কে ওখানে?
পেছন থেকে আচমকা প্রশ্নটা শুনে আয়েজ আজিজ ভড়কে গেলো না মোটেই। গোয়েন্দাদের ভড়কে যেতে নেই।
সে আস্তে আস্তে প্রশ্নকারীর দিকে ফিরে বললো, আমাকে তুমি চিনবে না। তুমি নিশ্চয়ই সুধেন রারাং?
সুধেন রারাং আর না এগিয়ে বললো, জ্বি। কিন্তু আপনি কে?
আমার নাম আয়েজ আজিজ। আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আমি তোমার কাছেই এসেছি। তুমি ভার্সিটি থেকে ক্লান্ত হয়ে এসেছো। তুমি চট করে বাড়িতে ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি এখানেই অপেক্ষা করছি।
কী কারণে আমার কাছে এসেছেন জানতে পারি কি?
অবশ্যই বলবো। তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো।
বেশ। তাহলে আপনি বাংলোঘরে বসুন। আমি লাইট অন করে দিচ্ছি। মশা কামড়াতে পারে। তবে ডেঙ্গু হবার সম্ভাবনা নাই!
আয়েজ আজিজ মুচকি হেসে বললো, তথাস্তু!
সুধেন এগিয়ে গিয়ে বাংলোঘরে আলো জ্বেলে চলে গেলো বাড়ির ভেতরে। আয়েজ ঢুকলো বাংলোঘরে। টিনের বেড়া ঘেঁষে একটা খাট পাতা-কোন বিছানা নেই; খাটের পাশে একটা টেবিল ও দুটো চেয়ার; উল্টো দিকের বেড়া ঘেঁষে একটা বেঞ্চি পাতা। আয়েজ টেবিলটা সামনে রেখে একটা চেয়ারে বসলো।
দশ মিনিট পর সুধেন রারাং পেন্ট পাল্টে লুঙ্গি পরে এলো বাংলোঘরে। হাতে পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ-সর্ষে তেলে মাখানো মুড়ির থালা ও এক গ্লাস পানি। টেবিলে থালা ও পানির গ্লাস রেখে বললো, মাখানো মুড়ি খান সার। ভালো লাগবো।
আয়েজ একবার ঢোক গিলে বললো, ধন্যবাদ তোমাকে সুধেন। মুড়ি খেতে খেতেই তোমার সাথে কথা বলি।
সুধেন অপর চেয়ারে বসে বললো, এবার বলুন সার কী জানতে চান।
তপতী তো তোমার ক্লাশমেট ছিলো। তাই না?
সুধেন একটু চমকে বললো, আমি যদ্দূর জানি তপতী উধাও কেসের তদন্ত শেষ হয়ে গেছে। ও নিখোঁজ হয়ে গেছে।
একটা মানুষ এভাবে নিখোঁজ হয়ে যেতে পারে না সুধেন। কেউ কী ওকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা কেউ ওকে খারাপ প্রস্তাব দিয়েছিলো কিনা বা ওকে খারাপ নজরে দেখতো কিনা, বলতে পারো?
কী হবে এখন খোঁজ করে সার? ও কি আজো বেঁচে আছে?
হয়তোবা বেঁচে নেই। কিন্তু কেনো নিখোঁজ হলো, কিভাবে নিখোঁজ হলো, জানতে ইচ্ছে করে না তোমার?
তা ইচ্ছে করে।
গুড। তুমি কি তপতীর সাথে কলেজে যেতে? নাকি আলাদাভাবে যেতে?
ও ওর মতো যেতো, আমি আমার মতো যেতাম।
কথা হতো তোমাদের মাঝে? নোট বিনিময় হতো?
তা হতো সার।
তোমার কি ভালো লাগতো কখনো ওকে? ভালোবাসতে ইচ্ছে করতো কখনো?
মেয়ে হিসেবে তপতী খুব ভালো ছিলো। আর কাছাকাছি থাকলে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে সার।
সুন্দর করে বলেছো তুমি কথাগুলো। মনের কথা কখনো বলেছো ওকে?
অনেকবার চেষ্টা করেছি; কিন্তু ওর কাছে যাবার পর আর সাহস পেতাম না।
কোন ছেলে কি ওকে উত্যক্ত করতো?
আমাদের গ্রামের একটি ছেলের সাথে তপতীকে একদিন রাগারাগি করতে দেখেছিলাম।
কী নাম ছেলেটির? কোন পাড়ায় থাকে? কী করে সে এখন?
ওর নাম রনজিত হাজং। মধ্যপাড়ায় থাকে। আমাদের সাথেই ও পড়তো। ক্লাশ ফাইভ পাশ করার পর আর পড়েনি। এখন সে গৃহস্থি করে।
পানি পান শেষ করে দাঁড়ালো আয়েজ আজিজ। সুধেনের সাথে করমর্দন করে বললো, অনেক কথা হলো তোমার সাথে। তপতীর বিষয়ে কোন কথা মনে এলে আমাকে জানাবে। আমি উপজেলা সদরের ডাকবাংলোয় আছি।
প্রয়োজনে আবার দেখা হবে আমাদের।
আয়েজ আজিজ নেমে এলো বাইরে। গ্রামের রাস্তা ধরে হাটছে সে। উঠে এলো পাকা রাস্তায়। ইজিবাইক ও ইঞ্জিন-রিক্সা আসছে-যাচ্ছে। আয়েজ কোন বাহনে না চড়ে হাটছে। ও সুযোগ পেলেই হাটে। তপতীদের বাড়ি অতিক্রম করার সময় দাঁড়িয়ে গেলো চমকে। পাকা রাস্তা থেকে খানিকটা দূরে তপতীদের বাড়ি। জোনাকি পোকার আলোয় পুরো বাড়ি আলোকিত। আশেপাশের বাড়িগুলোয় কোনো জোনাকিপোকা দেখা যাচ্ছে না।
আয়েজের মনে পড়লো: দুই বছর পূর্বে এই দিনে তপতী নিখোঁজ হয়ে যায়। তপতীর নিখোঁজ হওয়ার সাথে জোনাকিপোকার কোনো সংযোগ আছে নাকি? ডাকবাংলোর জোনাকিপোকা বা ডাকবাংলোর পেছনের জঙ্গলের জোনাকিপোকাগুলো ওকে কি কোনো বার্তা দিচ্ছে?
এসব ভাবতে ভাবতে আয়েজ আজিজ নেমে পড়লো পাকা রাস্তা থেকে হৈমন্ত রারাং-এর বাড়ি যাবার আইলে। জোনাকিপোকার রহস্য কোথায়: ভাবতে ভাবতে উঠে এলো হৈমন্ত রারাং-বাড়ির বাইরেগে। জোছনার চেয়েও অধিক আলোকিত হৈমন্ত রারাং-এর বাড়ি।
কোনো মানুষের আগমন টের পেয়ে হৈমন্ত রারাং বেড়িয়ে এলো বাইরে। জোনাকিপোকার আলোয় আয়েজ আজিজকে চিনতে পেরে বললো, আফনে সেই লোকটা না যে গত পরশু আইছিলো তপতীর ব্যাপারে জানতে?
আয়েজ সালাম জানিয় বললো, জ্বি জনাব। আজ জোনাকি পোকার এতো আলো কেন? প্রতিরাতেই কি জোনাকি পোকারা আপনার বাড়িতে আলো দেয়? আশেপাশের বাড়িগুলোতে জোনাক পোকাই দেখছি না!
হৈমন্ত রারাং বললো, আগে এমনটা ছিলো না। আমার মা-টা হারায়া যাইবার পর থাইকা বাড়িতে জোনাকি পোকা বাইড়া গেছে। গেলো বার থাইকা দেখতাছি মেয়েটার হারায় যাওয়ার রাইতে জোনাকী পোকারা বাড়িতে জোছনা নামায়া দিতাছে।
বেশ রহস্যময়। আচ্ছা চাচা, কলেজে আসতে যেতে রাস্তায় বিরক্ত করে এমন কোন কথা কি বলেছিলো তপতী? মনে পড়ে কিছু আপনার?
হৈমন্ত রারাং একবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, আমার মেয়েটা খুব শান্ত প্রকৃতির ছিলো বাবা। কোন ছেলে অমন করলেও বাড়িতে কখনো বলে নাই।
ঠিক আছে। প্রয়োজন হলে আবার আসবো।