বললেন আর একটু।রাস্তার পাশে মনসা মন্দির তার পাশ থেকে তাদের গ্রামের পথ।ওই মনসা মন্দিরের কাছেই তাকে নামিয়ে দিলে হবে।গ্রামের ভেতরে যেতে আরও পাঁচ টাকা অটো ভাড়া লাগে।
মনসা, কেতকা, পদ্মাবতী—এই নামেই মনসাদেবী সমধিক প্রসিদ্ধ।তাঁর অপর নামগুলি হল বিষহরি বা বিষহরা (বিষ ধ্বংস-কারিণী), নিত্যা (চিরন্তনী) ! ইনিই মনসামঙ্গল বা পদ্মপুরাণ কাব্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তাই এই কাব্যকে মনসামঙ্গল বা পদ্মপুরাণ বলে। মনসা প্রাক্-পৌরাণিক দেবতা। ইনি প্রাচীন পুরাণে স্থান পাননি অথচ লোকব্যবহারে ও লোকসাহিত্যে অর্বাচীন বৈদিক-কাল থেকে বিভিন্ন রূপ পরিবর্তন করে চলে আসছেন। অবশ্য কোন কোন প্রাচীন হিন্দু পুরাণ ও বৌদ্ধ গ্রন্থের সর্প দেবী মনসার বর্ণনা আছে। পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত-পুরাণ ও দেবী-ভাগবতে মনসার উল্লেখ রয়েছে। সংস্কৃত পুরাণ সাহিত্যে মনসা একবার ঈষৎ ধরা দিয়েছিলেন। সেটা মহাভারতের আদিপর্বে জন্মেজয়ের সর্পসত্রের পূর্ব-প্রসঙ্গক্রমে। কিন্তু প্রাচীন পুরাণ ও মহাভারতে যে সর্ব দেবীর উল্লেখ আছে সেখানে তিনি হচ্ছেন জরৎকারু—আস্তিক তাঁর ছেলে। মহাভারতে মনসার ও তাঁর স্বামীর নাম একই—জরৎকারু। ‘মনসা’ দেবতার ভাবনা ঋকবেদের অজ্ঞাত ছিল না। ঋগ্বেদের একটি শ্লোকে মনসা দেবীর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ত্রী সপ্ত ময়ুর্যঃ সপ্ত স্বসারো অগ্রু বঃ।
তাস্তে বিষং বিজভ্রির উদকং কুম্ভিনীরিব॥
‘তিন সাত ময়ূরী, সাত ভগিনী কুমারী, তাহারা তোমার বিষ তুলিয়া লইতেছে, যেমন কলসীকাঁখে মেয়েরা (কুপ হইতে) জল (লইয়া যায়)।
মনসা সর্পদেবী। প্রধানত বাংলা অঞ্চল এবং উত্তর ও উত্তরপূর্ব ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে তার পূজা প্রচলিত। সর্প-দংশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে, সর্প-দংশনের প্রতিকার পেতে, প্রজনন ও ঐশ্বর্যলাভের উদ্দেশ্যে মনসা ঘট স্থাপন করে তার পূজা করা হয়। মনসা নাগ-রাজ (সর্পরাজ) বাসুকীর ভগিনী এবং ঋষি জরৎকারুর (জগৎকারু) স্ত্রী।জরৎকারু মনসাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পুরাণ অনুসারে, মনসার হলেন শিবের স্বীকৃত-কন্যা ! মনসার মা চণ্ডী (শিবের স্ত্রী পার্বতী) তাঁকে ঘৃণা করতেন কিন্তু পরবর্তীতে মাতা চণ্ডী মনসাকে নিজের মেয়ের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।পুরাণে তাকে ঋষি কাশ্যপ ও নাগ-জননী কদ্রুর কন্যাও বলা হয়েছে।
বেশ আর কিছুটা যেতে রাস্তার পাশে গাড় হওয়া অন্ধকারে একটি পুরাতন মন্দির চোখে পড়লো বটে।কিন্তু মন্দিরের পাশ থেকে আমি রাস্তা খুঁজতে লাগলাম।কোথায় রাস্তা। গাছপালা জঙ্গল ঝোপ মাঠ।রাস্তা কোই।আমার গা ছমছম করে উঠলো।ততক্ষণে বুড়িটি আমার সাইকেলের ক্যারিয়ার থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে রাস্তার পাশে; হাতে তার সেই জলের বোতল একটি প্ল্যাস্টিকের ব্যাগে।
বুড়ি বললেন; আমি এই মন্দিরেই এখন থাকি বাবা।
সমস্ত শরীর আমার আরও ভারী হয়ে উঠতে লাগলো।কিরকম রহস্য ময় লাগছে আবছা অন্ধকারে সাদা শাড়ী পরা বিধবা বুড়িটাকে।
বুড়ি বললেন; চ একটু আমার কাছে বসবি তারপর না হয় বাড়ি ফিরিস।
আমি বললাম; অনেকটা রাস্তা। আমায় বাড়ি ফিরতে হবে।
এরপর বুড়ি যা বললেন আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
-শোন সব ব্যাপারে এত অস্থির হোসনা।সব ঠিক হয়ে যাবে।কোন রকম সমস্যা হলে আমার কাছে আসিস কেমন।
আমি তখন বাড়ির দিকে সাইকেল ছেড়ে দিয়েছি। জোনাকির ডাক একটা মায়াচ্ছন্ন লোক ঘোরের ভেতর ডুবে আমি বাড়ি ফিরছি।মনের ভেতর একটা প্রশ্ন উদিত হচ্ছে কিসের অস্থিরতা আমার।কিসের সমস্যা আমার?
তারপর বাড়ি পৌঁছেছি স্নান করে সুজি রুটি খেয়ে প্রতিদিনের মত ল্যাপটপটি খুলে বসেছি।ইমেইল খুলতেই চমকে উঠলাম।প্রায় সত্তর দিন অপেক্ষা করে আছি।দুইবার এগ্রিমেন্ট ক্যানসেল হয়েছে।অ্যাপেল প্রোরেস এইচ কিউ এমওভি ফাইলে আমার ছবি গুলো চাইছিল ব্রিটেনের এক টিভি চ্যানেল।আর আমি তা কোনোভাবেই তাদের দিতে পারছিলাম না।এই টিভি চ্যানেলে আমার ছবি গুলো দেখানো হলে সাউথইস্ট এশিয়া ও ইন্ডিয়াতে আমার ছবি মাইলেজ পাবে।এটা আমার ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে আমি জানি।অথচ তীরে এসে তরী ডুবে যাচ্ছিল।সিলেক্টেড ফিল্ম গুলো ওরা যে ফাইলে চাইছিল আমি কিছুতেই দিতে পারছিলাম না।তিন রাত্রি আমি ঘুমাতে পারিনি।অবশেষে তাদের রিকোয়ারমেন্ট অনুসারে কাছাকাছি একটি কম্পোজিশন আমি পাঠিয়ে ছিলাম বটে কিন্তু তা পুরপুরি তাদের রিকোয়ারমেন্ট ফুলফিল করেনা।হাজার সংশয় হাজার দ্বিধার মধ্যে তাই ভয় ছিল কন্টাক্ট ভেস্তে যাবার।না ইমেইল এসেছে Hi Allabhya,\The new file has been QC approved – thanks for resubmitting.All the best.আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম।হু এসব চিন্তা মানসিক প্রশান্তির খোঁজে স্বস্তির জন্যই বিকালে গেছিলাম ঘুরতে।ঠিক তখনই আবার বুড়িটার কথা মনে পড়লো।কিসের অস্থিরতা আমার।কিসের সমস্যা আমার?আমি সবটা বুঝতে পারলাম।
ছুটে গেলাম মার কাছে।আদ্যপ্রান্ত গোটা ঘটনাটা তাকে খুলে বললাম।
সব শুনে মা বলল; তিনি তোকে বারবার দেখাদেয়।আর তুই বারবার তাকে চিনতে পারিস না।
কি রহস্য ময় এসব কথা সমস্ত শরীর শিরশির করে ওঠে।কে এই তিনি? আর আমার মত তুচ্ছ সামান্য মানুষকে বারবার কেনও তিনি দেখাদেন।ভাবতে ভাবতে ভীষণ কান্নাপায়।