রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড (Radiant Fish World) আমাদের দেশের আন্তর্জাতিক মানের একমাত্র ফিস অ্যাকুরিয়াম। কক্সবাজার শহরের ঝাউতলায় এটির অবস্থান।রেডিয়েন্ট গ্রুপ প্রায় একশো কোটি টাকা ব্যয় করে এটি নির্মাণ করেছে প্রায় দুই বছর সময় লাগিয়ে।

মাটির নিচে তৈরি ফিস ওয়ার্ল্ড অ্যাকুরিয়ামের ভেতর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। চারদিকে সামুদ্রিক প্রাণীর দৌড়ঝাঁপ। হাতের কাছে, মাথার ওপর, ডানে বামে। আপনি দাঁড়িয়ে অথবা হেঁটে এসব মন ভরে দেখতে পারবেন। মনে হবে, আপনি সমুদ্রের তলদেশে নেমে এ প্রাণিদের সাথে খেলছেন- এই হচ্ছে সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণীর রাজ্য ‘রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড ’এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।

এ্যাকুরিয়াম কমপ্লেক্সে আছে সাগর ও মিঠা পানির প্রায় ১০০ প্রজাতির মাছ। বিরল প্রজাতির মাছসহ এখানে আছে হাঙ্গর, পিরানহা, শাপলাপাতা, পানপাতা, কাছিম, কাঁকড়া, সামুদ্রিক শৈবাল, পিতম্বরী, সাগর কুঁচিয়া, বোল, জেলিফিস, চেওয়া, পাঙ্গাস, আউস সহ আরও অনেক মাছ ও জলজ প্রাণী। ৩০০ টাকার টিকেট কেটে এ্যাকুরিয়ামে ঢুকতেই মনে হলো সাগরের তলদেশে আমি, আর আমার চারপাশে খেলা করছে বর্ণিল প্রজাতির নানা মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী।

সে এক অভূতপূর্ব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা! ওয়াল এবং সিলিং এমনভাবে করা যে মাথার উপরেও মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে! শুরুতেই দুপাশে জীবন্ত মাছ। তারপর সুরঙ্গ দিয়ে সমুদ্রের তলদেশের জীব-জীবাশ্ম। আমি এমনিতেই ভোলা মন, তার উপর মাছ খাইনা বললেই চলে। তাই মাছের একিউরেট নাম আমি বলতে পারবোনা, মনে নেই সব মাছের বর্ণনা। তবে পিরানহা মাছ আমার নজর কেড়েছে। ভালো লেগেছে ঘোড়া মাছ আর জেলিফিশ এর মুভমেন্ট। কত রকম যে মাছ আছে, কত তার রঙ বলে বোঝানো সম্ভব নয়। চলতে চলতে ছলাৎ শব্দে আমি উপর দিকে তাকালাম। ওমা, একি! ৪/৫টা মাছ আমার দিকে পিট পিট করে তাকিয়ে আছে, নট নড়নচড়ন! যেই আমি ওদের দিকে তাকিয়েছি, অমনিই ওরা গ্রীবা বাঁকিয়ে নিজ পথে চলে গেলো যেন ‘কে তুমি’ ভাব! আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। ভুলেই গিয়েছিলাম কৃত্রিম সাগরতলে দাঁড়িয়ে আছি। আলমাস সাহেব সামনে যাবার তাড়া দিলেন। যতই সামনে যাই ততই বিস্ময়! একসময় সাগর তলের রহস্য থেকে বেরিয়ে এলাম। চোখের সামনে থ্রি ডি মুভির হাতছানি। এটা আর বাদ যাবে কেন! ৫০ টাকার টিকেট কেটে ১০ মিনিটের ছবি দেখতে বসে পড়লাম।ছবি দেখার আগে একটু বলে নেই। নায়ক সালমান শাহ মারা যাবার পরে হলে গিয়ে ছবি দেখেছি কি না মনে পড়ছেনা। আর থ্রি ডি তো দূর কী বাত! তাই থ্রি ডি চশমার বদৌলতে সাগর তলের জীব-জীবাশ্ম যখন আমার মুখের কাছে চলে আসছে, অবচেতন মনেই আমার হাত চলে যাচ্ছে ওদের ঠেকাতে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে উঃ আহ্ শব্দ! এলো মস্ত বড় কাছিম। আমার তো ঘৃণায় গা রি রি করছে! চোখ একবার বন্ধ করি তো একবার খুলি। হঠাৎ বিকট শব্দে শার্ক মাছ আমাকে খেতে এলো। আমি ভয়ে এমন চিৎকার দিলাম যে, ছোট ছোট বাচ্চারা পর্যন্ত আমার দিকে ঘুরে তাকালো। কী সব শার্ক আর মানুষের যুদ্ধ দেখাতে শুরু করলো। আমি সত্যি সত্যি তখন চোখ বন্ধ করে কাঁপছি। আমার অবস্থা দেখে আলমাস সাহেব খুব শক্ত করে আমার হাত ধরে রাখলেন। আল্লাহ আল্লাহ করে ছবি শেষ হলো, আমি যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম। হোস্ট মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত করে হাসলো। কিন্তু কেউ জানতেও পারলো না রক্ত দেখে আমি কেন এতো বিচলিত হলাম, অমন করে চিৎকার করলাম। আব্বা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছেন। সেই থেকে আমি কোন রক্ত দেখলেই কাঁপতে থাকি। রক্তকে আমি ভিষণ ভয় পাই, সহ্য করতে পারিনা।

তারপর শুরু হলো যাদুর খেলা। সেও এক নারীকে কেটে জোড়া লাগানোর ভেল্কি। আমি খুব যত্ন করে থ্রি ডি চশমা খুলে যতটুকু সম্ভব দেখলাম। মনে মনে ভাবলাম আমাদের অধঃপতনের মূল কারণই হচ্ছে আমাদের বিকৃত মন মানসিকতা। সাগর তল দেখার জন্য এই হলে বেশির ভাগ বাচ্চারাই আসে। বাবা-মা বাচ্চাদের ঢুকিয়ে বাইরে অপেক্ষা করেন। এই সব বাচ্চাদের কাছে নির্মল বৈচিত্র্যময় সাগর তল উপস্থাপন করলেই হয়, তা না করে কী ভয়ংকর সব কাটপিস দেখায়! কোমলমতি বাচ্চাগুলো এখান থেকে দুধর্ষতাই শুধু শিখে যাচ্ছে!

সামনে এগুচ্ছি বেরোবার পথ ধরে। তিন তলার দরজার মুখে একজন লোক স্টুডিও খুলে বসে আছেন। মোবাইল থেকে ছবি ওয়াশ করে দেন। খুব হাসি পেলো কর্তৃপক্ষের চালাকি দেখে। কিন্তু আরও কিছু যে আমার দেখার বাকি ছিল বুঝলাম একটু পরেই। যে পথে হাঁটছি,সেদিকেই একমাত্র এক্সিট ডোর। অগত্যা দরজা দিয়ে ঢুকতেই বিরাট দোকান। নানারকম পণ্যে ঠাসা। না দেখে উপায় নেই। এমন জিনিস বিশেষত মেয়েরা হাতছাড়া করেনা। আমার বেলায় ইবা এর ব্যতিক্রম কেন হবে? একটি নেকলেস পার্চেজ করেই বেরোনোর পথে হাঁটছি। সিঁড়ি বেয়ে চার তলায় যেতে হবে লিফটের জন্য। চারতলায় রেস্টুরেন্ট। আমরা তেমন ভোজন রসিক নই বলে পাশ কাটিয়ে লিফটের কাছে দাঁড়ালাম। লিফট আমাদের নিয়ে চললো নিচে। আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

ট্যাক্সি নিয়েই সোজা বীচ। সে এক শান্তির জায়গা ! নেই হাঁড়ি-পাতিলের টুংটাং, বাজারের তাড়া,আর বুয়ার ঝামেলা। শুধু দিগন্ত জোড়া নীল ঢেউয়ের গর্জন; বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের খেলা। ইচ্ছে হলে চুপ করে সাগরের সাথে মিতালি করো নয় বেলাভূমি ধরে সঙ্গীর হাত ছুঁয়ে হেঁটে যাও যতদূর চোখ যায়…