মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত Manwar Shamsi Shakhawat। প্রাবন্ধিক, গবেষক, কবি। ১৯৬৭ সালের ২৫ আগস্ট ফরিদপুর জেলা সদরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আবুল বাশার মুহাম্মদ শামসুল হক এবং মা শামসুন্নাহার হক। ১৯৮৪ সালে তিনি খুলনার রোটারি স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টে ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে যথাক্রমে বিএ এবং এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ এডুকেশন থেকে ২০১৪ সালে কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন।

মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে টিচিং ও রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট হিশেবে কাজ করেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ২০০৩ সাল থেকে প্রাইভেট সেকটরে শিক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ে কারিকুলাম স্পেশালিস্ট হিশাবে কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষা বিষয়ক তিনটি রিসোর্স তিনি ইংরেজী ভাষায় লিখেছেন যা ২০১৩ ও ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত ১৯৮৪ সাল থেকে সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং শিল্পকলা বিষয়ে প্রবন্ধ লিখছেন। যা আশি দশকের বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর তিনি ২০১৩ সাল থেকে সোশাল মিডিয়াকে তার লেখালেখির বাহন করে নেন।

‘রিথিংকিং ইসলাম ইন পোস্টমডার্ন টাইমস’ (২০১৮) তার প্রথম প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি পাশ্চাত্যের উত্তরাধুনিক সংকট ও বিকারকে প্রত্যাখ্যান করে ইসলামের সুষমাময় দিব্য ও বাস্তব ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাদর্শকে পুনর্বিবেচনার আহবান জানিয়েছেন। এই বইতে তিনি উপস্থাপন করেছেন শাশ্বত ও চিরন্তন ইসলামের এক সমকালীন ভাষা ও ভাষ্য। ইসলামের এমন একটি রূপ—যা একাধারে ধারণ করে দিব্যজ্ঞান ও বিজ্ঞান; ঐশী অনুপ্রেরণা ও সুযুক্তির সুষমা; আধ্যাত্মিক আবেগ, বাস্তব চিন্তা ও কর্মের সুষ্মিত মেলবন্ধন। এই ইসলাম আল্লাহর একত্ববাদে নিঃসংশয় ও নিশ্চিত; কিন্তু মানবের অনিবার্য বহুমাত্রিক, বহুবাচনিক ও বহুমাননিক বৈচিত্র্যকে পর্যাপ্ত পরিসর দিতে স্থিতিস্থাপক।

তার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘রূপালি কলসভরা রুহানি কাব্যজল’ (২০১৯) একটি কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের শানে নজুল হিশেবে তিনি লিখেছেন যে বাংলা কবিতা চর্যাপদ থেকে বৈষ্ণব পদাবলী হয়ে রবীন্দ্রনাথ অবধি আধ্যাত্মিক ধারাতেই অবগাহন করেছে। কিন্তু বিগত শতকের তিরিশের দশক থেকে বাংলা আধুনিক কবিতার আদর্শ ও লক্ষ্য আধ্যাত্মিকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এরপরে বাংলা কবিতার এই আধুনিক ধারায় প্রথম কাউন্টার-কাব্য লিখে ব্যত্যয় ঘটাতে শুরু করেন কবি ফররুখ আহমদ এবং কবি আল মাহমুদ। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং কবি ফরহাদ মজহার। বাংলা কবিতার এই কাউন্টার-কাব্য ধারাতে শামিল হতে চেয়েছেন মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত তার এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। একচোখা আধুনিক কাব্যে যেন জুড়ে দেয়া যায় আধ্যাত্মিক দ্বিতীয় চোখের জল! এ যেন ইহসান ও ইরফানে এই মনপ্রাণ সঁপে সুফি ইশকের বিনি সুতোয় এই বিশ্বভূবনকে বাঁধার এক কাব্য আকাঙ্খা।

তার তৃতীয় গ্রন্থে তিনি আবার ফিরে গেছেন গদ্যে। এই গ্রন্থটির নাম হল ‘বাঙালি মুসলমানের বয়ান ও প্রতিবয়ান’ (২০২১)। এই বইয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: সাতচল্লিশ উত্তর ধর্ম ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ইনক্লুসিভ ছিল না। আবার আমাদের একাত্তর পরবর্তী অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা কিংবা বিশেষ ভূগোল ভিত্তিক জাতীয়তাবাদও যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। অন্যদিকে ইসলামপন্থী জীবনবীক্ষা (ইসলাম নয়) হল মতাদর্শের সীমিত ও অস্থিতিস্থাপক ছকে বাঁধা। তাই এসবের গ্রহণযোগ্যতাও এখন অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।

ফলে আমাদের জীবন ও বিশ্ববীক্ষার এমন বয়ান প্রয়োজন যা যেমন সাম্প্রদায়িক এবং জাতিবাদী নয় তেমনি মতাদর্শিক কিংবা সামগ্রিক ও অধিমানবিক স্বৈরতান্ত্রিকও Totalitarian Theofascist নয়। অতএব আমাদের এমন বয়ান প্রয়োজন যা একাধারে তৌহিদী ও আধ্যাত্মিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুগ্রাহী বা বহুধারণে সক্ষম। যা কোনোরকম পরিচয়ের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয় না। কিন্তু আবার মৌলিক পরিচয়ের চিহ্নগুলিকেও অগ্রাহ্য করে না। যা একাধারে স্থানিক ও বৈশ্বিক এবং সর্বজনীন হয়ে উঠতে সক্ষম।

মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত একাধারে মননশীল এবং সৃজনশীল একজন লেখক, গবেষক ও কবি। যিনি বিগত শতকের আশি দশকের শেষার্ধ থেকে আজ অব্দি তার চিন্তা, কল্পনা ও বাসনাকে বাংলা ভাষায় গদ্য ও পদ্যের আঙ্গিকে রূপায়ণের লক্ষে তার মেধাশ্রমের চিহ্ন ও ছায়াপাত রেখে যাচ্ছেন।