ছুটি নিয়ে নির্জনবাসে চলে এলো আয়েজ আজিজ। নেত্রকোণার দূর্গাপুরে।আয়েজ আজিজ কোনো চাকরি করে না-সে নিজের কাছ থেকে ছুটি নিয়েছে নিজে! পাহাড় থাকলেও এদিকে ছুটি কাটাতে তেমন কেউ আসে না। ডাকবাংলো অবহেলিত। পেছনেই ছোট একটি জঙ্গল। আশেপাশে ছোট ছোট পাহাড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এলাকাটা উপজাতি অধ্যুসিত। গারো ও হাজং।
কিশোরগঞ্জ থেকে বাসে আসতে গড়িয়ে গেছে দুপুর। কেয়ারটেকার রবার্ট সিধু দুটো টোস্ট ও চা রেখে গেলো।
আয়েজ আজিজ শুয়ে আছে বিছানায়। বেশ ক্লান্তি লাগায় ইচ্ছে করছে না বিছানা থেকে উঠতে। চা-এর কাপ থেকে ভেসে আসছে লেবুর ঘ্রাণ। লেবুর ঘ্রাণটা ওকে চা-এর প্রতি তৃষ্ণার্ত করে তুললো। সে বিছানা থেকে নেমে চা-এর কাপটা তুলে নিলো হাতে। তাকালো চা-এর কাপে-সরাসরি কিছু পাত্তি দেয়া হয়েছে। বেশ কাঁচা কাঁচা ঘ্রাণ বের হচ্ছে এখন। চা-এর কাপটা নাকে ঠেকিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে ঘ্রাণ নিলো একবার। দ্বিতীয় বার নাকে না ঠেকিয়ে দিলো চুমুক। অন্যরকম স্বাদ! আয়েশ করে চা পান শেষ করে লম্বা একটা হাই তুলে বেরিয়ে এলো কক্ষ থেকে।
সাথে সাথে কেয়ারটেকার সিধু এসে হাজির। বললো, কোথাও যাইবাইন ছার?
আয়েজ বললো, আগে তোমার নামটা জানা দরকার। কী নাম তোমার?
রবার্ট সিধু বললো, আমার নাম রবার্ট সিধু।
রবার্ট সিধু? এ কেমন নাম? তুমি কি কনভার্টেড খৃষ্টান?
সিধু বললো, এখানের অধিকাংশই কনভার্টেড খৃষ্টান ছার।
এরকম হলো কেনো? তোমরা তো অরিজিনালি বুড্ডিস্ট ছিলে?
অভাব ছার।
বুঝতে পেরেছি। এটা বৃটিশ শাসনামল হতেই চলে আসছে। যাক গে।
কই যাইবাইন ছার?
এই পিছনের জঙ্গলটায় একটু ঘুরে আসি।
একলা ডরাইবাইন না তো?
ডরাবো কেন! এই জঙ্গলে তো আর বাঘ ভাল্লুক নাই।
ঠিকাছে। যান ছার। রাইতে কী খাইবাইন?
তুমি যা খাওয়াও সিধু!
আলুভাজি, চাইপলা মাছের দোপেয়াজি, মুরগির মাংশ আর ডাউল।
বাস বাস! চাপিলার দোপিয়াজা শুনেই আমার জিভে পানি চলে এসেছে। আয়েজ একবার ঢোক গিলে বললো, চাপিলা মাছটা আমার খুব পছন্দের। তুমি রাতের রান্নার ব্যবস্থা করতে থাকো। আমি গেলাম।
আয়েজ আজিজ এগিয়ে গেলো জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো আয়েজ। পায়ে চলার পথ দেখা যাচ্ছে। জঙ্গলের ভেতরে পা দেবার সাথে সাথে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠলো ওর। ওর গ্রামের বাড়িতে ছোট একটা জঙ্গল আছে। বাড়ি গেলেই ও একবার ঐ জঙ্গলে ঢুকে বিভিন্ন গাছ-গাছালি দেখে। এটা অচেনা জঙ্গল হওয়ায় একটু ভয়ের মতো লাগছে। ভয় কাটাতে সে অচেনা গুল্মজাতিয় গাছ থেকে একটা ডাল ভেঙে নিলো হাতে।

ডালটা হাতে নেয়ায় সাহস ফিরে এসেছে আয়েজ আজিজের। পায়ে চলার পথে শুকনো পাতা পড়ে থাকায় শব্দ হচ্ছে মচমচ। এই মচমচ শব্দটা গা ছমছম ভাব তৈরি করছে। আয়েজ সামনে পেছনে অর্থাৎ চারদিকে নজর রেখে হাটছে আস্তে ধীরে। এক জায়গায় এসে অদূরে একটা গামছার প্রান্ত দেখতে পেয়ে দ্রুত চলে গেলো গাছের আড়ালে। ওখানে কোন মানুষ থেকে থাকলে ওর আগমন টের পায় নি।
আয়েজ আজিজ গাছের আড়ালে থেকে উঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করলো ওটা কি শুধুই গামছার প্রান্ত, নাকি কোন মানুষ আছে গামছার আড়ালে? গামছার প্রান্তটা নড়ছে না একদম। গাছের আড়াল ধরে নিঃশব্দে ওদিকে যেতে থাকলো আয়েজ। আছে! গামছাটা একটা লোকের কাঁধে! লোকটা তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। আয়েজও লোকটার দিকে অনুসরণ করে তাকালো সামনের দিকে। একটি খাঁচার উপরেরটুকু দেখতে পাচ্ছে ও। সামনে গলা বাড়িয়ে ষ্পষ্ট দেখার জন্য গলা বাড়াতে গেলে লোকটি ওর দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে চুপ থাকতে বললো। অর্থাৎ লোকটি ওর আগমন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কিছু না বুঝলেও আয়েজ আজিজ চুপচাপ বসে থাকলো ওর পেছনে।
সময় বয়ে যাচ্ছে; অথচ ঘটছে না কিছুই। উসখুস করলেও সামলে নিয়ে চুপচাপ থাকছে আয়েজ আজিজ। হঠাৎ লোকটা ছুটে গেলো খাঁচাটার দিকে। কিছু বুঝতে না পারলেও আয়েজও ছুটলো লোকটার পিছনে। খাঁচার কাছাকাছি গিয়ে লোকটা গেলো দাঁড়িয়ে। আয়েজ আজিজ নিজকে সামলাতে গিয়ে লোকটার উপর পড়তে গিয়েও থামতে পারলো। সামনে অভূতপূর্ব দৃশ্য।
খাঁচার কাছে দুটি ডাহুক পাখি মারামারি করছে। লোকটা ছুটে গিয়ে ডাহুক দুটোকে ধরে ফেললো। একটাকে ঢুকিয়ে দিলো খাঁচায়, আর অপরটার পা দুটো ঝটপট বেঁধে দুটো পাখায় প্যাঁচ লাগিয়ে রেখে দিলো মাটিতে।
এভাবে পাখিকে পাখা দিয়ে পাখায় প্যাঁচ লাগিয়ে দিলে আর উড়তে পারে না।
আয়েজ আজিজ লোকটাকে জিজ্ঞেস করলো, কী হলো এটা ভাই?
লোকটা যুবক বয়সের। পরনে টাখনু পর্যন্ত মুড়ানো জিন্সের প্যান্ট, গায়ে নেভি ব্লু রঙের টি-শার্ট, কোমরে একটি গামছা বাঁধা-একই রঙের একটি গামছা কাঁধেও। যুবকটা পান খায়-দাঁতগুলো সাক্ষী, ধূমপান করে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। পিঠে একটা ব্যাগপ্যাক ঝুলছে।
যুবকটি কৃতিত্বের একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে পিঠ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে হাত দিলো ভেতরে। একটা এলুমিনিয়ামের বাটা বের করে পান সাজিয়ে আয়েজের দিকে বাড়িয়ে ধরলো। আয়েজ পান চিবুয় না; কিন্তু এখন ওর পানটা দেখে লোভ লাগলো বেশ। সে পানটা নিয়ে মুখে পুরলো। লোকটা আরেকটা পান বানিয়ে নিজে মুখে পুরে চিবুতে লাগলো। এবার সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা শলাকা নিয়ে প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরলো আয়েজ আজিজের দিকে। আয়েজ ধূমপানে অভ্যস্ত না বিধায় হাত নেড়ে নেতিবাচক জবাব দিলে লোকটা সিগারেটের প্যাকেটটা রেখে দিলো ভেতরে। একটা লাইটার বের করে সিগারেট জ্বালিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে লাইটারটা রেখে দিলো ব্যাগে। লোকটা পাশেই পানের পিক ফেলে যা বললো তা এরকম:
ওর নাম সিদ্দিকালি। ও ডাহুক শিকার করে বিক্রি করে। এটাই ওর পেশা। খাঁচার ডাহুকটা ওর পোষা। এটা পুরুষ ডাহুক। স্ত্রী-ডাহুক দিয়ে শিকার করা যায় না। ডাহুক শিকারের জন্য শিকারি ডাহুক বানাতে হলে বাচ্চা থেকেই পালতে হয়। বাচ্চা থেকে পালা হলে বড় হবার পর ছেড়ে দিলেও চলে যায় না। সারাদিন ৪/৫-টার বেশি ডাহুক পাওয়া যায় না। ইদানিং ডাহুক বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রামে জঙ্গল কমে যাচ্ছে। জঙ্গল উঠিয়ে বাড়ি বানাচ্ছে অথবা কাঠ পাওয়ার জন্য বৃক্ষচারা লাগাচ্ছে। এক একটা ডাহুক চার শ টাকা বা পাঁচ শ টাকায় বিক্রি করে-চার শ টাকার কম হলে পোষায় না।
আয়েজ বললো, এই ডাহুকটা কত নিবেন সিদ্দকালি সাহেব?
সিদ্দিকালি এক গাল হেসে বললো, আফনে এই ডাহুকটা শিকার করতে দ্যাখছেন। তাই আফনে চাইশ শ টাকা দেন।
ওকে।
বলে আয়েজ আজিজ এক শত টাকার চারটি নোট সিদ্দিকালির হাতে দিয়ে বললো, আপনি এই ডাহুকটা ডাকবাংলোর দারোয়ানের হাতে দিয়ে বলবেন, রাতের জন্য রান্না করতে। ঝাল যেনো একটু বেশি দেয়।
আইচ্ছা। আফনে কি এই জঙ্গলে আরো থাকবাইন ভাইসাব?
জ্বি।আপনার জন্য এই জঙ্গলের কিছুই দেখা হয় নাই। আপনি যান।
একটু সাবধানে থাইকেন। বলে ডাহুক শিকারি সিদ্দিকালি খাঁচা ও ডাহুকটা নিয়ে চলে গেলো।
আয়েজ আজিজ ঘাড় নেড়ে মুচকি হেসে হাতের লাঠিটা নাড়তে নাড়তে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। হাটছে এলোমেলো। জন্তু-জানোয়ার চোখে পড়ছে না। তারপরও গা-টা কেমন যেনো ছমছম করছে। সামনের একটা ঝোপ থেকে চিলতে ধোঁয়া উড়তে দেখে দাঁড়ালো আয়েজ। ধোঁয়া মানে লোক আছে ওখানে। কী করছে? এখনো খোলা জায়গায় পায়খানা করে এখানকার লোক? পায়খানার চাপ আসার জন্য সিগারেট টানছে। ছ্যা! ওদিকে না গিয়ে বরং অন্যদিকে যাই। সে ডানদিকে মোড় নিয়ে যেতে থাকলো ওদিকে। কিছুদূর যাবার পর ফের সামনের এক ঝোপের আড়াল থেকে ধোঁয়ার চিলতে বেরুতে দেখে নাক কুচকে ওখানেই দাঁড়িয়ে গেলো আয়েজ। মনে মনে বললো: এখানেও একজন খোলা জায়গায় বসে গেছে মল ত্যাগে। ফের ডানে বাঁক নিয়ে হাটতে লাগলো। কিছুদূর যাবার পর একইভাবে একটা ঝোপের আড়াল থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখে ডানে নিলো। এভাবে ও যেদিকেই বাঁক নেয় সেদিকেই ঝোপের আড়াল থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখতে পাচ্ছে আয়েজ।
বিরক্ত হয়ে আয়েজ আজিজ সেখানেই বসে বিরবির করে বললো, এতো লোক একসাথে জঙ্গলে বসে খোলা জায়গায় পায়খানা করছে!? সবাই সিগারেট টানছে! তাহলে সবাই পুরুষ। কী আশ্চর্য!

রাতে খেতে বসে আয়েজ আজিজ কথাটা বললে রবার্ট সিধু বিস্মিত হয়ে বললো, কী কন ছার! আমাদের এখানে অহন আর কেউ জঙ্গলে পায়খানা করে না।
আয়েজ আজিজ বিষম খেয়ে বললো, কী বলছো তুমি সিধু! তাহলে আমি ওগুলো কী দেখলাম?
জোনাকি পোকা দেখছেন মনে হয়।
জোনাকি পোকা! দিনের বেলা জোনাকি পোকা দেখা যায় নাকি? তাছাড়া জোনাকিরা কি সিগারেট খায় যে ধোঁয়া বের হবে?
রবার্ট সিধু ঠোঁট উল্টে বললো, কী জানি ছার! ঐসব ভুইল্যা যান। সকালে কী নাস্তা খাইবাইন ছার?
আয়েজ আজিজ পাতে ডাল নিতে নিতে বললো, আচ্ছা সিধু, জঙ্গলে কী ভূত আছে?
আফনে কী ভূত বিশ্বাস করেন ছার?
সিধুর পাল্টা প্রশ্ন শুনে থতমত খেলো আয়েজ আজিজ। সামলে নিয়ে বললো, বাস্তবে ভূত নাই, তবে কল্পনায় আছে। একসময় প্রচুর ভূতের সিনেমা দেখেছি। এখন আর ভালো লাগে না।
সিধু বললো, আত্মা আছে ছার। রাইতে আত্মারা ঘুইরা বেড়ায়।
আয়েজ বললো, আমাদের ধর্মে আত্মা বলতে কিছু নাই। যাক সে কথা।
ছার কি চা খাইবেন অহন?
খাওয়া শেষ হওয়ায় আয়েজ হাত ধোবার জন্য বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো, এক কাপ লেবু চা দাও। চিনি দিবা হাফ চামচ।
সিধু একটু কণ্ঠ উঁচিয়ে বললো, চিনি খাইয়েন না ছার।
কেনো?
চিনির সাথে চায়ের কী সম্পর্ক? কন ছার!
কী বলছো তুমি! চিনি ছাড়া চা পান করা যায়? তিতা লাগবে না?
চা-এর আসল স্বাদ চায়ে। চিনি দুধ দিলে চায়ের অন্য স্বাদ হয়, চায়ের আসল স্বাদ থাকে না। আমি চিনি ছাড়া রং চা খাই ছার। চায়ের আসল স্বাদ পাই।
আয়েজ আজিজ এক চিলতে হেসে দিয়ে বললো, চমৎকার বলেছো তুমি। আমার চারটাই পছন্দ।
চারটা মানে ছার?
চিনি-দুধ ছাড়া রং চা, চিনি-দুধের চা, চিনি ছাড়া দুধ-চা এবং দুধ ছাড়া চিনির রং চা।
এবার রবার্ট সিধু নিঃশব্দ হেসে বললো, আফেনর জন্য অহন কোন চা আনতাম ছার?
এখন আমার জন্য চিনি দুধের চা নিয়ে এসো।
ঠিকাছে ছার।