বাদ্যযন্ত্র

সকালে নিজেকে বাদ্যযন্ত্রের মতো মনে হল, ভালো করে বাজালে সুর উঠে
চাষাবাদ করলে সব মাটিই সবুজ, এই প্রাণও এক আকাশ পাখির ঝাঁক
আমি টিয়া কাকাতুয়া ময়না বুলবুলির মতো গায়ক পাখি এবং ময়ূর ময়ূরীও হয়েছি
বলতে ইচ্ছে করল রাতদিন যা কিছু ঘটে, আমার দেহের সাথে তার সম্পর্ক বিস্তর
সাধনায় চোখ ধুয়ে যায়, ধরা পড়ে কতগুলি ছিদ্র থাকে শরীরে
আজ দেখলাম নিজেকে, নিজেকে নিজে আদর!

ঘুম ভেঙে উঠে আমার অঙ্গে আমি হাত রাখি, বাজতে থাকে সকাল দুপুর সন্ধ্যায়
সব অক্ষর ঝরে যায় কাজে নামে,তৈরি হয় স্বপ্নের গন্ধ পর্বত্র
আমি ক্রেতা আমি বিক্রেতা ভালোবাসা হাঁটছে আমারই হাত ধরে, এ এক রহস্য এ্যালবাম
মানুষের ভেতর মানুষ আছে বাতাসের মধ্যে যেমন চন্দন, সেই তার এখন বেঁধে দিলাম।

শরীর-রক্ত আপনা থেকেই নিঃশেষ হয়ে যায়, দিন দিন নষ্ট মনের নষ্ট দেহের শশ্মান কবর
যমুনায় কলস ডোবালেই হয় না, চাই কদম তলার মুখ কৃষ্ণ সুখ
ভৈরব এক শুদ্ধ সকাল, বাদ্যযন্ত্রের মতো নিজেকে বাজালে আপনা থেকেই মানবে আঁকা হবে দীঘি পদ্মের কোরক।
…………………………………………..

ভিখারি

রঙ তুলি নিয়ে বসেছি,আঁকছি আমার মায়ের মুখ
তুলি বুলিয়েই যাচ্ছি এক মুখ থেকে আর এক
শেষই হয় না, গর্ত থেকে যেন বেরিয়ে আসছে পিপিলিকা
সতী একান্ন খণ্ডে ভাগ হয়েছিল, মা কত খণ্ড হবে
মুখ আঁকতেই আমি ক্লান্ত হাত পা অসাড়, দিন অবসানের আগুন দেখতে পেলাম
এখনো চোখ নাক চুল ঠোঁট ও শরীর বাকি !

মা যত কথা বলেছেন তা এক এক ঠোঁটের শব্দ, তাঁর অজস্র চোখের নজরদারিতে ছিলাম
ঝড় বাতাস গচ্ছিত আছে নাকে চোখে মেঘ রোদ, এত ফুল ফল লতা পাতা আঁকা যায় না কি
রঙ শেষ হল তুলি ছিঁড়ে গেল কাগজ শেষ-
সাগরের তলায় কি আছে,মাথার উপর আকাশ আর কতদূর
মাঝখানের পৃথিবী আঁকতেই ভিখারি আমি !

রঙ মিস্ত্রী আরো রঙ তৈরি করল, তুলি গড়ে জীবনযাপন যাদের তারা ধনী চেতনার রঙে সন্ন্যাসী ক্রমশ স্ফীত হয়েছে চৈতন্যে
কৃষ্ণ উৎসব শুরু হল, যেখানে জল নেই রাধা ছুটে যায় জল চাই
মিস্ত্রী জলে রঙ দাও, রঙ শেষ হয়ে যাচ্ছে
আমার মায়ের মুখ আঁকাই হল না, শরীর গড়বো কিভাবে !

দোলনায় আছি,শুধু আঙুলের স্পর্শেই দোলনার পৃথিবী ঘুরছে
এক জন্মে জননী দেখা হল না আমার !
…………………………………………..

নির্মাণ

আমার ফুল হয়ে ফোটা তোমার নয়,আমার জন্য আমি মোহর
এই দেহ মাটিতে মিশে তোমাদের শোক করার নেই, আমার প্রয়োজনে শীতল
একটি জন্মের জন্য সময় বদলায় পালটায় প্রকৃতি, আমারও পরিবর্তন প্রেম প্রসঙ্গে
আসলে দিনভর রাতভর আমি আমাকেই ভাঙছি, দেখছি ঘর কোথায় ঘর-বর
যেদিন হবে আকৃতি,সেদিনই ডাকবো তোমাদের হরষ-ভূষণে
এই সুন্দরের স্বাদ যদি দেওয়া যায় শস্য ও ঘ্রাণে।

প্রতিদিন আমি একটু একটু মায়াহীন হতে থাকি,কারণ ছায়াগুলি সব রাত
তোমরা ভেবো না আমি যন্ত্রণার আবর্তনে ঝরণা হয়ে যাচ্ছি,সমুদ্রই তো আসল স্বাদ
বনের ভেতর আমি আমার মতো উপকথা,কখনো অধর কখনো নধর লাল সবুজ
পোড়ো হওয়ার বাসনায় কুমোর কামারে ঘোরাঘুরি, আমার জন্যই আমি লতা ও অবুজ।

ঢেউগুলি জানে কোথায় যাবে গর্জনে তুফান তারা, তোমাদের লক্ষ্যে নয় প্রবাহে
যে যাকে ভালোবাসে জল ভরে ঘাটে, তারই ইচ্ছাধীন আকাঙ্খা জাগে আকাঙ্খা ভাবে
অনেকে ঐশ্বর্য ফেলে ঝুলি ভরেছে শিশিরে, আমাকেও ভেবে নাও তাদেরই মতো কেউ এক
তৃষ্ণায় শস্যক্ষেতে শুয়ে আছি তোমাদের নয়, আমার জন্য আমি পৃথিবীতে প্রহর
দেখছি তাঁর নিকটে আসতে কত সময় কত যুগ-
ফুল ফলের মতো হলে মনও কাজ করে, বহু মৃত্যুর পর সহজেই ঈশ্বর নির্মাণ সম্ভব।
…………………………………………..

বন্ধু

বন্ধু লিখেছে বাড়িতেই আছি যখন খুশি এসো, বৃষ্টির পরে রৌদ্র
সাত সমুদ্রের জল জড়ো করা আছে, যতটা নেওয়ার নেবে
দুঃখের ভাগ তোমায় দেবো বলে বসে আছি, নিরুদ্দেশে যাব না
সকালেও আসতে পারো অথবা বিকালে, লাল রঙ ভাসিয়ে দেবে যখন বৃক্ষ লতা
আমার ভাণ্ডারে সমূহ আলোছায়া তুমি না এলে কার হাতে দিই
হৃদয় নিয়ে এসো চোখে চোখে শুধু উচ্চারণ, তার বাহিরেও অনেক অক্ষর বরফ থেকে অগ্নি।

বন্ধু লিখেছে ছয়টি ঋতু নয়, প্রতিদিনই সহস্র ঋতু সময় পালটায়
প্রতি সেকেণ্ড মুছে দিচ্ছে অতীত সন্ধ্যা আরতি, যৌবন-জরায়ু অবিরাম ব্যস্ত
মাঝিও ভাসানে ভেসে চলে, সমুদ্রের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সংবাদ
যখন খুশি এসো, সেই শরীরের মাংস পাবে আকাশ জুড়ে খেলা
রাখা যায় না জলের ঢেউ আসে আর যায়, মায়া নয় ছায়াবেলা।

বন্ধু লিখেছে চেপে ধরেছি নিজেকে, তুমি আসবে বলে দৃঢতা
পড়শিরা চলে গেল সূর্য উঠলে যেমন শিশির লুকায়, সেইমতো সহজ চলা
খেলতে খেলতে বড় হয়ে যায় শিশু, চাঁদ দেখে না তখন সাড়ে তিন হাত জমি
বাড়িতেই আছি যখন খুশি এসো, তোমার জন্য চারপাশে আছে অনির্দিষ্ট ভূমি।
…………………………………………..

আগুন

আমি ক্ষুধার্ত কিছু অন্ন দাও
আঁচল পাতলাম একে একে সকলে আমায় বাঁচাতে ছুটে এল
কেউ ভাত ঢেলে দিল কলাপাতায়, কেউ বা আমিশ নিরামিশের হাজারদুয়ারী পদ।
আমি বললাম বাঁচতে দাও, এত ক্ষত সহ্য করতে আমি অপরাগ
জল খাবে, জল ?কারো কণ্ঠস্বরে বড় মায়া, কেউ বলল ছায়ায় এসো তোমার ছায়া দরকার।
সংসারে এখনো আশা ভালোবাসা আছে, অনেকেই হাজির
পোশাক ছিঁড়েছে দেখে জামা কাপড়ে সাজাতে চাইছে কিছুজন
কেউ দেখছে না, আমার কণ্ঠ কিন্তু ক্ষীণ হয়ে আসছে ক্রমশ।

সমস্ত কিছু পড়ে আছে আমার সামনে
ভাত তরকারি ছায়া মায়া পোশাক পরিচ্ছদ সবই, আমার চারপাশে ভূমি চারপাশে বটবৃক্ষ―
লজ্জ্বা নিবারণের ছাল, যা দিয়ে নিম্নাঙ্গ ঢাকা যায়
মানে একটি সংসার, বিছানা খাট কীট পতঙ্গ উঁইপোকা ও সুখ ও দুঃখ নিয়ে হাজির সকলে
তারা আমাকেও দেবে এমন মহার্ঘ বস্তু, আমি যে ক্ষুধার্ত !

আমি বাঁচতে চাই তোমাদের লালসা থেকে বাঁচাতে চাই, ইঁট কাট লোহা নিয়ে আমি কি করবো
আমি ক্ষুধার্ত খুব, পূজার জন্য লাগবে আমার আগুন কিছু।
…………………………………………..

অন্ন

পড়ে যাওয়ার ভয় বলেই উড়তে থাকি, ভয় খেয়ে সাহস হল
জল খাল বিলে যাবে, এই ভয় কাটিয়ে নদী চলল সোজা হয়ে
মৃত্যু মনে করে চার দেওয়ালে দেওয়াল, মৃত্যুর জন্য লুকোচুরি
তাকে খাবে ভয়ে কামারের হাতে নতুন অস্ত্র, সাহসে সকাল হল
খাদ্য নেই তাই ভয় আমারও বীজ ধান, রোপন করে জল দিই
যেমন জলে মাছ ছেড়ে ধরে ধরে ভক্ষণ সেই।

জীবনে অনেক ব্যথা তাই বিচ্ছেদ বড় বেশি, যন্ত্রণা ভুলে মিলন
আমাকে কেউ ভরা নদী দেয়নি যে জল ঢেলে স্রোত মাট ভরাবে
তাতে বন্যার ভয়, সে তো সাহসই তুলে রাখে মাটিতে পলিতে
ভয় খেয়েই আমার সাহস জায়গা খোঁজে, খড়কুটোর ঘর রৌদ্রে রৌদ্রে নাচে।

ছায়া মায়া আমাকে খায় সকলেরই ভয়ের শিরা
আমি নিজে কি খাব
মায়া ক্ষেতই আমার ক্ষুধার অন্ন, বাঁচার জন্য অন্ন চাই
পুষ্ট হয়ে উড়ে যাব।
…………………………………………..

বাউল

এক পৃথিবীর জন্য মাটি কোপাও জল দাও পৃথিবী হয়ে থাকো
মাঠ পারাপার ইচ্ছেগুলি দাঁড় করিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাই খাওয়াই
বহুকাল আগে থেকে গুহামুখ আলোর দিকে রেখেছি, পরস্পর নির্ভর করেছি
শরীর জুড়ে ভূমিক্ষয় তাকেও পরামর্শ দিলাম বৈষ্ণব হও, রক্তমাংসে অরুচি
একটি ফুলের জন্যই অজস্র কাগজের ফুল, কাঁচি দিয়ে কাটি আর ভাসি জলে জল সংকীর্তন প্রীতি।

অন্য কথা যারা বলে তারাও সাম্রাজ্য গড়েছে এক কন্যার লোভে ও অভ্যাসে
ইতিহাস কত কাগজ নষ্ট করে, ইতিহাসই ফেলে এবং প্রতি বপনের বীজ বাছে
সেদিন দেখি নিজেকে কম দামে বিক্রি করে লাভ হয়নি বলে বিষণ্ণ তুমি
জীবনের যুদ্ধ জীবনের সঙ্গে, মরণের সংলাপ মরণের কাছে কেউ সরে দাঁড়াই নি।

আমার সুখের প্রহর দুঃখকে দিয়েছি, দুঃখের কাঞ্চন এনে আগলে রাখে শরীর
এক পৃথিবীর জন্যই অনেক ধুলোর পৃথিবী গড়ে নিয়ে আমি বাউল নাগরিক।
…………………………………………..

স্কুলের ঘণ্টা

খেলাধুলা করার কিছু সরঞ্জাম তোমাদের বলি
পুতুল খেলতে খেলতে পুতুল হয়েছ জানি, বর বউ চিৎকারে জেগে গেছে পাড়া
এ আগুনের স্বাদও অনেক বছরের পুরানো।
আর কি কি ছিল খেলার খেলা ?
চুষিকাঠি চোষা ছেলে ভুলানো, সেই থেকে শোষণ রোগ
ঠাকুরের কলা বাজারে বিকোয় প্রচুর, আমিও কখনো-সখনো এনেছি দু চারখানা
ভয়ে প্রদীপ জ্বালা হয় নি সাহস ছিল না
তবু কচু কাটার খড়্গ দেখে ফেলেছে একজন,চুষি কেড়ে স্তনে মুখ গুঁজে দিয়েছেন।

লেবুপাতার মতো শরীরে প্রচ্ছদ আছে, পাতার গন্ধ এমনই তেল মাখা হয় নি কোনদিন
কাঁচের শিশি ভেঙে গেছে, তেল পড়ে ছিল উঠানে
কাঁচ টুকরো কখনো অহিংস নয়- তাই
বাবা মাটির গোড়ায় পুঁতে দিতেন ধারালো দাঁতগুলি
হাতে ছিল তার মাদুর বিছানো ফ্ল্যাট, ফ্লাটে ভাঙা চাঁদ গোটা চাঁদ
থালায় নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়েছি বাঁশের ডগা ,বকুল গাছ গুড়ের পাটালি শ্রাবণ মাসের থৈ থৈ জল।

খেলার কোনো জিনিসই “সখের বাজার” থেকে আসে নি
আম মুকুল সজনে ডাঁটা, ফুল বলতে শিমুল আর মুক্তো বার করে নেওয়া সমাধিস্থ ঝিনুক খোল
তা দিয়েই স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে দিতাম প্রতিদিন।
…………………………………………..

বাড়ি

আমাদের বাড়িটা খুব অন্ধকার
কথা ছিল মা এখানেই সীমাহীন জ্যোৎনায় মিশে সারাদিনের গল্পকথা রাতকে শোনায়
গল্প জানে কার হাত ধরে সে বেশি রূপসী, কথারা কার স্বপ্ন খোঁজে বাড়ি বানায়।
আলোর রেখা ভাসছে বাঁশ বাগানের কোণে, তাকে ধরে আনি জল ভরে দিই কুঁয়োতলার উঠানে।
এইখানে বসো, আমার খোলা চুলের ওড়না দেবো জোনাকির ঝিঁকিমিকি গোপনে।
মা বলবে একটা রাত নৈবেদ্য এনে সাজিয়ে দিলে, তোর বাবা কি আর শশ্মান ছবি আঁকতে পারে !

মা আসবে ভেবে সারাবেলা একটা দিন নিঃশব্দে এঁকে যাই ঘর ভর্তি তারই ছবি
সরিয়ে দিলাম যুদ্ধ জাহাজ অস্ত্রাগার নিয়ে যাই মাটির নিচে, এখন নির্জন নির্ভয়ে তৃপ্ত হয় প্রাচীন কোনো শস্যবীজ।
ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে বৃক্ষ জেগে থাকে, বনভূমি চাঁদ একাকী নদীর পাশে এসে বসেছে
শৈশব নৃত্য ছড়িয়ে দিলেই অসহায় ঘুম মৃত্যু পার হয়ে যাবে।

স্বপ্নচ্যুত ভাবনাগুলি ক্ষতিপূরণ চায় তাকাই আকাশের কোলে
ছোট ছেলেটির হাতমুঠি কি যেন প্রার্থনা করে
এখন শুধুই পাঠশালা, কৈশোরের শিউলি গেছে, নেই মেঘমল্লার সাথে শিমুল উৎসব
অলস দুপুর কাটে ব্যর্থ অনুরাগে।

আমাদের বাড়িটা খুব একা, একা একা কাঁদে
মা যদি আসে পতিত জমিতে স্বপ্ন এঁকে দেবে।
…………………………………………..

কুটুমপাখি

অনেক অনেক সৃষ্টি আছে তবু সামান্য ধ্বংসের দিকেই চোখ চলে যায়
জীবনের ধ্বনি শুনতে পাবে দেওয়ালের গায়েও, শশ্মানের আগুনেও ছাই
রক্তের দাগগুলি জোরে জোরে প্রতিধ্বনি তোলে, দল বেঁধে প্রসারিত দলে
এত বড় সূর্যটা ঢাকা পড়ে যায় মেঘের কণায়
অনেক অনেক আত্মীযজন ভক্ষণ করে আনন্দ, সেই আনন্দ আলো ছড়ায়
তবু সামান্য বমনেই নিকানো উঠান হাঁসফাঁস, দীর্ঘ মানুষ ছোট দেখায়।

অন্তহীন ভালোবাসি তোমায় রামধনু ঝলক, আড়াই হাত জমির উপর বাড়ি
ঘরে থাকে নানান আসবাবপত্র, কোলাহল নির্জনতা কি নেই
আগুন বলল রাখ তোমার শস্য আমি থাকলে ভষ্ম, দেখ একবার ছুঁয়ে দেখি
অনেক দিনের উপবাস ভেঙে পড়ে একটু ফলের রসে, এমনই জীবন পাঁচালী।

অনেক অনেক বয়সের বয়স আমার, মহূর্তের অভিমানে ছোট হয়ে থাকি
সামান্য ধ্বংসের অণু আলোর চেয়েও গতিবেগ পেয়ে যায়, বড় কুটুম পাখি।