পরদিন সকালে নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লো আয়েজ আজিজ। সরাসরি চলে এলো সুধেন রারাং-বাড়িতে। পেলো না সুধেন রারাং-কে। সে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিদ্যালয়ে সম্মান পড়ছে। সে বাড়ি থেকেই ময়মনসিংহ গিয়ে ক্লাশ করছে। খুব ভোরে বেরিয়ে যায় এবং ফেরে সন্ধ্যার পর।
কী করা যায়? কী করা যায়? সারাদিন হাতে। দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে সমস্যা কী! চললো ওদিকেই। রাণীমাতা রাশমণি স্মৃতি সৌধ দেখবে আজ। গতরাতে ইন্টারনেটে রাশমনি হাজং সম্পর্কে জেনে নিয়েছে।
ধোবাউড়া উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে ছয় কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলি গ্রামে চৌ-রাস্তা মোড়ে রাশমণি স্মৃতি সৌধ অবস্থিত।
রাশমনি হাজং ছিলেন টংক ও কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। তিনি ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে ধোবাউড়া উপজেলায় বেদিকুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জমিদার ও বৃটিশদের বিরুদ্ধে কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেন। ১৯৪৬ খৃষ্টাব্দে ৩১ জানুয়ারি কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে গিয়ে মুখোমুখি সংগ্রামে বৃটিশ বাহিনীর গুলিতে বহেড়াতলি গ্রামে তার সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজংসহ শহীদ হন। রাশমনি ও সুরেন্দ্র হাজং টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদ। রাশমনির দায়ের আঘাতে দুজন ব্রিটিশ পুলিশ নিহত হয়। এই বীর যোদ্ধার স্মরণে হাজংলতা রাশমনি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। প্রতিবছর ৩১ জানুয়ারি রাশমনি দিবস ও টংক শহীদ দিবস পালন করা হয়।
আয়েজ আজিজ মোটরসাইকেলে রাইড-শেয়ার করে সোমেশ্বরী নদী পাড় হয়ে চলে এলো বহেড়াতলি রাশিমণি স্মৃতি সৌধে। দেশি-বিদেশি প্রচুর পর্যটক। সবাই ঘুরছে সেল্ফি তুলছে, যারা একক তারা অন্যকে অনুরোধ করে ছবি তুলছে বিভিন্ন ভঙ্গিমায়। আয়েজ আজিজ দুপুর পর্যন্ত ওখানে কাটিয়ে খাবার খেয়ে নিলো একটি রেস্টুরেন্টে।
বিশ্রাম দরকার। বসে পড়লো একটি গাছতলায়। চোখ বুজে ছিলো কিছুক্ষণ। মোবাইল ফোন বাজায় কেটে গেলো তন্দ্রাভাব। বাবার কল। সে ইয়েস বাটন চেপে কানে ঠেকিয়ে বললো, আসসালামু আলাইকুম বাবা।কেমন আছেন বাবা? মা কেমন আছেন?
আজিজুল হাকিম বললেন, ওয়ালাইকুম সালাম। আমরা সবাই ভালো আছি। তুই কেমন আছিস? কোথায় আছিস?
আলহামদুলিল্লাহ বাবা। এখন আমি ধোবাউড়া উপজেলার বহেড়াতলি গ্রামে রাশমিন স্মৃতিসৌধে আছি।
আমারও একবার ধোবাউড়া যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো আয়েজ। যে চিনামাটির প্লেটে খানা খাই, সেই চিনামাটি পাওয়া যায় নেত্রকোণা জেলার ধোবাউড়ায়। ঐ চিনামাটি দেখার খুব শখ আমার।
ঠিক আছে বাবা। আমি কিশোরগঞ্জ ফিরেই আপনাকে এখানে আসার ব্যবস্থা করবো। আপনি কি দুপুরের খাবার খেয়েছেন বাবা? নিশ্চয়ই আপনি অফিসে?
হাঁ। যোহরের নামাজ আদায় করে এইমাত্র লাঞ্চ করলাম। তোমার মা-ও এ সময়ই লাঞ্চ করে।
আমি মার সাথে কথা বলে নেবো বাবা। আপনি কেনো ফোন করেছেন তা এখনো বলেন নি বাবা।
তোমাকে মনে পড়ছিলো, তাই ফোন দিলাম।
আপনার কথায় আমার কান্না চলে আসছে বাবা। আয়েজ আজিজ ফুপিয়ে উঠলো।
অনেক শখের গোয়েন্দাগিরি তো করেছো। আমার ফার্মে তুমি বসতে চাও না দরকার নাই। একটা চাকরি নেবার চেষ্টা করো। আমি ঘুষের টাকা দেবো।
আয়েজ খানিক উষ্মা-মিশ্রিত স্বরে বললো, এখন একথা থাকা বাবা। আমি কিশোরগঞ্জ আসার পর কথা বলবো এ বিষয়ে।
বুঝতে পেরেছি পুত্র আমার। আমার কথা শেষ তাহলে। তুমি তোমার মার সাথে কথা বলো। ভালো থেকো।
শরীরের যত্ন নিও। আল্লাহ হাফেজ।
আয়েজ আজিজ আসসালামু আলাইকুম পুরো বলার আগেই কেটে গেলো লাইন। আয়েজ আজিজ মাকে রিং করলো। মা কল গ্রহণ করতেই আয়েজ বললো, আসসালামু আলাইকুম মা। কেমন আছেন আপনি মা?
ওদিক থেকে আছিয়া হাকিম বললেন, ভালো আছি আয়েজ। তুই কেমন আছিস রে আমার একরোখা ছেলে?
আমিও ভালো আছি মা। তুমি তো স্কুলে। তাই না মা?
হাঁ বাপ।
তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে মা। ছবি দেখে তৃপ্তি পাচ্ছি না।
ভিডিও কল করছি।
ভিডিও কলেও তৃপ্তি পাবো না মা। যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করে কিশোরগঞ্জ চলে আসবো মা।
ঠিক আছে। হা রে, ওখানে নাকবোঁচা কাউকে পছন্দ করতে পেরেছিস?
নাকবোঁচা মানে?
নেত্রকোণায় সাঁওতাল রারাংরা থাকে তো। ওদের তো নাক চ্যাপ্টা।
তাই বলো মা। ওভাবে কাউকে দেখি নি মা! তুমি কি লাঞ্চ করেছো মা?
কথা ঘুরাইস না বাপ! আমার একটা পুত্রবধূ চাই রে!
মা! সময় মতো হবে মা। আমি এখন রাখি মা?
আচ্ছা রাখ। বাড়ি আসবি কবে?
এই তো হাতের কাজটা শেষ হলেই চলে আসবো।
আবার গোয়েন্দাগিরি?
মা! এটা আমার পেশা।
ঠিক আছে। ঠিক আছে। এখন একটা বৌ আনার ব্যবস্থা কর।
সময় মতো বৌ চলে আসবে ঘরে মা। তুমি আবার মেয়ে দেখতে যেয়ো না যেনো।
কেনো রে? লুৎফা যা বললো সেদিন তাহলে সেটা সত্যি।
সময় এলে জানতে পারবে মা। এখন রাখছি। দোয়া করো মা। আসসালামু আলাইকুম।
আয়েজ আজিজ মোবাইল ফোনের লাইন কেটে হাতঘড়ির দিকে তাকালো। মাত্র দুটো বাজে। বেড়ানো যাক।
কোথায় যাওয়া যায়? ব্যাগ থেকে ট্যাবটা বের করলো। কমলা রাণীর দীঘি দেখতে যাওয়া যায়। এই দূর্গাপুর উপজেলায় কাছাকাছি। দরদাম ঠিক করে উঠে পড়লো এক মোটরবাইকে। আধাঘন্টা লাগবে যেতে। কমলারাণীর দীঘি সম্পর্কে ইন্টারনেটে যা জেনেছে, তা এরকম-
নেত্রকোণা জেলার দূর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত কমলা রাণীর দীঘির কাহিনী অনেক প্রাচীন। জনশ্রুতি আছে সুসং দুর্গাপুরের রানী কমলা খটখটে শুকনো দীঘির মাঝখানে গিয়ে পূজা দেয়ার সময় বজ্রপাতে দীঘির তলার মাটি ফেটে পানিতে ভরে যায়। এতে সলিল সমাধি হয় রানীর। কালের আবর্তনে আজ ধ্বংস হয়ে গেছে সেই কমলা রাণীর দীঘি।
কথিত আছে, ১৫ শতকের শেষ দিকে সুসং দুর্গাপুরের রাজা জানকী নাথ বিয়ে করেন কমলা দেবীকে। ষোড়শ শতাব্দির প্রথম ভাগে প্রজাদের পানির অভাব মিটানোর জন্য একটি বিশাল দীঘি খনন করেন তিনি।
খনন করা হলেও দীঘিতে পানি ওঠে না। রানী কমলা দেবী স্বপ্নে দেখেন, তিনি যদি দীঘির মাঝখানে গিয়ে পূজা দেন তাহলেই দীঘি পানিতে ভরে উঠবে। স্বপ্নাদেশ পেয়ে রানী পুকুরের মাঝখানে গিয়ে পূজায় বসলেন। হঠাৎ বজ্রপাতে দীঘির তলার মাঠি ফেটে পানি উঠতে লাগলো। পানিতে কানায় কানায় ভরে উঠল দীঘি। সলিল সমাধি হলো কমলা রানীর।
বর্তমানে এই দীঘির মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সোমেশ্বরি নদী। কালের সাক্ষী হয়ে থেকে গেছে পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়। কিছু অংশে রয়েছে ফসলি জমি আর পাড়গুলোতে গড়ে উঠেছে বসতভিটা।
আধাঘণ্টায় আয়েজ আজিজ চলে এলো কমলা রাণীর দীঘির স্মৃতিস্থানে। ক্ষয়ে যাওয়া পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর মতো আরো পর্যটক আছে এই পুকুর পাড়ে। কালের কামড়ে পুকুর এখন নদী। ঝিরিঝিরি বাতাসে বেশ ভালোই লাগছে ওর। সারাদিন এখানেই কাটিয়ে দেবে সে। মোবাইল ফোনে অন্যান্যদের মতো ছবি উঠাচ্ছে সেও।
এদিকওদিক ঘুরাঘুরি করে বিকেল পার করে আয়েজ রওয়ানা দিলো আটপাড়া গ্রামের সুধেন রারাং-এর বাড়ির দিকে। সুধেনের বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো পেরিয়ে। ভেতরের ঘরে আলো জ্বললেও বাংলোঘরটা অন্ধকার।