প্রত্যাশার অতীত

নিস্তব্ধ তমশা ঘন রাতের পাহাড় ঘেঁষা আকাশটা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে।
বাতায়নের গ্রিল জাপটে ধরা মাধবী লতার ঝিরি ঝিরি বাতাসে সুবাসিত প্রহরে আমিও ঘুমহীন।
নীল রঙা চার কোনা লম্বা খাম তখনও হাতের মুঠায়। খুব যত্নে সোনালী অক্ষরে লিখা ঠিকানা দেখেই বুঝা যায় ঠিকানা হীন প্রেরকের পরিচয়, যদিও প্রেরকের নামের জায়গায় তারকা চিহ্নিত সংকেত। কাঠ ফাটা দুপুরে নিস্তব্ধ প্রহরে ডাক পিয়নের বাজানো বেলের শব্দ আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো সদর দরজায়। তবে কি চিঠিখানা পাব বলেই অপেক্ষায় ছিলাম?
নিয়ন বাতির আলোয় রজনীগন্ধা জল ছাপে প্যাডে নীল কালিতে গোটা অক্ষরের লিখা কোন সম্বোধন ছাড়াই।
দু’ফোটা নোনা জল গড়িয়ে পড়লো ক্লান্ত কপোল বেয়ে-
আমার কোন অভিযোগ নেই, নেই কোন অনুযোগ
অনুভুতিহীন আবেগ যেন পুরনো ইমারতের প্লাস্টারের মত খসে পরেছে।
পরম নির্মমতায় নোনা ইটের মত ভাগ্য যেন উপহাসের হাসি হাসছে।
যখন আমি সত্যিই আর থাকবো না,
গাংচিলের সোনালী পালকে উচ্ছল স্বপ্নরাশি
তুমি হয়ে যাবে না।
সেদিন আমার হয়ে চিঠিটা আর একবার তুমিই না হয় পড়ে নিও।।
…………………………………………..

জীবনের জলসাঘর

শ্রাবণের ধূসর মেঘে ঢাকা আকাশে গোধূলির রাঙা আলোয়
পূর্ব দিগন্তে রংধনু দেখিয়ে তুমি আমায় কবিতা শুনিয়েছিলে।
কোন এক কবির রচিত প্রাপ্ত বয়স্ক নর নারীর জীবনের গান,
তোমার ভরাট গলায় অসাধারণ উচ্চারণ ভঙ্গিমা-
আমি মন্ত্র মুগ্ধে প্রতিটা কথা নিজের ভিতর গেঁথে নিয়েছিলাম।
হঠাৎ থেমে গিয়ে আমার চোখে চোখ রাখতে চেয়েছো,
আমি লজ্জায় দু’হাতে মুখ ঢেকেছিলাম-
বলেছিলে এ কবিতা নয়- জীবনের গল্প নর নারীর, তোমার আমার।

প্রাপ্তির মন্দিরে প্রদ্বীপ জ্বেলে বিমূর্ত সন্ধ্যা সেদিন উজ্জীবিত
সময়ের কাছে দুজনই হার মেনেছিলাম,
সুখী হবো বলে হয়েছিলাম দিশেহারা
ভুল শুধরে নেবার প্রতিশ্রুতিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

বিশ্বাসের হাত ধরে আজ খুপরি ঘরের চার দেয়ালের ভাঁজে
প্রতিদিন রঙ মেখে রংচটা আয়নার সামনে এসে দাঁড়াই,
সরু সিঁথি যেন ধূ-ধূ মাঠ,অথচ মুখে ঠোঁটে কত রং।

প্রতি রাতে তোমার দেওয়া স্বপ্ন আমায় খুবলে খায়
বুকের জমিনে রক্ত ঝরায়, মদ্যপায়ীর সঙ্গী হয়ে টাকা কুড়াই
প্রতি দিনের শেষে মুখে রং মেখে স্বপ্ন বিকাই।

আজও শ্রাবণ আসে, ধূসর মেঘে আকাশ সাজে
গোধূলির রঙে রংধনু একাকার হয়,
বর্ষা নামে, মেঘলা আকাশ, অনুভবের হাতে হাত রেখে সুখের দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে,
তুমিকি এখনো ওমনি করে আবারও কাউকে কবিতা শুনাও !!
…………………………………………..

প্রচ্ছন্ন প্রেম

দখিনা বাতায়নে দৃষ্টি ছুঁয়ে গেলেই যদি
আমার অনুভূতি তোমায় আষ্টে পিষ্টে বাঁধে,
সংযত কর ঐ মায়াবতী আঁখি,
আমি না হয় বিরহিত গুল্মলতা হব,
বিলাসী বাগানে মাধবীলতা নাইবা হলাম
সুবাসহীন শীতল ছোঁয়ায় নোনা ঘাম শুকিয়ে দেব।

ভাতঘুম দুপুরে মায়ার পরশ নাইবা হলে
আগুন ঝরা দৃষ্টিবানে বিক্ষত কর
হৃদয়ের হীম ঘরে জমাট বাঁধা সুপ্ত বাসনাগুলো
গলে গলে দেখ একটা শান্ত শীতল নদী হবে,
ভালোবাসতে না পারলেও সেথায় না হয়
ডুব সাঁতারের খেলায় মেত।

পৌঢা বিকেলের ললাট ভেজা এক চিলতে
সোনালী রৌদ্দুর আমাকে ভেবে নাইবা ছুঁলে,
তাতে যদি তোমার হৃদ আকাশের মেঘ সড়িয়ে
আমার মায়ার মুখটা তোমায় ব্যাকুল করে।
তার চেয়ে ভালো মনের কপাটে আগল এঁটে
অন্ধকারে মুখটি গুঁজে আমার প্রেমে ডুবে মর।
…………………………………………..

সন্তপ্ত

মন ভাল নেই আমার মনের
মন ভাল নেই জলেরও
মন ভাল নেই পুবাল হাওয়ার
শঙ্খচিলের ডানারো।

মন ভাল নেই সবুজ বনের
দোয়েল শ্যামা টিয়ার যে
সিংহ মামার মন ভাল নেই
ভাবছে ধূর্ত শিয়ালে

মন ভাল নেই পাবদা পুটির
কিংবা রাঘব বোয়ালের
মন ভাল নেই আম জনতার
কিংবা দাদা গোপালের।

কেমনে বলি সবুজ বনে
পলাশ রাঙা ফাগুনে,
অ আ র বুক যে দগ্ধ হোল
মন পোড়া ঐ আগুনে।।
…………………………………………..

বাঞ্চিত স্বাধীনতা

স্বাধীনতা মানে প্রভাতের বুক চিরে উঁকি দেওয়া
লাল সূর্যটা
৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে সূর্যটা হাসবে বলে
এক সাগর রক্তের স্রোতে নয় মাস অবিরাম হাবুডুবু খেয়েছে
এই সেই স্বাধীনতা আজ মাথার উপর জ্বল জ্বল করে কষ্ট ঝরায়।

স্বাধীনতা মানে বীরাঙ্গনা মালা মাসীর নির্বাক চোখে থমকে যাওয়া
কিশোরী মনে প্রথম প্রেমের রেশ এখনও বয়ে চলে নোনা স্রোতে,
একদিন লন্ঠনের নীল আলোয় শাখা সিঁদুরে রাঙা মুখে
অপেক্ষায় থাকতো অবাক প্রেমের পশরা সাজিয়ে মন মানুষের
আজ সে নিয়ন বাতির উজ্জ্বল আলোয় মনের ঘরে অর্গল এঁটে
শূন্য হাতে ভাঙ্গা স্বপ্ন জোড়া দিয়ে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকে।

এই সেই স্বাধীনতা লক্ষ বীরঙ্গনার স্বপ্নে ধোয়া-

স্বাধীনতা মানে দৃষ্টিহীন চোখে বৃদ্ধমায়ের চেয়ে থাকা অসীমে
খোকা তার লাল সবুজের পতাকা হাতে ফিরে আসবে।
মা মাটির সম্ভ্রম বাঁচাতে যে কিশোর ডাঙগুলির গুটি ফেলে
শক্ত হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে জোড় কদমে পা বাড়িয়েছিল অজানায়
মাকে ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিল দেশকে স্বাধীন করে তবেই ঘরে ফিরবে।

চারিদিকে স্বাধীনতার গান বাজে পত্ পত্ করে লাল সবুজ পতাকা উড়ে
খোকা তার আজও বাড়ি ফিরে না-
তবে কি খোকার আকাঙ্খিত স্বাধীনতা আজও আসেনি?
ক্লান্ত অবয়বে দৃষ্টিহীন চোখে গড়িয়ে পড়া নোনা জলে হাজারও
প্রশ্ন ছুঁড়ানো চোখ মায়ের মলিন আঁচল আড়াল করতে পারে না

মা তার আজও গরম ভাতে পাখা হাতে বসে থাকে
খোকা বলেছিল, মা– আমি ফিরে আসবো বীরের বেশে
বিজয় এনে দিবো তোমার আঁচলে,
আজও মা লাল সবুজের পতাকার মাঝে স্বাধীনতাকামী খোকাকে খোঁজে।
…………………………………………..

অন্তহীন অপেক্ষা

আমি চলে যাব একথা নতুন নয়
আমি চলেই যাব
এক দিন সব শূন্য করে।

প্রতিদিন ভোর হোলেই যে তুমি অতিষ্ট হতে
মায়াবী এ চোখ দুটির মায়া টানতো বলে,
অথবা মোবাইল স্ক্রিন কেঁপে উঠতো
চির চেনা সেই রিং টোনে,
কাঙ্খিত চাওয়াটাই কখনো বা বিরক্তির কারণ।
সব অসস্হিকে ছুটি দিয়ে আমি হবো
তোমার স্মৃতির আঙ্গিনায় বিস্মৃত স্মৃতি।

যে আমি তোমার এক সময়ের
ভালেবাসা থেকে বিরক্তির কারণ,
সেই আমিই আবারও তোমার অনন্ত অপেক্ষা হব।

আমার এস এম এস দেখবেনা বলে
যে তুমি শব্দকে ছুটি দিয়েছিলে
এক দিন আসবে দেখে নিও
সেই প্রিয় দুটি শব্দ দেখার জন্য
মোবাইলের স্ক্রিনে আলো খুঁড়ে শব্দ খুঁজবে।
সে দিন আমি থাকবো না
থাকবেনা আমাকে নিয়ে তোমার অসস্হি।

শুধু অনন্ত অপেক্ষা, বৃষ্টি হয়ে ঝড়বে
তোমার মনের উঠোন ভেজাবে,
নোনা স্রোতে ভেসে যাবে তোমার
সমস্ত অভিমান, অবহেলা, বিরক্তি।
তুমি বৃষ্টি পিপাসু চাতক হয়ে খুঁজবে আমায়,
অভিযোগহীন এই আমি রয়ে যাব
তোমার স্পর্শিত সীমানার বাইরে
হয়ে যাব তোমার অনন্ত অপেক্ষা।
…………………………………………..

বিরহী প্রেম

সেদিন সুপ্ত ষোড়সী বিকেলের হাত ধরে
নীল ভ্রমরেরর সোনালী ডানায়,
মৃদু অস্পষ্ট মধুর স্পন্দন ধ্বনির ছন্দের তালে
এসেছিল আগমনী বার্তা ছাড়াই।
ধূসর মনের আঙিনায় ঢেউহীন
খেলে যাওয়া পড়ন্ত বিকেলের
দীপক’রাগ হয়ে এসেছিলে তুমি
আলোক’লতা স্বপ্নগুলি সাজিয়ে দিতে।

ঢেউ হীন শান্ত নদীতে জলকেলি
খেলে আন্দোলীত স্বপ্ন তরঙ্গ,
আঁজলা ভরে ভাসিয়ে দিতে এসেছিলে বলেই,
চলে গেল কিছু না বলেই।
নীরবে নিভৃতে রেখে গেলে কিছু স্মৃতি
সেই বিস্মৃত স্মৃতি গুলো কাঁদায় অহর্নিশী,
বেদনার নোনা জলে ভেসে যাওয়া
স্বপ্নগুলি আজ পূজার অর্ঘ্য তোমার।

লুন্ঠিত স্বপ্ন বুকে বেঁধে আজও
আমি তোমাকেই ভালোবাসি-
ভালোবাসি ঠিক সেদিনের মতোই নিশ্চুপ

হয়তো ঝরাপাতার কষ্ট গুলো তোমার করে,
জ্যোৎস্নার ভেজা সুখ পাখিটা এনে দিবে,
আমার আঁচলে ভাসাবে স্বপ্নের ভেলা

তাই আজও ভালবাসি আমি তোমাকে
সে দিনের মত করে…
…………………………………………..

স্বপ্নচারী

একটা সোনালী বিকেল আমার জানালায় দাঁড়িয়ে
গোধূলির রক্তিম আভা গায়ে মেখে
সে সময়ের অপেক্ষায় ছিল।

শুকিয়ে যাওয়া ভোরের শিশিরের কষ্ট বুকে নিয়ে পথ হেঁটেছি,
সবুজ পাতার বুকে দুরন্ত স্বপ্ন গুলো
ডানা মেলতে পারেনি, পারেনি হাতে পায়ে লম্বা হতে।
শাসনের নির্মমতায় বনশাই হয়ে
ড্রইং রুমের কাঁচের টেবিলে শোভা বাড়িয়ছে।
কতদিন ইচ্ছে করেছ ভোরের শিশিরে
পা ভিজিয়ে সকালের নরম রৌদ্দুর গায়ে মাখতে,
ইচ্ছে করেছে বিশাল খোলা আকাশটার নীচে
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে,
কাশফুল বুকে শরতের নরম বাতাস গায়ে মাখতে।
কিন্তু ডানা ছাঁটা ইচ্ছাগুলো বনশাই হয়ে
ড্রইং রুমের কাচের টেবিলে মুখ থুবরে পড়ে থেকেছে।

হঠাৎ সেদিনের সোনাঝড়া বিকেল
সোনারোদ গায়ে মেখে আমায় আকাশ দেখালো,
বৃষ্টিতে ভেজালো, রংধনু দেখতে শেখালো।
স্বপ্নের গাংচিল সোনালী ডানা মেলে
বিশাল আকাশটা আমাদের করে দিল।
…………………………………………..

তোমার জন্য

শরতের শুভ্রকাশে সাদা মেঘ সড়িয়ে
একফালি চাঁদ হেসেছিল সেদিন,
তারার ফুলের মালা গেঁথে জোসনা রানী
বাসর সাজিয়েছিল প্রেমাকুঞ্জে।

তুমি আসবে বলে হাজার আলোর
পিদিম জ্বালিয়ে জেনাকির দল অপেক্ষায় ছিল।
অথবা অমাবস্যার আঁধারেও কোজাগরী চাঁদ দেখেছিল
সে তো তোমার জন্যই।

তুমি আসবে বলেই এক মা
অজস্র যন্ত্রনায় রাতের নদী সাঁতরে
প্রভাতের আলোর অপেক্ষা করেছে।

অবশেষে তুমি এলে অবাক পাওয়া হয়ে,

তুমি এলে বলেইতো হাজারও পাখির গানে
মুখরিত হোল প্রসূতি রাতের নবজাত প্রভাত
তুমি এলে বলেই পাতার ঠোঁটে হেসে উঠলো
হাজারও শিশির কণা।

তুমি এলে বলেই তো সূর্য্য মামার
হাসির ঝলকে আলোকিত হোল ধরনী।
সুশোভিত হোল এই পৃথিবীর প্রতিটি কণা।
…………………………………………..

ধর্ষিত ভূ-খন্ড

নীতিনির্ধারকের কলমের লিঙ্গে ধর্ষিত হয়ে
রক্তাক্ত সমাজ চিকিৎসার অভাবে মৃতপ্রায়।

একবিংশ শতাব্দীর ঘৃণিত অধ্যায়
ধর্ষকের অট্টহাসিতে বিদীর্ণ আকাশ
দূর্গন্ধ ছড়ায় বাতাসের অণু পরমাণুতে
কুলষিত ইতিহাস আগামী প্রজন্ম জারজের অপেক্ষায়।

স্বাধীন দেশের মাটিতে আজ ধর্ষনের চাষ
কখন কোথায় কে, কিভাবে বুনেছিল বীজ
আজ সে অলক্ষে আত্ম তৃপ্তির ঢেকুর তোলে
কঙ্কালসার ভুখা সমাজ তপ্ত বালিতে হাড্ডি শুকায়।

স্বাধীন এদেশে এ কেমন অনাচার অবিচার
সীমাহীন আয়তন ধর্ষিতার ভূ-খন্ডে
ক্ষমতার দাপটে আর টাকার খেলায়
খুনিরা অকাট্য হাসিতে টুথপিকের খেলা দেখায়।