হঠাৎ করেই একদিন আলমাস সাহেব মেয়েদের বললেন, ” তোর মাকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যাবো “। সত্যি বলতে বিয়ের পর সাংসারিক ঝামেলায় দুজনে কখনোই একা কোথাও যাইনি। যেখানেই গেছি মেয়েদের সাথে নিয়েই গেছি। এখন থ্রি এঞ্জেলস নিজেদের ঘর নিয়ে ব্যস্ত। তবুও আমাদের সকল কাজেই ওদের সদর্প উপস্থিতি। তাই উনি যখন বললেন, আমরা কেউই তেমন গা করিনি। কিন্তু যেদিন বিমানের টিকেট কনফার্ম করলেন, এবার আর উড়িয়ে দেবার সুযোগ রইলোনা। তাই ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলাম কক্সের উদ্দেশ্যে।

যথা সময়ে বিমানে চড়ে বসলাম। কেবিন ক্রু স্নিগ্ধ হেসে আমাদের বরণ করলেন, আলমাস সাহেবের সাথে হাত মিলিয়ে বললো,” আংকেল, আমায় মনে হয় চিনতে পারেননি, আমার আরেকটি পরিচয় আছে। মুক্তা আমার ক্লাসমেট। আমি বললাম, “মুজাহিদ”। বলা বাহুল্য, মুক্তা আমার মেজো মেয়ের নাম। ছোট্ট একটুখানি পথ, মুজাহিদের বিশেষ আতিথেয়তায় তা হয়ে উঠলো অসামান্য!
বিমান উড়ে চললো মেঘের সাথে যুদ্ধ করে। একদিকে অসাধারণ মেঘের বাড়ি, অন্যদিকে মেয়েদের চিন্তায় আমার কান্নায় চলার পথটুকু ভিজে গেলো! ওইযে বললাম, মেয়েদের ছাড়া এবারই প্রথম কোথাও যাচ্ছি, বিমানের অস্থির উড্ডয়নে আমার কলিজার পানি শুকিয়ে কাঠ হতে লাগলো। সারাক্ষণ মেয়েদের মুখচ্ছবি চোখে ভাসছিল আর ভাবছিলাম, আর যদি দেখা না হয় ওদের সাথে! আর যদি ওরা আমার বুকে না শুতে পারে! একদিকে কাঁদছি, আরেকদিকে আকাশের সৌন্দর্য দেখার অসংবরণীয় লোভ আমায় আকুল করে তুললো! শেষে ভাবলাম, এখন মরে গেলে আর কিছুই করার নেই, বরং মন তুই তোর চোখকে তৃপ্ত করে নে এইবেলা…
মেঘ যে কী অদ্ভুত সুন্দরম, যে চোখ না দেখেছে সে চোখ হতভাগা।

মেঘের বড় বড় পাহাড়গুলো দেখছি আর ভাবছি আল্লাহর মহিমার কথা! এইযে এতো বিশাল বিশাল মেঘের চাঁই উড়ে বেড়াচ্ছে সারা আকাশ জুড়ে, এই যে একটি যান আকাশ পাড়ি দিচ্ছে, আল্লাহ সহায় না থাকলে কী করে সম্ভব! মাথাটা আল্লাহর উদ্দেশ্যে নুয়ে এলো আমার। মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি দেখতে দেখতে নিমেষেই কক্সবাজার বিমান বন্দরে জাহাজ ভোঁ করে নেমে গেলো। অতৃপ্ত চোখ নিয়েই এয়ারপোর্টে লাগেজের অপেক্ষা করতে লাগলাম।

এদিকে এয়ারপোর্টের বাইরে অপেক্ষায় আমার ছেলেসম কাইজার। টেকনাফ থেকে সে এসেছে মায়ের সাথে দেখা করতে। ওর সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকে। কিন্তু কী করে যেন ও ধীরে ধীরে আমার ফ্যামিলি মেম্বার হয়ে গেছে!

তিনজনে মিলে নির্ধারিত হোটেলে চলে এলাম। তখন বিকেল প্রায় ৫টা। সামান্য কিছু মুখে দিয়েই দে ছুট সাগর পানে। বেলাভূমির ভেজা বালু দুপায়ে চুমু দিলো। সাগর গর্জন করে স্বাগত জানালো আমাদের। আমরাও জল ছুঁয়ে ওর আতিথেয়তার জবাব দিলাম।
সন্ধ্যায় কাইজার বিদায় নিলো। আমরা দুজন সাগরের ঢেউ গুনতে শুরু করলাম। কিন্তু জীবনের অগুনতি ঘটনার মতো ঢেউ গুনে শেষ করা অসম্ভব। অগত্যা ছাতার নীচে শুয়ে শুয়ে ঢেউয়ের তান্ডব দেখতে লাগলাম।

পরের দিনটি কেন জানি কোথাও যেতে ইচ্ছে করলো না। ঘর-সাগর-বিছানা করেই কাটিয়ে দিলাম পুরো দিনটি।
তৃতীয় দিন নয়টার মধ্যে বেরিয়ে গেলাম হিমছড়ি, ইনানী আর পেঁচার দ্বীপের উদ্দেশ্যে। কাছের হোটেলে নাস্তা সেরে সি এন জি নিয়ে ছুটলাম মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে। অদ্ভুত মুগ্ধতায় দু’চোখ ভরে গেলো! একপাশে দিগন্তছোঁয়া সাগর অন্যপাশে সবুজ পাহাড়ের হাতছানি, কোনটা দেখি কোনটা ছাড়ি! একবার সাগর দেখি তো আরেকবার আলমাস সাহেবের উপর দিয়ে পাহাড় দেখি। কোনোটা দেখেই যেন তৃষ্ণা মিটছেনা! আমার কান্ড দেখে আলমাস সাহেব শুধু মুচকি মুচকি হাসছেন আর উপভোগ করছেন।
ড্রাইভার পথে ছোট-বড় আরো দুটি ঝর্ণা দেখালো। প্রকৃতি এখানে দুহাত ভরে তার রূপ রহস্য ঢেলে দিয়েছে। পথে পেঁচার দ্বীপে অবস্থিত মারমেইড বীচ রিসোর্ট কিছুটা ঘুরে দেখলাম। ওদের হাতের স্বাদ নিতেও ভুল করলাম না।

হিমছড়ি নেমে টিকেট নিয়ে যেই না পাহাড়ে উঠবো, অমনিই ১২/১৩ বছরের একটি ছেলে ক্যামেরা হাতে দৌড়ে এলো, “স্যার আমি আপনাদের ছবি তুলে দেই? পছন্দ হলে নিবেন নয়তো নয়”।

আমিতো অবাক! এতো ছোট ছেলে কী ছবি তুলবে! অবশেষে দরদাম করে ছবি তুলতে তুলতে উপরে উঠতে শুরু করলাম। দুপাশে নাম না জানা কত গাছ, কত লতা আমাদের পাতা দুলিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে। আমিও সাধ্যমতো ওদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে উত্তর দিচ্ছিলাম। সিড়ি দিয়ে কিছুটা পথ উঠতেই দেখলাম ছনের ছাউনিটি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। মনটা একটু হলেও খারাপ হয়ে গেলো। ৩ বছর আগে এসে আমি বিশ্রামের জন্য ওখানে বসেছিলাম। কোথা থেকে আলমাস সাহেব এক বুনো ফুল এনে আমাকে বললেন “দাঁড়াও, তোমার চুলে পরিয়ে দেই”। সে ছবিটি উনি উনার এফবি ওয়ালে দিয়েছিলেন এবং অনেকেই ছবিটি খুব পছন্দ করেছিলেন। তাই স্মারকটির অপমৃত্যু আমায় কিছুক্ষণ বিহ্বল করে রাখলো। আলমাস সাহেবের তাড়ায় উপরে উঠতে লাগলাম সিড়ি বেয়ে আর সাথে সাথে চলছে ফটোসেশান। ছেলেটির পাকা হাত আমায় মুগ্ধ করলো! বি এড এর ক্লাসে চেয়ারম্যান স্যার একদিন বলেছিলেন, “পৃথিবীতে কেউ অশিক্ষিত নয়। আমি যে কাজটা পারিনা অন্যজন সেটা পারে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে একাডেমিক শিক্ষাটাই মূল শিক্ষা নয়। পৃথিবীর সব কাজই মূল্যবান এবং শিক্ষণীয়”। ছেলেটি আমায় আবার সেকথা মনে করিয়ে দিলো।

সাগর পৃষ্ঠ থেকে ৩০০ ফিট উপরে হিমছড়ি পাহাড়ের চূড়া। এখানে উঠে চারিদিকে তাকালে কিছু বলার থাকেনা, শুধু চোখ দুটি বিস্ফোরিত হয়! আকাশ নেমে এসেছে সাগরের বুকে, সাগর যেন পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছে আকাশকে। আর দুজনার গভীর মিতালির সাক্ষী হয়ে প্রকৃতি অবিচল পাহারায় নিযুক্ত। এ এক অসাধারণ দৃশ্যপট! নীল সমুদ্রের হাতছানি উপেক্ষা করে ফেরা বড়ই কঠিন। তবুও ফিরতে হয় বাস্তবের কঠিন বলয়ে। আমিও ফিরতে শুরু করলাম সিড়ি ভেঙে ভেঙে। দু’পাশে পাহাড়ের মাঝে কী বিচিত্র গাছ আর বুনো ফুল ! সবুজের রাজ্যে শুধু সবুজেরই প্রবেশাধিকার, মানুষ সেখানে অনাহুত।কোন সুযোগ নেই সবুজ সরিয়ে ইট গাঁথার। এ যেন ঘোর লাগা মাদকতা! মাঝপথে ডাবের দোকানে বসে ডাব খেলাম। এতো মিষ্টি পানি! প্রাণটা জুড়িয়ে গেলো…