প্রেমটা হয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে। দু’জন একই বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। ক্লাশ চলাকালে চোরা চোখে তপতীকে দেখায় মনযোগ থাকতো না শিক্ষকের পাঠদানে। শিক্ষক ওর অমনোযোগীতা সবার সামনে প্রকাশ করে লজ্জা দেবার জন্যই ওকে প্রশ্ন করতো। উত্তর দিতে পারতো না সুধেন। সেকারণে শাস্তি অবধারিত।
বেত্রাঘাত নিষিদ্ধ থাকায় শারীরিক শাস্তি চলতো: মেঝেতে হাটু গেড়ে বসে থাকা; কান ধরে এক ঠ্যাং বকের মতো বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে থাকা; মোরগা হওয়া ইত্যাদি। যখন ক্লাশ-টিচার সুধেনকে শাস্তি দিতো তখন তপতী খিলখিল করেই হাসতো। সুধেন শাস্তি পাওয়ায় কেনো তপতী হাসতো তা প্রথম প্রথম কেউ বুঝতে না পারলেও অবসরে লুকিয়ে তপতী-সুধেনের মেলামেশায় বুঝে নেয় সবাই যে ওদের মাঝে মন দেয়ানেয়ার অধ্যায় চলছে।
একান ওকান হয়ে উভয় পরিবারে জানাজানি হলে সম্পদ-প্রতিপত্তি ও ধর্ম এসে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সুধেনের পরিবারের অঢেল টাকা থাকলেও তপতী পরিবারের কিছুটা টানাপোড়েন আছে। এতে ওদের প্রেমে কোন রকম ভাটা পড়েনি। গোপনে ভালোবাসা চলতে থাকায় পড়ালেখায় চলতে লাগলো ঘাটতি। সুধেনের শাস্তি প্রাপ্তির সাথে যোগ হলো তপতীর বকা খাওয়া। পরীক্ষার ফলাফলও হতে থাকলো খারাপ। ক্লাশ টেনে টেস্ট পরীক্ষা খারাপ হলে উভয় পরিবারে দু’জনকে চালাতে লাগলো বকাঝকা। বকাঝকার তোড় সইতে না পেরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পা ধরে অঝোর কান্নাকাটি। দু’জনকে প্রতিজ্ঞা করতে হয় যে নিদ্রা ত্যাগ করে ওরা পড়ালেখা করবে এবং এসএসসি পরীক্ষা দেবার সুযোগ পাচ্ছে একবারই।
পরীক্ষা পর্যন্ত গোপনে মোলাকাত শিকেয় রেখে আদাজল খেয়ে পড়ালেখায় মনোযোগ দিলো ওরা। পরীক্ষা শেষ হবার দিনই মা-বাবা সুধেনকে পাঠিয়ে দিলো ইটালি ওর মামার কাছে। তপতী থমকে গেলেও ওর বিশ্বাস ছিলো সময় মতো ফিরে আসবে সুধেন। একটা মোবাইল ফোন থাকলে মাঝে মাঝে কথা বলতে পারতো সুধেনের সাথে। কিন্তু বাবার কাছেই মোবাইল ফোন নেই-ও পাবে কিভাবে! ও-ও চলে গেলো ধোবাউরা মামার বাড়ি।
ওখানে মন শান্ত করতে গিয়ে পড়ে গেলো মামাতো ভাই-এর প্রেমদৃষ্টিতে!
অনুপ বাড়ৈ দৈনিক একটা করে প্রেমপত্র লিখতে থাকলো তপতীকে। তপতী গ্যাড়াকলে। সে অনুপের প্রেমপত্র নিলেও না পড়ে ছিড়ে ফেলে দিতে লাগলো টয়লেটে। একদিন প্রেমপত্র দেবার সময় অনুপের মা দেখে দোষারোপ করতে লাগলো তপতীকেই। ফলশ্রুতিতে ও বাড়ি ছাড়তে হলো তপতীকে। ফের একাকীত্ব ও সুধেন-চিন্তা। বান্ধবীদের সাথে এদিক ওদিক ঘুরতে ফিরতে একদিন পা পিসলে পড়ে গেলো এক তরুণের গায়ে। দু’জন উঠে একে অপরের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে চলে গেলো যে যার পথে।
দিন যায় কথা থাকে। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পেলো একদিন। জিপিএ-৫ পেয়ে পাস
করলো তপতী ও সুধেন। দুই দিন পর ইটালি থেকে চলে এলো সুধেন। নিজ বাড়িতে না গিয়ে সরাসরি চলে এলো তপতীর বাড়ি। বলে গেলো ওর সাথে দূর্গাপুর কলেজে ভর্তি হতে। তপতী এমনিতেও দূর্গাপুর কলেজে ভর্তি হতো। কলেজের প্রথম দিনই ক্লাশে সেই ধাক্কা খাওয়া তরুণ ওর সামনে এসে আনন্দে উৎফুল্ল। নাম জানালো দস্তগীর ওবায়েদ, দূর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়েদ আকাশ ওর বাবা। তপতী কোন কথা না বলে মুচকি হাসলো শুধু। ওকে কিছুদিন বিরক্ত করার পরও সাড়া না পেয়ে সুধেনের পিছু নিলো দস্তগীর। একদিন দেখা গেলো দস্তগীর সুধেনের জিগরি দোস্ত হয়ে গেছে।
সুধেন বলে দেয়ায় দস্তগীর তপতীর সাথে ঠাট্টা করতে শুরু করলো যখন তখন। তপতীর পছন্দ না হলেও ও দমতো না। মাঝে মাঝে অশ্লীল কথাও বলতো।
এভাবেই সময় বয়ে চলে এলো টেস্ট পরীক্ষা। তপতী কলেজে যাওয়া কমিয়ে মনযোগ দিলো পড়ায়। কাজ হলো এতে। টেস্টে টিকে গেলো তপতী ও সুধেন। এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করলো তপতী ও সুধেন একত্রে পাশাপাশি সিট পড়ার জন্য। পরীক্ষা যত কাছে আসতে লাগলো, দস্তগীরের উপদ্রবও গেলো বেড়ে। বাধ্য হয়ে তপতীকে ছেড়ে দিতে হলো কোচিং।
এরপর ডায়েরিতে আর কিছু লেখা নেই। অর্থাৎ ঐদিন ডায়রি লেখার পরদিনই তপতী হয়েছে নিখোঁজ। এই ডায়রি থেকে সন্দেহটা দস্তগীর ওবায়েদের দিকেই যায়। দস্তগীর ওবায়েদ দূর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়েদ আকাশের সন্তান। এই ডায়রির উপর ভিত্তি করে কী দস্তগীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে?
একটা প্রশ্ন আয়েজ আজিজের মনে: হৈমন্ত রারাং পরিবার জানতো না কিছুই তপতী-সুধেন সম্পর্কে? হতে পারে।
কিন্তু সুধেন লুকালো কেনো? ও কি কিছু জানে? আলাপচারিতায় সুধেনের কোনরূপ দুঃখবোধ প্রকাশ পায় নি। গতরাতে ওকে মারপিট করলো কারা? এখন সুধেনকে দরকার। ও নিশ্চয়ই আরো কিছু জানে? ডায়রি হাতে ছুটলো সুধেনের বাড়ির দিকে আয়েজ।
সুধেনের বাবা জানালো যে রাতে সুধেন বাড়ি ফিরে নি। রাত দশটার দিকে কে একজন এসে ওকে ডেকে নিয়ে গেছে। হাঁ, সুধেন মাঝে মধ্যে এভাবে বন্ধুদের সাথে বাইরে যায় এবং আসে না। গতরাতের যাওয়া ও আগের যাওয়া যে এক না তা বলতে গিয়েও থেমে গেলো আয়েজ। যে করেই হোক সুধেনকে খুঁজে বের করতে হবে।
তপতী-অন্তর্ধান-রহস্য উদ্ঘাটনের খুব কাছে এসে সুধেন-গায়েবে বেশ জটিল হয়ে গেলো ফের।
মেঠোপথ ধরে হাটছে আর ভাবছে সুধেনকে খুঁজে পাবার উপায় নিয়ে। খালপাড়ে জটলা দেখে এগিয়ে গেলো ওদিকে। সুধেনের লাশ! গলা কেটে ফেলা হয়েছে। কী মর্মান্তিক! তার মানে সুধেন জানতো কে বা কারা তপতীকে খুন করেছে। সে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলো লাশের কাছে। না ছুঁয়ে লাশ পরখ করতে লাগলো। দুই হাতের নখে কিছু একটা লেগে আছে। মোবাইল ফোনে কয়েকটা ছবি নিয়ে প্রথমে নেত্রকোণা ফরেনসিক বিভাগে এবং পরে দূর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়েদ আকাশকে ফোন করলো।
পিকাপ ভর্তি পুলিশ নিয়ে ওসি ওবায়েদ হাজির হয়েই বললো, লাশ উঠিয়ে নিয়ে যাও পোস্টমর্টেমর জন্য।
আয়েজ বললো, প্রথমে সুরতহাল করতে হবে ওবায়েদ ভাই।
সুরতহাল করার কী দরকার! একেবারে পোস্টমর্টেম করলেই হবে!
একটু সমস্যা আছে ওবায়েদ ভাই।
কী সমস্যা?
এটা খুন। আর লাশের হাতের নখে কিছু একটা লেগে আছে। খুনি আইডেন্টিফিকেশনে এটা খুব হেল্প করবে।
আমি ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টে ফোন করে দিয়েছি।
তখনই সাব-ইন্সপেক্টর সামছুল আলম চলে এলো লোকজন নিয়ে। লেগে গেলো কাজে। ওবায়েদ আকাশ খামোশ খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। আয়েজ আজিজ লাশের হাতের নখ দেখিয়ে বললো যে নখে লেগে থাকা এই ক্লু খুনিকে সনাক্তকরণে অনেক সহায়তা করবে।
সুধেনের লাশ নিয়ে সামছুল আলম চলে গেলো নেত্রকোণায়। চুপসে থাকা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়েদ আকাশের সামনে এসে আয়েজ আজিজ জিজ্ঞেস করলো, সম্ভবতঃ আমার কেস খুব দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যাচ্ছে।
কিভাবে?
আর কিছু বলা যাবে না ওবায়েদ ভাই। প্রয়োজনে আপনার সহযোগিতা চাইবো ওবায়েদ ভাই।