ফাল্গুন মাস পার হয়ে চৈত্র এসে গেছে। প্রকৃতি খুব রুক্ষ হয়ে উঠেছে। মতিন সাহেব বিছানায় শুয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। সকাল এগারোটা বাজে। কারেন্ট চলে গেছে। এক ঘন্টার আগে আসবে না। তিনি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, রাহেলা, আজ বাংলা মাসের কত তারিখ? পহেলা বৈশাখ কবে? রাহেলা কুলার মধ্যে ভাতের চাল নিয়ে মরা চাল বাচছে। আজকাল সে কোনো কথাই সহজ করে বলতে পারে না। কথায় কথায় রেগে যায়। মতিন সাহেবের মত নিরীহ একজন মানুষের নিরীহ এই প্রশ্নটা শুনে রাহেলার মেজাজ বিগড়ে গেছে। সে মুখ ঝামটা দিয়ে উত্তর দিল- তুমি কি কানা? নিজে উঠে গিয়ে ক্যালেন্ডার দেখে নাও। আমি জানি না।

মতিন সাহেব মনে মনে হাসলেন। তিনি খুব জোরে হাত পাখা ঘুরাতে লাগলেন। তারপর হাসিমুখে রাহেলাকে বললেন, বুঝলা মিলির মা, এইবার পহেলা বৈশাখে ইলিশ ভাজা দিয়ে পান্তা খাবো। এক-দেড় কেজি ওজনের একটা ইলিশ কিনে আনবো। অর্ধেকটা ভাজবা আর বাকি অর্ধেকটা সরিষাবাটা দিয়া রান্না করবা। অনেকদিন ইলিশ খাই না। না খেতে খেতে জাতীয় মাছ ইলিশের স্বাদ-গন্ধ একদম ভুলে গেছি।

চাল বাছা বন্ধ করে রাহেলা কিছুক্ষণ তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল। মতিন সাহেবের কাছে মনে হল- এখন যদি ঘরে একটা ইলিশ থাকতো তবে রাহেলা চুলার আগুন ছাড়া কেবল অগ্নিদৃষ্টি দিয়েই সেই মাছ ভেজে ফেলতে পারতো। মতিন সাহেব তার মুখের হাসি কিছুটা প্রসারিত করলেন। বিছানা থেকে উঠে বসলেন। বালিশের পাশ থেকে চশমাটা চোখে লাগিয়ে ধীর গলায় বললেন, জানি সংসারে টানাটানি আছে। মিলির বিয়ে দেয়াটা জরুরি। আমার পেনশনের ফাইলটা এখনো আটকে আছে। তাই বলে কি বছরে এক দুইটা দিন কিছু ভালো-মন্দ খেতে পারবো না?

খাও, যত খুশি খাও। ইলিশ কেন, তুমি ইচ্ছে করলে বাজার থেকে হাঙ্গর কিনে আনতে পারো। আমি সরিষাবাটা দিয়ে রান্না করে দিবো। তারপর তোমরা বাপ-মেয়ে মিলে বৈশাখে খেয়ো- এই বলে রাহেলা স্বামীর সামনে থেকে উঠে গেলো। মতিন সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

তিন বছরের বেশী হল মতিন সাহেব একটা বেসরকারী হাই স্কুল থেকে সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসাবে অবসর নিয়েছেন। তিনি বাংলাসাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ। তার গ্রামের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম এতো বড় ডিগ্রিধারী মানুষ। কিন্তু থার্ড ক্লাশ পাওয়ার কারণে জীবনে ভালো কিছু করতে পারেননি। তার এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলেটা বড়, বউ-বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় থাকে। একটা ওষুধ কোম্পানীর মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। তারও টানাটানি করে সংসার চলে। মেয়েটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছে নেত্রকোণা সরকারি কলেজ থেকে। এখন শহরের একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুলে বাচ্চাদের পড়ায়। সামান্য কয়েক হাজার টাকা বেতন পায়। তাই দিয়ে সে নিজের হাত খরচটা চালায় আর কিছু টাকা সংসারে খরচ করে। মতিন সাহেবের বাড়িটা আধা কাঠা জায়গার উপর বানানো। সেমিপাকা ঘর। একজন বেসরকারী শিক্ষকের বসত বাড়ি যেমন হওয়ার কথা এটা সেরকমই। ঘর দরোজার সর্বত্র দারিদ্র্যের ছাপ।

দুই
ছেলে-মেয়ে দুইটা তখন ছোট। মতিন সাহেব গ্রামের ধানী জমি, বাড়ির বড় আম গাছ, কাঁঠাল গাছ বিক্রি করে নেত্রকোণা শহরে এই বাড়িটা করেছেন। আশা ছিল সন্তান দুটো পড়ালেখা শিখে বড় কিছু করবে। তার অভাব-অনটন দূর হবে। কিন্তু সেই আশা তার পুর্ণ হয়নি। সারা জীবন তিনি অভাব আর অনটনের ভিতর চাকরি করে গেছেন। কোন মাসেই নিয়মিত বেতন পেতেন না। প্রতি মাসেই ধার দেনা করে সংসার চালাতেন। সঞ্চয় বলতে তার কিছুই নেই। যেদিন বেতন হওয়ার তারিখ থাকতো সেদিন খুব আশা নিয়ে তিনি ব্যাংকে যেতেন চেক বই নিয়ে। কিন্তু টাকা একাউন্টে জমা না হওয়ায় তুলতে পারতেন না।

কত দিন যে এমন হয়েছে। সকাল বেলা বাড়ি থেকে বের হবার সময় মতিন সাহেব বাচ্চা দুইটাকে বলেছেন, এই যে সোনামনিরা, মন দিয়ে পড়বা। আম্মুর কথা শুনবা। একদম দুষ্টামি করবা না। আজকে স্কুল থেকে আসার সময় গরুর মাংস নিয়ে আসবো। রাতে সবাই গরুর মাংস ভুনা দিয়ে ভাত খাবো। রাহেলাকে ডেকে বলেছেন, তুমি মশলা বেটে রেখো। এক কেজি গরুর মাংস নিয়ে আসবো, সিনার ফ্রেশ মাংস।

রাহেলা খুব আয়োজন করে মাংসের মশলা বেটে রেখেছে। ছেলেমেয়ে দুইটা খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থেকেছে। কিন্তু সন্ধ্যায় মতিন সাহেব ক্লান্ত দেহে, খালি হাতে ঘরে ফিরেছেন। গরুর মাংস আনতে পারেন নাই। কারণ বেতন হয় নাই। রাহেলা তখন নীরবে চোখের পানি ফেলেছে। ঘরে হয়ত কিছু আলু কিংবা দুইটা ডিম আছে। তাই রাতের খাবারের জন্য সিদ্ধ বসিয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে রাহেলা এইসব অভাব অনটন সহ্য করতে না পেরে রাগে ক্ষোভে তার শিক্ষক স্বামীকে বলেছে, তুমি যদি এইরকম বেসরকারি স্কুলে মাস্টারি না করে রিকশা চালাতে তবু ভালো ছিল। আমার এই অভিশপ্ত সংসার আর ভালো লাগে না। মতিন সাহেব খুব বিরক্তি নিয়ে বউকে বললেন, আহ, চুপ করো তো। তোমার প্যান-প্যানানি ভালোগে না। পৃথিবীতে আমার চেয়েও বেশী কষ্টে অনেক মানুষ আছে। অভাবের সংসারে এরকম কত হাজারো স্মৃতি তার চোখের সামনে ভাসে।

রাহেলা চুলায় ভাত বসিয়েছে। মতিন সাহেব কল তলায় গিয়ে বালতিতে গোসলের পানি ভরলেন। যোহরের নামাজের সময় ঘনিয়ে এসেছে। মিলি এখনো স্কুল থেকে ফিরেনি। হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরবে।

নামাজের সালাম ফেরাতেই মতিন সাহেব দেখলেন মিলি স্কুল থেকে ফিরেছে। তিনি মেয়েকে বললেন, আম্মাজী, হাত মুখ ধুয়ে নে। এক সাথে সবাই ভাত খাবো। তোর মাকে বল তাড়াতাড়ি গোসল সেরে নিতে। মিলি হাসি মুখে বললো, বাবা, আমি তোমার ভাত টেবিলে দিচ্ছি। তুমি খেয়ে নাও। আমি আর মা- দুজন পরে খাবো। মতিন সাহেব ভাবলেন- মা আর মেয়ে এক সাথে খাক, আমি বরং একাই খেয়ে নিই। তিনি মিলিকে বললেন, ঠিক আছে আম্মাজী, আমি তাহলে খেয়ে নিলাম। তোরা পরে খাস।

মতিন সাহেব খাচ্ছেন। মিলি পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি খেতে খেতে ভাবছেন মেয়েটা যেদিন পরের ঘরে চলে যাবে সেদিন তিনি কেমন করে থাকবেন। খুব অভাব অনটনের ভেতর দিয়ে তিনি মেয়েকে বড় করেছেন। কোনোদিন ভাল কিছু দিতে পারেন নাই- না ভালো খাবার, না ভালো একটা জামা। মতিন সাহেবের চোখ ভিজে গেছে। তরকারির ঝালে নয়, মেয়ের কষ্টের কথা ভেবে। তিনি ভেজা চোখ নিয়েই মাথা নিচু করে ভাত মাখাতে লাগলেন।

মতিন সাহেব খুব জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মেয়ের বিয়ের জন্য। কেননা তার শরীর ভালো না। হার্টের সমস্যা আছে। কখন কী হয়ে যায়! একটা সম্বন্ধ তার খুব পছন্দ হয়েছিল। ছেলে নেত্রকোণার একটা বেসরকারি কলেজের শিক্ষক। ভালো বংশের ছেলে। কিন্তু রাহেলার প্রবল আপত্তির কারণে বিয়েটা পাকা করতে পারলেন না। কোনো শিক্ষকের কাছে রাহেলা মেয়েকে বিয়ে দিবে না। হোক সে বেসরকারি কলেজের, হোক সে সরকারি কলেজের। রাহেলা মতিন সাহেবকে স্পষ্ট জানিয়ে রেখেছে- আমার মেয়েকে প্রয়োজনে কুলি-মজুরের কাছে বিয়ে দিব তবু কোনো মাস্টারের কাছে দিব না!

মতিন সাহেব তার স্ত্রীর এই কথায় কষ্ট পাননি। তিনি জানেন রাহেলার দুঃখটা কোথায়। তিনি কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ থেকেছেন। তিনি কেবল স্ত্রীকে বলেছেন, ঠিক আছে রাহেলা। তোমার পছন্দই আমার পছন্দ। তাছাড়া বিয়ে-শাদী হল তকদীরের বিষয়। কার জোড়া কোথায় মিলবে কেউ জানে না। তুমি, আমি কেবল চেষ্টা করে যেতে পারি।

তিন
মতিন মাঝে মাঝে ভাবেন, মেয়ের বিয়ের জন্য যে এতো তাড়াহুড়া করছেন কিন্তু এক টাকারও তো কোনো জোগাড় নেই। পেনশনের টাকা না পেলে কিছুই করা যাবে না। সাদামাটা করে বিয়ে দিলেও আজকাল চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ হবে। তিনি আর কিছু ভাবতে পারেন না। অস্থির লাগে, মাথা ঝিম ঝিম করে। তারচেয়ে সবকিছু নিয়তির উপর ছেড়ে দেয়াই মঙ্গল। তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন এই বলে যে, মুরগী কোনোদিন দৌড়িয়ে ধরা যায় না। তাই এতো চিন্তা করে লাভ নেই।

বিকেল হয়ে গেছে। আসরের আজান পড়েছে। মতিন সাহেব রাহেলাকে বললেন, ঘরে কি চিনি আছে মিলির মা? থাকলে আমাকে এক কাপ চা করে দাও। তার ধারণা ছিল- এই কথা বলার পর রাহেলা হয়ত আগের মত রেগে যাবে। কিন্তু তা ঘটলো না। রাহেলা খুব নরম গলায় বলল, চায়ের সাথে কি মুড়ি খাবে নাকি বিস্কুট দিবো? মতিন সাহেব উদাস ভঙ্গিতে বললেন, একটা কিছু দিলেই হল। রাহেলা হাসি মুখে বলল, তুমি নামাজ শেষ করো। আমি চা করছি।

মতিন সাহেব আর তার স্ত্রী টেবিলে মুখোমুখি বসে বিকেলের চা-নাশতা খাচ্ছেন। মিলি টিউশনিতে গেছে। রাহেলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, পহেলা বৈশাখের আর চারদিন আছে। ফরিদ গতকাল ফোন করেছিল। অফিস থেকে তিনদিনের ছুটি পেয়েছে নববর্ষের। বউ বাচ্চা নিয়ে আসছে বাড়িতে। বিকাশ করে মিলির কাছে চার হাজার টাকাও পাঠিয়েছে বাজার খরচের। তুমি আগামিকাল মাছ বাজার থেকে দুইটা ইলিশ কিনে আনবা। ইলিশের দাম এখন অনেক চড়া। দরদাম করে কিনো কিন্তু!

মতিন সাহেবের চোখে মুখে খুশির ঝিলিক বয়ে গেল। তিনি রাহেলাকে বললেন, এভাবে মুখে মুখে বললে হবে না। কী কী লাগবে তুমি ভাল করে একটা লিস্ট করো। বাবুটার জন্য একটা ড্রেস কিনে রাখতে হবে। বাচ্চাদের ফতুয়া পাওয়া গেলে ভাল হতো। মিলিকে বলো- দুই একদিনের ভেতর বাবুর জন্য বৈশাখের একটা ফতুয়া কিনে আনতে।

চার
সকাল থেকে মতিন সাহেবের বাড়িতে ঈদ ঈদ ভাব। আজ পহেলা বৈশাখ। ঢাকা থেকে ছেলে, ছেলের বউ, নাতি এসেছে। রাহেলার দম ফেলার সময় নেই। সকালের নাশতা পান্তা ভাত আর চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা দিয়ে সবাই করেছে। ইলিশ মাছ দুপুরের খাবারের জন্য রান্না হবে সরিষাবাটা দিয়ে। মতিন সাহেব চুপি চুপি আগেই রাহেলাকে বলেছে- বড় ইলিশ কেনার সাধ্য তো নেই। মাঝারি সাইজের একজোড়া কিনেছি। পান্তা ভাতের সাথে খাওয়ার দরকার নেই। গরম ভাত দিয়ে দুপুরে সবাই খাবো। এই কারণে রাহেলা সকালের নাশতায় ইলিশ ভাজা করেনি।

নাশতার পর মতিন সাহেব নাতিকে কোলে নিয়ে বাড়ির সামনে হাঁটাহাঁটি করছেন। হঠাৎ তার মনে হল সারা শরীর ঘেমে যাচ্ছে। বুকের মাঝখানে ভারি একটা কিছু চেপে ধরেছে। তার নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন খুব খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে তার। তিনি দ্রুত বাবুকে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে রাহেলাকে চিৎকার করে ডাকলেন। সবাই দৌড়ে এসে মতিন সাহেবকে ধরলেন। কিন্তু কিছু বোঝার আগেই তার হৃদস্পন্দন থেমে গেল!

এই সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তার বয়স হয়েছিল সাতষট্টি বছর।

হাসপাতালে নিয়েও কোনো লাভ হয়নি। ডাক্তার বলল, ম্যাসিভ হার্ট এটাক। স্ত্রী, সন্তান, ছেলের বউ, নাতি আর ইলিশ মাছ না খেতে পারার আক্ষেপ রেখে মতিন সাহেব পহেলা বৈশাখের সকালে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিলেন। সারা বাড়ি জুড়ে কী যে আহাজারি, শোকের মাতম, কান্নার রোল!

পহেলা বৈশাখের রোদ ঝলমলে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে এই কান্নার রোল দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়ছে।