হৈমন্ত রারাং-এর পরিবার বলতে হৈমন্ত রারাং, স্ত্রী মাধবী রারাং ও বিদ্যালয়-পড়ুয়া মেয়ে অতসী রারাং। তিনজন এসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলে। আর গ্রামের সবাই করতে লাগলো আফসোস। ইতোমধ্যে জোনাকি পোকা আরো জড়ো হয়ে হ্যাজাকের আলো ছাপিয়ে ছোট জঙ্গলটাকে বিষাদময় আলোয় করে তুললো আলোকিত।
জোনাকির আলোয় জনতার বিষাদময় মুখগুলোর ফাঁকে সুধেন রারাং-এর আতঙ্কিত মুখটা এক ঝলক দেখে আয়েজ আজিজ এগিয়ে গেলো হৈমন্ত পরিবারের দিকে। হৈমন্ত-এর কাঁধে হাত রাখলেও শান্তনামূলক কোন কথা বলতে পারলো না। ক্রন্দনরত সবাইকে দেখে সে চলে এলো এদিকে। ইতোমধ্যে ফরেনসিক বিভাগের কাজ হয়ে গেছে শেষ। ওরা পঁচা-গলা লাশটাকে বডিপ্যাকেটে মুড়িয়ে তুলে নিলো গাড়িতে এবং গর্ত থেকে সকল ধরনের আলামতও করলো সংগ্রহ।
ডাকবাংলোর ড্রয়িংরুমে বসে আছে দূর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়েদ আকাশ, ফরেনসিক বিভাগের দলপতি সাব-ইন্সপেক্টর সামছুল আলম ও শখের গোয়েন্দা আয়েজ আজিজ। সামনে রাখা চা-এর কাপ তিনটি থেকে বের হচ্ছে ধূয়া।
ওসি ওবায়েদ আকাশ বললো, ইনভেস্টিগেশনটা আবার রিওপেন করতে হবে। কী ঝামেলা! আমি যত ঝামেলামুক্ত থাকতে চাই, ততো জড়িয়ে যাই ঝামেলায়।
সাব-ইন্সপেক্টর সামছুল আলম চায়ের কাপে একবার চুমুক দিয়ে বললো, এই লাশ উদ্ধারের ক্রেডিট যায় আমাদের শখের গোয়েন্দা আয়েজ ভায়ের দিকে।
আয়েজ আজিজ সাব-ইন্সপেক্টর সামছুল আলমক জিজ্ঞেস করলো, ফরেনসিক রিপোর্ট কবে পাওয়া যাবে সামছুল আলম ভাই?
এক সপ্তাহ লাগবে।
একটু তাড়াতাড়ি করা যায় না? আমি এসেছিলাম এখানে বেড়াতে। জড়িয়ে গেলাম এই কেসটায়। বাড়ি যাওয়া দরকার।
ওসি ওবায়েদ আকাশ বললো, আপনি তো সরকারি চাকরি করেন না। বাড়ি যাওয়ার তাড়া কী। আপনি কেসটা সলভ করে যান, যদি পারেন!
আয়েজ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো, কেস প্রায় সলভ হওয়ার পথে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলেই কন্ক্রিট সিদ্ধান্তে যেতে পারবো।
ওসি ওবায়েদ আকাশ দাঁড়িয়ে বললো, আজ উঠি।।অনেক রাত হয়েছে। মিস্টার আয়েজ, তদন্তে যত রকম সাহায্য লাগে আপনি পাবেন আমার কাছ থেকে।
ওবায়েদ আকাশ আয়েজের সাথে শেকহ্যান্ড করে এগিয়ে গেলো নিজ জিপের দিকে।
সাব-ইন্সপেক্টর সামছুল আলম আয়েজের সাথে শেকহ্যান্ড করে বললো, আপনি আমাকে সঙ্গে নিলে আমি চাকরি ছেড়ে দেবো। আমার প্রাইভেট ডিটেক্টিভ হবার খুব শখ।
আয়েজ আজিজ সামছুল আলমের হাত থেকে হাতটা ছাড়িয়ে মুচকি হেসে বললো, প্রাইভেট ডিটেক্টিভদের ভাত জোটে না পেটে। তাছাড়া আজো আমাদের দেশে প্রাইভেট ডিটেকটিভদের পুলিশ বিভাগ সুনজরে দেখে না।
তাছাড়া পরিবারের সদস্যদের বকাঝকা তো আছেই।
আপনার কথা সত্যি। তাই আপাততঃ বাদ দিলাম প্রাইভেট ডিটেকটিভ হওয়া। গেলাম। আমি যত দ্রুত সম্ভব পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাঠিয়ে দেবো আপনার কাছে। শুভরাত্রি।
আয়েজ আজিজ কক্ষে ঢোকার সাথে সাথে রবার্ট সিধু ঢুকলো ভেতরে। আয়েজ সাথে সাথে ওকে বললো, প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। খাবার নিয়ে এসো।
রবার্ট সিধু বললো, তপতীর মা-বাবা আর বোনটা আসছে আফনের সাথে কথা কওয়ার লাইগ্যা।
নিয়ে এসো। আগে ওদের সাথে কথা বলে নেই।
রবার্ট সিধু কক্ষ থেকে বেরিয়ে একটু পর তিনজনকে নিয়ে ফের ঢুকলো ভেতরে। তিনজন ঢুকেই ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। হৃদয় বিদারক দৃশ্য। কী শান্তনা দেবে আয়েজ ওদের। তবু শান্তনা দিতে হয়।
আয়েজ আজিজ হৈমন্ত রারাং-এর কাছে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রেখে বললো, সন্তান হারানোর কোন শান্তনা হয় না। তবু শান্তনা দিতে হয়।আপনারা প্রার্থনা করেন যেনো তপতীর খুনিকে শনাক্ত করতে পারি।
হৈমন্ত রারাং একবার হেচকি টেনে বললো, আমার মারে এভাবে মারলো কারা? আমি ওদের শাস্তি চাই সাহেব।
তপতীর মা কাজল রারাং একবার ফুপিয়ে বললো, কী হইবো বিচার কইরা। আমার মাইয়াডা কি ফিইরা আইবো?
আয়েজ ব্যথাতুর কণ্ঠে বললো, তারপরও বিচার হতে হবে।
হৈমন্ত রারাং জিজ্ঞেস করলো, আমার মাইয়াডার এই অবস্থা কেডা করলো বাবা?
আয়েজ বললো, কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছি। কনফার্ম না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না। যদি আপনি আমাকে আরেকটু সহযোগিতা করেন তাহলে কাজটা আমার জন্য বেশ সহজ হয়ে যাবে।
কিতা কইতাম বাবা। এর আগেও আফনেরে কইছি, আমি কিছুই জানি না।
তপতীকে ঘিরে ছোটখাট ঘটনাও খুনিকে বের করতে সহায়তা করবে। যা-ই মনে আসে,বলেন।
বাবা রে, আমার মাইয়াডা বাড়িত্থন হাইট্টা কলেজে যাইতো আইতো। মাঝে মইধ্যে সুধেনকে দেখতাম ওর সাথে কথা কইতে।
সুধেন ও তপতী একই ক্লাশে পড়তো। তাই না চাচা?
জ্বে।
আর কিছু?
ওসি সাবের ছেলেকে দেখেছি সুধেনের সাথে কথা কইতে।
ওসি সাহেবের ছেলে কি তপতীদের সাথে পড়তো?
কইতে পারতাম না গো।
ঠিক আছে। আপনারা যান। আর মনটাকে শক্ত রাখেন। আমি তপতীর খুনিকে বের করবোই!
তখন তপতীর ছোটবোন অতসী বললো, আফাকে দেখছি মাঝে মধ্যে ডাইরি লিখতে।
আয়েজ আজিজ চমকে উঠে বললো, কী বলছো তুমি! একথাটা আগে বলো নাই কেনো?
এতক্ষণ মনে ছিলো না সার।
আমাকে স্যার বলার দরকার নাই-ভাই বলবা, আয়েজ ভাই। তুমি ডায়রিটা পড়েছো কখনো?
না ভাইয়া। আফা কখনো আমারে পড়তে দেয় নাই।
তুমি কি ডায়রিটা খুঁজে বের করতে পারবে?
বিছরাইলে পায়াম ভাইয়া।
তাহলে যাও। ডায়রিটা খুঁজে বের করে তোমার বাবার কাছে দিয়ে রেখো। ওটা নিয়ে রাতে আসার দরকার নাই।
সকালে নিয়ে আসলেই হবে।
হৈমন্ত রারাং পরিবার কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো। সাথে সাথে রাতের খাবার নিয়ে ছেলেসহ রবার্ট সিধু ঢুকলো কক্ষে। আয়েজ দ্রুত খেয়ে নিলো। রবার্ট এঁটো থালাবাসন নিয়ে চলে যাবার পর দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো আয়েজ। আড়াইটা বাজে। মা-বাবা ও সুস্মিতা কয়েকবার ফোন করলেও সে ধরতে পারে নি। খবর আছে! খবর থাকলেও এখন কাউকে ফোন করা যাবে না। সুইচ অফ করে শোবার সাথে সাথে জোনাকিপোকার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো কক্ষটা।
আয়েজ বিছানায় উঠে বসে বললো, তোদের ধন্যবাদ। তোরা আলো জ্বেলে ওভাবে সংকেত না দিলে ভাবতামই না যে ওখানে লাশ আছে।
সাথে সাথে জোনাকি পোকাগুলো আয়েজের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মোলায়েম স্পর্শ দিয়ে উঠে গেলো উপরে।
আয়েজ মুচকি হেসে বললো, তোদের এই হঠাৎ আদরের আক্রমনে প্রথমে আমি ভড়কে গিয়েছিলাম রে! আবারো ধন্যবাদ তোদের। একটা বিষয় বুঝতে পারছি না-তপতীকে ঘিরে তোদের এই ভালোবাসার কারণ কী?
জোনাকি পোকাগুলো আলো নিভিয়ে দিলো সাথে সাথে।
আয়েজ বললো, ঠিক আছে। আমি কারণ খুঁজে নেবো। কারা এই মর্মান্তিক কাজটা করলো তার কোন হিন্টস দিতে পারিস তোরা?
সকল জোনাকি পোকা টপাটপ পড়তে থাকলো মেঝেতে। আলোও জ্বলছে না কোনো।
আয়েজ আজিজ বললো, নো প্রবলেম। তোরা যথেষ্ট হেল্প করেছিস। অনেক রাত হয়েছে। তোরা ভাগ এখান থেকে। আমার ঘুম পাচ্ছে খুব। সামনে বহু কাজ। আল্লাহ হাফেজ।
জোনাকি পোকাগুলো দৌড়াতে লাগলো ওয়াশরুমের দিকে। ওখান থেকে ওরা ঘুলঘুলি দিয়ে চলে যাবে বাইরে।
আয়েজ শুয়ে পড়ার সাথে সাথে গভীর ঘুমে গেলো তলিয়ে।
পরদিন আয়েজের ঘুম ভাংলো মোবাইল ফোনের রিং-এর শব্দে। ধড়ফড়িয়ে উঠে টেবিলের উপর থেকে মোবাইল ফোনটা তুলে নম্বর দেখে দ্রুত স্ক্রিণ ইতিবাচক স্লাইডিং করে ঠেকালো কানে। কথা বলছে না সুস্মিতা। অন্য কেউ নাকি?
আয়েজ বললো, হ্যালো? কী খবর? কেমন আছো তুমি? তুমি রিং না করলে তো জাগতেই পারতাম না এখন!
আশ্চর্য! এলার্মেও জাগতে পারি নাই!
সুস্মিতা গাল ফুলিয়ে বললো, তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ। ভাবছি, আমার বাবার দেখা পাত্রকেই বিয়ে করে ফেলবো!
কী সর্বনাশ! তোমার বাবা মানে আমার হবু শ্বশুর ছেলে দেখেছেন নাকি?
বাবা তো তোমাকেই পছন্দ করে বসে আছেন!
এটা তো জানি! আমি ভাবলাম অন্য কোন ছেলে!
তুমি কি তাই চাচ্ছো?
তখন হৈমন্ত রারাং ঢুকলো কক্ষে। ওর হাতে ছোট একটা ডায়েরি।
আয়েজ বললো, এখন রাখতে হচ্ছে সুস্মিতা। একটা কাজ চলে এসেছে। ফৃ হয়ে তোমাকে ফের ফোন করবো।
কেমন?
আয়েজ আজিজ ফোনের লাইন কেটে হৈমন্তের দিকে তাকিয়ে বললো, ডায়েরিটা পাওয়ায় ভালোই হলো। দেন।
হৈমন্ত রারাং আয়েজের হাতে ডায়েরিটা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পরক্ষণে ফুপিয়ে উঠলো।
আয়েজ আজিজ হৈমন্ত রারাং-এর কাঁধে হাত রেখে বললো, আপনার মেয়ে তো ফিরে আসবে না চাচা। খুনিকে সনাক্ত করতে এই ডায়েরিটা অনেক সহায়তা করবে। আপনি বাড়ি চলে যান। প্রয়োজনে আমি আপনার বাড়ি চলে আসবো।
অশ্রু মুছতে মুছতে চলে গেলো হৈমন্ত রারাং।