অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। অবারিত বৃষ্টির ধারায়, উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে বস্তির ছেলে-মেয়েগুলো। করিডোরে দাঁড়িয়ে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে “বৃষ্টি”। “আহারে, আমি যদি বিষ্টিতে বিজতে পারতাম।” একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃষ্টি। অজপাড়া গাঁয়ের মেয়ে সে। মা মারা গেছেন জন্মের পরই। বৃষ্টির বয়স যখন পাঁচ, তখন তার বাবা আরেকটি বিয়ে করে। সৎ মায়ের অত্যাচার থেকে রেহাই পাবার জন্য চাচা রহীমুদ্দীন এই ঢাকা শহরে নিয়ে আসে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলো বৃষ্টি। এখন বারো বছরের কিশোরী সে। উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং, টানা মায়াবী চোখ- সব মিলিয়ে চমৎকার একটি মেয়ে।
বৃষ্টি অতীতে হারিয়ে যায়। ছোটবেলায় লতার সাথে দারুন ভাব ছিল তার। আবার ঝগড়াও হতো খুব। ঝগড়া হলেই লতা মুখ ভেংচিয়ে বলতো- “বিষ্টি গিষ্টি ,পচা মিষ্টি।” বৃষ্টিও কমনা। সেও বলতো- “লতা-পাতা,বেংগের ছাতা।”
লতার জন্যে মনটা কেঁদে উঠলো। গত রোযায় মারা গেছে সে।

“ছেমরি-ঐ ছেমরি? ঐ হানে কি করোছ-?”
কদম মিয়া ডাকে বাস্তবে ফিরে এলো বৃষ্টি। কদম মিয়া, এই বাসার কেয়ারটেকার। শুধু কদম মিয়াই নয়, এ বাসার কেউই বৃষ্টিকে নাম ধরে ডাকেনা।

আর দশদিন পরেই রোযার ঈদ। কাজের চাপ অনেক বেড়েছে। গ্রাম থেকে মাহিনের দাদা এসেছেন গতকাল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাহিনের রুমের দিকে তাকাচ্ছিল বৃষ্টি। ছোট্র মাহিনকে দাদা গল্প শোনাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি বৃষ্টিকে ডাক দিলেন ।ভীতু পায়ে এগিয়ে গেল বৃষ্টি-

-“তুমি গল্প শুনবে?”-বৃদ্ধ বললেন
-হ দাদা।
-ঠিক আছে, বসো।

পাঁচমিনিটও হয়নি । এর মধ্যে বৃষ্টির ডাক পড়লো- “ছেরি-ঐ ছেরি-কই গেলি?এদিকে আয়…”

-“যাই দাদা,খালাম্মায় ডাকতাছে…”

কিছুক্ষণ পর-
-“এই যে নবাবজাদী—-কই ছিলি এতোক্ষণ?”
ইকটু আগেইতো গেছিলাম!
“মুখের উপর তর্ক? পোড়ামুখি- বেয়াদ্দব ছেরি কোথাকার। বারোটা বাজে, এখনো বাইরের কাজ শেষ হয়নি?”
-জ্বে- হইছে।
-“যত্তসব ঝামেলা, তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে যা।”

রান্নাঘরে সবজির স্তুপ হয়ে আছে। হঠাৎ করে পেটের মধ্যে কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো বৃষ্টির। নিজেকে সামলে নিল। তারপর একে একে সবকাজ শেষ করলো।

ইফতারের জন্য সবাই ডাইনিং রুমে বসেছে। বৃষ্টিকে রুমের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহিনের দাদা বললেন, “বৃষ্টি ওখানে কেন? ঐ চেয়ারটায় বসো।” শশুরকে থামিয়ে দিয়ে মাহিনের আম্মু বললেন,”না; ওখানেই বসুক”।
আর কিছুই বলতে পারলেন না বৃদ্ধ!

মাগরিবের নামাজ আদায় করে সবকাজ শেষ করলো বৃষ্টি। রান্না ঘরের পাশেই ছোট্র বারান্দায় জলচৌকি পাতা। এখানেই বৃষ্টি রাতে ঘুমায়। ওর বিছানা ঝাড়ু দিচ্ছিল।
-“ছেরি- টেবিলে খাবার দে।”
-আইতাছি খালাম্মা।

একটু আগেই সবার খাওয়া শেষ হয়েছে। বৃষ্টি ভাত খেতে বসেছে। প্লেটে সামান্য ভাত আর তরকারী। প্রতিদিনের মাপা খাবার। তৃপ্তি সহকারে খেয়ে আল্লাহ’র শুকরিয়া আদায় করলো সে।

রাত একটা। সাড়া শরীর যন্ত্রনায় মুষড়ে পড়ছে। আস্তে আস্তে উঠে কলসি থেকে এক গ্লাস পানি খেল বৃষ্টি।

সেহেরীর সময় হয়েছে অনেক আগেই। বৃষ্টি এখনো বিছানা থেকে উঠতে পারেনি। প্রচন্ড জ্বরে শরীর কাঁপছে। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে মেমসাহেবা বললেন- “এতোগুলো কাজ কে করবে শুনি? এই যে নাপা,তাড়াতাড়ি খেয়ে রান্নাঘরে যা।”
-“খা-লা-ম্মা-,আপ-নে- যান, আ-মি-আই-তাছি-!”
অনেক কষ্ট করে কথাগুলো বললো বৃষ্টি । টপটপ করে চোখ বেয়ে গরম অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।

প্রচন্ড জ্বর আর মাথাব্যাথার মধ্যেও ভাত রান্না করলো বৃষ্টি। তরকারী আগেই রান্না করা ছিল। সেগুলো গরম করলো। নাহ! আর দাঁড়াতে পারছেনা। মাথাটা কেমন যেন ঘুরছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে- আসছে!

সকাল ৭.৩০ বাজে। নিজেকে মেঝের বিছিনায় আবিষ্কার করলো বৃষ্টি। ড্রয়িং রুম। চারদিকে তাকালো। কেউ নেই। এখানে কেমন করে এলো সে? একটু পরেই মনে পড়লো গত রাতের কথা। শরীরটা জ্বরে এখনো অবশ হয়ে আছে তার। আর মাত্র ন’দিন পরেই ঈদ। বাড়িতে খবর পাঠিয়েছে বাবাকে আসার জন্য। কত বছর ধরে বাড়িতে যায়না সে! বৃষ্টির অনেক শখ বাড়িতে ঈদ করবে। কিন্তু পাষান বাবা তার! মনে মনে প্রচন্ড অভিমান করে বাবার উপর। চাচি ঠিকিই কইছিল “মাও মরলে বাপ হয় তাওই!” মাকে খুব ভালোবাসে বৃষ্টি। “আইচ্ছা,মায় দেখতে কেমুন আছিলো?” নিজেকে প্রশ্ন করে সে। আবার নিজেই উত্তর খোঁজে “চাচী কইছে,মায় নাকি দেখতে চান্দের লাহান আছিলো! মা তুমি কোনহানে? তোমার কাছে আমি যামু!” চোখ বেয়ে অশ্রুর বন্যা নামলো বৃষ্টির।

-“বৃষ্টি- বৃষ্টি…”
দূর্বল হাত দিয়ে চোখ মুছে বৃষ্টি। চোখ তুলে তাকালো, “কেডা? দাদা?”

-হ্যারে- আমি।
-“এত সকালেই চইলা যাইতেছেন যে!”
-এখানে ভালো লাগে নারে! এই ইট-কাঠের শহরে কোনো ভালোবাসা নেই।ধর, এই টাকা গুলো রাখ।
-“না, দাদা লাগবোনা। ট্যাকা দিয়া আমি কি করমু?”
-কদম মিয়াকে দিয়ে ফল কিনবি তোর জন্য।
-“একবার খাইলে যদি আবার খাইতে মনে চায়- তহন পামু কোনহানে? তার চাইতে আপনে ফল কিনা খাইয়েন।”
স্বান্তনার কোনো ভাষাই খুঁজে পেলেন না বৃদ্ধ।
বৃষ্টি বলতেই থাকলো, “দাদা, আপনে না কইছিলেন- জান্নাতে গেলে আল্লার কাছে, মানুষের মন যা- চাইবো তাই পাইবো?”
-হ্যাঁ, বলেছিলাম।
-“আল্লায় যদি আমারে জান্নাতে যাইতে দেন দয়া কইরা, তাইলে- পরথমেই আমি আল্লারে দেখতে চামু! তিনি এতো সোন্দর কইরা মানুষ বানাইছেন! পরে আল্লারে কমু- আল্লাগো,আমি আমার মায়রে দেখমু; তারে জনমের পর থিকা দেহি নাই!” ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো বৃষ্টি। মাহিনের দাদা আর দাঁড়াতে পারলেন না। দ্রুত বাইরে চলে এলেন। অশ্রুকে আর ধরে রাখতে পারলেন না, ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি!