কক্সবাজারের ডাব কাটার সিস্টেমটা দারুণ ! সাধারণত ডাবের গোড়ার সাইড কেটে পাইপ দিয়ে দেয়া হয়।কিন্তু এখানে যত জায়গায় ডাব খেয়েছি, প্রতিটা জায়গায় ই ডাবের পেট কেটে পাইপ ঢুকিয়ে দেয়। আর অদ্ভুত হচ্ছে ঢাকার দুটো ডাবের পানি থাকছে কক্সবাজারের একটি ডাবে।সে কী স্বাদ! মুখে লেগে আছে যেন…

ধীরে ধীরে সিড়ি ভেঙে যতই নীচে নামছি, পাল্লা দিয়ে মনটা ততই খারাপ হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই, যেতেই হবে। অগত্যা নীচে এসে বিশাল সুখ্যাত হিমছড়ি ঝর্ণা দর্শনে সামনে এগুতে লাগলাম। শামুক-ঝিনুক আর বার্মিজ খাবারের দোকানগুলো পেরিয়ে ঝর্ণা। এটি মূলত কৃত্রিম ঝর্ণা। সাগর থেকে পানি সিস্টেমেটিক ওয়েতে ঝর্ণায় আসে। রাত ১১টার পরে বন্ধ করে দেয়া হয় ঝর্ণা।
এটা জানার পরেই কেন জানি আমি ঝর্ণার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেললাম !

ফিরতি পথে খেলাম পাহাড়ি আনার। এতো স্বাদ! আমাদের কদবেলের মতো আকার। মুখটা কেটে লবন মরিচ আর একটু চিনি মিশিয়ে দিলো দোকানী।যেমন টক তেমনি মিষ্টি।আনারের ভেতরের মাংসের সাথে ছোট ছোট কালো বীচিগুলোও চিবিয়ে খেতে হয়। দারুণ মজার ফল এই পাহাড়ি আনার!

ঝর্ণা দেখে বের হয়ে বার্মিজ দোকানগুলো ঘুরে দেখলাম। তারপর ছোট ছোট পিঁয়াজু কিনে সেখানে দাঁড়িয়েই পেট পূজার সাথে সাথে পারিপার্শ্বিকতাটুকু জেনে নিলাম। এবার গন্তব্য ইনানী বীচ আর টেকের হাট…

ব্যাটারির গাড়ি ছুটে চলছে মেরিন ড্রাইভ রোডে আর আমি আলমাস সাহেবের কাঁধে মাথা রেখে সাগরের উদ্দাম নৃত্য দেখছি। সত্যি এ এক পরম সুখ। ভালোবাসার মানুষটির হাত ছুঁয়ে থাকতে পারা নর-নারী দুজনেই পরম ভাগ্যবান! গাড়ি চলছে। ইনানীর স্থলভাগে নগরায়নের ছোঁয়া লাগছে ধীরে ধীরে। বিভিন্ন হোটেল মোটেল মাথা উঁচু করছে সগর্বে। আর নির্মাণশৈলীও কিন্তু দারুণ!
দেখতে প্রশান্তিকর। ইনানী বীচে পর্যটকেরা দুপুরের স্নানে ব্যস্ত। আমরা পাশ কাটিয়ে ছুটে চলেছি টেকের হাটের দিকে যেখানে বড় বড় পাথর উঠে আসে সমুদ্র থেকে। যেখানে ইনানীর সুন্দরতম হোটেল ‘হোটেল রয়েল টিউলিপ’অবস্থিত। দারুণ দৃষ্টিনন্দন হোটেল! না জানি ভেতরটা কত সুন্দর করেছে!

আমরা দুজন নেমে এগোতে লাগলাম পাথরের রাজ্যে। আমার ক্যামেরাম্যানের তো মাথা নষ্ট এমন অপরূপ সৌন্দর্য্যের আঁধারে এসে। ক্লিকের পর ক্লিক চলছে চারিদিকে। এতো বড় বড় পাথর আর এমনভাবে সেগুলো মাঝ বরাবর কাটা যে না দেখলে বিশ্বাস করার উপায় নেই এসব মহান আল্লাহর নিজ হাতে করা!

এতো রকমারি ঝিনুক শামুক কড়ি- কী নেই এখানে!
পানি ভেঙে যতই সামনে যাই ততই মুগ্ধ হই, একটার চেয়ে একটা বড় বড় পাথর বিছিয়ে আছে সারা বেলাভূমি জুড়ে। আলমাস সাহেব ঝিনুক আর অসাধারণ সব রঙিন পাথর কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আর আমি তো সব্যসাচী হয়ে সাগরের পানি ছুঁয়ে নির্জনতাকে সঙ্গ দিচ্ছি। আমাদের তরুণ ড্রাইভারও আলমাস সাহেবের সঙ্গী হলো। দুজনে ঝিনুক কুড়িয়ে আমার অঞ্জলি ভরে দিলো। আমি সানন্দে সেগুলো ভ্যানিটিব্যাগে চালান দিলাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল এই বেলাভূমিতে শুধু আমরা তিনজনই ঘুরে বেড়ালাম। এই দিকটায় নাকি ভরদুপুরে খুব কম লোকই আসে। তবে আমাদের সঙ্গী ছিল লাল কাঁকড়াদের অদ্ভুত সুন্দর আল্পনা। ম্যাচের কাঠির মতো চিকন ছিদ্র দিয়ে ওরা বেলাভূমিতে বেরিয়ে আসে এবং ওদের বাসার চারিপাশে কেমন যেন পায়ের ছাপ রেখে চলে। সারা বেলাভূমি জুড়েই ওদের পদচারণা যেন পর্যটকদের স্বাগত জানানোর প্রাকৃতিক আয়োজন! ইচ্ছেমতো ফটোসেশান করে ফিরতি পথ ধরলাম।
পথে জেলে নৌকা দেখে জেলেদের সাথে কথা বলে নিলাম, আমি নৌকায় উঠে পুরোটা ঘুরেফিরে দেখলাম। কিছুক্ষণ গলুইয়ে বসে থাকলাম। ওদের জীবনটা খুব কষ্টের। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু হাসিমুখে আমাদের বিদায় জানাতে ভুললোনা। ওদের হাসিটাই বলে দেয় ওদের সরলতার কথা। রেজু খালের উপর নির্মিত চমৎকার ব্রিজ দিয়ে আমরা শহরের দিকে ছুটে চললাম। এবার আমার সাইডে পাহাড়। আমার দুচোখ তো ভুল করবার নয়! পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে শহরে চলে এলাম। কিন্তু শহরে ঢুকতে গিয়েই যত বিপত্তি হলো। বিদ্যুতের কাজের জন্য রাস্তা বন্ধ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। আমরা ৯টার মধ্যে বেরিয়েছিলাম বলে বাঁধা পাইনি। পড়লাম বিপদে, বিশেষ করে আমি। হাঁটায় আমি খুব কাঁচা। একবার সাহস করে আব্বাকে বলেছিলাম “যেখানেই বিয়ে দেন, গাড়ি যেন উঠোনে যায়”। আব্বা তো অবাক!

যাহোক হাঁটা শুরু হলো। কিন্তু আল্লাহ সবসময়ই আমার সাথে থাকেন। কিছুদূর যেতেই একটা ব্যাটারির গাড়ি পেলাম। আল্লাহকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়লাম। নির্দিষ্ট একটি জায়গায় এনে নামিয়ে দিলো। সেখান থেকে রিকশায় কলাতলী এসে হোটেলে পেট পূজা করে সোজা বাসায়। তখন বাজে বিকেল ৩টা। ফ্রেস হয়েই বিছানার সদ্ব্যবহার করে ফেললাম। সিদ্ধান্ত হলো আগামী দিনের অভিযাত্রা হবে মহেশখালী…