বিধাতা কে বেনামী চিঠি

তোমার অনেক কারসাজি সত্ত্বেও সে কালো রাত্রির রূপ নিয়েই মেঘ চুলে তারা সাজায়।
একবেলা কলমি শাক, আর গেঁড়ির ঝোল, মাঝেমধ্যে নিরম্বু আকাশের থেকে জিভ দিয়ে চেটে নেয় শিবের জটা থেকে ঝরে পড়া দুধেল চরণামৃত,

তবুও দেখো আবাগীর শরীরের খাঁজে খাঁজে বিপজ্জনক ঢেউ, ঠোঁটের নোনা গন্ধে হাজার সাপের বিষ, নাকি অমৃত?

সুডৌল শ্বেত শঙ্খ স্তনে,মায়ের দুধের স্বাদ,
কোমরের খাঁজে সিংহ নীরবে অপেক্ষায়,
ভরাট হস্তিনী এতটুকু নাজেহাল হয়না অনটনের শূন্য ঘটে,
নিত্য উনা, রুক্ষ চুলেও সে রূপকথার আরব্যরজনী সাজাতে জানে…

তুমি তো ইচ্ছাধারী পুরুষ, কতো নির্মম গণহত্যার সাক্ষী তুমি,

এবার সেই কালো, বিধবা রাত্রির আকাশে নিঃশব্দে পাঠিয়ে দাও, একটা শুকতারা।
সেই অধরা, মাধুরী কে স্পর্শ করুক, কোন সংযমী পুরুষ নক্ষত্র ডুব দিক তার অমৃতগন্ধী ঊরুসন্ধির উপত্যকায়।

সর্বনাশীকে এমন মরণ দিও বিধাতা…
…………………………………………..

যুগান্তর শেষে

কি করে জীবন কে দেখি,
পদক্ষেপে বন্ধুরতার নাগপাশে
দেখি শুধু ম্রিয়মাণ হৃদয়ের ভিড়,
আমাদের আশেপাশে।

চুপিচুপি কথা বলে মিশরীয় মৃত মুখের সারি,
অদ্ভুত মন্ত্রে জেনে গেছে, প্রেম, প্রাণ বুভুক্ষু অনাহারী,

শুনেছি শবের সারি গান
পাথরের জড়তায়।
তাই বিষন্ন মৃত্যুর গ্রাস,
কচি সবুজ পাতায়।

সীমারেখা, শব্দতরঙ্গ খুঁজে পায় নীলতিমি অতলান্তিক
ফ্লোরা ও ফওনার বিশ্বমাঝে ক্ষুদ্রতা বিমর্ষ জাগতিক।

শেষ প্রহরে গিরি জনি ক্রিয়াজাত
উত্থাপন আবশ্যিক,
পরিবর্তনের ছবিতে দেখা হবে
সভ্যতার নবীন সৈনিক।

বহমান জীবন স্রোত জর্জরিত শ্যাওলার জালে,
মৃত্যুর উপত্যকা আজ মারণসম কর্মসূচি করালে।

এ কোন কালো রাত্রিগ্রাস,
ঢেকেছে পিঙ্গল গালিচা।
হৃদয় জুড়ে রুদালীর অনুভবে,
আমাদের মৃত্যুর মতো বাঁচা।
যুগান্তর শেষে : মধুপর্ণা বসু।
…………………………………………..

অর্কেস্ট্রা

নিঃঝুম দুপুরে বাসনওয়ালা ডেকে যাচ্ছে,
আমার বারান্দায় চড়ুইয়ের ঘরকন্না,
এই গরমে নিরন্তর ডুব দিয়েছে, আমচুর আর প্রেমের গল্প,
হঠাৎ আকাশ থেকে ঝুপ করে খসে পড়ে কালবৈশাখী কান্না,
সেই কান্নাটা ফুলে ফুলে সারা দেওয়াল সিলিং জুড়ে, মৃতদের ছায়া,
ভুল,
ভুল,
ভুল সব মরুমায়া…

গরমের লু বইছে বারান্দায়, বিছানা, কোলবালিশ, কার্পেট, জানলার পর্দা কেঁপে কেঁপে…
রূপকথার শহর আজ ঘুমিয়েছে মরফিনে
মিছিল হরতাল, ধর্মঘটের গন্ধ নেই, বাসনওয়ালাও ঘুমিয়ে পড়েছে,
হেঁকে যাচ্ছে মহামারী অর্কেস্ট্রা।
…………………………………………..

উপক্রমণিকা

আমি ফিরে আসবো,অসুখের শেষে,
ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ দীর্ঘ অবকাশে মিলিয়ে যাক,
এখনো তারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে অদৃশ্য শত্রুর বিপক্ষে যুযুধান-
আমরা নিরুপায়, হাত তুলে দেবার উপায় নেই,
কাল আয়ুরেখা বরাবর ইস্পাতের শকট গেছে
ফালাফালা করেছে, কণ্ঠনালী, হৃদয়, ফুসফুস।
শেষ বনৌষধি খুঁজে চলেছে অশ্বিনী তার দৈবচয়ন সন্ধানে।
যদিও শুশ্রূষা ভীষণ অপ্রতুল, বিশল্যকরণী অসংরক্ষণে নিরুদ্দিষ্ট,
জমিতে ফুটিফাটা খরায় কালবৈশাখী ক্ষীণ,
পর্বতের এলোমেলো পাকদণ্ডী বেয়ে নেমে আসে বুভুক্ষু শ্বাপদের পাল, ছিঁড়ে নেবে রুগ্ন মেষ শাবকের ফুসফুস…
তবুও নিশ্চিত জেনো,আমি ফিরবোই ক্রান্তি শেষে, জড়িবুটি মন্ত্রের অমোঘ খবর নিয়ে।
এই গাছেদের, পাহাড়ের, ঝর্ণা, মেঘের অদৃশ্য পথ ধরে আমি নতুন সবুজবীথি সাজিয়ে দেবো, আমাদের ভালোবাসার বিস্তীর্ণ গালিচায়।
…………………………………………..

আত্মপ্রতারক

সব কথা মনে রাখতে হয়?সাবধানের মার নেই
কিছু কথা, দেওয়ালের ছিদ্রান্বেষী কানে ঢুকবেই।
সিঁড়ি ওঠার সময় যার কাঁধে হাত দিলে অভয়ে
তাকে কি ঠেলে দিলে গভীর দুর্গন্ধ নালায়?
আমাদের মধ্যে সহবাস করে দ্বিমুখী প্রবণতা
আমরা প্রকৃত আদম, কখনো স্যাটার্ন, বিধাতা।
প্রবৃত্তির জালকে বিষাক্ত মাকড়সা দাঁত বসায়,
প্রতিবার ভুল করে মন একটু উষ্ণতার ছোঁয়ায়।
মুছে যায় গতরাতের নীল রক্ত, পাঁজরের চামড়ায়।
বুকের কর্কটের আঁচড়, শিউরে ওঠে ঠোঁটে জমা ভয়,
খুন হয়ে যাওয়া শরীর, অসময়ে অন্ধত্ব গ্রাস,
ভেতরের সব প্রশ্নের নির্ভেজাল উত্তর ফাঁস।
অসম্মান, প্রতারণা, কালরাত বেহিসেবে জমিয়ে রাখি,
আর কিছু নয়, একটা নতুন ভোরের আশায় থাকি।
…………………………………………..

শ্যেনদৃষ্টি

আজ আকাশের ডাকঘরে মেঘের খোলা চিঠি মেলে ধরেছি,
গনগনে রোদে মেঘেরাও বেশ শীর্ণ ব্যাকুল তৃষ্ণার্ত,
সেই যে কালো মেয়েটি শ্রমণ আনন্দ কে জলদান করেছিল,
নিরুক্ত আকাশ তার কাছেই জল যাচঞা করেছে কতো যুগ আগে।

শহর, গ্রাম, মফস্বলি ক্রমশ মহামারীর কাছে হাত তুলে পরাজয় স্বীকার করে অধোমুখ, লজ্জিত।
ঘুঘু চড়া নিঃসঙ্গতায় একমাত্র চিলের দৃষ্টি শিকারের গান গাইতে গাইতে নেমে আসছে মাটির কাছাকাছি,
আমাদের পাশে এখন মৃত্যুর নিস্তব্ধ উপনিবেশ…
সেই কালো মেয়েটি আর ফেরেনি কথার উপদ্বীপে, কবিতায়, মহাকাব্যে, আমার কাছে।

ঈশান কোণে ঝড়ের মেঘ রয়েছে,
আমরা ভয় পাইনি, আমরা আপাত স্থিতিশীল
অপেক্ষা করুক মৃত্যুর রাজা, শিকারী চিল,
অবশেষে দেখবো, আশ্চর্য রহস্যের সুরে সেই সুদর্শন চিল গাইছে ঘুমপাড়ানি গান।
…………………………………………..

সপ্রেম স্বীকারোক্তি

আমি আমার হৃদয়কে মোমের ছোঁয়ায় নিয়ত জ্বালিয়ে নিয়েছি।
তোমার জীবনে সন্ধ্যাদীপ অম্রিয়মাণ হোক, আমার লজ্জার বাঁধন, সংসারের যত মহার্ঘ, সব পুরোন দেরাজে চাবি দেবো, আমি আজ নিজেকেই হারালাম।
আমার ক্ষয়ে যাওয়া আত্মগ্লানি, লোকলাজ, অপমান, সাতনরী কণ্ঠহার হয়ে তোমার উত্তাপ হীন দুটি পায়ে উষ্ণ পশমের আসন পেতে দেবে,
আমি ঈশ্বরের কাছে, মনে মনে চেয়ে নেব তোমার শান্তির চাবিকাঠি; তোমার ছোঁয়ায়, তোমার চোখের তারায়, তোমার শরীরের পুরুষালী গন্ধে মিশে গিয়ে খুলে যাবে গুপ্ত সমাজব্যবস্থার সম্পর্কের বন্ধদ্বার।
আমি আমার আঁধার রাতের রাজার
সব দুঃখ, কষ্ট, ভাব, অভাব, বকলম নিলাম।
আমার সব আত্মরতি, মুক্ত ভালোবাসা আজ অন্ধকারের শেষ করে ভোরের সাথীর সাথে, রাত, শেষ করে আসুক এক নতুন সূর্য আকাশ গঙ্গায়।
…………………………………………..

একান্ত আপন

১)
ভালো লাগা একাকীত্বের,
লুকোনো ছেঁড়া মেঘ,
আজ আকাশের থেকে
ঘুম চোখে বুকে নেমেছে।

২)
অচেনা নয় এ আকাশ
ঝিলের জলে সবুজ মায়া,
মেঠো আলপথে ন্যাংটো ছেলে
নীলে উড়িয়েছে ইচ্ছে ঘুড়ি।

৩)
শহরে এসেছে ফেরিওয়ালা
হাঁকছে,”সুখ নেবে গো সুখ?”
ফাঁকা, রোদ্দুরে রাজপথ
আজ ভালোবাসার অসুখ।
…………………………………………..

প্রকৃতির প্রতিশোধ

কষ্ট করে পোষা সুখগুলোর ছিল পৌষমাস,
রাতে একা বসে শুনছি শহরের নাভিশ্বাস।
অজানা রোগে জর্জরিত দর্পিত সভ্যতা
প্রতিশোধ নিচ্ছে এখন জর্জরিত প্রকৃতি সত্ত্বা
আমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করে হয়েছি স্বার্থপর
প্রকৃতি আমাদেরই দেবে বলে এখন তৎপর।
এই পরিশোধ মেনে নিয়ে সভ্যতা আজ গৃহবন্দী
পিছিয়ে যাবো কিছু পথ, মৃত্যুগ্রাসে দুরভিসন্ধি।
বহুবার সুযোগ ছিল নতুন করে সমাজ শোধন
অকাতরে আঘাত করেছি তৃতীয় গ্রহের উত্তরণ।
আজ সে দূরত্ব দিয়ে করেছে মানুষের বিধান
সহিষ্ণু হলে তবেই পাবো ধ্বংস থেকে পরিত্রাণ।
…………………………………………..

বোধোদয় হোক

কবিতা মাঝে মাঝে ছুটি চায়
দেশের হৃদয়েতে ক্ষত শোক
পেরিয়ে এসেছো যে সুসময়
এখন শরীরে তার গুটি রোগ।
সত্যি কবিরা আজ সংশয়ে
পৃথিবী জুড়ে মারণব্যাধি রাজ,
মাথায় জুড়ে মৃত মেঘ ঘনায়
জীবন হলো মৃত্যুর মহতাজ।
স্তব্ধ হয়েছে চেনা রাজ্যপাট,
এ’কটা দিন শীতঘুমেতে যাও।
রাহু গ্রাস শেষে খুলো কপাট,
দেশকে বাঁচাতে গৃহবন্দী হও।
…………………………………………..

শূন্য হাত

পথগুলো আজ অস্পষ্ট, অস্তিত্ব সঙ্কটে,
তবুও একদিন এই পথেই চলতো স্বপ্নরথ
পায়ে পায়ে জীবন এগিয়ে গেছে অনিশ্চিত ঠিকানায়…
রোদচশমা মৃত মাছের চোখ আড়ালে রাখে,
মন একবার ভর্তুকির শূন্য ঘরে চুপিসাড়ে এসে বলে,
আর একবার যাওয়া যায়? আমাদের সেই ভালোবাসার চিলেকোঠা ঘরে?
শূন্যতাও প্রতিধ্বনীর ছদ্মবেশে ফিরিয়ে দেয় ভিক্ষাপাত্র,
অন্ধত্ব হলেও শ্রবণ শুনে নেয় অমোঘ অশনিসঙ্কেত।
তিলে তিলে অনুভূতিরা আত্মহত্যার পথে চলছে,
আমরা শুধু বিসর্জিত চালচিত্র কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি জন্মান্তরে।