মহিলারা কি করতে পারবে বা পারবে না তার লম্বা লিস্ট সবসময় তৈরি সমাজের কাছে। আগে থেকেই নির্ধারিত এই কাজ পুরুষদের জন্য আর ঐগুলো মহিলাদের জন্য। এখনো পুরোনো ভারতীয় নিয়মানুসারে মহিলাদের শব্দ ঘরের চার দেয়ালে বন্দি। সমস্ত প্রথা ও বিধি মেনে ঘোমটার আড়ালে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে হাজারো মহিলা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। কিন্তু সত্যি কি এভাবে চলা সম্ভব? দরিদ্রতা কি এই অলিখিত নিয়ম মেনে চলে? না, সব সময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই রকমই এক মহিলার কথা আমরা জানবো যিনি সমস্ত প্রতিকূল অবস্থাকে কাটিয়ে এমনি এক পুরুষালি কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন।

ভারতের রেল ব্যবস্থা যোগাযোগের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ উপায়। জনসংখ্যার বেশিরভাগ লোকেই রেল যাত্রা করে থাকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছনোর জন্য। ভারতীয় রেল এমন অনেক ভারতবাসীর কর্মসংস্থান। এক ব্যতিক্রমী জীবিকা যা রেলওয়ের অন্তর্গত নয় কিন্তু যাত্রীরা এখনও অনেকেই নির্ভর করে এদের ওপর, সেটা হলো কুলি। আমরা স্টেশনে স্টেশনে কুলি দেখি, তারা সবাই পুরুষ, মাথায় আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে চলেছে যাত্রীদের সাথে। কিন্তু আমরা মহিলা কুলি কি দেখেছি কখনো স্টেশনে মাল বইতে? এই পেশা কি এতোই সহজ একজন মহিলার জন্য? সহজ হোক বা কঠিন এই কাজ করে দেখিয়েছেন জয়পুরের বাসিন্দা মঞ্জু দেবী। ভারতের প্রথম মহিলা কুলি।

জয়পুরের অন্তর্গত সুন্দরপুরা নামক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা মঞ্জু দেবী। গরিবী ও অশিক্ষার কারণে দশ বছর বয়সে তার বাল্য বিবাহ হয়। শ্বশুর বাড়িতে সংসার করতে করতে কখন যেন বড় হয়ে যায় সে। দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে গ্রামেই ছিল তার সংসার। তার স্বামী মহাদেব ছিলেন জয়পুর স্টেশনের কুলি। আকস্মিক তার স্বামীর মৃত্যু তাদের জীবনে অনেক পরিবর্তন এনে দেয়। জীবন যাপন করাও খুব কঠিন হয়ে পড়ে। দরিদ্রতার অন্ধকূপ গ্রাস করে তাদের। কারণ কোনো অর্থসংস্থান ছিল না তাদের আর। মঞ্জু দেবীর ঘরের কোণায় বসে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। কিভাবে তিন সন্তানের পেট ভরাবেন সেই চিন্তায় তিনি আকুল। কৃষিকাজ করবে তারও উপায় নেই, কিছুদিন কৃষি করার পর সেখানে জলের সমস্যা দেখা যায় তখন সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। ভেড়া মোষ বিক্রি করে কিছুদিন চালানোর পর আবারো একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। অশিক্ষার কারণ বসত খুব বেশি রাস্তা খোলা নেই তার কাছে উপার্জনের। দিশেহারা হয়ে শেষ মেশ সিদ্ধান্তে এলেন, তিনি তার স্বামীর কাজটাই করবেন অর্থাৎ স্বামীর কুলির লাইসেন্স নেবেন। এমন সিদ্ধান্তে সবাই তাকে নিরুৎসাহিত করলো , মহিলা হয়ে এমন কাজ পারবে না বলে বা করা উচিত নয় বলে। একমাত্র তার মা মোহিনী দেবীর অনুপ্রেরণাতে তিনি সাহস করে এগিয়ে ছিলেন।

জয়পুরের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে তার স্বামী মহাদেবের লাইসেন্স নং ১৫ এর জন্য আবেদন জানালেন। আবেদন অনুমোদন করলেও কর্তৃপক্ষ প্রথমেই তাকে জানিয়েছিলেন এই কাজ তিনি কতটা করতে পারবেন, কারণ এই কাজ একদমই সহজ নয় আর সেখানে কোনো মহিলা কর্মরত ও নয়। কিন্তু মঞ্জু দেবী মনের জোরে কাজে নেমে পড়লেন। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জয়পুর শহরে এসে তিনি প্রথমেই অবাক হয়েছিলেন। শহরের তাকঝাঁক যা তার স্বপ্নাতীত ছিল। জয়পুর স্টেশনে এত লোকজন দেখে ঘাবড়েও গিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে নিজেকে শহরের সাথে মানিয়ে তুললেন। অক্ষরজ্ঞান না থাকায় স্টেশন নম্বর, সিট নম্বর দেখতে তার অসুবিধেও ছিল ভালো রকম। তখন অন্যসব কুলিদের অনুসরণ করে কাজ চালাতেন। ছ’ মাসের একটা প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন রেল কর্তৃপক্ষ। যাতে ন্যূনতম অক্ষর জ্ঞান টা হয়। কাজের সুবিধে হয়। প্রথম দিকে একটা ছোট ট্রলি ব্যাগ মাথায় নিতে গিয়ে পাহাড়ের মতো মনে হতো তার, মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে। সঠিক আহার ও ঘুম কোনোটাই ঠিক মতো না করার দরুন কাজটা তিনি ঠিক মতো করতে পারছিলেন না।বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ধীরে ধীরে নিজেই অনুভব করলেন এভাবে চলবে না। তাকে উপার্জনের জন্য ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করতেই হবে। সব দিক টা বুঝে তিনি কাজ শুরু করলেন।এমন সময় ও গেছে যখন মঞ্জু দেবীর শরীরের ওজন ৩০ কেজি আর তিনি মাথায় ও ৩০ কেজি ওজন বইছেন, শুধুমাত্র তার তিন সন্তানের প্রতিপালনের জন্য। এখন তিনি মাথায় পঞ্চাশ কিলো ওজন অবধি নিতে পারেন। শুধু নিতেই পারেন না সিঁড়ি চড়ে গাড়ি অবধি পৌঁছে দিতে সক্ষম। এছাড়াও ট্রলিতে কত ওজন টানেন তা জানা নেই মঞ্জু দেবীর ও। দুইশত পুরুষ কুলির মাঝে একা মহিলা কুলি হিসেবে মাথা উঁচু করে কাজ করে যাচ্ছেন। কোনো রকম অসুবিধাতে সব সহকর্মী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বিনা দ্বিধায়। শুধু মাত্র মনের জোর দিয়ে এই কাজ করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন।

বর্তমানে তার রোজগারের অর্থ দিয়ে অন্ন বস্ত্র সংস্থান ভালোভাবে হয়ে যায়। সন্তানদের পড়াশুনার জন্য ও তিনি যথেষ্ট সচেতন। জয়পুরের স্কুলে ভর্তিও করেছেন তাদের। সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে সকালে চলে আসেন স্টেশনে আবার দুপুরে ফেরেন আবার বিকেল থেকে রাত অবধি স্টেশনে অপেক্ষা করেন ট্রেনের জন্য। মাঝে বাচ্ছাদের দেখাশুনা ঘরের কাজ রান্নাবান্না সবটাই একা হাতে সামলান। এইভাবে বিভিন্ন শিফটে কাজ করে উপার্জন করেন মঞ্জু দেবী। রেলওয়ে মেডিক্যাল সুবিধা ও ট্রেনে যাতায়াতের জন্য পাস সরবরাহ করেন বিনামূল্যে। কিন্তু কোনোরকন বেতন তাদের নেই। যাত্রীদের ব্যাগ বহন করে যা উপার্জন সেটুকুই সম্বল তাদের। তিনি স্টেশনের বাইরেও কখনো কখনো কাজ করেছেন। এইভাবেই মঞ্জু দেবী উত্তর পশ্চিম রেলওয়ের প্রথম মহিলা কুলি হয়ে ওঠেন।

নিজের উনিফর্ম নিজেই ডিজাইন করেছিলেন তিনি। লাল কুর্তার সাথে সাদা পাজামা আর সাদা ওড়না। হাতে ১৫ নম্বরের ব্যাচ। এভাবেই অভাবের তাগিদে দরিদ্রতার ঘোমটার আড়াল থেকে বেরিয়ে পুরুষদের সাথে একসাথে কাজ করে চলেছেন মঞ্জু দেবী দীর্ঘ সাত বছর ধরে জয়পুর স্টেশনে।

হঠাৎ একদিন তার কাছে ফোন আসে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের জন্য তিনি মনোনীত হয়েছেন, একথা জানিয়ে। কিন্তু তিনি বোঝেন নি এই পুরস্কারের মাহাত্ম। তিনি গুরুত্ব দেন নি। আবার করে স্টেশন মাস্টারের কাছে ফোন আসার পর, সবাই বুঝিয়ে বলাতে তিনি দিল্লি যেতে রাজি হলেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১১২ জন মহিলার মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। ১১২ জনের মধ্যে ঐশ্বর্য রাই, বাচেন্দ্রি পাল এমন আরো অনেকে ছিলেন। মঞ্জু দেবীর কথায়, “ ওখানে গিয়ে সবাইকে দেখে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। সাথে ঐশ্বর্য রাই কে দেখে আপ্লুত হয়ে তার সাথে ছবিও তুলেছিলেন”। পুরস্কারের সাথে এগুলোও তার উপরি প্রাপ্য ছিল। এত সম্মান আগে তিনি কখনো পান নি। এই বছর জানুয়ারি মাসে তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন ভারতের প্রথম মহিলা কুলি হিসেবে। রাষ্ট্রপতি শ্রী রাম নাথ কোভিন্দ তার জীবন কাহিনী জেনে যথেষ্ট সহানুভূতিশীল হয়েছিলেন।এছাড়াও তিনি রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি বসুন্ধরা রাজের কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছেন। ইন্ডিয়া টুডে মহিলা পুরস্কার পেয়েছেন সাহসিকতার জন্য। এমন অনেক পুরস্কার ও সম্মানে আভুষিত হয়েছেন।

জয়পুরে শুটিং করতে এসে অভিনেত্রী বিদ্যা বালন তাকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন । সেই জমিয়েই তার আশা বাচ্ছাদের পড়াশুনা করানোর। সত্যিই তিনি একজন গর্বিত সন্তান ও মা।

এইভাবেই দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের সাথে নিজেকে প্রমাণ করেছেন মঞ্জু দেবী। সমস্ত সামাজিক বাঁধা পেরিয়ে আজ তিনি জয়পুর কুলি সংগঠনের সভাপতি হিসেবেও নিযুক্ত। তিনি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করে সকল মহিলাদের উদ্দেশ্যে জানিয়েছেন শিক্ষা গ্রহনের জন্য।

এর থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে কোন কাজ নারী বা পুরুষের জন্য নির্ধারিত নয়। ইচ্ছে আর চেষ্টার জোরে শত বাঁধা পার করে এগিয়ে আসা সম্ভব। এভাবেই মঞ্জু দেবীও তার জীবনটাকে ইতিবাচক স্রোতে বহমান করতে সক্ষম হলেন আর দৃষ্টান্ত রাখলেন সমাজের কাছে।