ওবায়েদ আকাশ কিছু না বলে পিকাপে উঠে চলে গেলো। আর আয়েজ আজিজ ছুটলো নেত্রকোণায়। সরাসরি চলে গেলো পুলিশ তত্ত্বাবধায়ক ফকরোল আমিনের অফিসে।
ফকরোল আমিন বললেন, সুধেনের হত্যা সম্পর্কে আপনার কী ধারনা প্রাইভেট ডিটেক্টিভ আয়েজ আজিজ?
আয়েজ আজিজ বললো, আমার সন্দেহ ছিলো তপতীর গায়েবের সাথে সুধেনের হাত আছে। ও খুন হওয়াতে আমার সন্দেহ আরো বদ্ধমূল হলো যে ও খুন না করলেও তপতীর গায়েবের বিষয়ে ও জানতো। সুধেনের সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং তপতীর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জরুরি দরকার স্যার। সুধেনের দুই হাতের নখে ফরেন পার্টিকল লেগে আছে স্যার। ওটা কী তাও জানা দরকার।
ওকে। আমি দেখছি কত তাড়াতাড়ি এগুলো আপনাকে দেয়া যায়।
ফকরোল আমিন ফরেনসিক বিভাগের সাব-ইন্সপেক্টর সামছুল আলমকে ফোন করে বললেন, আজ বিকেলের মধ্যে সুধেনের সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং তপতীর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দিতে হবে। সব কাজ ফেলে সবাইকে এই কাজে লাগিয়ে দাও। নো ওজর-আপত্তি! সময় বিকেল চারটা।
ক্রাডলে ফোনের রিসিভার রেখে আয়েজ আজিজের দিকে তাকিয়ে ফকরোল আমিন বললেন, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আপনি আমার গেস্ট। দুপুরে আমার সাথে লাঞ্চ করবেন।
সামনের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফকরোল আমিন বললেন, এখন বাজে বারোটা। শহরে আপনার কোন কাজ থাকলে দেড় ঘন্টা সময়ে সেরে আসতে পারেন। ঠিক দেড়টায় লাঞ্চে বসবো। চাইনিজ অথবা ভাত-ভর্তা।
কোনটা পর্যন্ত?
চাইনিজ স্যার। বাসায় চাইনিজ হয় না। তাই সুযোগ পেলেই বাইরে মোরগ-পোলাও বা চাইনিজ খাই। গেলাম স্যার। ফিরবো ঠিক দুপুর একটা উনত্রিশ মিনিটে।
আয়েজ আজিজ বেরিয়ে গেলো পুলিশ সুপারের অফিস থেকে। সাথে সাথে ভেতরে ঢুকলো তাড়াইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়েদ আকাশ।
পুলিশ সুপার ফকরোল আমিন বললেন, তুমি হঠাৎ? কোন জরুরি কাজ?
স্যার, প্রাইভেট ডিটেক্টিভ আয়েজ আজিজকে মাথায় তুলে রাখছেন স্যার!
কেনো? কী করেছে সে?
আটপাড়া গ্রামের সুধেন নামের এক স্টুডেন্ট খুন হয়েছে গতকাল স্যার।আমাকে না জানিয়ে সরাসরি পোস্টমর্টেমের জন্য লাশ নিতে ফরেনসিক বিভাগকে ফোন করেছে।ওদেরকে দিয়ে সুরতহাল করালো; পোস্টমর্টেমও করবে ওরা। এটা সরাসরি আমার কাজে হস্তক্ষেপ স্যার।
ওবায়েদ, তপতী নামের একটা মেয়ে গায়েব হয়ে কোথায় গেলো দুই বছরেও তুমি তা বের করতে পারলে না। আয়েজ আজিজ তোমার এলাকায় দুই দিন থেকেই বের করে ফেললো হতভাগী মেয়েটার লাশ। সুধেনের হত্যা তপতী-হত্যা রহস্যের সাথে জড়িত থাকতে পারে, এই সন্দেহটা তোমার মাথায় আসে নাই কেনো? নাকি মাথা ঘামানো ভুলে গেছো থানার চার্জ পেয়ে?
স্যার!
এই কেস নিয়ে আপাতত তোমার ভাবার দরকার নাই। আয়েজ রহস্য উদ্ঘাটন করে দিলে তুমি খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এখন তুমি যেতে পারো।
ওবায়েদ আকাশ চেম্বার থেকে বের হলে ফকরোল আমিন সামনের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন। মাত্র একটা বাজে! আধাঘন্টা কী করা যায়? টেলিভিশনের রিমোট কন্ট্রোলটা নিয়ে চ্যানেল দেখতে লাগলেন বাটন টিপে। বিবিসি-তে রেখে দিলেন। রিমোট কন্ট্রোলটা রেখে আইফোন-১০ তুলে ঢুকলেন ইন্টারনেটে। ভ্রমণ করছেন একে একে। কখন দেড়টা বেজে গেলো টেরই পেলেন না। পাশের কক্ষে টেবিলে খাবার তৈরি করে অফিস সহায়ক কাশেম জানালো যে খাবার তৈরি হয়েছে। কিন্তু আয়েজ না আসায় ফকরোল আমিন খেতে গেলেন না। কিছুক্ষণ পরপর তাকাচ্ছেন ঘড়ির দিকে। দুইটায়ও আয়েজ আজিজ না আসায় একবার ঘাড় নেড়ে ও একবার মুখ টিপে হেসে খেতে গেলেন পাশের কক্ষে। খেয়ে এসে ফের বসলেন গদিআটা চেয়ারে। সাথে সাথে চলে এলো ধোয়াউঠা কফি। ইলেকট্রনিক সিগারেটে টান দিয়ে কফির কাপে চুমুক দিয়ে ভাবলেন: প্রাইভেট ডিটেক্টিভ আয়েজ এলো না কেনো? না এলে ফোন তো করতে পারতো? কোনো বিপদে পড়লো নাকি? সাথে সাথে সাব-ইন্সপেক্টর আশিষকে ফোন করে আয়েজের খোঁজখবর নিতে বললেন।
আয়েজ আজিজকে নিয়ে পুলিশ সুপার ফকরোল আমিন দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। আয়েজ আজিজ কখনো এমনটা করে নি। তাহলে কী সে বিপদগ্রস্ত? এই কেসটা নিয়েই? সাড়ে তিনটা পর্যন্ত আয়েজের কোন খোঁজ পাওয়া না গেলেও ফরেনসিক বিভাগের সাব-ইন্সপেক্টর সামছুল আলম পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নিয়ে ঢুকায় মনযোগ এলো এদিকে। পরপরই আয়েজ ঢুকায় ফকরোল আমিনের দুশ্চিন্তা কমলেও রাগ হলো আয়েজের উপর পুলিশ সুপারের।
ফকরোল আমিন কিছু বলার আগেই আয়েজ আজিজ বললো, দুঃখিত স্যার! খুউব জরুরি কাজে এক জায়গায় যেতে হয়েছিলো। তাই আপনার দাওয়াত রক্ষা করতে সময় মতো আসতে পারে নাই। কোথাও খাইও নাই।
নিশ্চয়ই আমার খাবারটা এখনো আছে স্যার।
পুলিশ সুপার ফকরোল আমিন রাগ আর প্রকাশ করতে পারলেন না। তবে মুখমণ্ডল গম্ভীর রেখেই বললেন, পাশের রুমেই আছে।
ধন্যবাদ স্যার। তার আগে ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্ট শুনতে চাই স্যার।
পুলিশ সুপার ফকরোল আমিন সামছুল আলমের দিকে তাকিয়ে বললেন, সামারি বলতে থাকো আর আমাকে রিপোর্টের ফাইলটা দাও।
সামছুল আলম পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ফাইলটা পুলিশ সুপারের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, তপতীর দেহাবশেষের সাথে পাওয়া ফরেন চুল এবং সুধেনের লাশে পাওয়া চুল একই লোকের। তাছাড়া সুধেনের হাতের নখে যে চামড়া পাওয়া গেছে ওটার ডিএনএ ও ঐ ফরেন চুলের ডিএনএ ম্যাচ করে গেছে স্যার।
আয়েজ আজিজ পুলিশ সুপার ফকরোল আমিনের দিকে তাকিয়ে বললো, আমরা খুনির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি স্যার।
বলতে বলতে ব্যাগ থেকে ছোট একটা পলিথিনের প্যাকেট বের করে সামছুল আলমের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, এই চুলের ডিএনএ টেস্ট দরকার। এই চুলের ডিএনএ আগে পাওয়া চুল ও চামড়ার ডিএনএ-র সাথে ম্যাচ করে গেলে ইনভেস্টিগেশন সাকসেসফুল স্যার!
পুলিশ সুপার ফকরোল আমিন আয়েজের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই চুল কার প্রাইভেট ডিটেক্টিভ?
এখন বলা যাবে না স্যার! আমি খেতে খেতে ডিএনএ টেস্ট রিপোর্ট সামছুল আলম ভাই আনতে পারলে কেল্লাফতে।
সামছুল আলম উত্তেজিত কণ্ঠে বললো, আমারও খুনির নাম জানতে ইচ্ছে করছে। তাই আমি দশ মিনিটে ডিএনএ রিপোর্ট নিয়া আসতাছি স্যার।
সামছুল আলম বেরিয়ে গেলেন পুলিশ সুপারের চেম্বার থেকে; আর আয়েজ আজিজ নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে ঢুকলো পাশের কক্ষে দুপুরের খাবার খেতে।
পুলিশ সুপার ফকরোল আমিন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেখতে লাগলেন। চমৎকার রিপোর্টের বিন্যাস। কোন খুঁত বা গোঁজামিল নেই কোথাও। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেখা শেষ হতেই সামছুল আলম এক ফাইল হাতে ঢুকলো ভেতরে; সাথে সাথে আয়েজ আজিজও ঢুকলো।
সামছুল আলম আয়েজকে একবার দেখে ফকরোল আমিনের দিকে তাকিয়ে বললো, অবাক কাণ্ড স্যার! এই চুলের ডিএনএ-এর সাথে তপতী ও সুধেনের লাশে পাওয়া চুল এবং সুধেনের নখে পাওয়া চামড়ার ডিএনএ ম্যাচ করে গেছে স্যার।
সাফল্যের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করে আয়েজ আজিজ ধীরস্থির কণ্ঠে পুলিশ সুপারের দিকে তাকিয়ে বললো, আমার ইনভেস্টিগেশন সমাপ্ত স্যার। খুনি আইডেন্টিফাই হয়ে গেছে।
পুলিশ সুপার ফকরোল আমিন জিজ্ঞেস করলেন, কে?
আপনার দাওয়াতে দেরিতে এটেন্ড করার কারণ হলো এই চুল আনতে গিয়েছিলাম। চুল সংগ্রহ করার সময় ওর বুকে নখের আচড়ের ঘা-ও দেখলাম স্যার।
মার্ডারারটা কে আয়েজ?
আয়েজ আজিজ প্রত্যেকটি শব্দে জোর দিয়ে উচ্চারণ করে বললো, তাড়াইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়েদ আকাশের একমাত্র সন্তান দস্তগীর ওবায়েদ।