রাতে আর বাইরে যায় নি আয়েজ আজিজ। চা পানের সাথে প্রিয় ও কাছের মানুষদের সাথে কথা বললো বেশ সময় নিয়ে। এরপর ম্যাসেঞ্জারে আসা প্রত্যক মন্তব্য বা বার্তার জবাব ও ফেসবুক ঘেটে রাত এগারো পার। হাই উঠতে শুরু করলো বারবার। কক্ষের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো আয়েজ। সারাদিনের পর রাতে বিছানায় পিঠ লাগালে বে-শ আরাম! কিছু দোয়া-দরুদ পড়ে বন্ধ করলো চোখ। কিছুক্ষণ পর ঘুম ঘুম ভাব চলে আসছে চোখ জুড়ে। এসময় মনে হলো একটা তীব্র আলোর রেখা ছুটে গেলো ডানদিক থেকে বামদিকে। সাথে সাথে তাকালো আয়েজ। কিছু নেই; কিন্তু ওর মনে হচ্ছে কিছু একটা আছে এই কক্ষে। রোমাঞ্চকর অবস্থা। ডানদিকে জানালার উপরে সিগারেটের মতো আগুন জ্বলছে। জোনাক পোকা নাকি? হবে হয়তোবা। কিন্তু আয়েজের বিছানা থেকে নামতে ইচ্ছে করছে না। চোখ বন্ধ করে ফের তাকালো-নেই সিগারেট বা জোনাক পোকার আলো। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ফের চোখ বুজলো আয়েজ এবং ঘুমিয়ে গেলো পরক্ষণে।
স্বপ্ন দেখতে দোষ কী! মানুষ ঘুমের চেয়ে জেগে থেকে অনেক বেশি স্বপ্ন দেখে। আয়েজের স্বপ্ন দেখে পার হয়ে গেলো পুরো রাত। সকালে জেগে দেখে পাজামা ও বিছানার চাদর দুটোই নষ্ট! আয়েজ কী স্বপ্ন দেখেছে তা পাঠকের নিশ্চয়ই জানার অধিকার আছে!

ছুটির দিনে রামসাগর দীঘিতে বর্শি পেতে মাছ শিকারে গেলো আয়েজ আজিজ। বর্শি পেতে মাছ ধরা ওর খুব শখ, যদিও সে তেমন মাছ মারতে পারে না। বর্শিতে ঠোকর দিলেও টোপ খেয়ে চলে যায় অধিকাংশ মাছ। তবুও শখ মরে না ওর। আজ আয়েজ নৌকা নিয়ে চলে এলো দীঘির মাঝখানে। বর্শিতে টোপ গেঁথে ছুড়ে দিলো পানিতে। এবার শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ফাৎনার দিকে। অপেক্ষা! অপক্ষা!! অপেক্ষা!!! একসময় ফাৎনা নড়ে উঠায় চমকে উঠলো আয়েজ। মাছটা খুব পাজি! ফাৎনা টানছে আস্তে আস্তে। হঠাৎ ডুবে গেলো পুরোপুরি। ছিপেও পড়েছে টান! আয়েজ ছেড়ে দিয়েছে হুইল। সূতা ছুটে যাচ্ছে পানিতে। সূতা শেষ। আয়েজ দাঁড়িয়ে ছিপ টানতে লাগলো নিজের দিকে। কিন্তু পারছে না মাছের সাথে। ছিপটা ভেঙ্গেই যাবে মনে হচ্ছে। কত বড় মাছ এটা? ভাবনা শেষ হবার আগেই সূতোর টানে ছিপের সাথে পড়ে গেলো পানিতে আয়েজ আজিজ।
হাবুডুবু অবস্থা থেকে তলিয়ে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ আয়েজ আজিজের। মাছ কোথায়! এ যে মানুষ! অপূর্ব সুন্দরী জলকুমারী! মুখটা কই? দেখি একটু! আয়েজ জলপরীকে ধরে মুখ দেখতে যাবে তখন জলকুমারী নিজেই ওর দিকে ঘুরলো। একি! এ যে সুস্মিতা! ও পানিতে বাস করতে শুরু করলো কবে?
এরপরে কী ঘটেছে তা তো আগেই জেনেছি আমরা।

তখনই ফোনটা এলো সুস্মিতার। মোবাইল ফোনে নম্বরটা দেখে আঁতকে উঠে মনে মনে বললো আয়েজ: সর্বনাশ! এতো বড় ভুল হলো কী করে? এখানে এসে ওকে ফোন করতে একদম ভুলে গেলো! কিভাবে? এখন কী জবাব দেবে? রিং শেষ হবার আগেই ধরতে হবে। সে মোবাইল ফোনটা তুলে ইয়েস বাটন টিপে কানে ঠেকিয়ে তোতলাতে শুরু করলো আয়েজ, হে-হেলো! কে-কেমন আছো সু-সুস্মিতা?
ওদিকে সুস্মিতার সাপের মতো ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনতে পেলো আয়েজ। মনে মনে বললো: এই সেরেছে! সাপ!
সুস্মিতা সাপ হয়ে গেলো?
আয়েজ ফের বললে, সাপ! সুস্মিতা কোথায়!
ওদিকে কান্নার শব্দ শুনে আয়েজ বললো, সাপ মেয়েছেলের মতো কাঁদতে পারে দেখছি! এবার কান্না থামাও প্রিয় সাপিনী!
এবার সুস্মিতা কথা বললো, তুমি কী! চব্বিশ ঘন্টা পার হয়েছে যোগাযোগ নেই। কখন পৌঁছলে সেখানে, আদৌ পৌঁছেছো কিনা তাও জানাও নি। তোমার জন্য আমার ভাবনা হয় না বুঝি!
আয়েজ আজিজ স্বস্থির নিঃশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বললো: শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছিলাম! মিথ্যেই বলতে হলো ওকে। বললো, বেশ ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু সারারাত তো তুমি আমার সাথে ছিলে, তাই ফোন করার তাগিদ অনুভব করি নি!
সুস্মিতা বিস্মিত হয়ে বললো, কী বলছো তুমি আয়েজ! আমি আবার কিভাবে তোমার সাথে সারারাত ছিলাম?
আমি আছি কিশোরগঞ্জ আর তুমি আছো নেত্রকোণার প্রত্যন্ত উপজেলা দূর্গাপুরে।
স্বপ্নে! তুমি সারারাত স্বপ্নে ছিলে এবং…
আয়েজ আজিজ থেমে গেলে সুস্মিতা প্রশ্ন করলো, থেমে গেলে কেনো?
সেকথা ফোনে বলা যাবে না। সামনাসামনি বলবো।
তাহলে আমি চলে আসি আগামীকাল?
আসো! কিন্তু থাকবে কোথায়? ডাকবাংলোয় রুম খালি নাই! আমার সাথে এক রুমে থাকতে হবে, এক বেডে!
বিয়ের আগে একসাথে থাকা আমাদের ধর্ম এলাও করে না সুস্মিতা।
জানি। এখন রাখলাম। আল্লাহ হাফেজ।
মা-বাবা-ভাই-বোনদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করে আয়েজ আজিজ ঢুকলো ওয়াশরুমে। সাথে সাথে গা কাঁটা দেয়ায় ভড়কে গেলো একটু। হঠাৎ শীত লাগলে যেমন লাগে, খানিকটা তেমনই। গোসলের জন্য গরম পানি নেবে নাকি? নাকি জ্বর জ্বর ভাব? বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে আয়েজ। বিছানায় বসে নিজেই নিজের কপালে হাত রাখলো: তাপমাত্রা স্বাভাবিক। গোসল করেই বের হবে। কক্ষের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো: সাড়ে সাতটা বাজে। এখনো অনেক সময় হাতে। আটটায় নাস্তা দিতে বলেছে।
মাছি ওড়ার ভনভন শব্দে বাথরুমের দরজার দিকে তাকালো আয়েজ আজিজ। মাছির চেয়ে বড় একটি পোকা উড়ে আসছে ওর দিকে। না, পোকাটা ওর দিকে এলেও ওর গায়ে না বসে চলে গেলো পেছনের দিকে। ফের গা কাঁটা দিলেও জ্বর জ্বর ভাবটা চলে গেলো তখনই। আর দেরি না করে ঢুকে গেলো ওয়াশরুমে। হাত বুলালো মুখমণ্ডলে: খোঁচা খোঁচা দাড়ি-আরেকটু বাড়া দরকার। যাক। দাড়ি কামানোর ঝামেলা বিদায়! বেসিনের কল খুলতে যাবে তখন বেসিনের উপরের গ্লাসবারে ঐ রকম একটা পোকা দেখতে পেলো। এট কি সেটাই? ওটা এখনো ওর কোনো ক্ষতি করে নি; তাই থাক পোকাটা ওর মতো। একটা কাঁচি দিয়ে দাড়ি ও গোঁফ সামান্য ছেটে ঢুকলো বাথরুমে। গোসল সেরে পেন্ট পরে গায়ে টি-শার্ট গায়ে দিতেই নাস্তা নিয়ে কেয়ারটেকার ঢুকলো কক্ষে।
ট্রের উপর ঐ রকম পোকা দেখে আয়েজ জিজ্ঞেস করলো রবার্ট সিধুকে, এই পোকাটাকে চেনো সিধু? সকাল থেকে এটাকে দেখছি সব জায়গায়।
রবার্ট সিধু উচ্ছল কণ্ঠে বললো, এইডারে চিনেন না ছার! এইডাই তো জোনাকি পোকা! আমাদের এই জঙ্গলে গত এক বছর ধইরা হঠাৎ কইরা জোনাকি পোকা বাইড়া গেছে গা।
সিধু বেরিয়ে গেলে আয়েজ আজিজ বসলো নাস্তা খেতে। রুটির সাথে আলুভাজি ও ডিমের ওমলেট। নাস্তা খাওয়া শেষ হবার সাথে সাথে চা নিয়ে ঢুকলো সিধু। আয়েজ মনে মনে বললো: সিধু কি চা’র কাপ নিয়ে দরজার ওপাড়ে আমার নাস্তা খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো? হবে হয়তোবা।
আয়েজ আজিজ বের হলো বেড়াতে। যেতে চেয়েছিলো অন্যদিকে; কিন্তু জঙ্গলটা কেনো যেনো ওকে টানছে। অজান্তেই পা পা করে এলো জঙ্গলের কাছে। কোত্থেকে এক ঝাক জোনাকি পোকা ওর সামনে এসে আলো জ্বেলে নাচতে লাগলো। নাচের সাথে পাখার গুঞ্জনে মুগ্ধ আয়েজ ঢুকে পড়লো জঙ্গলে। জোনাকি পোকাগুলো নেচে নেচে ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে-কোন দিকে বুঝতে পারছে না ও। একটা গাব গাছের নিচে এসে হঠাৎ করেই জোনাকি পোকাগুলো হয়ে গেলো গায়েব। এতক্ষণ আয়েজ ছিলো একটা ঘোরের মধ্যে। গ্রামের একটা লোককে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠলো ভূত দেখার মতোই।
আয়েজ লোকটাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি এখানে কী করছেন মিস্টার? কখন এলেন এখানে?
লোকটা বললো, আমি সবসময় এই গাছ থাইকা গাব পাইরা নেই।
গাব? এটা কি গাব গাছ?
শহরে থাইকা কিচ্ছু চিনেন না আফনেরা! গাবের কষ জালে দিলে জাল শক্ত হয়, নায়ে দিলে নাওরে পানি কামড়াইতে পারে না।
পানি নাওকে কামড়ায়!?
জ্বে সাব। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে যখন বন্যার পানি কমতে থাকে, তখন ঐ পানি মানুষরেও কামড়ায়।
আয়েজ আজিজ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, আমিও গ্রামের ছেলে। কিন্তু শহরে থেকে গ্রামের কৃষ্টি-কালচার সব ভুলে যাচ্ছি। আপনি গাব পারেন। আমি গেলাম। আপনার নামটা যেনো কী?
লোকটা তরতর করে গাবগাছে উঠতে উঠতে বললো, আমার নাম ব্রায়ান, ব্রায়ান পালিত।
আয়েজ দ্রুত হেটে বেরিয়ে এলো জঙ্গল থেকে।