সকাল থেকেই আজ অঝোর ধারায় বৃষ্টি। আকাশটা যেন কেউ ফুটো করে দিয়েছে। বিশাখা বারান্দায় বসে বৃষ্টির গান শুনছে। বৃষ্টির ছাঁট এসে তার শাড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে তা নিয়ে তার ভাবান্তর নেই। আাঁচল টেনে আরও একটু জড়িয়ে নেয় সে। বারান্দায় বসলে খোলা রাস্তা অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় কোন বাধা ছাড়াই। খুব ভালো লাগে তার বৃষ্টি স্নাতা এই সকাল। সোজা এই রাস্তা কতদূর গেছে জানতে ইচ্ছে হয়। হয়তো কোথাও গিয়ে ভাগ হয়ে গেছে। ওখানে গিয়ে ভাবতে হবে কোন ভাগ সে বেছে নেবে জীবনের মতো।
আজ রাস্তায় কেউ নেই। জনশূন্য। বিশাখা বারান্দায় বসে মানুষ দেখে। এটা তার শখ। তাদের
হাঁটার অভিব্যক্তি, চেহারার সাদৃশ্য এসব নিয়ে তাকে ভাবায়।
খুব জোরে একটা বাজ পড়লো। আলো এসে তার চোখে পড়ে। বিশাখা চোখ বুজে কানে হাত দেয়।
তারপরেই চোখ খুলে দেখে রাস্তায় একজন লোক ভিজতে ভিজতে যাচ্ছে। ছাতা নেই, বর্ষাতি নেই।
প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে সে যেন জীবনকে মধুরতায় ভরে
নিয়ে চলছে ।
বিশাখা খুব কৌতূহল নিয়ে চেয়ার ছেড়ে রেলিং ধরে
দাঁড়িয়ে দেখছে। বৃষ্টির ফোঁটা ধারালো সুচের মতো
লোকটার গায়ে বিঁধছে। আবার একটা জোরে বাজ পড়লো। ঠিক তখুনি লোকটা উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলে বিশাখার চোখে চোখ পড়ে। আর বিশাখা বুকের মাঝখানে এসে বৃষ্টির ফলার মতো বিদ্ধ করে।
মুহূর্ত মাত্র। লোকটা দাঁড়ায় না। ঠিক তেমনি কপালের অবাধ্য চুল বাম হাতে সরাতে সরাতে বৃষ্টির মধ্যেই মিলিয়ে গেল।
বিশাখা অতীতের পাতা ওল্টাতে থাকে। কে? কোথায়? কেন নামটা মনে করতে পারছে না!
এতো পরিচিত মনে হচ্ছে তার। দু’হাতে মাথা চেপে চেয়ারে এসে বসে।
ভাবনার মাঝপথে কাজের মেয়েটা ভগ্নদূতের মতো এসে বলে ‘ আপনার স্নানের সময় তো হয়ে গেছে’।
বিশাখা শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে তন্ন তন্ন করে কতো নাম মনে করার চেষ্টা করছে। কিছুতেই মিলছে না। দরজায় আবার টোকা। আফা এতো জল ঢাললে কাশি বাড়বো।
বিশাখা দ্রুত কাপড় পাল্টে খাবার টেবিলে বসেও একই চিন্তা তাকে সুস্থির হতে দিচ্ছে না। প্লেটে অনেকখানি ভাত নিয়ে শেষে নষ্ট করে উঠে পড়ে।
বেডরুমে এসে ছাই রঙা পর্দা টেনে দেয়। ছায়া ছায়া আলোয় সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আরেকবার
চেষ্টা করে মনে করার এ মুখ কার? কেন তাকে এমনভাবে আকুল করছে! শৈশব, কৈশোর, যৌবনের আলো রেখায় সে হাঁটছে। কিন্তু না। স্মৃতি তার সাথে বেঈমানী করছে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে উঠে পর্দা সরিয়ে দিয়ে ডাইনিং এ গিয়ে ঢকঢক করে জল খেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। এখন বৃষ্টি নেই। প্রকৃতির মুখ ভার। ভালো লাগে না তার। লঘু পায়ে সে ঘরে ঢুকে ওয়ার্ডরোব খুলে শাড়ি বের করতে করতে ভাবছে কোন শাড়ি পরবে। কতো শাড়ি কিনেছে, পরা হয়নি। অবহেলায় পড়ে আছে সেসব। আকাশ রঙ চিরদিন তার প্রিয়। হাতে নিয়েও আবার রেখে সাদা খোলের শাড়ি বেছে ময়ুরকণ্ঠি রঙের ব্লাউজ নিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়।
তাকিয়ে দেখে কানের দুপাশে রূপোলী চুলের ঝিলিক। ময়ূখ চৌধুরীর সেই কবিতার লাইন মনে পড়ে যায় ” এখন আয়না দেখার সমস্ত যোগ্যতাই তুমি হারিয়েছো”। বিশাখা চিরুণী হাতে তার বয়সের সিঁড়ি ভাঙছে।
আঠারোতে এসে থমকে যায়। বিদ্যুৎ গতিতে একটি কিশোরের আবছা মুখের ছবি তার স্মৃতির ডালপালা নাড়িয়ে ঝুরঝুর করে ফুল হয়ে ঝরতে ঝরতে মনে পড়লো “অয়ন “। আশ্চর্য সকাল থেকে এতো কষ্ট করেও নামটা তার মনে করতে পারেনি।
আঠেরতে সে এসেই চলে গেছে। শহরতলীর সেই বাড়িতে তাদের দু বাড়ি পরেই থাকতো। তখন থেকেই ঠিক এমন কপাল জুড়ে অবাধ্য চুল বাম হাতে সরানো এখনো একই ভঙ্গিতে আজও রয়ে গেছে। সেই বাড়ির রাস্তার দুপাশ জুড়ে ছিল কৃষ্ণচুড়ার সারি। রোজ স্কুলে যাওয়ার পথে দুজনের দেখা হতো। অয়ন কপালের চুল সরাতে সরাতে তাকিয়ে দেখতো বিশাখার মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি। একবার ফাজিল অতনু ওদের দেখে গান গেয়ে ওঠে “দুজনে দেখা হলো মধুযামিনীতে–
কোন কথা কহিল না, চলিয়া গেল ধিরে।”
ওরা দুজন ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি নিজ নিজ পথে চলে যায়। তারপর আর কোনদিন ওদের দেখা হয়নি। পরে শুনেছে ওরা এখান থেকে চলে গেছে। ওর বাবার বদলীর চাকরি। বিশাখার মন খারাপ হয় বহুদিন। আবার একসময় ভাটিতে বিলীন হয়ে যায় সে মুখ। এতো বছর পর আবার ফিরে এলো এভাবে । আসলে কিছুই হয়তো মুছে যায় না মন থেকে। কতো তাড়াতাড়ি জীবন ফুরিয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে সে শাড়িতে আয়নার দিকে তাকায়। খোলা চুল, নীল টিপ ঠোঁটে আলতো লিপস্টিকের ছোঁয়া। মনে মনে সে নিজেকে বলে এখনও ফুরায়নি বেলা।
মেইন গেট বন্ধ করে সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
আবার বৃষ্টি এলো। বিশাখা বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাঁটছে। অনেকদিন পর সে এভাবে ভিজতে ভিজতে গান গেয়ে ওঠে “দুজনে দেখা হলো-