আজ বিরাট ঝামেলার দিন। কারণ আজ আমার প্রথম চুমুর দিন। রেড লেটার ডে’র মতো, ফার্স্ট চুমু ডে। সকালে ঘুম ভেঙেছে একটা ‘ফ্যাচাকেও স্বপ্ন’ দেখে। ফ্যাচাকেও স্বপ্নে ফ্যাচাং আছে আবার কেলেঙ্কারিও আছে। স্বপ্নটা হল, আমাদের পরীক্ষা চলছে। থার্ড সেমিস্টার। এরোডায়নামিক্সের পেপার। কিন্তু প্রশ্নপত্র খুলে দেখি, ক্লাস সিক্সের অঙ্ক এসেছে! বাঁদরের তেল মাখা বাঁশে ওঠা-নামার পাটিগণিত। এরোডায়নামিক্সে পাটিগণিত কোথা থেকে এল? এই হল ফ্যাচাং। আর কেলেঙ্কারিটা হল, অঙ্কগুলো করতে গিয়ে দেখলাম, একটাও মিলছে না। এই ধেড়ে বয়সে ক্লাস সিক্সের অঙ্ক না পারাটা বিরাট কেলেঙ্কারি ছাড়া আর কী? এটাই ফ্যাচাকেও স্বপ্ন। ‘ফ্যাচাকেও’ শব্দটা নিনিতের বানানো। নিনিত একটা খ্যাছড়াকাটিং মেয়ে। ‘খ্যাছড়াকাটিং’ শব্দটাও নিনিতের বানানো। তবে এটার মানে পুরোটা জানা যায়নি। মনে হয় খাপছাড়া ধরনের কিছু হবে।
নিনিত থার্ড ইয়ার ইলেকট্রনিক্স। অ্যাডমিশনের পর থেকে এই মেয়ে ডিপার্টমেন্টকে ঘোল খাইয়ে মারছে। পরীক্ষায় যাচ্ছেতাই রকম সব নম্বর পেয়ে ফার্স্ট তো হচ্ছেই, ক্লাসে প্রশ্নে-প্রশ্নে টিচারদের ঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছে। কোনও-কোনওদিন ল্যাবে রাত দশটা পর্যন্ত পড়ে থাকছে। তারপর শিস মারতে-মারতে বেরোচ্ছে। ওল্ড হিন্দি গান, ‘বেচারা দিল কেয়া করে’। এদিকে অত রাত পর্যন্ত ল্যাব খুলে রাখার নিয়ম নেই। আমাদের এইচ ও ডি (হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট) ওকে ডেকে সেকথা বলেওছেন। ঠান্ডা ভাবেই বলেছেন, ‘‘নিনিত, তুমি সারাদিন ল্যাবে থাকো, সমস্যা নেই, কিন্তু অত রাত পর্যন্ত থাকবে না। আমাদের একটা নিয়ম আছে।’’
নিনিত বলল, ‘‘ম্যাম, কবিতা আর সায়েন্সের এক্সপেরিমেন্ট নিয়ম মেনে চলে না। তারা কখন আসবে, কখন যাবে, কেউ বলতে পারে না। শুনেছি, বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে একবার সতেরোদিন পর ল্যাব থেকে বেরিয়েছিলেন। সেই সময়টাতেই উনি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশন আবিষ্কার করেন।’’
এইচ ও ডি জোর ধমক দিতে গিয়ে নিজেকে সামলালেন। শান্ত ভাবে বলেন, ‘‘নিনিত, তুমি মাইকেল ফ্যারাডে নও। আমিও মাইকেল ফ্যারাডের টিচার নই। আমাদের এখানে ল্যাবরেটরিতে রাতে তালা দিতে হয়। চুরিচামারির ভয় থাকে।’’
নিনিত বিনীত গলায় বলে, ‘‘ম্যাম, সবচেয়ে ভাল হয়, আমাকে ভিতরে রেখে বাইরে থেকে যদি তালা দিয়ে দেওয়া হয়। সকালে খুললেই হবে।’’
এইচ ও ডি আর কথা বাড়াননি। এই মেয়ের সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ কী?
নিনিত
ছিপছিপে রোগা, একমাথা ঝাঁকড়া চুল, বড়-বড় চোখের নিনিতের দুটো নেশা। তার একটা হল, নানারকম উদ্ভট শব্দ তৈরি। কম্বিনেশন ওয়ার্ড। এটার সঙ্গে সেটা জুড়ে, সেটার সঙ্গে ওটা জুড়ে। কোনওটার মানে আছে, কোনওটার মানে নেই। সেগুলো নাকি বলতে আর শুনতে আরাম। নিনিত বলেছে, ‘‘এগুলো ফ্লেক্সিবল। নিজের মতো মানে করে নেওয়া যায়। যেমন চিচিঙ্গল, ট্যাঁকারাম, গালটু। যেখানে খুশি ইউজ় করতে পারিস। স্ল্যাং হিসেবে চলবে, আবার আদর করেও চলবে। ইচ্ছে হলে অ্যাডজেকটিভ হিসেবেও চালাতে পারিস। যেমন ধর, বললি, ওই ছেলেটা একটা বিরাট ট্যাঁকারাম। ট্যাঁকে একটা পয়সা নেই, কিন্তু আরাম চায়।’’
নিনিতের দু’নম্বর নেশা হল, সায়েন্স মডেল বানানো। এখন সে বানাচ্ছে ইউ এফ ও। অজানা উড়ন্ত বস্তু। রিমোট কন্ট্রোলে চলবে। নিনিত ঠিক করছে, প্রথম পরীক্ষা হবে বয়েজ় হস্টেলের ছাদে নামিয়ে। খুবই সিক্রেট বিষয়। আমি ছাড়া কোনও ‘বয়’ ব্যাপারটা জানে না। নিনিত বলেছে, ‘‘যদি জানে, তোকে আমার ইউ এফ ও-তে চাপিয়ে গার্লস হস্টেলের ছাদে ফেলে দেব। আর দারোয়ানকাকুদের ডেকে বলব, প্রেম করার জন্য পাইপ বেয়ে উঠেছে।’’
এতটা না করলেও নিনিত ইচ্ছে করলে একটা কোনও ঝামেলায় ফেলতে পারে। আমাদের ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসে নিনিত সবচেয়ে আকর্ষক মেয়ে। শুধু লেখাপড়া বা ঝামেলা পাকানোয় নয়, নিনিত নাচ–গানেও ফুলটিস। ‘ফুলটিস’ শব্দটাও নিনিতের। মানে জানি না। বিউটিফুলের সঙ্গে আরও একটা কিছু আছে নিশ্চয়ই। কিছুদিন আগে ওরা ‘মায়ার খেলা’ করল। নিনিত ‘‘আমারও পরান যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো’—র সঙ্গে এমন দারুণ নেচেছে যে সবার চোখ ছানকু। ছানকু নিনিতের শব্দ। এর মানে হল, চোখ ছানাবড়া।
যাই হোক, আজ ওই নিনিতের জন্যই আমার ঝামেলার দিন। আমি খুব নার্ভাস। আমি কী করব? ক্লাস কামাই করে হস্টেলে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকব? অন্য কারও ঘরে গা ঢাকা দেব? বাড়ি পালাব? এগোরোটা কুড়িতে একটা বাস আছে। সোজা স্টেশন যায়। কিন্তু ঘর থেকে বেরলে যদি নিনিত দেখতে পায়? ক্যাম্পাসের পাঁচিল টপকাব? ঘরে থাকলে নিস্তার পাব বলে মনে হয় না। ওই মেয়ে বয়েজ় হস্টেলের ঘরেও হানা দিতে পারে। সে ক্ষমতা ওর আছে। আমার কী হবে?ঘটনাটা তা হলে বলি।
গত সোমবার ক্যান্টিনে নিনিতের সঙ্গে কোল্ড ড্রিংক্স খাচ্ছিলাম। কেন জানি না নিনিতকে আমি ভয় পাই, তারপরেও ওর কাছে-কাছে থাকতে আমার ভাল লাগে। নিনিতের কম্পানি পাবার জন্য এখানে লম্বা লাইন। নিনিত পাত্তা দেয় না। সোমবার ছিল ভয়ঙ্কর গরম। নিনিত ‘উস্ আস্’ করতে-করতে বলল, ‘‘আমার এখন কী ইচ্ছে করছে জানিস রঙ্গন? ইচ্ছে করছে জামা-কাপড় সব খুলে ফেলে কোনও একটা জলে ঝাঁপ দিতে। অ্যাই চল, কোনও একটা সি বিচে পালাই। যাবি?’’
আমি নার্ভাস হয়ে তাড়াতাড়ি বললাম, ‘‘দুটো দিন অপেক্ষা কর, দু’দিন পরে বৃষ্টি হবে। সব ঠান্ডা হয়ে যাবে।’’
নিনিত চোখ কটমট করে বলল, ‘‘তোকে কে বলল? ওয়েদার অ্যাপ তো বলছে, এক সপ্তাহ ঝড়বৃষ্টির নো চান্স।’’
আমাকে কেউ কিছু বলেনি, নিনিতকে সামলাতে মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে এসেছে। আমতা-আমতা করে বললাম, ‘‘না, কেউ বলেনি। আমার মন বলছে।’’
নিনিত একটু চুপ করে থেকে চাপা গলায় বলল, ‘‘তোর কথা সত্যি হলে… সত্যি হলে… যা! তোকে আমি সেদিনই চুমু খাব। কেউ ঠেকাতে পারবে না। আর মিথ্যে হলে? মিথ্যে হলে তুই আমার সঙ্গে সি বিচে যাবি। না গেলে ঠ্যাং ভেঙে দেব।’’
আজ সেই দু’দিন কেটেছে। সকালে ঘুম ভেঙেছে জানলা দিয়ে আসা বৃষ্টির ছাঁট মেখে। ক’দিন চাঁদিফাটা গরমের পর আকাশ মেঘে-মেঘে সেজে বসে আছে দেখছি। চারপাশ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। আহ, কী আরাম! আরামের নিকুচি! আমার তো সর্বনাশ! নিনিত কি সত্যি আজ আমায় চুমু খাবে? নাহ, পালাতেই হবে। ওই মেয়ে ঠিক একটা ক্যান্টিকারি করে বসবে। ও সব পারে। ক্যান্টিকারি নিনিতের বানানো শব্দ। মানে মনে হয় কেলেঙ্কারি।
হাত বাড়িয়ে বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা অন করলাম। ‘টিং’ আওয়াজে হোয়াটসঅ্যাপে উড়ে এল মেসেজ। মোবাইল তুলে দেখি, নিনিতের মেসেজ। কী লিখেছে এই সাতসকালে? চুমু খেতে ঘরে আসছে নাকি? ওরে বাবা! তাড়াতাড়ি পড়লাম—
‘‘রঙ্গন, বাড়ি থেকে জরুরি কল পেয়ে ভোরে কলকাতায় যেতে হচ্ছে। আকাশ দেখছি মেঘে ছেয়ে গিয়েছে। বৃষ্টিও পড়তে শুরু করছে। এই মাত্র ট্রেন ছাড়ল আর তখনই দেখছি তোর জন্য খুব মন কেমন করছে। কেন? এমন তো আগে কখনও হয়নি!’’
বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আমি তিনবার, সাতবার, একুশবার মেসেজটা পড়লাম। যতবার পড়লাম ততবার মনে হল, নিনিত আমাকে চুমু খাচ্ছে।