আজ ২৭/৮/২০১৯। বিকেলেই তল্পিতল্পা গুটাতে হবে।প্রতিদিনই সাগর তীরে থেকে সূর্যোদয় উপভোগ করেছি, আজও তার ব্যতিক্রম হলোনা। বেশির ভাগ সৈকতের দোকানীরা এখনো ঘুমে। পর্যটকেরা কেবল আসতে শুরু করেছে। আলমাস সাহেব খুব পোজ নিয়ে এসেছেন সাগরে নামবেন বলে। কিন্তু ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে ওদিকটা মাড়াবেন না। ক্যামেরার সদ্ব্যবহার করছি দুজনেই। ঢাকাতে যে ভোর ৫টায় মর্নিং ওয়াক করি, গাড়িঘোড়ার আনাগোনা থাকেই। কিন্তু এখানে ৫টার পরিবেশ পূতপবিত্র। সাগরও পুথি পাঠের মত সুরেলা শব্দে সৈকত ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমরা সাগরে পা ভিজিয়ে ধীর লয়ে হাঁটছি। সাগরের বিশালতার কাছে পৃথিবী নুয়ে আছে।

সূর্যোদয়টি অসাধারণ উপভোগ্য ! দিগন্তের ওপাশে প্রথমে মেঘলা আলো ফুটে উঠে, তারপর সেটা আস্তে আস্তে লালচে আভায় বিস্তৃত হয়। সমুদ্রের পানিগুলো কেমন রক্তাভ দেখায়। বেলাভূমি তখন অন্য একটি রূপকথার দেশ ! এদেশে দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, নেই কোন জীবনের বিষাদী ছাপ। এখানে তখন শুধুই ভালোবাসারা খেলা করে, দু’টি হাত নিবিড়ভাবে নিজেদের জড়িয়ে রাখে আর দু’চোখ ভরে থাকে অনাবিল মুগ্ধতা! এই জীবন সবাই উপভোগ করতে জানেনা, কিন্তু যাঁরা পায়, তাঁরা দাম দিয়েই পায়। এ পাওয়া জীবনের পরম পাওয়া, পরম আরাধনা।
আমরা ধীরে ধীরে ফিরে আসছি। কয়েকটা দোকান খুলেছে মাত্র। শেষ কেনাকাটা করে নিলাম। দোকানের পণ্যগুলোতে হাত বুলিয়ে আদর জানিয়ে দিচ্ছি। মনটা খুব খারাপ হলো। এ যেন আমার আপন কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হবার যন্ত্রণা!

নাস্তা করেই ঘরে ফিরলাম। লাঞ্চও করে এলাম সময়মতো। এবার যাবার পালা। ব্যাটারির গাড়ি ছুটে চলছে বিমানবন্দর অভিমুখে। আমি সব কিছু দেখে নিচ্ছি শেষবারের মতো। কে জানে, আর জীবনে কখনো দেখা হবে কী না! বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিমানের অপেক্ষায়…

বিমান দাঁড়িয়ে আছে গ্রাউন্ডে। আমরা বিমানে আসন নিলাম। এই বিমানেই বিডি এয়ারলাইনসের মাননীয় এমডি মহোদয়সহ আরো কিছু বস সঙ্গী হলেন। আকাশ বেয়ে বিমান ছুটছে নিজ গন্তব্যে, আমি ভুগছি স্মৃতি কাতরতায়। ৫টি দিন যেন পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে কাটিয়ে এলাম, ঘোর লাগা সফর। এবার কিন্তু ভয় পাচ্ছিনা ! উড়ু উড়ু মন, পরিষ্কার নীলাকাশ। বিমান স্মুথলি ছুটে চলেছে গন্তব্যে। আমি নীলাকাশের সাদা মেঘের খেলায় মন দিলাম। নির্দিষ্ট সময়ে বিমান ঢাকার মাটি ছুঁয়ে ফেললো। আমরা উবার নিয়ে বাসার পথ ধরলাম। পেছনে রেখে এলাম জীবনের কিছু অসাধারণ মূহুর্ত, অনেক অভাবনীয় সঞ্চয় -যা ছিল আমার কল্পনার অতীত।

আলমাস সাহেবের দিকে তাকালাম, উনি আলতো করে আমার হাত ধরলেন, দৃষ্টিতে সীমাহীন স্বচ্ছতা। যেন আশ্বস্ত করতে চাইছেন এমন সময় আবার ফিরে এলো বলে।
আমি তাঁর কাঁধে মাথা রেখে কৃতজ্ঞতা জানালাম…

কক্সবাজার এমন একটি জায়গা যেখানে আমরা সবাইই গেছি হয়তোবা। আমার বর্ণনা অনেকের খারাপ লাগতে পারে, আদিখ্যেতা মনে হতে পারে, হয়তো অনেক কিছু আমি স্কিপ করে গেছি ভুলে। কিন্তু আমার দু’চোখ যা দেখেছে, আমার উপলব্ধি যা ভেবেছে, সেটাই আমি পাঠকের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করেছি। যদি আমার কোন ভুলভ্রান্তি হয়, দয়া করে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

তবে একটি বিষয় আমি খুব ভালো বুঝেছি, কক্সবাজারের সার্বিক উন্নয়ন সময়ের দাবি। খুবই করুণ অবস্থা শহরের রাস্তাঘাটের। বীচে যাবার পথটুকু তো খুবই শোচনীয়। এটা কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে নগর পিতা হওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। তবে মানুষগুলো খুব চমৎকার, আন্তরিক। যেখানেই গেছি ওদের হাসিমুখ,আতিথেয়তা মুগ্ধ করেছে। শহর জুড়ে শুধু এনজিওর গাড়ি। প্রাইভেট কার খুব কম। আর আমাদের আমজনতার জন্য রিকশা আর ব্যাটারির গাড়ি একমাত্র সম্বল। তবে ভালোবাসার চাদর সাথে থাকলে অন্য সবকিছুই তুচ্ছ।
ভ্রমণ যেন শুধু ভ্রমণ না হয়, সাথে যেন থাকে অদম্য কৌতুহল আর দেখার চোখ। তাহলেই ভ্রমণ হবে আকর্ষণীয়…

কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্হিত একটি পর্যটন শহর। এটি চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত। কক্সবাজার তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত, যার দৈর্ঘ্য ১২২ কি.মি পর্যন্ত বিস্তৃত, আছে বাংলাদেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর এবং সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন। কক্সবাজারের প্রাচীন নাম হচ্ছে পালঙ্কি।

নবম শতাব্দীর গোড়ার দিকে কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। মুঘল সম্রাট শাহ সুজা পাহাড়ী রাস্তা ধরে আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এখানেই ক্যাম্প স্থাপনের আদেশ দেন। তার যাত্রাবহরের প্রায় একহাজার পালঙ্কী কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা নামক স্থানে অবস্থান নেয়। ডুলহাজারা অর্থ হচ্ছে হাজার পালঙ্কী। মুঘলদের পরে ত্রিপুরা এবং আরাকান, তারও পরে পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশরা এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

কক্সবাজার নামটি এসেছে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স নামে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক অফিসারের নামানুসারে। আগেই বলেছি কক্সবাজারের আগের নাম ছিল পালংকি। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অধ্যাদেশ, ১৭৭৩ জারি হওয়ার পর ওয়ারেন্ট হোস্টিং বাঙলার গভর্ণর হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। তখন হিরাম কক্স পালংকির মহাপরিচালক হয়ে কক্সবাজার আসেন। ক্যাপ্টেন কক্স আরাকান শরণার্থী এবং স্থানীয় রাখাইনদের মধ্যে বিদ্যমান হাজার বছরেরও পুরানো সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেন। এবং শরণার্থীদের পুণর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেন কিন্তু কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেই ১৭৯৯ সনে তিনি মারা যান। তাঁর পূর্নবাসন অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে এলাকায় একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করে নাম দেয়া হয় কক্স সাহেবের বাজার। কালে কালে এটিই কক্সবাজার নামে পরিচিতি পায়।

সমাপ্ত