মোবাইল ফোনে ফেসবুক না ঘেটে ফটো এলবাম দেখছিলো সুস্মিতা-আয়েজ আজিজের বিভিন্ন ভঙ্গির ছবি।
প্রত্যেকটা ছবিতেই সে ঠোঁট সরু করে চুমু খাচ্ছে। শেষ ছবিটায় চুমু দিতে যাবে তখন বেজে উঠলো মোবাইল ফোনটা। আয়েজের ছোটবোন লুৎফা-উন-নাহারের ফোন। ইয়েস বাটন টিপে কানে ঠেকাতেই লুৎফার উচ্ছ্বল কণ্ঠ।
ভাবি কী করছো?
সুস্মিতা বিস্মিত কণ্ঠে বললো, হঠাৎ তুমি আমাকে ভাবি ডাকছো লুৎফা!
একটু আগে তোমাকে নিয়ে পরিবারের সবার সাথে আলোচনা হলো ভাবি।
কী আলোচনা হলো?
বড় ভাইয়া তোমাকে ভালোবাসে, বড় ভাইয়া তোমাকে বিয়ে করবে, এইসব।
চাচা-চাচি তোমার মা-বাবা কী বললেন?
তোমার হবু শ্বশুর-শাশুড়িকে তুমিও মা-বাবা ডাকতে পারো।
আমার লজ্জা লাগছে রে! বিয়ের পরেই ডাকি মা-বাবা।
তোমার ইচ্ছে। আমি রাখলাম। সবাই ডাইনিং রুমে বসে আছে।
লুৎফা কেটে দিলো লাইন মোবাইল ফোনের। সে রিং করলো আয়েজকে। আয়েজ কল গ্রহণ করতেই সুস্মিতা বললো, শখের টিকটিকি ডাকবাংলোয় নাকি রহস্য উদ্ঘাটনে কোথাও নাক গলাচ্ছো?
ওদিক থেকে আয়েজ সাড়া দিলো, ডাকবাংলোয়।
গোয়েন্দা ফেলুদার কি রাতের খাবার খাওয়া হয়েছে?
হয় নি এখনো।
মেনু কী?
বলতে পারছি না। তবে লোকাল মাছ রাখতে বলেছি।
আর মাংস?
নো মাংস।
গুড! তুমি কি কিছুক্ষণের মধ্যে চাচা-চাচির সাথে কথা বলেছো?
এখনো বলি নি। খাওয়ার পর বলবো। কেনো?
না, এমনি৷ এখন রাখি?
আরেকটু থাকো।
আগামীকাল চলে আসি তোমার কাছে?
কী যে বলো না! তোমাকে আগেও বলেছি, এখনও বলছি তোমার এখন এখানে আসা ঠিক হবে না। তবে একবেলার জন্য আসতে পারো।
সুস্মিতা উৎফুল্ল হয়ে বললো, তাহলে চলে আসি আগামীকাল!
আগামীকাল না। আমি যেদিন আসতে বলবো সেদিন।
তুমি বেড়াতে গিয়ে কি কেস হাতে নিয়েছো?
এখনো বুঝতে পারছি না।
মানে?
প্রায় দেড় বছর আগে এখানে একটা মেয়ে গায়েব হয়ে গেছে। একটু একটু করে এই রহস্য বের করার চেষ্টা করছি।
ফি দেবে কত?
ফ্যামিলিটা বেশ দরিদ্র। ফি দিতে পারবে বলে মনে হয় না।
এভাবে মুফত মে গোয়েন্দাগিরি করলে না খেয়ে থাকতে হবে! সেক্ষেত্রে তোমাকে বিয়ে করা ঠিক হবে কিনা ভাবতে হবে আমাকে!
তুমি ভাবো। আমি এখন ওয়াশরুমে যাবো। গুডনাইট!
আয়েজ আজিজ মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দেবার পরপরই গৃহ-সহায়িকা রহিমা এসে বলে গেলো যে মা ডাকছে।
সুস্মিতা মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে বের হলো নিজ কক্ষ থেকে। বিশাল বাড়ি। উপরের তলায় আনোয়ারা মোকাদ্দেমের বিশ্রামকক্ষ। লিফট থাকতে সিঁড়ি ভাংবে কেনো এরা! লিফটে চড়ে চলে এলো উপরের তলায় সুস্মিতা। একটা বেড়াল হেটে যাচ্ছে সামনের দিকে। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা খুলে পটাপট বেড়ালের কয়েকটি ছবি তুলে ফেললো। মায়ের দরজার সামনে এসে দরজায় একবার টোকা দিয়ে বললো, ভেতরে আসবো মা-মণি?
ভেতর থেকে আনোয়ারা মোকাদ্দেমের আওয়াজ এলো, এসো।
সুস্মিতা ভেতরে ঢুকে ভেজিয়ে দিলো দরজা। আনোয়ারা মোকাদ্দেম রকিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছেন আর কানে হেডফোন গুঁজে ট্যাবে কী যেনো দেখছেন। পাশে বিয়ারের ক্যান। সুস্মিতা একটা মোড়া টেনে মার পাশে বসলে মা বিয়ারের ক্যানটা বাড়িয়ে ধরলেন মেয়ের দিকে।
সুস্মিতা নেতিবাচক মাথা নেড়ে বললো, মা-মণি, তুমি জানো ওসব আমি পান করি না। কেনো ডেকেছো সেটা বলো?
ক্যান থেকে এক চুমুক বিয়ার পান করে ট্যাব থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে বললেন, একা একা রুমে কী করছো?
কী আর করবো! এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম?
বন্ধু! মানে ছেলে?
জ্বী মা-মণি।
সম্পর্ক কত দূর! আমরা বিব্রত হবো না তো?
তোমার ইঙ্গিত আমি বুঝতে পারছি মা-মণি। আমি এখনো গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেই নি মা-মণি।
শুনে মনে খুব শান্তি পাইলাম। আরেকটা কথা, বিয়ের ব্যাপারে হুট করে একা একা কোন সিদ্ধান্ত নিয়ো না।
যদি পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়ে যায়, তখন কী করবো?
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার আগে অন্ততপক্ষে আমার সাথে কথা বলো। আমি তোমার জন্মদাত্রী মা।
তখন আনোয়ারা মোকাদ্দেমের মোবাইল ফোন বাজতে শুরু করলেও কানে হেডফোন থাকায় শুনতে পাচ্ছেন না রিং। পেছনের টেবিলে ছিলো মোবাইল ফোনটা। সুস্মিতা ফোনটা তুলে পর্দায় নাম দেখে মার কান থেকে একটা হেডফোন সরিয়ে বললো, আব্বুর ফোন মা-মণি। তুমি কথা বলো, আমি গেলাম।
আনোয়ারা মোকাদ্দেমকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ত্রস্তে সুস্মিতা বেরিয়ে গেলো মার কক্ষ থেকে।
আনোয়ারা মোকাদ্দেম মোবাইল ফোনটা কানে ঠেকিয়ে সাড়া দিলেন, হ্যালো? কী খবর? কেমন আছো তুমি?
আতহার মোকাদ্দেম বললেন, তোমাদের ছাড়া ভালো থাকি কেমনে? অথচ তোমরা ঢাকা আসতে চাও না।
আনোয়ারা মোকাদ্দেম বললেন, ঢাকা আমার ভালো লাগে না। আমি কিশোরগঞ্জেই ভালো আছি। পারলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাও।
থাক ওসব কথা। একটা সংবাদ তোমাকে জানাতে ফোন করলাম।
কী?
সড়ক মন্ত্রী সুস্মিতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।
কী বলছো তুমি! ছয়মাসও হয় নি উনার ওয়াইফ মারা গেছেন। তাছাড়া ঐ বৃদ্ধের কাছে আমার সুস্মিতাকে বিয়ে দেবো কেনো? আমরা কি মেয়েকে নিয়ে পানিতে পড়ে গেছি?
পুরা কথা না শোনেই মন্তব্য করে ফেলো! এই একটা বদ-অভ্যাস তোমার!
কী বলছো তুমি!
মন্ত্রী বিয়ে না করেই একজন অভিনেত্রীর সাথে লিভিং-টুগেদার করছেন। বড় ছেলের সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।
ছেলে কী করে?
একটা বেসরকারি ভার্সিটিতে অনার্স পড়ার চেষ্টা করছে আর চাঁদাবাজি করছে। অনার্স পাস করার পর চলে যাবে কানাডা।
অমন ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দেবো না। আমার সাফ কথা!
মন্ত্রীর সাথে সমন্ধটা হলে মন্ত্রী হতে পারতাম।
মেয়ের জীবন নষ্ট করে তোমার মন্ত্রী হবার প্রয়োজন নাই। তাছাড়া আমার মেয়ের পড়ালেখা এখনো অনেক বাকি। রাখলাম।
আনোয়ারা মোকাদ্দেম মোবাইল ফোনের লাইন কেটে অপর কান থেকে হেডফোন খুলে উঠে দাঁড়ালেন।