বোধহয়, একেই বলে সঙ্গ দোষে শিলা ভাসে ! ভূত এসে সুখ খেয়ে যায়। সবার কপালে তো আর সুখ সয়না!

পাড়ার মোড়ে রবির কম্পিউটারের দোকান। অনলাইনের অনেক কাজ। রেলের টিকিট, বিভিন্ন ফর্ম ফিলাপ, ফটোসপ ইত্যাদি ইত্যাদি। দিন গেলে আয় বেশ ভালোই হয়। দুই ছেলেমেয়ে আর বাবা -মা কে নিয়ে ছোট্ট সংসার। বেশ আরামেই দিন কেটে যায়। ভালোবাসার চাদর যেন বিছিয়ে রেখেছে সংসারে। খুশির আলোয় ঝলমল করে সারাক্ষণ। কিন্তু সুখের আঙিনায় ডাইনির ছায়াটা কখন যে ঘিরে ফেলেছে তা সে নিজেও অনুভব করতে পারেনি। বোধহয় একেই বলে মোহমায়া। মায়া জালে কখন যে জড়িয়ে গেছে তা তার চিন্তারও বাইরে।

সুজা। রবির খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড। বাল্যকালের বন্ধু। এক গ্রামেই বাড়ি। একসাথেই পড়াশোনা। ভূগোল নিয়ে বি এ, বি এড শেষ করে বর্তমানে বেকার। চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে মাথাটাই বিগড়ে গেছে। চাকরির যা আকাল! তারওপর স্বজন পোষণ আর দূর্ণীতি সবকিছু বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে।

হতাশা আর দুশ্চিন্তায় অনিশ্চিত জীবন। ইন্টারনেটের যুগে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সেট তার সঙ্গী। তেজ, ফোনপে, গুগল পে এ-ই রকম এ্যাপ্সগুলোকে নেড়েচেড়ে যা দু পয়সা হয়, সেটাই আর কম কি? যার আয়ের কোনো উৎস নেই তার কাছে মোবাইলই ভরসা।
সামনেই আসছে এপ্রিল মাস। জমজমাট ক্রি পি এল ম্যাচ। গতবার তো মাত্র পাঁচ পয়েন্ট কম হওয়ার জন্য এক কোটি টাকার প্রথম পুরস্কারটা চলে গেল। তবুও” ড্রিম-ক্রিক…” এর সুবাদে কুড়ি হাজার টাকা পেয়েছিলাম। এবার একটু জমিয়ে খেলতে হবে। বেশি বেশি টিম নেবো। প্রথম পুরস্কারটা জিততেই হবে… জিততেই হবে। তাহলে কেল্লাফতে। পেছনে আর ফিরে তাকাতে হবে না। আঃ! ভাবতে কি যে মজা লাগছে!
সন্ধ্যার সময় সুজা রবির দোকানে এল। সুজা বলল-
তোর দোকান তো ভালোই চলছে। তা দিনে কি রকম হয়?
-হ্যাঁ রে ভালোই হয়।
-তা এক কাজ কর না।
-কি বল?
জানিস তো গত বছর মাত্র কয়েক পয়েন্ট এর জন্য প্রথম পুরস্কারটা পেলাম না।
-ও, আচ্ছা। খেলার কথা বলছিস
-শোন, তাই এবার ভাবছি জমিয়ে খেলবো। এতে তুই যদি সাথ দিস তো খুব ভালো হয়।
-কি আমি! আমি তো ক্রিকেটের ‘ক’ ও বুঝিনা।
-আরে আমি আছি না।সব সেট করে দেব। টাকার জন্য বেশি টিম সাজাতে পারছি না। তাই দুজন মিলে যদি বেশি টিম নিতে পারি, তাহলে দেখবি প্রথম প্রাইজ টা আমাদেরই। তারপর দেখবি জীবন ই পাল্টে যাবে। আমরা কোটিপতি হয়ে যাবো…কোটিপতি… গাড়ি, বাড়ি কোন কিছুর অভাব থাকবে না।

মনের মধ্যে দোটানা ভাব এলেও শেষমেশ রাজি হয়ে গেল রবি। ভাবলো কিছু টাকা সেদিকে লাগিয়ে যদি বড়ো কিছু একটা পাওয়া যায় তাহলে তো ভালোই হবে। তাছাড়া ব্যবসা করতে গেলে তো পুঁজি ইনভেস্ট করতেই হয় ।যদি এটাকে একটা ব্যবসা ধরে নিই, তাহলে ক্ষতি কি? এই সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে রবির মাথাটাই মজে গেল। আগামীকাল শুরু হবে ক্রি পি এল এ-র জমজমাট আসর। বিকেল হতেই সুজা রবির দোকানে হাজির -কি রে মনে আছে তো?
কম্পিউটারে কি যেন কাজ করতে করতে রবি বলল- ও, হ্যাঁ, বল্। ম্যাচের কথা বলছিস্ তো?
-হ্যাঁ। আগামীকাল তো শুরু হচ্ছে। আজকেই আমরা কিন্তু টিম সিলেক্ট করে রাখবো। পরে অবশ্য অবস্থা বুঝে এডিট করে নেব।
-তুই যেটা বুঝিস্।
আর হ্যাঁ, আজ সন্ধ্যা ৭ টায় জমজমাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে। দেখবো কিন্তু। তার আগে বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসি রে।
-আচ্ছা, ঠিক আছে। আয়।
সেদিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখার পর রাতভোর চলল ম্যাচ সেটিং প্ল্যান। রবিও ধীরে ধীরে বুঝে গেল কীভাবে সেটিং করতে হয়। কোন টিমে কোন প্লেয়ার। কে কে ভালো খেলে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আজ দুটো খেলা। বিকেলে একটা, আরেকটা রাতে।প্রতিদিনই প্রায় দুটো করে ম্যাচ। একমাস ধরে চলবে খেলা। সবমিলিয়ে কুড়ি খানা টিম সাজিয়েছে আজ। তাই অনলাইনে বাকি থাকা কিছু কাজ সময়ের আগেই সেরে নিয়েছে। খেলা শুরু হতেই পর্দায় চোখ। “সিনেক্স-11” টসে জিতে
“থান্ডার বার্ডস ” কে ব্যাট দিয়েছে । টেন… নাইন… এইট… ওয়ান…. জিরো… স্টার্ট। শুরু হল খেলা। প্রথম বলটা বাউন্ডারির ওপারে পড়তেই লাফিয়ে উঠলো সুজা-ওয়াও… গ্রেট শট। ব্যাটিংয়ে দাঁড়িয়ে তার নির্বাচিত ক্যাপ্টেন ডি.শনক্যাট। একের পর এক চার , ছয় আছড়ে পড়ছে গ্যালারিতে। রবিও উজ্জীবিত। কারণ সেও জেনে গেছে প্লেয়ার পয়েন্ট যত বাড়বে ততই ভালো। খেলা গড়িয়ে চলল। খেলা দেখার যে মানষিক কি চাপ থাকে সেদিন রবি বুঝতে পারলো-“ও হো… এটা কি হলো! বলটা ওভাবে না মারলেই পারতো। ইস্ একটুর জন্য। কি দারুণ বল করছে রে ছেলেটা!
ও মাই গড! আনব্লিভাবল! উড়ন্ত পাখির মতো ক্যাচটা তুলে নিলো। শনক্যাট প্যাভিলিয়নে। “তবে স্কোরটা খারাপ করেনি ৬২ রান ৩০ বলে। খেলার প্রতি ডেলিভারিতে প্রতিটা মুহুর্তে উত্তেজনা। কখনো “চিয়ার” তো কখনো “ফিয়ার”। খেলার বাইরে থেকে তারাই যেন খেলাটা খেলছে। টেনশন আর টেনশন।ম্যাচ শেষ হওয়া অব্দি তো বুঝার জো নেই। কি হয় কি হয় কম্পন বুকের ভেতর। যাই হোক প্রথম দিনটা মন্দ গেলনা। বড়োসড়ো না হলেও পাঁচ হাজার টাকা জিতেছে। বেশ ভালোই লাগছে। রবিও খুশি। সত্যি খেলাটাই যেমন চাপ আছে তেমনি ইনকাম করার সুযোগও আছে। তাছাড়া আজকাল প্রতিটি কাজেই টেনশন। চাপ না নিয়ে কি কিছু পাওয়া যায়?
এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকে। রবি এখন খেলা সম্পর্কে বেশ বুঝে গেছে। টিম সেটিং, প্লেয়ার চয়েস যাবতীয় নিয়মনীতি তার নখদর্পনে। সে এখন একা একা খেলে। ঐ যে সেদিন প্রাইজ মানির অংশ নিয়ে কথা-কাটাকাটি। তারপর আর সুজাও তেমন দোকানে আসেনা। কিন্তু খেলার ধাঁচ রবির জানা হয়ে গেছে। এখন সে শুধু ক্রিকেটই নয় অন্যান্য খেলা-কবাডি, ফুটবল, টেনিস ইত্যাদি খেলাতেও মন ডুবিয়েছে। হেড টু হেড কনটেস্ট। বড়ো কনটেস্ট, বেশি টিম। কারণ প্রথম প্রাইজটা সে জিতবেই জিতবে।
এই করে দিনরাত খেলার জালটা তাকে যেন ঘিরে ধরেছে। অনলাইনের বিভিন্ন কাজে এখন তার অনীহা। কখনো কখনো বড়োসড়ো ভুল করে বসে টিকিট বুকিং এ। তার খেসারত ও কম দিতে হয় না। বিভিন্ন ফর্ম ফিলাপে ভুলভ্রান্তি করার নানা অভিযোগ আসছে। অথচ এর আগে এমনটা প্রায় হতোনা বললেই চলে। দিনের পর দিন মানুষের মনে বিশ্বাস হারাচ্ছে। তার নিয়মিত কাস্টমাররা আর তেমন আসে না। কারণ একটু পাশেই Computer Science পাশ করে রাজু কম্পিউটার অনলাইনের দোকান খুলেছে। নতুন প্রজন্ম সেখানেই ভিড় জমাচ্ছে। আজকাল রবি বেশ দেরি করে বাড়ি ফেরে। খাওয়া দাওয়ার জন্যও যেন সময় নেই। সব সময় ব্যস্ত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলের স্ক্রিনে। টাচ এ্যান্ড লুক। মাঝে মাঝে হাসি, হাততালি, মাঝে মাঝে বিরক্তির সুর –“ওয়াট! ডিজগাস্টিং! ধুর্ ! এত্তো সহজ বলটা এভাবে…! “
বিছানায় রাত জেগে জেগে মোবাইলে চোখ। ঘুম হারিয়েছে।
এসব দেখে দেখে সুমনা ও বিরক্ত। স্ত্রীর চাওয়া পাওয়ার প্রতি কেমন জানি আজকাল অনীহা।ভালোবাসার বাঁধনটা যেনো দিন দিন আলগা হচ্ছে। আজকাল একটুতেই রেগে যায়। ছেলেমেয়ের প্রতিও উদাসীন। কি হল ওর…? এমন তো ছিল না ! মনে মনে এসব কথা ভাবতে ভাবতে সুমনার চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তাকে তো জানতেই হবে- কি হয়েছে? কেনো তার এমন আচরণ? কিন্তু কিভাবেই বা জানবে? আজকাল যা মেজাজ কোন কথা জিগ্যেস করাই যায়না। এতকিছু যখন ভাবছিল তখন ঠকঠক করে দরজায় কে আওয়াজ দিল-
রবি, রবি বাড়ি আছিস
-সুমনা ছুটে গিয়ে দরজা খুললো -ও বিকাশদা, আসুন, আসুন।
রবি কোথায়, রবিকে ডাকো,
রবি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো
বিকাশবাবু বলল -কি রে আট মাসের ভাড়া বাকি, দেবো দেবো করে কবে দিবি? শোন, আগামীকালকের মধ্যে না দিতে পারলে দোকান ছাড়তে হবে, আর কোনো কথা আমি শুনবোনা।
-রবি আমতা আমতা করে কি যেন বলতে যাচ্ছিল, বিকাশ বাবু সেটাকে গুরুত্ব না দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
-সুমনা দেবী বিস্মিত হয়ে জিগ্যেস করলেন -কি গো, কি বলছে এসব? এ কি সত্যি? এত্তো মাসের ভাড়া বাকি! কি করলে তুমি? কোন পাপে পড়লে?
-রবি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো
সুমনা হাঁউমাউ করে কাঁদতে লাগলো, চিন্তা আর ভয় যেন শরীর, মনকে আঁকড়ে ধরছে। কিন্তু কিই বা করা যায়? জীবন মানেই তো সংগ্রাম। লড়াই করে বাঁচতে হবে। ভাবলেন, বাক্সে রাখা সোনার হারটা বিক্রি করে এবারের মতো বাঁচা যাবে। কিন্তু বাক্স খুলতেই একি! সোনার হার… সোনার হারটা…. কোথায় গেল… কোথায় গেল… আমার সোনার হার র র………..
একটু সামলে নিয়ে ডাক দিলেন- কই গো শুনছো, এদিকে এসো তো, সোনার হারটা পাচ্ছি না, তুমি কি দেখেছো, তুমি কি কোথাও রেখেছো? কি শুনতে পাচ্ছনা? শুনতে পাচ্ছনা তুমি…?

-রবি আড়ষ্ট হয়ে নিচুস্বরে বলল-ওটা, ওটাতো আমি কয়েক মাস আগেই নিয়েছিলাম।
সুমনা-তাহলে কই, ওটা দাও
রবি -নেই
সুমনা-নেই মানে!! কোথায় গেল?
রবি-বিক্রি করেছি
সুমনা-হায় হায়! এ কি করেছো তুমি! আমার হার, আমাকে না জানিয়ে তুমি কিনা চো… এর মতো বিক্রি করতে পারলে!! ছি:, ছি:, ছি: ঘেন্না করছে তোমাকে।

না, আমি আর পারছি না। ভালোবাসা তো কবেই কেড়ে নিয়েছো। তারওপর এসব কিছু ও কেড়ে নিলে। আমি কি পুতুল ?শান্তিতে একটু থাকতেও পারবো না?কি ভেবেছো আমাকে… (হাঁউ মাঁউ করে কাঁদতে কাঁদতে) ছেলেমেয়ে কে হাত ধরে টেনে চললাম যেদিকে চোখ যায়…
রবির চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। হাত দুটো বাড়াতে গিয়ে ও থমকে যায়। মনের ভেতর তীব্র ঝড়ে একুল ওকুল ভাঙার শব্দ। কি অধিকারেই বা ছেলেমেয়েকে কাছে টানবে? এতদিন তো তাদের ঠিকমতো খেয়ালই রাখেনি। নীরব অশ্রু সজল নয়ন দুটো ঊর্ধ্বপানে চেয়ে কি যেন বলতে চাই। কিন্তু বলার মতো শক্তি ও যেন হারিয়ে গেছে। শুধু অপলক দৃষ্টিতে ঐ দূরের পথে চোখ দুটো হারিয়ে যায়। তীব্র যন্ত্রণায় বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। নোনা জলের আবরণে স্বাদের পৃথিবীটা বিস্বাদ হয়ে ওঠে। চারিদিকে শুধুই ধোঁয়া আর শূন্যতা।