সকালে উঠেই তৈরি হয়ে নিলাম। খাবারের ভরসা একমাত্র হোটেল। তাই সাড়ম্বরে হোটেলে নাস্তা করে ব্যাটারির গাড়ি নিয়ে ৬ নাম্বার জেটি ঘাটের উদ্দেশ্যে দে ছুট। গাড়ি শহরের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে ছুটে চললো। পুরো শহর জুড়েই প্রাণ চাঞ্চল্য শুরু হয়ে গেছে। কক্সবাজার থেকে মহেশখালীর বাহন বলতে ইঞ্জিন চালিত বোট অথবা স্পিডবোট। নৌকায় গেলে ঘন্টা দেড়েক আর স্পিডবোটে গেলে ২০/২৫ মিনিট লাগে। সে এক দারুণ ব্যাপার! আমরা স্পিডবোটই বেছে নিলাম।

মহেশখালী উপজেলা কক্সবাজার জেলার একটি দ্বীপ। কক্সবাজার থেকে এটি মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জনশ্রুতি আছে ১৫৫৯ সালের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই দ্বীপের সৃষ্টি হয়। বৌদ্ধ সেন মহেশ্বর থেকেই প্রায় ২০০ বছর আগে এই জায়গায়র নামকরণ হয়। যা মহেশখালী দ্বীপ নামেও পরিচিত। মহেশখালী উপজেলায় সোনাদিয়া, মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা নামে তিনটি ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। পান, মাছ, শুঁটকী, চিংড়ি, লবণ এবং মুক্তার উৎপাদনের জন্য সুখ্যাত। বলা বাহুল্য, এটিই বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ।

স্পিডবোট পানি কেটে এগিয়ে চললো। আমি ভয় আর রোমাঞ্চ মিশ্রিত আবেগে কাঁপছি। বাঁকখালি নদী বেয়ে স্পিডবোট ছুটে চলেছে। একপাশে জলাবন, তিন ভাগ পানির নীচে থেকেও কী সতেজ সবুজ তার রঙ! পাখপাখালি মাথার উপর উড়ছে, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সূর্যের তেজ। ১০টার মধ্যেই আমরা স্বপ্নের মহেশখালী। এই মহেশখালীর স্বপ্ন দেখছি ১৯৭৭ সাল থেকে। তখন একটি সিনেমা হয়েছিল ‘মহেশখালীর বাঁকে’নামে। সেই ছবিতে মহেশখালীর রূপ-যৌবন আমাকে মুগ্ধ করেছিল। স্বপ্ন দেখতাম আমিও সুচরিতার মতো মহেশখালীর সৈকতে হাঁটছি। আজ সে স্বপ্ন পূরণের দিন!

ঘাটে নেমেই দালালের উৎপাত। সেসব মাড়িয়ে একটি রিকশা রিজার্ভ করে শুরু হলো মহেশখালী দর্শন অভিযান। গোরকঘাটা ঘাট থেকেই শুরু হলো দর্শন। ঘাট থেকে লম্বা ব্রীজ পার হয়েই বাজার। বাজারের সাথেই রাখাইনদের আদি বৌদ্ধ মন্দির। ঘুরে ফিরে পুরোটাই দেখা হলো।দেখতে চমৎকার হলেও আমার মনে হয়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব। বাজার মহেশখালীর মিষ্টি পানের পাইকারদের আনাগোনায় মুখর। সাথে শুঁটকির বেচাকেনা। একপাশে শুঁটকি শুকাতে দেয়া। এসব কিছু পাশ কাটিয়ে রিকশা চলছে স্বর্ণ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। শহর জুড়ে একটিই পাকা রাস্তা। প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিরাট দীঘি। দারুণ টলটলে জল। ইচ্ছে করছিল জলে পা ভেজাই কিন্তু… দেখলাম লবণ তৈরির জন্য আটকে রাখা পানি।

রাখাইন পাড়ায় চলে এলাম স্বর্ণ মন্দিরের কাছে। ঘুরে দেখলাম। একটি রুমে গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের নিয়ে মিটিং করছেন। খেলারত শিক্ষার্থীদের ডেকে জানতে চাইলাম সাঙ্গ-পাঙ্গদের নাম। একজনও বলতে পারলো না। আমি ভেবেছিলাম পুরো মুর্তিটিই স্বর্ণের তৈরি। কিন্তু না। বুদ্ধের মুকুটটিই কেবল স্বর্ণ দিয়ে বাঁধানো। তাই মন্দিরটির নাম স্বর্ণ মন্দির। পাশেই রাখাইনদের দোকান। এখানে প্রায় সব দোকানীই মেয়ে। রাখাইনরা সাধারণত খুব কর্মঠ। এরা নারী পুরুষ দুজনে মিলেই কাজ করে। আর সত্যি বলতে কি, মেয়েগুলো যে কী সুন্দর, না দেখলে বোঝা যাবেনা। আমি ওদের পণ্য দেখবো না ওদের দেখবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একটি মেয়েকে বললাম, তোমাদের পাড়াটা ঘুরিয়ে দেখাও। মেয়েটি হাসিমুখে সঙ্গী হলো। তবে আমি যা দেখতে চেয়েছি তা পেলাম না। ওদের আদি জীবন যাপনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ইটের বাড়ি প্রায় প্রতিটি পরিবারে।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আমায় মুগ্ধ করলো। বিদায় নিয়ে ছুটলাম মহেশখালীর অন্যতম আকর্ষণ আদিনাথ মন্দির, মৈনাক পাহাড় আর আদিনাথ শুটিং স্পটের দিকে।

মন্দিরের কাছেই বিভিন্ন দোকানপাট গড়ে উঠেছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। আছে শুঁটকির আড়ত। চায়ের দোকান দেখলেই আলমাস সাহেবের চায়ের তেষ্টা লাগে। আমরা গিয়ে বসলাম দিদির চা স্টলে। দিদি খুব যত্ন করে ডাব কেটে দিলেন। সেই পেট কাটা ডাব। ভেতরে শ্বাস। আহ্ কী স্বাদ রে বাবা ! তিনজন মিলে ডাব, চা আর কলা খেলাম। এবার পান খাওয়ার পালা। দিদি দুটো পানের দাম রাখলেন ৩০ টাকা। পানের দেশে এতো দাম দেখে আমার যেন কেমন লাগলো। কিন্তু মুখে দিতেই আমার সব কথার উত্তর পেয়ে গেলাম। এখন ঢাকার পান আর মহেশখালীর পানের তুলনাটা খুব ভালোকরেই বুঝতে পারবো।

রিকশাওয়ালা ভাই দোকানেই বসে রইল। আমরা চললাম মন্দির দর্শনে। এখানেও সেই ফটোগ্রাফার। আমরা দরদাম করে একটাকে ঠিক করে নিলাম। এবার ক্যামেরা নিয়ে এলেও বেশিরভাগ সময়ই ওটা নিষ্ক্রিয় ছিল। সিড়ি বেয়ে উঠছি আর চলছে ফটোসেশান…