প্রথম যেদিন চাকরির জন্য এ প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিতে আসে, তখন মন মোটেই সায় দেয়নি। স্নিন্ধা অনেকটা বিপ্লব মানে বিপুর আগ্রহে এবং কিছুটা কৌতূলহলবশতঃ দিন ও সময় মতো নগরীর অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডির সুসজ্জিত এই অফিসে উপস্থিত হয়েছিল। ইন্টারভিউ দিয়ে চাকুরিটা পাওয়ার ঝোঁকে নয়। তবে তার একটা চাকরি দরকার। এ বোধ খানিকটা তাড়িত করেনি, একথা বলা যাবে না।
এসেই দু’শতাধিক ছেলে-মেয়ের দঙ্গল অতিক্রম করে ইন্টারভিউ বোর্ড গিয়ে হাজির হলো। তখন মনে মনে ধরেই নিয়েছিল চাকরিটা তার হচ্ছে না। সে-ও পেতে আসেনি। কিন্তু এতো প্রতিদ্বন্দ্বীর মাঝে ঘটে। মনে মনে দৃঢ় পণ করে বসে চাকরি তার পেতে হবে।
ইন্টারভিউর জন্য নির্দিষ্ট রুমে প্রবেশ করার পর প্রথম সম্মুখ পানে যে মুখটি চোখে পড়ল, তা স্নিগ্ধার পরিচিত মনে হলো। কিন্তু চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসে পরিচয়-সম্পর্ক প্রকাশ করার নিয়ম নেই। সেটা করলে প্রার্থীর অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য হয়। তাই সে না চেনার ভাব করে প্রার্থীর চেয়ারে গিয়ে বসলো। যতোটা স্বাভাবিক থাকা যায় সেভাবে। তেমন হৃদ-কম্পন ছিল না। চাকরির জন্য এটাই প্রথম ইন্টারভিউ নয়। বেশ সাবলীল ও এবং টু-দ্য পয়েন্ট আনছার করে ইন্টাভিউ গ্রহীতাদের সন্তুষ্ট করেছিল। একেবারে উঠে আসার সময় ইন্টারভিউ গ্রহীতা পরিচিত মুখটি আত্মপ্রকাশ করলÑ আমাকে চিনতে পেরেছেন?
স্মৃতির পাতায় ধূলোবালি পড়া অস্পষ্ট ছবির ওপর তে ঝাড়-মোছর করে স্পষ্ট দৃশ্য উদ্ধার করতে যে সামান্য সময় ব্যয় হয়, তেমনি একটা নাটকীয় ভাবভঙ্গি প্রকাশ করে বলেছিলÑ ঠিক-চি-ন-তে পারছি না-
স্নিগ্ধা বোঝাতে চেয়েছিল কোন পূর্ভ পরিচিতির সুবাবে চাকরি পেতে সে আগ্রহী নয়। কিন্তু স্নিগ্ধার ইচ্ছেকৃত এই নাটকীয়তার আড়ালে যে সত্যটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইলÑ আপনি তো সেই রুস্তম ভাই। একই ভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট আমরা। আপনি ছিলেন ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। আমি সবে মাত্র অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। বেশ সিনিওর হওয়া সত্ত্বেও আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেড়ে উঠেছিল। লেখালেখির সুবাদেই। আপনি ডিপার্টমেন্টের উজ্জ্বল স্টুডেন্ট। সবাই চেনে। সমীহ করে। স্যাররা বলাবলি করেনÑ অনেকদিন পর ডিপার্টমেন্টে একটা ছাত্র পাওয়া গেছে যাকে ফার্স্ট ক্লাশ দেওয়া যায় ‘নির্দ্বিধায়’। হ্যাঁ, মজুমদার স্যার ঐ ‘নির্দ্বিধা’ শব্দটি জোর দিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু আপনার ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত ফার্স্ট ক্লাশ জুটল না। ডিপার্টমেন্টের স্যারদের দলীয় দৃষ্টির বিবাদ-বিসম্বাদের মাঝে আপনি ‘নিরপেক্ষ’ আর থাকতে পারলেন না। রেজাল্টের পর সবাই হতবাক। অনেকেই শক্ পেয়েছিল। ছাত্র-ছাত্রীরা মুখ ফুটে বলেছিলথ- আজকাল মেধার কোন দান নেই। আর মজুমদার স্যার প্রকাশ্যে বলেছিলেন- ঐ শয়তানটার জন্যই রুস্তম ফার্স্ট ক্লাশ পেলো না। তবে ফার্স্ট ক্লাশ না পেলেও ইংরেজী ডিপার্টমন্টে আপনার সমাদার ছিল একজন শিক্ষকের মতো। পরীক্ষার পর কিছুদিন আপনি আমাদের ক্লাশ নিয়েছিলেন। সবাই আশা করেছিল আপনি যোগ্য শিক্ষক হিসাবে ডিপার্টমেন্টে ঠাঁই পাচ্ছেন। ‘কী আশ্চার্য! আপনি এই অল্প দিনের কথা ভুলে গেছেন?’ গোল গোল চোখ করে ইন্টারভিউ গ্রহীতা স্নিগ্ধার দিকে তাকালেন।
এমনভাবে তাকালেন যে এরপর আর অবগুণ্ঠনের আড়ালে পালিয়ে বেরালে ইঁদুর ধরার মতো খপ্ করে ধরেই ফেলবেন। তখন এতোগুলো লোকের সামনে কী এক সীন ক্রিয়েট হবে!
‘জ্বী- এবার মনে পড়েছে। আপনি আমাদের সিনিয়র ছিলেন-’
স্নিগ্ধা স্মিত হাসিতে আশ্বস্ত করতে চায় ইন্টারভিউ গ্রহীতাকে। শুধু কি সিনিওর রুস্তম ভাই শুধু ভাল ছাত্রই ছিলেন না লেখালেখিতেও ছিল তার পাকা হাত। বিভিন্ন ইংরেজী দৈনিকের পাতায় সামাজিক সমস্যা ইত্যাদির উপর আর্টিকল মুদ্রিত হতো। একটা ইংরেজী প্রিওডিক্যালসের কো-অডিটর ছিলেন তিনি। সেই পত্রিকার সুবাদেই রুস্তম ভাই’র সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাত। একটা ছোট আর্টিকল স্নিগ্ধার প্রকাশ পেয়েছিল সেই ম্যাগাজিনে। লেখাটি ছিল- “Woman Rights & Human Rights in Banglades”। আর্টিকলটি মুদ্রিত হওয়ার পর একদিন রুস্তম ভাই স্নিগ্ধাকে সেমিনার কক্ষে এসে কনগ্রাচুলেট করলেন, উৎসাহ দিয়ে বললেন- আপনার লেখার হাত ভাল, চালিয়ে যান। ব্যাস। তখনই জানতে পারে ঐ পত্রিকার কো-এডিটর নামের রুস্তম ইলাহীর অন্তরালে তাদের ডিপার্টমেন্টের ভাল ছাত্র রুস্তম আলী।
-চাকরিটা কি করবেন?
আচমকা প্রশ্ন করেন ইন্টারভিউ গ্রহীতা মানে সদ্য আত্মপ্রকাশিত রুস্তম ভাই।
কি জবাব দেখে স্নিগ্ধা ভেবে পায় না। আসলে চাকরি তার একটা দরকার ঠিকই কিন্তু এরকম চাকরি নয় সেটা। সবকিছু পছন্দ মতো হয় না। স্নিগ্ধার জীবনে অন্ততঃ বার বার তা প্রমাণিত। আজও এখানে এসেছে খালাত ভাই বিপ্লবের তাগিদে। পেপার কাটিং যোগাড় করে এনে বলেছিল- আপু, একটা মজার চাকরির বিজ্ঞপ্তি- তুই সাপ্লাই করলে হয়ে যাবে- স্নিগ্ধা হেসে উড়িয়ে দেয়- ধোৎ ঘটকালির চাকরি নেবো নাকি? বিপ্লব বলেছে, চাকরি তো শুধুই চাকরি নয়- একটা সামাজিক দায়িত্ব পালনও বটে- তছাড়া ত্ইু তো আগে এসব নিয়ে খুব লেখালেখি করতিস।
গাধার সামনে মূলো ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো বিপ্লব ‘সামাজিক দায়িত্ব’ পালনের কথা বলায় স্নিগ্ধা নড়ে চড়ে বসে। পেপার কাটিংটা তার হাত থেকে নিয়ে বিছানার তোষকের নীচে রেখে দেয়। চাকরিটা যতো অপছন্দের হোক একটা সোস্যাল কমিটমেন্ট তাকে তাড়া করতে থাকে। থাচাড়া বর্তমান অবস্থায় মানসিক পরিবর্তনের জন্য একটা কিছু করা দরকার। সরকারী চাকরির বয়স উত্তীর্ণ তাই ঐ চিন্তা বাদ। ভেবেছিল কোন এনজিওতে ঢুকে পড়বে। অনেক ছেলে-মেয়ে করছেও। যদিও অধিকাংশ এনজিওর আয়ু নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফান্ড ফুরালেই সবাইকে বিদেয় করে দেয়। বলে ফান্ড এল পরে ডাকা হবে। তার মানে ততোদিন তীর্থের কাকের মতো বসে থাকো। তাই এনজিওর প্রতিও তার আস্থা নেই। আর শিক্ষকতা পেশাকে তার খুব ভারী এবং কঠিন মনে হয়। সময়গুলো খুব চাপের মধ্যে ফুরিয়ে যায়। উপভোগ করা যায় না লাইফ। এমন সময় স্নিগ্ধার মনে একটা বুদ্ধি এসে যায়। তাছাড়া সে জিতে যেতে চায়।
-চাকরি না কলে ইন্টারভিউ দিবো কেন্- তবে প্রতিষ্ঠানটা ব্যতিক্রমী- সোস্যাল কমিটমেন্ট আছে-
ইয়েস! সোশ্যাল কমিটমেন্টের জন্যই আমরা আপনার মতো মহিলা চাই- ডোন্ট মাইন্ড, আমরা ব্যাচেলরকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছি, ম্যারেজ পজিশন কলাম খালি ছিল, কিছু উল্লেখ করেন নি- আই মিন ইট্স এ মিসটেক- বোর্ডের পাঁচ জোড়া চোখ তখন সার্চ লাইট হয়ে স্নিগ্ধার মুখ ও শরীরকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছিল। স্নিগ্ধা আগের সাবলীল ভাব আর ধরে রাখতে পারল না। সমস্ত শরীর গামতে থাকে। এ জীবনে অন্ততঃ একটি প্রশ্ন তার জন্য কঠিন। পারতপক্ষে জবাব দেয় না। আজও তাই নীরবতা পালন করতে চাইল।
স্নিগ্ধার বিব্রত ভাব আঁচ করতে পেরে রুস্তম ভাই শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করল ঐ পাঁচ জোড়া চোখের কবল হতে।
-ঠিক আছে, স্নিগ্ধা, আপনি আসুন- আমরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।
সেই থেকে স্নিগ্ধা ‘পরিণয়’ নামে এই ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ পদে চাকরি করছে। সামনের পৌষে তিন বছর পূর্ণ হবে। স্নিগ্ধা বছরগুলোকে গণনা করে এভাবেই। ঋথু বিবর্তনের ধারায়। শীতে তার দুর্বলতা। প্রিয় ঋতু।
এক সময় ‘পরিনয়’ নিয়ে অনেক হাসি-তামাশার কাণ্ড ঘটতো। পত্র-পত্রিকাগুলো কিন্তু বেশ উৎসাহ দিয়েছে। প্রগতিশীল পত্রিকাগুলো ভাল কোন ঘটনা ঘটলেই কভারেজ দিতো। রুস্তম ভাইর ছিল মিডিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক। মূলতঃ রুস্তম ভাইর বুদ্ধি, পরিশ্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মনিষ্ঠা পতিষ্ঠানকে দিয়েছে দেশজোড়া খ্যাতি। এমনকি ইন্টারনেটের সুবাদে বিদেশের মাটিতেও এর নাম ছড়িয়ে পড়েছে। আজ আর দ্বিধা নেই স্নিগ্ধার। বুক ফুলিয়ে পরিচয় দেয় প্রতিষ্ঠানের। আর জীবনে যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল সেদিনÑ মানসিক এবং বৈষয়িক, তাও কাটিয়ে ওঠেছে। তবু একটা শূন্যতা রয়েই গেছে। চাকরির সুবাদে নিজের সুবিধা-অসুবিধার কথা ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুস্তম ভাইকে জানাতে হয়েছে। কিন্তু ঐ শূন্যতা সম্পর্কে আজের কিছু বলা হয়নি। রুস্তম ভাইও কখনো উপযাচক হয়ে জানতে চাননি। একটা নির্ভার ব্যক্তিত্বের আড়ালে উভয়ই চাপা দিয়ে রেখেছে। ব্যক্তি জীবনের বিষয় আষয়। যতো দেখেছে একটা দায়িত্বশীল ভাল মানুষ হিসেবেই বসকে দেখেছে।
রুস্তম ইলাহী মানে রুস্তম ভাই তার কাছে বিরাট কিছু মনে না হলেও শ্রদ্ধা করার মতো অনেক উপাদান খুঁজে পেয়েছে। কখনো এম,ডি’র আসন থেকে কিঞ্চিৎ নেমে এসে ধরা দেন প্রাণখোলা উদার মানুষ! কখনো কলিগা।কখনো পূর্ব পরিচিতির জের ধরে ‘সিনিওর ভাই’ হিসেবে। আবার কখনো মনে হয় স্নিগ্ধার সঙ্গে তিনি লুকোচুরি খেলছেন। এই লুকোচুরির আড়ালে যে সত্তাটি আছে সেই সত্তাটি তাকে কিছু বলতে চায়। একান্ত নিজের কথা। এই ধারণা সত্যি নাও হতে পারে। আমাদের দেশের পরিবেশে একটা মেয়ে যখন বাইরে চাকরি করতে বের হয়- যে মন ও মানস নিয়ে- সেই মনের জন্যও এরকম মনে হাত পায়ে স্নিগ্ধার।তবে কয়েক দিনের ঘটনায় স্নিগ্ধার এই মনে হওয়াকে যুক্তি দিয়েছে। তার মানে স্নিগ্ধার জীবনে আরেকটি বিপর্যয় অপেক্ষা করছে না। তো? এমন প্রশ্নও তার আজকাল মনে জাগে।
সেদিন ঘটনা। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। ফাল্গুনের প্রথম বৃষ্টি। উথালপাথাল, ঝড়ো, একটা উদ্দামতা ছিল বৃষ্টিতে। অফিস আওযার শেষ। পাঁচটা বেজে গিয়ে ঘড়ির কাটা আরো অর্ধেক পথ অতিক্রম করে গেছে। সাড়ে পাঁচটা। টেবিলের কাগজপত্র ফাইল গুছিলে রওনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল স্নিগ্ধা জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আঁচ করছিল বের হতে পারবে কি-না।
-ম্যাডাম, স্যার সালাম দিচ্ছেন।
পিওন হেনা কখন রুমে প্রবেশ করেছে টের পায় নি। তার কথায় খানিকটা চমকে উঠে।
-স্যার, মানে এম ডি স্যার? স্নিগ্ধা অবাক হলো। এমন সময় ডাকার কথা নয়।
স্নিগ্ধা ব্যাগ নিয়ে একেবারে বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিয়েই ঘর ছাড়ল।
হে! জানালা-দরজা লাগিয়ে দাও। বের হতে হতে বলল।
ক্রীম কালারের ভারী পর্দা সরিয়ে স্নিগ্ধা যখন এমডির চেম্বারে প্রবেম করে, তখন তার ‘রুস্তম ভাই’ টেবিলে মাথা রেখে বসে। না, তিনি ঘুমিয়ে নয়। স্নিগ্ধার উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলে আন্তরিক আমন্ত্রণ জানালেন-
-আসুন মিস্ স্নিগ্ধা- বাইরে প্রকৃতি বিরূপ তাই,-
‘মিস্! স্নিগ্ধা একটু অবাক হলো। এতোদিন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে কোনদিন মিস্ বা মিসেস ব্যবহার করেননি এম ডি সাহেব। আজ কি ইচ্ছ করেই এমনটি করলেন?
স্নিগ্ধা সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বলল- স্যার, আপনার শরীর ভাল তো?
স্নিগ্ধাও এরকম প্রশ্ন আর কোনদিন করে নি। স্নিগ্ধার প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য নড়ে চড়ে বসে এম ডি।
-শরীর ভালই- তবে খানিকটা অবসন্নতা যেনো পেয়ে বসেছে।
বাসায় ফেরার জন্য তৈরী তো- কিন্তু প্রকৃতি বিরূপ, তাই ভাবলাম আপনাকে নিয়ে চা খাই। একা একা খেতে ইচ্ছে করছিল না।
কলিংবেল বাজাতেই হেনা উপস্থিত।
-চা দাও-। এম ডি সাহেব একটা ফাইল টেবিল থেকে হাতে নিলেন।
-স্নিগ্ধা, ভাবছি একটা ম্যাগাজিন সাইজ প্রিওডিক্যালসকরবÑ পরিণয়-এর মুখপত্র হিসাবে- দাবী আসছে- মানুষের কাছ থেকে। তবে এটা কোন বিজনেস গাইড হবে না- সমাজ উন্নয়মূলক এবং সৃষ্টিশীল সাহিত্য নির্ভর। এটা তার প্রডেক্ট প্রোফাইল।
-ভাল হবে স্যার- আপনার তো লেখার হাত ছিল ভাল-
-আপনারও-। এম ডি হা-হা করে হাসতে থাকেন। স্নিগ্ধা লক্ষ্য কললে যেনো ইচ্ছে করেই এম ডি সাহেব বিষয়টির অবতারণা করলেন। স্নিগ্ধাকে অতীতের দিকে টেনে নিতে চাচ্ছেন কি! আজ এমন এক পরিবেশ, অতীতে ডুবি দিতে মন্দ লাগবে না।
একটি হাফ প্লেটে চারটে গরম ডালপুড়ি এবং দু’কাপ চা নিয়ে হেনার প্রবেশ। পুড়ি এবং চা স্নিগ্ধার মনোযোগ আকর্ষণ করল। এই শেষ বিকেলে বৃষ্টিমুখর পরিবেশে লাগবে।
-নিন, স্নিগ্ধা-
পুড়ি খেতে খেতে স্নিগ্ধার মনে পড়ে যায় বহুদিন তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক এতো কিছু থাকতে এমন প্রতিষ্ঠান করার ইচ্ছা কেন জাগল রুস্তম ভাইর। সেই প্রশ্ন করার মোক্ষম সময় আজই।
-একটা প্রশ্ন করতে পারি স্যার?
-করুন!
-‘পরিণয়’ করার প্রেরণা পেলেন কোত্থেকে?
-সে অনেক কথা। শুরু কলেন রুস্তম ইলাহী তার জীবনের গোড়ার কথা। শোনালেন ব্যক্তিগত জীবনের অনেক আবেগ-অনুভূতির কথা। কেন ‘পরিণয়’ করতে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্র কেন র্ভার্সিটিতে শিক্ষকতা পেশায় গেলেন না। কেন ক্যাডার সার্বিসে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও গেলেন না। এমনকি বিদেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও তা কেন করেন নি। সব খোলামেলা বললেন। অবশেষে এলেন স্নিগ্ধার ব্যক্তিগত জীবনের দিকে। এটাই স্বাভাবিক। ব্যক্তি-জীবন চর্চা যেখানে শুরু হয় সেখানে অন্য পক্ষ বাদ যাবে কেন।
-যদি কিছু মনে না করেন, আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই-
-কি প্রশ্ন করবেন স্যার আমি জানি। বলছি- আমার বিয়ে হয়েছিল- মাস্টার্স দিয়ে একটা কিন্ডারগার্টেনে ঢুকে পড়ি। এখানে থাকাবস্থায় একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। হাসান। আমেরিকা প্রবাসী। অল্পদিনের পরিচয়-সম্পর্ক গড়িয়ে বিয়ে পর্যন্ত। মাস খানেক সেছিল দেশে। এর মধ্যে জানতে পারলাম সে বিবাহিত। আমেরিকা যাবার আগে নিজ দেশে বরিশালে বিয়ে করে। একটা মেয়েও আছে। তার কিন্তু ঐ বউর সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে এতোদিন আমেরিকা ছিল। বিষয়টা জানতে পেরে আমার খুব ঘৃণা হলো লোকটির ওপর। তাই, ডিভোর্স নিয়ে নিয়েছি। আজ থেকে টিক তিন বছর আগে। পরিণয়ে আসার প্রেক্ষাপট এটাই। এতোসব বলতে যেয়ে স্নিগ্ধার খুব হালকা লাগছিল। একটা কঠিন পাথর বুঝি তার বুকের ওপর হতে সরে গেল। এম ডি সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সংকোচটাও কমে গেছে। এমন সময় চোখ পড়ে ঘড়ির দিকে। একটা চেইনযুক্ত ঘড়ি। চেইন ছোট বড় হওয়া দিয়ে সময় নিরূপন করা চলে। কাঁটার পরিবর্তে চেইন। ভিন্ন রকম ব্যবস্থা। কিন্তু চেইন দিয়ে তো সময় বেঁধে রাখা যায় না।
বৃষ্টির দাপাদাপি তখন থেমে গেছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সন্ধ্যাও রাতের আঙিনায় প্রবেশ করছে একটু একটু।
-উঠি স্যার।
-স্যার না, রুস্তম ভাই, যেভাবে অতীতে ডাকতেন। চলুন, আজ আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। স্নিগ্ধা কোন কিছুতেই আপত্তি করল না। রুস্তম ভাইর সহগামী হলো। রুস্তম ভাই ড্রাইভিং সীটে। সে তার পাশের সীটে বসলো। যে ঘটনাপ্রবাহ এই সন্ধ্যায় ঘটছে তার গতি নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই। আর মানুষের হাতে অনেক কিছুই থাকে না। ‘নিয়তি’ বলে একটা শব্দ তাহলে থাকলো না। তাছাড়া এই যে একাকি আঠাশ বছরে দাঁড়িয়ে আর বুঝি পারা যাচ্ছে না। একটা অবলম্বন চাই। মেয়েরা নাকি লতানো গাছের মতো। একটা অবলম্বন তাদের দরকার হয়। সেও হাঁপিয়ে উঠেছে। সে জানে রুস্তম ভাই এরপর তাকে কি বলবে। তার জন্য সে প্রস্তুত। জবা ঠিক করা আছে।
-স্নিগ্ধা, আপনাকে আমার যা যা বলেছি তা ছিল একটি প্রতিষ্ঠারে এম ডির চেয়ারে বসে। তার মধ্যে ছিল চালাকি এবং লুকানো। আসলে আমিও একটা মেয়েকে প্রতারিত করেছি- ঠকিয়েছে দারুণভাবে। আমার একটা মেয়ে আছে। নাম নিস্তা। আমার বউ চাইনিজ। কিছুদিন আমি চীনে ছিলাম। সে সময় তায়ী জিং নামে চাইনীজ মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হয়। বিয়ে এবং কন্যা সন্তুান। মুসলিম মেয়ে। বিয়ের আগে কথা ছিল আমি চীনেই ফিরে যাবো স্থায়ীভাবে। কিন্তু দেশে এসে নানা বাধা আমাকে যেতে দিলো না। আজও হয়তো তায়ী আমার জন্য অপেক্ষা করছে- নয়তো অন্য কারও সঙ্গে- হাঃ হাঃ হাঃ-। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে রুস্তম ভাই।
রুস্তম ভাইর হাসি বিকট শোনায় তার কানে। ভিন্ন এক রস্তম ভাইকে দেখছে। সে যার সঙ্গে তার পাশাপাশি বসে এক ইঞ্চি পথও অতিক্রম করতে রুচিতে কুলোচ্ছে না। কিন্তু ভদ্রতা-ভব্যতা- শিষ্টাচার এসব শব্দগুলো তার মনে যেভাবে স্থায়ী আসন গেঁড়ে আছে। তাই পাল না তৎক্ষণাৎ কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে।
-রুস্তম ভাই, আমাকে এখানে নামিয়ে দিন- আমার সামান্য শপিং আছে- এখান থেকে আমার বাসা খুব কাছেই-
গাড়ি থেকে নেমে স্নিগ্ধা পূর্বের মতে হাত তুলে বিদায় জানায়। মুখে একটু হাসি ঝুলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাতে প্রাণ ছিল না। মনে মনে এই ভেবে আশ্বস্ত বোধ করল- রুস্তম ভাই অন্ততঃ তাকে প্রতারিত করে নি। ইচ্ছে করলে তাও করতে পারতো। গাড়ি চলে যাবার পর একটা রিক্সায় চেপে বসলো স্নিগ্ধা। রিক্সাই উত্তম বাহন। বেশ বাতাস লাগে গায়ে। মুক্ত পরিবেশ। এই মুক্ততাই ভাল।