বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন ব্যুরোর সাবেক মহাপরিচালক এবং চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী শাহ আবদুল হান্নান গত বুধবার ঢাকায় ইন্তেকাল করেছেন। একই দিনে চট্টগ্রামে ইন্তেকাল করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠি ও ঘনিষ্ট বন্ধু, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ও কুমিল্লা দক্ষিণ শাখা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জিএম আলী হোসেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আলী হোসেনের সঙ্গে নিয়মিতই কথা হতো। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও ফেসবুকে তার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাকে দু:শ্চিন্তা মুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছি। শাহ আবদুল হান্নান গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবত চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলার মত অবস্থা ছিল না। আল্লাহ তাদের উভয়কে জান্নাতুল ফিরদাউসে দাখিল করুন।

বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেই প্রথম কাজ হিসেবে তাদের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী আমলাদের ‘ওএসডি’ অর্থ্যাৎ ‘অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি’র চিঠি ধরিয়ে তাদেরকে কর্মহীন ও অপমানজনক অবস্থার মধ্যে ফেলে। নতুন সরকারের তাবেদার আমলারাই এই তালিকা তৈরি করে সরকারকে দেন তালিকাভূক্তদের ‘ওএসডি’ করতে, তাদের পদোন্নতি বন্ধ করতে, কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ন্যস্ত করতে। আমাদের সহপাঠি ও বন্ধু আমলাদের অনেকেই এ ধরনের অবস্থার শিকার হয়েছেন। ‘ওএসডি’ থাকা অবস্থায় একাধিক সচিব বন্ধু মারা গেছেন, অনেকে ‘ওএসডি’ অবস্থায় অবসরে গেছেন। এটি অন্যায় কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের বহু দেশে কোনো দল ক্ষমতায় আসা মানেই প্রতিপক্ষ দলের ক্ষমতায় থাকাকালীন প্রশাসনের খোলনচে পাল্টে ফেলা। বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে যদি প্রশাসনকে নিজেদের মত করে সাজাতেই পারে।

এরও ব্যতিক্রম ঘটে কখনও কখনও। কবি ইশ্বর গুপ্তের “এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ, তবু রঙ্গে ভরা।” এই বঙ্গদেশে জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত সমর্থক হওয়া সত্বেও সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নানকে কোনো সরকারের আমলেই এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। বরং সব দলের সরকার তাঁর ওপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে। এমনকি আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি তদারকিতে তিন বা পাঁচ সদস্যের দুর্নীতি বিরোধী যে টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছিল, শাহ আবদুল হান্নান ছিলেন সেটির প্রধান। ওই সময় একবার দেখা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও আমার মাঝে আর কোনো ব্যক্তি নেই।’ তিনি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসে অটল থেকেও সততা ও কর্মনিষ্ঠা দিয়ে তাঁর বিশ্বাসের পরিপন্থী রাজনৈতিক সরকারের আস্থা অর্জনের ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নজীরবিহীন বলা চলে। কিন্তু সকলের আস্থা অর্জনে তাঁর সফলতার পেছনে কারও বিরাগভাজন না হওয়া ও বৈরিতা সত্বেও আপোষ করে চলার নীতি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল বলে আমার বিশ্বাস।

কয়েক বছর আগে টেলিফোনে শাহ আবদুল হান্নানের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। তিনি আমার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান পছন্দ করেননি। দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য তাগিদ দেন। তাঁর তাগিদ মানে সিদ্ধান্ত ঘোষণার মত। ২০১০ সালে আমি যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসার পরও তিনি একইভাবে বলেন, ‘আমেরিকায় তুমি কী করবে। তোমার কাজের জায়গা বাংলাদেশ। অহেতুক আমেরিকায় সময় নষ্ট করছো কেন। ঘুরেফিরে চলে আসো। আমি বলবো, তুমি কী করবে।’ আমি তাঁকে ইয়েস, নো কিছু বলিনি। আসলেও আমেরিকায় আমার করার কিছু নেই। এখানেও সাংবাদিকতাই করি, যাতে আমাকে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা পরিচয়ের সংকটে ভুগতে না হয়। কিন্তু যা করি সেটি আমার ধারার সাংবাদিকতা নয়। এখানকার কমিউনিটি সাংবাদিকতা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ধারা অনুসরণ করে চলে না, আমেরিকার ধারাও অনুসরণ করে না। কমিউনিটি সাংবাদিকতার স্টাইল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের দামী এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ওপর সামান্য কিছু পড়াশোনা এবং বেশ কিছু সেরা আমেরিকান সাংবাদিকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ও মতবিনিময়ের পর অন্তত এটুকু উপলব্ধি করেছি যে, নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশী-আমেরিকানদের কেউ যদি আমেরিকান সাংবাদিকতা করতে চায়, তাহলে তাদের পক্ষে হয়তো এখানে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব, আমার মত কেউ এদেশে সাংবাদিকতা করতে চাইলে তার পক্ষে বড় জোর কপি এডিটর হওয়া সম্ভব; যাকে আমরা আমাদের দেশে প্রুফ রিডার বা সম্পাদনা সহকারী বলি। অতএব আমি আমেরিকায় সাংবাদিকতা করার স্বপ্নও দেখিনি, ‘আমেরিকান ড্রিম’ও আমাকে আমেরিকায় আটকে রাখতে পারেনি। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮৯ সালে আমি দেশে ফিরে আমার পুরনো কাজেই যোগ দিয়েছিলাম। শাহ হান্নান ভাই সবই জানতেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে রাজস্ব ভবনে তাঁর অফিসে গিয়ে অনেক কাগজপত্র সত্যায়িত করিয়ে নিয়েছি। তিনি তখন জয়েন্ট সেক্রেটারী পর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তা। কঠোর সততার কারণে তাঁর সুনাম ছিল এবং রাজস্ব বিভাগের ছোটবড় সকল ঘুষখোর কর্মকর্তারা তাঁকে সমীহ ও ভয় করতেন। দেশে ফেরার পর আমি আমার আমেরিকান অভিজ্ঞতা তাঁকে শেয়ার করি। আমার দেশে ফিরে যাওয়ায় তিনি উচ্ছসিতভাবে ধন্যবাদ জানান।

হান্নান ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার এক বছর পর ১৯৭৫ সালে। তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য বিজয় নগরে এক সরকারি আবাসিক ভবনের নিচতলায় তাঁর বাসায় আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আমার সহপাঠি বন্ধু আবু তাহের ভাই। তখন তিনি প্রারম্ভিক পর্যায় থেকে এক স্তর ওপরের রাজস্ব কর্মকর্তা হলেও আমার কাছে বেশ বড় কর্মকর্তা। কারণ মফস্বল শহরে বড় হওয়া আমি ম্যাজিষ্ট্রেটের চেয়ে বড় কোনো কর্মকর্তা দেখিনি বা সে ধরনের কোনো কর্মকর্তার কাছে যাইনি। তিনি নিজেই তার সন্তানদের পড়াচ্ছিলেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময়েও ওদেরকে বলেন ভালোভাবে পড়াশোনা করতে, যাতে আমাদের মত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে। বাসায় কাজের লোক বলে কেউ ছিল না। নিজেই ওঠে গিয়ে চা-নাশতা আনেন। বন্ধুর মত কথা বলেন আমাদের সঙ্গে। কোনো প্রয়োজনে সংকোচ না করে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ১৯৭৭ সালে সাংবাদিকতা শুরু করার আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করার আর কোনো প্রয়োজন হয়নি। সাংবাদিকতার সূত্রেই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্টতা বেড়ে চলে। কখনো কোনো তথ্য পাওয়ার জন্য তাঁর কাছে যাই, কোনো তথ্য জাতীয় স্বার্থে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়া উচিত মনে করলে তিনি নিজেই ফোন করে তাঁর অফিসে যেতে বলেন।

রিডার্স ডাইজেস্ট পড়ার সময় থেকে আমার মাথায় একটি মাসিক ম্যাগাজিন বের করার চিন্তা কাজ করেছে। জার্মানিতে এক প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৮৩ সালের শেষদিকে দেশে ফেরার পর আমি ম্যাগাজিন বের করার প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করলেও নানা কারণে তা থেমে গিয়েছিল। এমনকি আমার মনের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে ব্রিটিশ হাইকমিশনের এক বিজ্ঞপ্তি দেখে আমি সাংবাদিকতা ছেড়ে হাইকমিশনের তথ্য অফিসার পদের জন্য আবেদন করি। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা হয় এবং তাদের নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ লাভের জন্য শর্ট লিষ্টেট হই। আমার সঙ্গে পরীক্ষা দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেক্ট্রিক্যাল বিভাগের আমার পরিচিত এক সহযোগী অধ্যাপকের স্ত্রীও শর্ট লিষ্টেড হয়েছিলেন। তার গাড়িতেই বাসায় ফিরি এবং পথে উনি আমাকে বলছিলেন চাকরিটা আমারই হবে; আমি তাকে বলছিলাম, না তারই হবে। ততোদিনে সাংবাদিকতায় আট বছর কাটিয়ে দিয়েছি। পেশার প্রতি এক ধরনের আবেগ জন্মেছে। মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করে পরদিন আমি ব্রিটিশ হাইকমিশনে সংশ্লিষ্ট অফিসারকে বলি আমাকে শর্ট লিষ্ট থেকে বাদ দিতে।

আমার ম্যাগাজিন প্রকাশের আগ্রহ বেড়ে যায় এবং আমার বিশ্বাস ছিল এ ধরনের একটি ম্যাগাজিন অবশ্যই ভালো বাজার পাবে। ১৯৮৬ সালের প্রথম থেকে আমি ‘নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট’ নামে মাসিক ম্যাগাজিনের জন্য ডিক্লারেশন চেয়ে আবেদন করি। প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী সংবাদপত্র প্রকাশ করার জন্য ডিক্লারেশন দেওয়ার এখতিয়ার ডেপুটি কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের। কিন্তু ওই সময় এই প্রক্রিয়াকে এত জটিল করে রাখা হয়েছিল যে আবেদনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জেলা প্রশাসকের অফিস পর্যন্ত পৌঁছার আগে তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) ও ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্মস এন্ড পাবলিকেশন্স (ডিএফপি), পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার ছাড়পত্রের প্রয়োজন হতো। তখন দেশে জেনারেল এরশাদের একনায়কতন্ত্র চলছিল। কোনো প্রভাবশালী আমলা ছাড়া এতগুলো সরকারি দফতর থেকে ছাড়পত্র আদায় করা কঠিন ব্যাপার। বেশ ক’জনের সঙ্গে কথা বলার পর একজন আমাকে বললেন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর পরিচালক (অপারেশন) শহীদুল আলমের সঙ্গে কথা বলতে। তিনি একজন ডাকসাইটে আমলা।

ওই সময় দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক ছিলেন শাহ আবদুল হান্নান। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্টতার কারণেই আমি তাঁকে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ধরনের আমলা বলেই জানতাম। কোনো সরকারি অফিসে তাঁকে তদবিরের কথা বললে তিনি এড়ানোর চেষ্টা করবেন বা অন্য কাউকে দেখিয়ে দেবেন। অতএব শহীদুল আলমের সঙ্গে কথা বলি এবং তিনি দেখা করতে বললে আমি দেখা করি। আমার প্রয়োজনের কথা জানাই। যেখানে যাকে ফোন করা প্রয়োজন তিনি ফোন করে আমার কাজে সহযোগিতা করতে বলেন। আমি সংশ্লিষ্ট অফিসারদের সঙ্গে দেখা করে আমার কাজ এগিয়ে নেই। ম্যাগাজিনের জন্য ডিক্লারেশন পাওয়ার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে শহীদুল আলমের সঙ্গে আমার ঘনিষ্টতা বেড়ে চলে। দুর্নীতি দমন ব্যুরোর পরিচালক-অপারেশন হিসেবে শহীদুল আলম অসীম ক্ষমতার অধিকারী। কোনো পদক্ষেপ নিতে তাঁকে কারও অনুমতি গ্রহণ করতে হতো না। দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে তাদের প্রায় সবাই খ্যাতিমান ব্যক্তি। কোনো না কোনো সময় তারা সরকার, প্রশাসন, অর্থনীতির কলকাঠি নেড়েছেন এবং প্রায় ক্ষেত্রেই এবং প্রায় সময়ই তাদের “তুই আমার কী ছিঁড়বি” হাবভাব। আসলেও কেউ তাদের কিছু ছিঁড়তে পারে না। শহীদুল আলম এমন সব ব্যক্তির গ্রেফতারের আদেশ দিতে শুরু করেন, যারা সকল সরকারের আমলে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। তিনি আমাকে ফোন করেন, ‘আজ আসুন, ভালো খবর দেব।’ আমি যাই। কাকে গ্রেফতার করার আদেশ দিয়েছেন বলেন। আমি বলি, ‘তাাদের তো আটকে রাখতে পারবেন না। বরং আপনি তাদের শত্রু হবেন।’ তিনি পরোয়া করেন না। তার বক্তব্য, ‘আমি জানি, তাদের কাউকে একদিনের বেশি আটকে রাখতে পারবো না। আমার উদ্দেশ্য, তাদেরকে সামাজিকভাবে পরিচিত করা যে, তারা দুর্নীতিবাজ। সেজন্য তাদের একদিন থানা হাজতে রাখতে পারাই যথেষ্ট।’

আমার রিপোর্ট সংগ্রামে প্রকাশিত হয়। লোকজন আমাকে প্রশংসা করে। ব্যুরোর মহাপরিচালক আমাকে ফোন করে বলেন, ‘শহীদ কোনো ইনফরমেশন দিলে আমার সাথে কথা বলে নিয়ো।’ শাহ হান্নান অত্যন্ত নরম প্রকৃতির ও ঝুঁকি এড়িয়ে চলার মানুষ। সকল পক্ষকে খুশি রেখে কাজ করেন। আমি জানি, তাঁর সাথে কথা বললে আমার রিপোর্ট প্রকাশিত হবে না। অতএব আমি তাঁর সাথে কথা বলি না। ওই সময়ে দুর্নীতি দমন ব্যুরো ঘোরাফেরা করে উপলব্ধি করতে কষ্ট হয় না যে, এই রাষ্ট্রয়ি প্রতিষ্ঠান আসলে নখ ও দাঁতবিহীন কাগুজে বাঘ। সংবিধানে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে বলেই এর অস্তিত্ব আছে। কোনো দুর্নীতপরায়ণ সরকারি অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যুরোকে অবশ্যই প্রেসিডেন্টের অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া সরকার যদি কারও ওপর থেকে অভিযোগ বা দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করতে চায়, তাহলে কোনো কারণ না দর্শিয়েই তা করতে পারে। অনেক মামলা করা হয় শুধু রাজনৈতিক কারণে এবং এ ধরনের ক্ষেত্রে ‘এফআইআর’ বা প্রথম তথ্য প্রতিবেদন তৈরি করা হয় শুধু রাজনৈতিক চাপ দিয়ে। অভিযুক্তরা এমন রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে যাতে চার্জশিটে তাদের নাম অন্তর্ভূক্ত না করা হয়। এফআইআর এ যাদের নাম থাকে না, এমন নামও ব্যুরোর দুর্নীতিবাজ অফিসাররা নিজেদের এখতিয়ার খাটিয়ে ঘুষ আদায় করতে তাদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভূক্ত করতে পারে। পুলিশ যেমন কোনো ঘটনায় অজ্ঞাত সংখ্যক ব্যক্তিকে আসামী করে চার্জশিট তৈরি করে যে কোনো লোককে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে, দুর্নীতি দমন ব্যুরোর চার্জশিটেও তা করা হয়। ব্যুরোর অভ্যন্তরে এ ধরনের দুর্নীতি রোধ করতে একজন সৎ ও কর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে মহাপরিচালক শাহ আবদুল হান্নান কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেননি। এমনকি পরিচালক হিসেবে শহীদুল আলম যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করছিলেন তাতেও তাঁর কোনো সমর্থন বা সহযোগিতা ছিল না। শহীদুল আলম যখনই কোনো স্পর্শকাতর দুর্নীতি মামলা শুরু করার উদ্যোগ নিতেন তখন সংশ্লিষ্ট মহলগুলো থেকে তাঁর বিরুদ্ধে যারা কথা বলতেন মহাপরিচালক শাহ আবদুল হান্নান তা শুনতেন এবং এর ফলে দু’জনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিও সৃষ্টি হয়েছিল। শাহ হান্নানের প্রক্রিয়া ছিল সহজ সরল, যা আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। তিনি অভিযুক্তদের তার অফিস রুমে তলব করতেন এবং তারা ভবিষ্যতে আর দুর্নীতিতে জড়িত হবে না মর্মে তওবা পড়াতেন বা শপথ উচ্চারণ করিয়ে অভিযুক্তদের ছাড় দিতেন।

আমার ব্যাপারে তিনি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। আমিও তাঁকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতাম। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ‘ভ্যাট’ বা মূল্য সংযোজন কর চালু করার উদ্যোগ নিলে এর মুখ্য দায়িত্ব দেওয়া রাজস্ব বোর্ডের সদস্য শাহ আবদুল হান্নানকে। ‘ভ্যাট’ আদায় শুরু করার আগে এই নতুন কর ব্যবস্থাকে সর্বমহলে পরিচিত করে তোলার উদ্দেশ্যে বেতার-টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা করা। প্রথম যে টেলিভিশন প্রোগ্রামটি হবে সেটি আমাকে সঞ্চালনা করতে হবে বলে শাহ হান্নান ভাই আমাকে ফোন করে জানান। বাংলাদেশে তখন টেলিভিশন বলতে ছিল বিটিভি। আমি অর্থনৈতিক বিষয়ক রিপোর্ট করতাম। ১৯৯০ সালে পাকিস্তান ভ্রমণে গেলে ইসলামাবাবাদের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে বাংলাদেশের ছাত্র ফজলুল হকের কাছে ‘ভ্যাট’ সম্পর্কে প্রথম শুনি। আমার আগ্রহের কারণে সে আমাকে ভ্যাট বোঝায় এবং পাকিস্তানে ভ্যাট চালু হওয়ার পর রাজস্ব আয়ে ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানায়। ঢাকায় ফিরে আমি এ সম্পর্কে রিপোর্ট করেছিলাম। হান্নান ভাইয়ের সেটি মনে ছিল এবং বিটিভি’র ভ্যাট সংক্রান্ত প্রোগ্রামের সঞ্চালনার জন্য আমার কথা ভাবেন। এতে আমার আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমি আনন্দিত হতে পারিনি। কারণ দু’চার লাইন সোজা করে লিখতে পারলেও কথা বলতে আমি কখনও পারঙ্গম ছিলাম না। এখনও নই। কথা আটকে যায়, আমি ঘামতে থাকি। হান্নান ভাই আমাকে ধমক দেন। কাজটি আমাকেই করতে হবে। আমি সেগুনবাগিচায় রাজস্ব ভবনে তাঁর অফিসে যাই। আমার ওজর-আপত্তি বলি। তিনি নাছোড়বান্দা। প্রোগ্রামে অংশ নেবেন আট জন। রাজস্ব বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিবৃন্দ। আমাকে ক’দিন পর্যন্ত ভ্যাট বোঝান, কী কী প্রশ্ন করতে হবে বা করা উচিত তা শিখিয়ে দেন। যাহোক, কোনোভাবে আমি কাজটি সম্পন্ন করি এবং হান্নান ভাইকে বলি লেখার কাজ ছাড়া কথা বলার কোনো কাজে আমাকে স্মরণ না করতে। তিনি হেসে আমার কান ধরে টানেন। এভাবে স্নেহের স্পর্শ করতেন আমার এক ভাবি শেরপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মরহুমা ফেরদৌস জাহান।

‘মাসিক নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট’ ইতোমধ্যে দেশজুড়ে পাঠকপ্রিয় ম্যাগাজিনে পরিণত হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী সংসদের ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র তিনটি আসনে জয়ী হয়। এটি ছিল কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম নির্বাচন। কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে জামায়াত ১৯৮১ সাল থেকে সোচ্চার ছিল। পরবর্তীতে তা বিএনপির বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে কেয়ারটেকার সরকারের বিরোধী ছিলাম। দুনিয়াজুড়ে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশে কেন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তা আমি কখনও মেনে নিতে পারিনি। অতএব নির্বাচনের পর কেয়ারটেকার সরকার ও জামায়াতের নির্বাচনী ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে ঢাকা ডাইজেস্টে লিখতে শুরু করি। এর পরিণতি হিসেবে ওই বছরের অক্টোবর মাসে সংগ্রাম থেকে আমাকে চাকুরিচ্যুত করা হয়। তাতে আমার জামায়াত বিরোধী লেখা থামেনি। শাহ হান্নান ভাই আমাকে ফোন করেন। আমার সমালোচনামূলক লেখা তাঁকে আহত করেনি, বরং আমার সঙ্গে সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ ও কিছু জামায়াত নেতার আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং আমাকে ডেকে কারও প্রতি ক্ষুব্ধ না হতে ও কাউকে বদদোয়া না করতে বলেন। আমি ক্ষুব্ধ ছিলাম না এবং কোনো দোয়া কিছু হয় বলেও বিশ্বাস করতাম না। আমি নিজেও কারও কারও জন্য দোয়া উচ্চারণ করি, তা বিশ্বাস থেকে নয়, নিতান্তই অভ্যাসবশত। দোয়ায় কাজ হলে আমি তখন বেশ কয়েকজনের ধ্বংস কামনা করতাম।

আমি বাংলাবাজার, মানবজমিনে কিছুদিন কাজ করার পর যখন দৈনিক বাংলার বাণীতে বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই হান্নান ভাই আমাকে ফোন করেন তার সঙ্গে দেখা করতে। আমি দেখা করি এবং তিনি আমাকে ইসলাম গ্রুপের অর্থায়নে জাহিদুজ্জামান ফারুক সম্পাদিত দৈনিক অর্থনীতিতে বার্তা সম্পাদক পদে যোগ দিয়ে তাঁর বাসায় আমার স্ত্রীসহ ডিনার করতে বলেন। বাংলার বাণীর পাশেই বাংলাদেশ বিমান অফিসে দৈনিক অর্থনীতির অফিস। আমি জাহিদুজ্জামান ফারুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও অর্থনীতিতে যোগ দেব বলে সম্মতি দেইনি। দু’দিন পর হান্নান ভাই আমাকে আবার ফোন করলে আমি বাংলার বাণীতেই ভালো আছি বলে জানাই। কিন্তু তিনি আমার কল্যাণকামী ছিলেন। ক’দিন পর আবার ফোন করেন সেক্রেটারিয়েটে তার অফিসে সাক্ষাৎ করতে। তিনি তখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব। আমাকে বেক্সিমকো মিডিয়ার কোনো একটি দৈনিকে যোগ দিতে বলেন। দেখা করতে বলেন বেক্সিমকো মিডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল আহমদের সঙ্গে । তিনি একটি ফাইল হাতে নিয়ে বলেন যে বেক্সিমকোর ২০০ কোটি টাকার একটি প্রজেক্ট কাল অনুমোদন হবে। সালমান এফ রহমান তাঁর কাছে আসবেন, তাকেও তিনি বলবেন আমাকে নিয়োগ দিতে। আমি ধানমন্ডির দুই নম্বর সড়কে ইকবাল আহমদের অফিসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। অন্যান্য কথার মধ্যে তিনি জানতে চান যে আমি শাহ আবদুল হান্নানকে কীভাবে জানি। এতদিন ধরে সাংবাদিকতা করি, একজন সচিবকে কীভাবে জানি এটা কোনো প্রশ্ন হতে পারে না। সম্ভবত তিনি জানতে চাইছিলেন আমি শাহ হান্নানের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে জড়িত কিনা। আমি জড়িত ছিলাম না। অতএব ইকবাল আহমদের প্রশ্ন আমার কাছে ইঙ্গিতপূর্ণ মনে হয়েছে। আমি তাঁকে বলি, হান্নান ভাই বলেছেন বলেই তাঁর সম্মান রাখতে আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। চাকরির জন্য জন্য নয়। আমার নিজের পরিচয়ই যথেষ্ট বলে মনে করি। আমি চলে আসি। হান্নান ভাই হয়তো বিষয়টি জেনেছিলেন। আমাকে ফোন করে বলেন, এতটা সেনসিটিভ হলে চলে। আমি তাঁকে বলি, আপনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন, আমিও আপনাকে শ্রদ্ধা করি। আশা করি আমি আমার নিজের যোগ্যতায় চলতে পারবো। মাঝে মাঝে আমার জন্য আপনার দরজা খোলা রাখবেন। ১৯৯৮ সালে তিনি সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

২০০১ সালে বাংলার বাণী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) এ যোগ দেই। হান্নান ভাই ফোন করে আমাকে শুভেচ্ছা জানান। এরপর তাঁর সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। তাঁর মৃত্যুতে আমি আমার একজন পরম শুভাকাঙ্খী হারিয়েছি।