শেষ ক্লাস ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, ক্লাসের ভিতরে মেয়েরা সব হৈচৈ করছে আর একে অপরকে বলছে চল চল আমরা একসাথে নাচ গান করি। কে কে গান ভালো গায় হাত তোলো। নিপা হাত তুললো, সিখা বলল তুই আবার কবে থেকে গান করিস জানতাম নাতো। আরে আমি গাই নাকি? গায়তো বুলা… দেখনা এতো বলছি হাত তোল হাত তোল কিছু তেই হাত তুলছে না অগত্যা আমি ই হাত তুলে তোদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। সবাই হা হা করে হেসে উঠলো আর বলল, ভালো বুদ্ধি আছে তো তোর মাথায় কি সুন্দর বুলাকে ধরিয়ে দিলি? সবাই হাতে তালি দাও সিখার এই হঠাৎ বুদ্ধির জন্য। এই নিলা তুই ও তো ভালো গান জানিস। আরে আমি গান গাইলে সব ক্লাস ছেড়ে পালাবে। এই বুলা চট করে একটা গান ধরোতো বৃষ্টির গান। বাইরে কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে তোরা আয় আমরা সবাই মিলে নাচবো। বুলা বলল নিলা তুই তো ভালো নাচ জানিস। আগে তুই একা নাচ তারপর সবাইমিলে। বুলা গান ধরলো “মন মোর মেঘের সংগী উড়ে চলে দিক দিগন্তের পানে” কি করছো মেয়েরা সব …

বাংলা সাহিত্য পড়ান নিশা ম্যাডাম। ক্লাসে ঢুকে বললেন, তোমারা বুঝি নাচ গান করছিলে? তা করোনা। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে এর ভিতরেতো কেউ বাড়ি যেতে পারবে না তাই আমিও একটু দেরি করে ঢুকলাম। একেই শেষ ক্লাস আমি ভাবলাম ওরা একটু দুষ্টমি করুক আমি একটু পরে যাই। কি নিলা হবে নাকি একটু? বুলা গানটা আবার ধরো নিলার নাচটা দিয়ে ক্লাস শুরু হোক। বুলা গান ধরলো আজি ঝরো ঝরো মুখরো বাদল দিনে জানিনে জানিনে…

নিশা ম্যাডাম সখিপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য পড়ান। এই ম্যাডামের ক্লাস মেয়েরা খুব পছন্দ করে। সহজে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে এই নিশা ম্যাডাম। নিলার নাচটা শেষ হলে সবাই হাত তালি দিলো। বাহ্ ভারি সুন্দর নেচেছো তুমি আর বুলার গানটাও চমৎকার হয়েছে। শোনো মেয়েরা তোমরা তো এই স্কুলের সবচেয়ে বড়ো ক্লাসে পড়ো। সামনে তোমরা এসএসসি পরীক্ষা দেবে। আজ তোমাদের ক্লাসের পড়া থাক, আজ বরং দেখি কে কেমন সৃষ্টি করতে পাড়ো, যেমন ধরো আজতো প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে এই বৃষ্টির উপরে সবাই কিছু লেখো।
ম্যাম বৃষ্টির রচনা লিখবো? রচনা নয় বিথি এ যার যার অনুভূতি বৃষ্টিকে নিয়ে। লেখো যার যেমন মনে হয় সেটাই লেখো।
সবাইকে লিখতে বসিয়ে দিয়ে নিশা ভাবনার সাগরে ডুব দিলো।

এমনই এক বৃষ্টির সন্ধায় আমার চয়নের সাথে দেখা হয়ে ছিলো। সেদিন ও ঠিক এভাবে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিলো। পড়ার টেবিলে বসে অংক করছি লাম হঠাৎ বৃষ্টির শব্দে মনটা কেমন উদাস হয়ে গেলো, খাতা কলম রেখে সোজা ছাদে বৃষ্টির তালে তালে নাচতে শুরু করলাম। আকাশে আলো আঁধারের খেলে চলছিল। সেই আলোতে পাশের বাড়ির ছাদে একটি ছেলেকে দাড়িয়ে ভিজতে দেখলাম। তাড়াতাড়ি নিজেকে গুটিয়ে বেড়িয়ে এলাম। ছেলেটি আমায় দেখছিলো কেমন মুগ্ধ নয়নে। আমি লজ্জিত হলাম। তখন কতোইবা বয়স হবে এই পনের কি ষোল। সেই শুরু প্রায়ই ও ছাদে আসতো আমিও চলে যেতাম একটু আদটু কথা হতে। এভাবেই। আমরা একসময় দুজন দুজনের হয়ে গেলাম।

নিলার কন্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। ম্যাম আমাদের লেখা হয়ে গেছে। আচ্ছা ঠিক য়াছে নিলা তুমি পড়ো কি লিখেছো? আমার বৃষ্টি খুব পছন্দ। বৃষ্টি হলে কেমন যেন মনটা অন্য রকম হয়ে যায় তখন যা তা করতে ইচ্ছে করে যেমন ছোট বোনের পুতুল নিয়ে খেলতে ইচ্ছে করে। মুড়ি চানাচুর মাখা খেতে ইচ্ছে করে। লুডু খেলতে ইচ্ছে করে। বৃস্টির ভিতরে ঝাপিয়ে পড়ে ভিজতে ইচ্ছে করে। আসলে কোন টাই হয়না কারণ যখনি বৃষ্টি নামে বাবা তখনই আমাকে অংক করান। বলেন এই সময় মাথায় ভালো অংক ঢোকে। বাবা আমি একটু ভিজবে। না না বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হয়। আমরা এখন মুড়ি চানাচুর মাখা খাবো তোমার মা মেখে নিয়ে আসছে তুমি অংকে মনদাও। সবাই হা হা করে হেসে উঠলো বলল ঘটনা কি সত্যি নিলা? হ্যা। এবার কে বলবে? বিথি তুমি বল? আমি বৃষ্টি খুব পছন্দ করি। যখনই বৃষ্টি নামে তখনই আমি মায়ের আচারের বৈয়ম থেকে আচার চুরি করে চুপি চুপি জালনার কাছে বসে খাই আর বৃষ্টির শব্দ শুনি। তারপরে রং তুলি নিয়ে আঁকতে বসি। কোন এক কাল্পনিক রাজপুত্রের বৃষ্টিতে ভিজে ঘোড়ায় চড়ার দৃশ্য, দৃশ্যটা আঁকতে আঁকতে সেই ঠাকুরমার ঝুলির গল্পের দেশে চলে যাই। কখন বৃষ্টি থেমে গেছে তার হুসই নেই। আঁকছি তো আঁকছি তখন মা বলে কিরে শুধু আঁকা নিয়ে বসে থাকবি না কি অন্য কাজ ও আছে? বাহ্ সুন্দর৷ আচ্ছা এখন কে বলবে? বুলা তুমি বল।

আমার বৃষ্টি একদম ভালো লাগে না। ওর আগমনে আমরা ভিজে যাই। আমাদের ঘরে জল পড়ে এখানে ঘটি পাতো ওখানে বালতি পাতো। বইগুলো প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরো। বিছানা, জামাকাপড় জরো করে প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকো। সখ করে বৃষ্টিতে ভিজতে কোথাও যেতে হয়। আমরা ঘুমের ঘোরে ও ভিজি। বৃষ্টি হলো ধনীদের সুখ আরাম। ওরা সুখে নাচে উল্লাস করে ভালো ভালো রান্না করে খায়। বৃষ্টিতে ভেজে বৃষ্টিতে নাচে বৃষ্টিতে গায়।ওদের বৃষ্টি সুখের আমাদের নয়।

একদম ঠিক বলেছো বুলা গরিব দুখিদের জন্যই বৃষ্টিটা সুখকর নয়। কারন জলতো সব কিছু ভিজিয়ে দেয়। যাদের মাথায় চাল নেই তারা কি করে বৃষ্টি বিলাস করবে…