কবিতা লিখতে লিখতে ক্লান্ত আমি। ভাবলাম, একটা গল্প লিখব। তখন ভুতের অন্ধকার নেমে আসছে। মেঘমেঘ আকাশ। ঘোর সন্ধ্যা পেরিয়েছে কেবল। দমধরা প্রকৃতির মাঝে ঘর থেকে নেমে মাঠের দিকে হাঁটছি। জিকে ক্যানালের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে একটি আমকাঁঠালের বাগানের পাশে দাঁড়ালাম। গল্পের প্লট নিয়ে ভাবছি। হঠাৎ গামছা মাথায় দিয়ে ধড়ি বেঁধে একটি লোককে অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেখছি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৃষ্টির সীমা ছেড়ে গেল। দু’চার মিটার দূরে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। লোকটিকে এখন ভুত মনে হচ্ছে। হয়তো ভুতই চলে গেছে পাশ দিয়ে। গা ছমছম করছে। দু’একটা লোম কিছুটা খাঁড়াও হয়ে গেছে। ক্যানেলের ধার ঘেষে বসে পড়লাম। এমন ভাব যে,ভুত যেন আমাকে দেখতে না পারে।
অথচ আমন ধানের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন হাটুপানিতে চলে এসেছি টের পায়নি। হুস ফিরলেই লক্ষ্য করি, আমি পানির ভিতর দাঁড়িয়ে আছি। এই ধানের ভিতর ডাহুক পাখির ডিম খুঁজতে এসেছিলাম। সেদিন সাথে ছিল মদিনা। মদিনা আমাদের প্রতিবেশী হাবিল চাচার মেয়ে। আমরা দু’জন হাটুপানিতে ধান ভেঙে বিছানা বানিয়েছিলাম। তারপর ধানের উপর শুয়ে পড়েছিলাম। আমি না ভিজলেও সেদিন মদিনা বেশ ভিজে গিয়েছিল।
তারপর হাবিল চাচা ধানের মাঠে এসে মদিনাকে মারতে মারতে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল।
আবার দেখি এত অন্ধকারের মধ্যেও ভুতটা হাপাতে হাপাতে খপ-খপ পা ফেলে দ্রুত যাচ্ছে আর আসছে।

ভুতটাকে ঠিক হাবিল চাচার মতই লাগছে। যে হাবিল চাচা গত বর্ষায় দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। সেরাতেও ব্যাপক বৃষ্টি হচ্ছিল। তার আগেও একটানা সারা রাত বৃষ্টি হয়েছিল। চারদিকে পানি থৈ থৈ করছিল। খালবিল ছাড়িয়ে, নদী ভাটিয়ে স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল ফসলাদি,এমনকি গরু-ছাগলও। হাবিল চাচার মাটির ঘর ও টিনের ছাপড়া ছিল। সে রাতেই দেওয়াল পড়ে ঘুমের মধ্যেই মাটিচাপায় মারা যায় হাবিল চাচা। মদিনা বেঁচে ছিল,বেঁচেছিল মদিনার মাও। তবে বুক থেকে পা পর্যন্ত মাটির দেওয়ালের নিচে পড়ে অকেজো হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুদিন বেঁচে থেকে ধুকে ধুকে বিনা চিকিৎসায় না খেয়ে মারা গিয়েছিল। শুধু মদিনায় বেঁচেছিল। অনেকদিন আমাদের বাড়ি থেকেছে মদিনা। গৃহস্থবাড়ির গোয়ালঘর পরিস্কার,ঝাড়ু দেওয়া,থালাবাসন মাজাসহ প্রয়োজনীয় সব কাজই করতো। একটানা চোখে ঠুসি বাঁধা গরুর মত খেটেছে।

খাটতে খাটতে গতর শেষ, শেষ যৌবনের উত্তাপও। নেতিয়ে পড়া ধর্ষিতা রমনীয় চিহারা হয়ে গিয়েছিল মদিনার। কেন এমন হয়েছিল, সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো না। শুধু মনে পড়ছে, আমার মা একরাতে চিৎকার করে বাবাকে গালিগালাজ করেছিল। আমি মায়ের রাগ-ক্ষোভ-হতাশাগুলো না দেখার অথবা না শোনার ভান করে জেগে জেগে ঘুমাচ্ছিলাম। তারপর আমি আর মদিনাকে দেখিনি, খোঁজও নিইনি। কেন খোঁজ রাখিনি তাও জানি না। শুধু জানি মদিনা আমার কিশোর বেলার যেমন সঙ্গী ছিল, তেমন যৌবনেরও গোপন সঙ্গী ছিল।
হঠাৎ মদিনাও এ আ্ঁধার পেরিয়ে এসে, গাছের অন্ধকার গহীন ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমি চিৎকার করতে গিয়ে পারিনা। অবশ হয়ে আসে হাত-পা ও গলার কণ্ঠনালী।
ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একটি নিকষ কালো পোকা এসে ভুঁ-উঁ-উঁ শব্দ করতে করতে কপালের সাথে আছাড় খেয়ে নিচে পড়ে যায়। আমি একবার কপালে হাত দিই আর একবার পোকাটিকে খুঁজতে থাকি। পোকাটাকে খুঁজতে খুঁজতে অবাক হই। কপালের এক কোণায় যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়। ভীষণ যন্ত্রণা। কিসের যন্ত্রণা-মদিনার স্মৃতির, মায়ের কান্নার না সামনে দাঁড়ানো হাবিল চাচার?
মাথাটা ভীষণ ধরেছে। কোনো বোধই কাজ করছে না। চোখের সামনে বা চতুর্দিকে ঝিলঝিল আলো জ্বলছে। চৈত্রের প্রখর রোদের দুপুরের দূর মাঠ কাঁপানো কম্পন শুরু হয়ে যায় আমার মুখমণ্ডলে।
লাঙ্গলের ফলায় হাঁটছি আমি। নীরব অথচ কানের মধ্যে মাটি ফাড়ার ভড়-ভড় শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ডাডা শব্দে রাখাল গরু খ্যাদাচ্ছে। কিন্তু কী দেখছি আমি!- মদিনা তার নগ্নস্তনের উপর জোয়াল তুলে নিয়ে সামনে হাঁটছে আর মাটি দুইদিকে সরে যাচ্ছে। তার যৌবনের স্নিগ্ধ আলোতে অন্ধকার হারিয়ে যাচ্ছে আকাশের মধ্য সীমানায়। বৃষ্টিস্নাত এ রাতে মদিনা কী পরী হয়ে এলো!
নিয়ে যাবে মদনকুমারকে?
নির্ভেজাল নগ্ন নারী,পাখাহীন যে!- পরী তো নয়। ঝিরিঝিরি বাতাস ভেসে আসে। সেগুন গাছের বুড়ো পাতাগুলো ঝরে যাচ্ছে। পাতাগুলোকে ধবধবে সাদা শিউলি ফুলের মত দেখা যাচ্ছে। হাবিল চাচাকে কাফন পরানোর সময় ঠিক এ রকমই দেখা গিয়েছিল। বৃষ্টিমুড়োয় ভেজা মাটি কবরের উপর দিতে দিতে আমার খুব ভয় লাগছিল সেদিন। তারপর অতিবৃষ্টির কারণে কবরস্থান ডুবে গিয়েছিল। কোথাও কোথাও হালকা মাটি দেখা যাচ্ছিল। মদিনার মা মারা গেলে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল ওই কবরস্থানেই। সেদিন কবরখানা থেকে খুব দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। আমরা গামছা দিয়ে নাকমুখ বেঁধে স্যাঁতস্যাঁতে কাঁদামাটির মধ্যে আস্ত একটা লাশ রেখে এসেছিলাম।
তারপর বেশ কিছুদিন পর মদিনা হারিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ কোথায় কার সাথে গিয়েছিল তা কেউ জানতো না। মদিনার এমন কেউ ছিল না যে, তাকে খুঁজে কেউ বের করবে বা জায়গা দেবে।
প্রায় এক বছর পর আমি খুলনা থেকে পিঁয়াজ বিক্রি করে ট্রেনে আসছিলাম। চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনে প্লাটফরমে নেমে একটা সিগারেট নিচ্ছি এবং ঠোঁটের আগায় সিগারেটটা ধরে, দোকানদারের কাছ থেকে ম্যাচ নিয়ে কেবল আগুন জ্বেলে সিগারেটের আগায় দিয়েছি, এমন সময় ট্রেন হুইসেল দিতে থাকে। আমি হুটহুট করে পা ফেলে দৌড়িয়ে ট্রেনে উঠছি। ঠিক তখনই পিছন থেকে মদিনা ডাকছিল, রিফাত ভাই-রিফাত ভাই?
আমি তো হতবাক হয়ে ট্রেনের কামরার হ্যান্ডেল ধরে ঝুলছি আর বলছি, আহারে ট্রেন যে ছেড়ে দিল-রে?
মদিনা হাত উঁচু করে বলেছিল, যাও যাও সাবধানে যাও-পড়ে যাইও না।
ট্রেনের ভিতরে এসে বার বার মদিনার কথা মনে হচ্ছিল।
কোথায় থাকে, কী করে কিছুই তো জানি না। তাহলে কিভাবে খুঁজে পাবো?
বাড়ি এসে মাকে মদিনার কথা বললাম, মা মদিনা চুয়াডাঙ্গার কোথাও থাকে মনে হয়।
মা বললো, মরুকগে মুখপুড়ি। বুঝেছিলাম, মা আমার বাবাকে দোষারুপ করে, ক্ষোভে বলেছিল।
মনে মনে বলেছিলাম, হায় আল্লাহ; দোষ করেছিলাম আমরা, আর অপরাধী মদিনা?
এত-এত অন্ধকারে মদিনার তো এখানে আশার কথা নয়। ঠিক ভুতপেতনীর কাজ। আমাকে ভয় দেখাতে এসেছে। আমি কী ভয় করা ছেলে? – ওসব বিশ্বাসই করি না।
মনে মনে বলতে বলতেই পানি গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ হতে লাগলো। স্রোতের সে যে কি বেগ!
জিকে ক্যানাল ভাটিয়ে পানির স্রোত বইছে, চলে যাচ্ছে মাঠের দিকে। সব ফসল ডুবে যাচ্ছে।
কদিন আগেই তো বাবার সাথে লাঙ্গল ধরে মাঠে কাঁদা করে, ধান লাগালাম। সে ধান ডুবে যাবে! – তা কী হয়?
আমি চিৎকার করে ডাকি সবাইকে, ওগো ক্যানেল ভেঙে গেছে, ঝুঁড়ি-কোঁদাল নিয়ে আইসু- ওগো গ্রামের লোক শুইনছো।
কিন্তু আমার চিৎকার-ডাকাডাকি কেউ শুনছে না।
এভাবেই একবার পুকুর ভরতি মাছ, পুকুর ভাটিয়ে সব ভেসে গিয়েছিল।
আমার মা সেবার আঁচলে চোখ মুছেছিল, এত দামের মাছগুলো সব ভেসে গেল, মিন্সির অভিশাপ লাইগিছে।
মদিনা এবং বাবাকে ইঙ্গিত করে মা প্রায়ই এরকম কথা বলতো।
অথচ আমি মনে মনে নিজেকে অপরাধী ভাবছিলাম।
মদিনার পেটে সন্তান ছিল। সে সন্তান পেটে নিয়েই আমাদের বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল।
এর বেশ কয়েক বছর পর আমি নতুন বউ সাথে করে যশোরে গিয়েছিলাম। শহরে ঘুরতে ঘুরতে দেখেছিলাম, দুইতিন বছরের একটি সন্তানকে কোলে করে নিয়ে, মদিনা চলে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। অবশ্য মদিনা আমাকে সেদিন দেখেনি।
বউ কী মনে করবে সে কথা ভেবে নীরবেই থেকেছি, যাতে মদিনা চলে যায় দ্রুত-চোখের আড়াল হলেই স্বস্তি আমার।
গভীর এ অন্ধকারে সেই শিশুটিও আজ মাঠে মাঠে ঠাণ্ডা বাতাসে খেলা করে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে, রেলস্টেশনের ধারে ঝুপড়িঘর থেকে বেরিয়ে এসে ছেলেটি খেলছে।
মেঘের আড়ালে চাঁদ তার রুপসী-মায়াবী আলো নিয়ে লুকোচুরি খেলছে। একবার মেঘমুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসছে আর একবার হারিয়ে যাচ্ছে। আমি জানালার ধারে জ্যোৎস্নাবুকে গল্পের প্লট খুঁজছি। হায় আমার গল্প! আমি আর কবিতা লিখবো না। সকল মানুষের জীবনে গল্প থাকে। কবিদের জীবনেও গল্প থাকে। আমি সে গল্প লিখবো। বাস্তবে গল্প খুঁজবো।কল্পনার-অভিসারে, মন-মননে গল্প খুঁজবো। অথচ কল্পনা বলে কিছু হয় না-স্বপ্নও বাস্তবের বাইরে নয়। তাই মদিনাকে নিয়েই গল্প লিখবো। ভাসিয়ে দেবো গল্পের ভেলা বর্ষাস্নাত নিকষ অন্ধকারে…

সন্তানের নাম জিহাদ এবং মদিনার নাম ফুলি। তারা রেললাইনের ধারে বেড়ার ঘর করে, আদিবাসি পরিচয়ে বসবাস করে।