চলছি আদিনাথ মন্দির…
আদিনাথের গোড়াপত্তন কয়েক হাজার বৎসর পূর্বে ত্রেতাযুগে। ত্রেতাযুগে রাম-রাবণের যুদ্ধের কথা ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়। রাবণ লঙ্কা যুদ্ধে রামের সঙ্গে জয়লাভের জন্য দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে অমরত্ব বর প্রার্থনা করেন। মহাদেব এসময় কৈলাসে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। তিনি রাবণের আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে অভীষ্ট সাধনে বর দান করেন এবং শর্ত দেন শিবরূপী উর্ধমুখী শিবলিঙ্গ কে কৈলাস হতে বহন করে লঙ্কায় নিয়ে যেতে হবে এবং পথিমধ্যে কোথাও রাখা যাবে না। যদি রাখা হয় তবে মহাদেব সেই স্থানেই অবস্থান নেবেন এবং রাবণের অভীষ্ট সাধন হবেনা। শর্তানুসারে রাবণ শিবলিঙ্গ বহন করে লঙ্কার উদ্দেশ্য গমন করেন তবে পথিমধ্যে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনের লক্ষ্যে বর্তমান মহেশখালীর মৈনাক পর্বতে থামতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে শর্তানুসারে রাবণ শিবলিঙ্গ পূনরায় উঠাতে ব্যর্থ হন এবং মহাদেব এই মৈনাক শিখরেই অবস্থান নেন।

শ্রী শ্রী আদিনাথ এর আবিস্কার সর্ম্পকেও স্থানীয়ভাবে একটি জনশ্রুতি রয়েছে। এলাকাবাসীর মতানুসারে এই তীর্থ আবিস্কৃত এবং মর্যাদা পায় নূর মোহাম্মদ শিকদার নামক একজন সচ্ছল মুসলিম ধর্মালম্বীর মাধ্যমে। তিনি লক্ষ্য করেন তার একটি গাভী হঠাৎ দুগ্ধদান বন্ধ করে। এ ঘটনায় তিনি রাখালের উপর সন্ধিহান হন। রাখাল বিষয়টির কারণ অণুসন্ধানে রাত্রি বেলায় গোয়ালঘরে গাভীটিকে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেখতে পায় গাভীটি গোয়ালঘর হতে বের হয়ে একটি কাল পাথরের উপর দাঁড়ায় এবং গাভীর স্তন হতে আপনা আপনি ঐ পাথরে দুধ পড়তে থাকে। দুধ পড়া শেষ হলে গাভীটি পূনরায় গোয়ালঘরে চলে যায়। রাখাল বিষয়টি নূর মোহাম্মদ শিকদার কে জানালে তিনি গুরুত্ব না দিয়ে গাভীটি বড় মহেশখালী নামক স্থানে সরিয়ে রাখেন। একদিন শিকদার স্বপ্নাদেশ পান গাভীটিকে সরিয়ে রাখলেও তার দুধ দেওয়া বন্ধ হবে না বরং সেখানে তাকে একটি মন্দির নির্মাণ ও হিন্দু জমিদারদের পুজোদানের বিষয়ে বলতে হবে। স্বপ্নানুসারে শিকদার সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের মতানুসারে আদিনাথ মন্দিরই একমাত্র মন্দির যা, মুসলিম ধর্মাবলম্বী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত।

আমরা সিঁড়ি ভেঙে চলছি আদিনাথের উদ্দেশ্যে। একে একে ৬৯ টি সিঁড়ি বেয়ে তবেই মন্দিরের দর্শন। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ৮৫.৩ মিটার উঁচুতে। আমাদের তেমন কোন কষ্ট হলোনা। আমরা তো থেমে থেমে ফটোসেশান করছি আর যাচ্ছি। খুব ভালো লাগছিলো। পাহাড়ের পাদদেশে পানের বরজ সারি সারি। শুনলাম এই পান উৎপাদনে নাকি নানা রকম নিয়ম কানুন মানতে হয়। চারা উঠার সংগে সংগেই পুরো বরজটাকে ঢেকে রাখতে হয় এমনকি খালি পায়ে পান ক্ষেতে যেতে হয় , আরও কত কী নিয়ম নাকি আছে। সিঁড়ির সাইড দিয়ে রাখাইনদের দোকান সাজানো। কী অদ্ভুত সুন্দর সব মেয়ে দোকানীগুলো! মজার ব্যাপার, প্রতিটি রাখাইন তরুণীর মুখ চন্দন দিয়ে সাজানো। কারো কপালে, কারো গালে, কারো বা চিবুকে। এটাই নাকি ওদের একমাত্র সাজসজ্জা! আর স্কিনের কথা নাইবা বললাম। দারুণ চকমকে! পাহাড়ের শেষ চূড়ায় আদিনাথ মন্দির। চারদিকে চারটি সিংহ মুর্তি। ভেতরে পূজা হয়। এর পাশেই আরেকটি চূড়া। পথ খুব চওড়া বলা চলেনা। উঠার ব্যবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। কিন্তু ওই যে মনকে বলে রেখেছি “মরে গেলে কিছু করার নেই। এসেছিস যখন, চোখ দুটোকে তৃপ্ত করে যা”। তাই ওখানে যাবার বায়না ধরলাম। বহু কষ্টে অসাধ্য সাধন হলো। চূড়ায় উঠে চারিদিকে তাকিয়ে দু’চোখ ভরে গেলো! যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি, অনেক দূরে সবুজের হাতছানি। সমুদ্র পেরিয়ে সোনাদিয়া দ্বীপের টাওয়ার। আরও দূরে আবছা সবুজের বন মেঘালয় রাজ্যের নিশানা।

আমি চোখ বন্ধ করে আল্লাহকে স্বরণ করলাম এই অপার সৌন্দর্য আমার দেশে ঢেলে দেবার জন্য। নামার সময় হলো বিপদ। আমি আর নামতে পারিনা। নীচের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে পড়ে যাবো! ভয়ে আমি ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করতে লাগলাম। আলমাস সাহেব খুব সাবধানে আমায় নামিয়ে আনলেন। তারপর কয়েক সিঁড়ি নেমে মন্দির। আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের পুরানো এই মন্দির ঘুরেফিরে দেখলাম। প্রশান্তিকর জায়গা। বেলা বাড়ছে হু হু করে। কাঠফাটা রোদের আগুন , অথচ মন্দির প্রাঙ্গণে কী ঠান্ডা, শান্ত পরিবেশ! আসতে ইচ্ছে করেনা। তবুও ধীরে ধীরে নেমে আসছি। মনটা ওখানেই রেখে এলাম আমি। রিকশা ছুটে চললো শুটিং ব্রীজে। পাকা ব্রীজের শেষ মাথায় গিয়ে থামলো। দেখলাম। খুব বেশি ভালো লাগলো ব্রীজের দুপাশের চ্যানেল।কেওড়া গাছ সারি সারি, তার মধ্যে কুলু কুলু পানির শব্দ। মাঝে মাঝে দু’পাশে চ্যানেল বরাবর সিঁড়ি নেমে গেছে। অসাধারণ সেই দৃশ্য! উপরে সূর্যের তেজ, নিচে বুক সমান পানিতে ডুবে আছে কেওড়ার সারি, পানির উপর দিয়ে রেখেছে ওদের স্নেহময় ছায়া। চ্যানেলগুলো গিয়ে মিশেছে আবার সাগরে। যেন পটে আঁকা ছবি! ফিরে এলাম শুঁটকির আড়তে। আমরা শুঁটকি হাভাতের মতো খাইনা বলে কেনার কোন তাগিদ ছিলনা। আসার সময় সেই দোকানী দিদি তার তরফ থেকে কিছু খাওয়ার জন্য খুব অনুরোধ করলো, নিদেনপক্ষে একটি মশলা পান। আমি সবিনয়ে অনুরোধ ফিরিয়ে দিলাম। পথে তিনজনে মিলে হোটেলে ডান হাত ব্যবহার করলাম। রিকশাওয়ালা ভাই আমাদের জেটি ঘাটে নামিয়ে দিলেন। আলমাস সাহেব তার সাথে হাত মিলিয়ে ফোন নাম্বার নিলেন। হাসিমুখে তিনি বিদায় জানালেন। সত্যি বলছি, আমি এই জীবনে এমন বিনয়ী রিকশাওয়ালা আর একটিও দেখিনি। লাল রঙের স্পিডবোট ছুটে চললো ৬ নং জেটি ঘাটের উদ্দেশ্যে। আমার দু’চোখ ফিরে ফিরে শেষবারের মতো অসাধারণ ছবিময় মহেশখালী দেখায় ব্যস্ত। ধীরে ধীরে চোখ থেকে বিদায় নিলো পাহাড়ি দ্বীপ আর কেওড়া গাছের সারি। অতৃপ্ত আত্মা বারবার ফিরে যেতে চায় প্রকৃতির রসাচ্ছাদনে ! কিন্তু সব চাওয়া কি পূরণ হয় এই জীবনে?
মধ্য দুপুরে কক্সবাজার, নিজেদের ক্ষণিকালয়ে ফিরে এলাম। ফ্রেস হয়ে গা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। ঘুমের রাজ্যে যাবার আগেই বিকেলের গন্তব্য ঠিক করে ফেললাম-রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড টু সুগন্ধা বীচ…

(মহেশখালী Maheshkhali উপজেলা কক্সবাজার জেলার একটি দ্বীপ। কক্সবাজার থেকে এটি মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জনশ্রুতি আছে, ১৫৫৯ সালের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই দ্বীপের সৃষ্টি হয়। বৌদ্ধ সেন মহেশ্বর থেকেই প্রায় ২০০ বছর আগে এই জায়গার নামকরণ হয় মহেশখালী। মহেশখালী উপজেলায় সোনাদিয়া, মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা নামে তিনটি ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। পান, মাছ, শুঁটকী, চিংড়ি, লবণ এবং মুক্তার উৎপাদনে জন্য এটি সুপরিচিত।)