রূপালী ইলিশ তুমি যাও

রূপালী ইলিশ তুমি যাও
পদ্মার মেঘনার ডাকাতিয়া মোহনার জল ছেড়ে
সহসা এলেই যদি উঠে, তবে যাও নিদয়া সে বন্ধুয়ার বাড়ি,
আগল দিয়েছি খুলে মায়াবতী শাড়ির আঁচলে
দুপুরের রোদে যারা চোখ বুজে স্বপ্নে চেখে তোমার আস্বাদ,
তোলে সুখে তুমুল উদগার
তাহাদের রসনার সুখপূর্তি হোক তবে তোমার উদর ভরা
হিমমাখা জোড়া জোড়া ডিমে
আমার ছেলেটা নয় খাবে শুধু পাংশুটে চাষের পাঙ্গাশ,
থাই কৈ, সরপুঁটি, বার্মার রুই।
আমারও সময় বুঝি আসে, বন্ধুর কাঁটাতারে, নিরন্তর জলের অবরোধে,
কণ্ঠ শুকিয়ে এলে আমিও তো যাবো বাবুদের তালের পুকুরে
হাওড়ায়, ফারাক্কায় আমারও তো ছেঁড়া ছেঁড়া নাড়ি পোঁতা আছে
হাত পেতে মমতার চোখ থেকে চেয়ে নেবো একবিন্দু জলের রেশন।
চারপাশে প্রেত নাচে, হায়েনার মত হাসে গোপন শ্বাপদ।
আমার কোথাও দেখ একটিও বটবৃক্ষ নাই, ছায়া নাই পুবে ও পশ্চিমে
দক্ষিণে মাতাল নোনাজল
যাবো না তো করবো কি আর? যেতে তো হবেই জানি আগে পড়ে
তুমি যাও সম্প্রদানে, মহা দানে, মণে মণে, টনে টনে
আগুনে ক্ষুধায় জ্বলে তুমি ছাই হলে, রাবন-রোমশ থাবা মেলে
ওরা ঠিক টেনে নেবে আমাকেও দাউ দাউ রৌরব জঠরে।
…………………………………………..

গুলবানু

হাফ-প্যান্টের ছেঁড়া পকেটের ফাঁক গলে
কখন জানি না পড়ে গেছে প্রিয় মার্বেলগুলি নিরবে,
একটি আবার ছিলো পঙ্ক্ষী, লাল, নীল, সবুজ, হলুদ
ডোরা তার গায়ে, যেন জহরত, অতি মূল্যবান
টের পাই খেলাশেষে ঘরের দোরের কাছে এসে-
আমার রাজ্যপাট, সোনাদানা এভাবেই ক্রমে ক্ষয়ে গেছে
সঞ্চয় কিছুই তার রাখতে পারি নাই।
ইশকুলে একদিন বাদলের অঝোর নির্জনে
গোলাপের রঙ গালে মেখে গুলবানু
চোখে রেখেছিলো স্বচ্ছ চোখ,
হাত ধরে বলেছিলো, বাসায় আসো না কেন? খোলা জানালায় বসে
পাশের মাঠে তো দেখি সারাবেলা ডাংগুলি খেলো!
স্বভাবে লাজুক আমি, ‘একদিন আসবো নিশ্চয়ই’ বলে
হাত নিয়েছি সরিয়ে লজ্জায়-
অথচ সেদিন তারপর, আরও কত কথা হয়তো ছিলো বলবার
হয়ত বা তার থেকে অথবা আমার!
ভোরের আকাশে শত রঙ ফুটে উঠবার অপার সুন্দর
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেখার ফুরসৎ জানি ফের মিলবে না আর;
জেনেছি ছ’মাস পরে, গুলবানু চলে গেছে নতুন শহরে।
তারপর কতশত বাদল-মুখর ক্লাশরুম এসে ফিরে গেছে
গুলবানুর স্পর্শমাখা সেই হাত আজও
ছোঁয় নাই অন্য কোনও উষ্ণ ব্যগ্র পাণি।
বুকের অতলে এক প্রশ্নপত্রে ড্যাস ড্যাস চিহ্ণআঁকা দুটি শূন্যস্থান
হারানো পঙ্ক্ষী বসে আছে এক ঘরে, অন্যটিতে
বয়ঃসন্ধির গোলাপি গাল বন্ধু গুলবানু!
…………………………………………..

জানি ফিরে আসবেই

আমাকে মাটির ঘরে রেখে ঠাঁই নিয়েছো আকাশে
মোহন রূপের রাণী গরবিনী মিষ্টি মধুভাষে
পেতেছো মায়ার জাল চরাচরজুড়ে উল্লাসে
যেন চিরবৈরী বেশে, মস্করা জুড়েছো বিলাসে।
হয়তো যাচাই করো কী করে এ আনাড়ি ফিয়াঁসে
যখন আঁধার জমে মনোময় নিগুঢ় বিশ্বাসে।
তাই বুঝি দেখা দাও রূপাতীত আনন্দ-স্বরূপে
সৃজনে লুকিয়ে হাসো, চালো হরতনের তুরুপে!
আমিও লাঙ্গল ধরি ফুল আর ফল ভালোবেসে
যেমন চতুর চাষী বর্ষণের ধারাজল শেষে
নরোম জমিতে রোয় আশ্বাসের বীজ অক্লেশে
মাটির শরীর জানি খেলা শেষে মাটিতেই মেশে।
আমিও পরখ করি অসীমের সীমা কতদূর
তুমি কি হয়েছো পর, আনঘর কতটা সুদূর?
বুকে যে গানের কল গান তার ভাসাই ইথারে,
হয়তো সে সুরসুধা পূর্ণিমার ঝিঝিম আঁধারে
তোমার হৃদয়ে মৃদু পরশের ছড়াবে আবেশ,
যে স্মৃতি ভুলেছো নিজে, যদি হয়ে না থাকে নিঃশেষ
যুগলবাসের দিন মনে করে, জানি বিরহিনী
কামনা-অধীর তনু অনুক্ষণ বাজাবে শিঞ্জিনী!
…………………………………………..

এক দিলরুবার জন্যে…

নিথর জলের নদী আমি বুক পেতে দিনমান
ধরেছি তোমার ছবি ঝুঁকে আছো কাকচক্ষু মেলে,
ভুলেছি পথের শ্রম গোধূলির রোদ মরে এলে
সুনীল আঁচল জলে ভেজে যেন নীল আলোয়ান
নেমেছে মেঘের মতো বেদনার নোনাজল ঢেলে
শ্রাবণ ধারার সুরে যেরকম মেহেদী হাসান
গেয়েছে তোমার গান বুকে রেখে ‘এক দিলরুবা’।
ভাষার সাহস বলো কতো আর নিখুঁত প্রতীকে
এঁকে তোলে নিসর্গের অপরূপ মায়া মেহবুবা,
জগৎ ভুলানো রূপ রঙধনু রঙের ফিনিকে!
হৃদয়ে হেনেছো বাণ নিরূপম চোখের চাবুকে
তুমুল জোছনা জলে গা ভিজিয়ে পেতেছে তাবু কে?
…………………………………………..

কান পেতে রাখি

যামিনী যখন স্তব্ধ পাথরের মত সুনশান
তখন দিনের শব্দ দূষণের ঘামে ভেজা জামা
খুলে রেখে অবেলায় আমি শুন্যে পেতেছি দু’কান
শঙ্খের বুকের রঙে সকরুণ জীর্ণ খাবনামা
মেলে দেখি বাজে কী কোথাও দূরে প্রিয় কোন গান
আমারই মতন কোন বিরহিনী জ্বেলে মৃদু শামা
হয়তো শুনছে মান্না, সতীনাথ কিংবা নূরজাহান
যখন পাতার ফাঁকে পূর্ণিমার মাতাল হাঙ্গামা।
…………………………………………..

কবিতার খাতায় আম্মার চোখ

রাতের আকাশ থেকে অন্ধকার
মঞ্চের পর্দার মত শব্দহীন
সরে গেলে, আমার কাটাকুটি ভরা
রাফ কবিতার খাতায় আম্মার
দু’চোখের নিবিষ্ট আদর হয়ে নেমে আসে
শান্ত পুত ভোর…
আমি কম্পিত বুকে ওই আদরের সামনে দাঁড়াই
মনে হয়, ছোট্ট বাবুটি হয়ে কোলে তার ঝাঁপাই আবার…
…………………………………………..

গেয়েছি নতুন সামগান

ভুঁইফোড় বণিক তো নই, নই স্রোতে হাল ধরা নবিস নাবিক
দুঃখের শরীর খুঁড়ে শূন্যগর্ভ সময়ের পলল জমিনে
সম্পন্ন কৃষাণ আমি রুয়ে দিই শৌর্যবান বীজে নব অর্থবহকতা
তখন আশ্চর্য এক প্রসবের ব্যথায় অস্থির
স্মৃতির জঘন ফুঁড়ে মৃদুমৌন আর্তনাদে ফোটে অনাবিল
মুঠো মুঠো সোনারঙ সঙ্গীতের শুদ্ধ ছানাপোনা-
পিপাসার স্বাদুপানি উঠে আসে উঠোনের নবীন কুয়ায়
শাহ জামালের পুণ্য মাজারের ঘুলঘুলি গলিয়ে অবাক
ডানা মেলে ঝাঁকঝাঁক আগুনের পাখি আবাবিল
খুঁজে নেয় দিকে দিকে প্রান্তরের অনধীত বিশ্ব-নিখিল।
আজন্ম ভিটার মাটি ভরে ওঠে জালালীর বাকুম-বাকুমে
কালামের পুত সুর কণ্ঠে তোলে আমার কামিনী
আমার সকল গোলা ভরে দীপ্ত সোনার ফসলে।
যদি গান ভালোবাসো দূর নভোলোকে ভেসে আসা
যদি বা কখনও কোনও পাখির নিয়মে বুনে তোলো
নকশি কাঁথার মতো বহমান বেদনার স্বচ্ছ স্রোতস্বিনী
বিশ্বাসের চঞ্চুতে খুঁটে যদি নাও জীর্ণ মাটির কলসে
আশ্বাসের মুঠ ভরে তুলে রাখা আম্মার মাঙ্গলিক খুদ
তবে এসো ক্লান্তি ও কাঁটাকীর্ণ বুনোপথ পেরিয়ে একাকী
উত্তর শিথানে শুয়ে মুখ রেখে কিবলারোখ অনতিনরম শয্যায়
ক্ষণিক জিরোও বন্ধু চোখ বুঁজে সুপ্তিমগ্ন পরম আরামে-
শিথিল আত্মার ধ্যানে শোনো গান নির্ঝরের নম্র কলতানে
শান্তির শামাদানে জ্বেলে আলো গেয়েছি নতুন সামগান
বেদনার রক্তবর্ণে শিখি নিত্য সেই তাঁর নামের বানান!
…………………………………………..

জাল

আমি তো পেতেছি জাল শব্দে শব্দে বেদনার সুতোয় নিপুণ
ভাষার সাগর ছেঁকে উঠিয়েছি রত্নরাজি বর্ণময় আলোকচ্ছটায়
যেন এক পৌরাণিক অপ্সরী আভরনে ভরে নগ্ন সোনার শরীর
স্বয়ম্বর সভার মেরাপে শত শত অভিজাত যুবকের মুখে
পেতেছে নয়ন তার সন্ধানী, উন্মুখ, উদ্বেলিত মনে
স্বপ্ন-কুসুমে গাঁথা মালা তার দেবে কার কণ্ঠে উপহার!
অসম সাহসী এরা, প্রত্যেকেই রণজয়ী যোদ্ধা, মহাবীর
কে জানে কোন্ সে জন, প্রেমময় নারীর সমুখে
জানু পেতে দিতে পারে হৃদয়ের অর্ঘ কিংশুকে
অন্তরের মৃদুজলে মুছে আর্ত প্রাণের রোদন
পাষাণে কৃপাণ হেনে কে পারে বহাতে উষ্ণ মিঠে প্রস্রবন!
ফলভারানত বৃক্ষ শাখার আদলে কোন্ বলী
আনত হৃদয়ে রেখে উতল হাওয়ায় কাঁপা অধীর আঙুল
অন্ধকার মন্দিরের রুদ্ধদ্বার ঘুঁচিয়ে নির্ভুল
হৃদয়ের উপকূলে কে পারে জ্বালাতে শুভ্র আকাঙ্ক্ষার দীপ্ত বাতিঘর?
কবিতা মূলত স্মৃতি, তুমি তো একাকী ভেসে স্মৃতির ডিঙ্গায়
এসেছো নিরবে তসলিমা, এ আমার নিকানো উঠানে
মুগ্ধতার মায়াময় মোহের চাতালে, যেন তপ্ত নবীন কিশোরী
প্রথম প্রেমের টানে ঝাঁপ দেয় দয়িতের রূপের আগুনে
তারপর ডানাপোড়া পতঙ্গের মতো অসহায় দুরু দুরু বুকে
কাটা মুরগির মতো তড়পায় জীবনের অন্ধকার বনের গহীনে
কখন যে চকচকে সুদর্শন মাৎসর্যের ছুরিতে অচিরে, দেহমন
কেটে কেটে নিরন্তর হেঁটে যায় চিরন্তন আঁধারের পথে নির্বিকার-
জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞজন আর পথে নির্বোধ কিশোরের দল
‘লাইলী’, ‘লাইলী’ বলে তাড়া করে পথহীন পথেই আবার!
…………………………………………..

নন্দিত বেদনা রঙিন

জমে ওঠা জরাজীর্ণ দস্তাবেজ খুঁজে দেখি সহসা সেদিন
কোথাও তোমার কোন ছবি নেই প্রিয়তমা উম্মে নাজনীন
শুধু এই রোগদীর্ণ বুকে আজো তোমার স্মৃতির
কায়াহীন যে স্বরূপ রেখেছি লুকিয়ে লোনাজলে
সেইটুকু আমার সান্ত্বনা! নন্দিত বেদনা রঙিন!
…………………………………………..

মহুয়ার নেশায় উবুড়

কখন যে বয়ে গেছে দীর্ঘ প্রায় তিন কুড়ি বসন্ত রঙিন
তোমারও তো হলো বুঝি দুই কুড়ি পাঁচ কিংবা ছয়!
রাজধানী শহরের রাজপথ অলিগলি দ’লে প্রতিদিন
ক্লান্তি আর অবসাদে গড়ি নিত্য জীবনের জরুরী সঞ্চয়।
তুমি থাকো দক্ষিণে, বন্দর-নগরীর কোনো লোকালয়ে
কখনও হয়নি দেখা এ জীবনে, হবার কথাও ছিলো না তো,
তবু কী অবাক তুমি যেন বন্ধু সাগরের ঘন মেঘ হয়ে
উড়ে এলে এ শহরে, অবেলায় ঢেলে জল কী অদ্ভুত
মৃদু হেসে কী নিখুঁত কৌতুকে মাতো!
আমারও কী পিঠে ডানা গজিয়েছে আবার নতুন?
যেন নব্য ইকারুস, খুঁজে নিই তোমার ঠিকানা
ডানার দাপটে ঠিক ঠিক, আকাশের মতো টানা
সীমানাবিহীন মহা-সাইবার জগতে নিপুণ।
অবেলায় কেন এলে ভার্চুয়াল মায়ার দেয়ালে সাহসিকা?
যখন বহতা নদী সীমন্তের প্রান্তে টানে রূপালি তুলিকা
কপালের লাল টিপ এখনও ছড়ায় বুঝি উষ্ণ অরুণিমা,
সোনার শরীরে রোজ মহুয়ার রঙ ঢালে উতল চন্দ্রিকা!
আমার হৃদয় তাই ছুঁয়ে থাকে ওই মুগ্ধ ত্বকের মহিমা,
মুগ্ধ চোখের ভাষা বুঝে নেয় আত্মার অন্ধ খদ্যোতিকা।
চিবুকে নকল তিল বুকে গাঁথে তীক্ষ্ণ আলপিন
আগুনে যেমন দাহ, রূপে মাখা বেদনা মিহিন
আবার ফোটায় ফুল যেন বা দিনের শেষে অবশ বাগানে
যেন ভরা মাঘের দুপুর ভরে শান্ত ফাগুনের গানে।
নিথর হাসির বাণে এ হৃদয় হয়েছে জর্জর
বুকের গহীনে ফের উছলায় নিঃশব্দ নিরব জলতরঙ্গ মুখর
মহুয়া-মদিরা রক্তে তোলে তীব্র আকাঙ্ক্ষার ঝড়।
নিথর ধ্বনির বাণী সঞ্চারিত যেমন ইথারে
রূপের পোশাক খুলে অবারিত সেতারের তারে
আনন্দ-টঙ্কার যদি তুলি এই তৃষিত আঙুলে
তুমি কি আরক্ত মুখ লাজনম্র লুকাবে আঁচলে?
কমলা কোষের মতো রাঙা ঠোঁট কাঁপবে দ্বিধায়?
সোনার নাকের ফুল খুলে নেবে তুচ্ছ অছিলায়?
বলবে কি, ‘বেশরম, কাছে এসো, খুলে নাও নিরুদ্ধ কাঁচুলি,
ভরা পূর্ণিমায় তোলো আনন্দ-জোয়ার আজ অমৃত-মন্থনে-
আলিঙ্গন চাও যদি এই দেখো খুলে নিচ্ছি কনক হাঁসুলি
চাঁদের শরীরে চাঁদ লাগে যদি পুত হয় আগুন-ইন্ধনে
এলায়িত কুন্তলে মুখ গুঁজে নেবে নাকি নিবিড় নিশ্বাস?
শিলার পরত খুঁড়ে তুলে নাও অবশিষ্ট ক্ষিতির নির্যাস’?
অবেলা কাটুক প্রিয় মহুয়ার নেশায় উবুড়
যতই বাজুক তেতো অনিবার্য সাঁঝের ঘুঙুর!