‘মহাশূন্যে প্রথম সাঁতার কেটেছে কে?’

কায়সার স্যারের প্রশ্নটা শুনে চমকে যায় ফাহিম। মহাশূন্যে পানি কোথায়, যে সাঁতার কাটবে মানুষ! মনে মনে ভাবছে ফাহিম, স্যার কি জোকস হিসেবে প্রশ্নটা করেছেন? আবার ভাবে সত্যিও তো হতে পারে! তাহলে এত উপরে সাঁতার কাটার মতো পানি মানে নদী-পুকুর এসব আছে?

ভাবছে মনে মনে। ঠিক তখনই ডান সারির মাঝের এক বেঞ্চ থেকে ওমর বলে, স্যার নীল আর্মস্ট্রং।

স্যার হাসতে হাসতে বলেন, হলো না রে বাবা, হলো না। তিনি প্রথম চাঁদে গিয়েছিলেন।

ফাহিমরা এবার সেভেনে পড়ে। এখন চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায় ওমরের দিকে। ভুল হোক তবু উত্তর দিয়েছে। তাহলে স্যারের প্রশ্ন জোকস নয়; সত্যি সত্যি প্রশ্ন। কিন্তু কেউ তো আর উত্তর দিচ্ছে না! স্যার এবার নিজেই বলেন, কেউ তো পারছো না? আচ্ছা আমিই বলছি।

কায়সার স্যারকে সবার পছন্দ এজন্যই। ক্লাসে ঢুকেই মজার একটি প্রশ্ন করবেন। তারপর সে প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই তিনি পড়াবেন। এভাবেই প্রশ্ন আর গল্পের মাধ্যমেই স্যার পড়িয়ে থাকেন। সবাইও বেশ আনন্দ নিয়ে স্যারের ক্লাসে মনযোগী হয়। কেউ স্যারের ক্লাস মিস দেয় না।

মহাশূন্যে সাঁতারকাটার প্রশ্নটা করেছেন মূলত আজকের পড়ার বিষয়কে নিয়ে। আজ মধ্যাকর্ষণ শক্তি নিয়ে পড়াবেন। এই মধ্যাকর্ষণ শক্তি বিজ্ঞানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শৈশব থেকেই বিষয়টাকে সহজ করতে এমন কৌতূহলী প্রশ্নটা করেছেন স্যার।

স্যার তাই বলেন, শুনো অ্যালেক্সি লিওনভ মহাশূন্যে প্রথম সাঁতার কেটেছেন। তিনি রাশিয়ার মানুষ ছিলেন।

ফাহিম আর নিজের কৌতূহলকে ধরে রাখতে পারল না। দাঁড়িয়ে বলে, স্যার আকাশে পানি কোথায়? তিনি কি মেঘের পানিতে সাঁতার কেটেছেন?

অনেকেই মুচকি হাসছে। স্যার সবার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, তোমরা হাসছো কেন? ফাহিম তো ঠিক প্রশ্নই করেছে? পানি না থাকলে সাঁতরাবে কীভাবে? আচ্ছা এমন প্রশ্ন আর কার কার আছে?

এবার অনেকেই হাত উঠায়। তিনি হাত নামাতে ইশারা দিয়ে বলেন, ওই যে আকাশ, ওটাই মহাশূন্য। ওখানে পানিও নেই, বাতাসও নেই। এমন কি মেঘও নেই। তারপরও অ্যালেক্সি লিওনভ সাঁতার কেটেছেন।

অনেকে একসাথে বলে ওঠে- কীভাবে স্যার?

-সবাই শান্ত হও, বলছি। এটা সম্ভব মধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে। এই শক্তিটা কি জানো? এ শক্তিটা হলো গ্রহের আকর্ষণ শক্তি। সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র সবারই একটা আকর্ষণ শক্তি থাকে। পৃথিবীও গ্রহ, তারও আছে এমন আকর্ষণ শক্তি। বিজ্ঞান বইতে পেয়েছো?

-জ্বি স্যার। আজ সেটাই পড়ানোর কথা।

অনেকেই বলে। স্যারও বলেন, হাঁ সেটাই পড়াব।

বিজ্ঞানী নিউটন মধ্যাকর্ষণ শক্তির তত্ত্বটা আবিষ্কার করেছেন। আমরা দেখি কোনো বস্তু উপরে না গিয়ে নিচে পড়ে। পৃথিবী সবকিছুকে নিজের দিকে টেনে রাখে বলেই উপরের দিকে যায় না। তাই আমরা মাটিতে হেঁটে বেড়াতে পারি। শূন্যে ভেসে থাকি না। এটাই পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি। অন্যান্য গ্রহেরও এমন আকর্ষণ শক্তি আছে।

অ্যালেক্সি লিওনভ যখন মহাশূন্যে গেলেন, এমন এক জায়গায় পৌঁছলেন যেখানে পৃথিবী আর অন্যগ্রহের আকর্ষণ শক্তি সমান হয়ে গেছে। ফলে ওই যায়গাটায় কোনো কিছু কোনো দিকে যায় না। এমন শূন্য যায়গাতেই যে কোনো বস্তু এমনি এমনি ভেসে থাকে।

আবার এটাকে অন্যভাবেই বলা যায়। আমরা ভূ-পৃষ্ঠ থেকে উপরে বা নিচের দিকে যত যেতে থাকব, পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তিও ততটাই কমতে থাকবে। এতে মধ্যাকর্ষণের প্রভাবও কমতে থাকে। ফলে আমাদের ওজনও কমতে থাকবে। সেজন্যই মহাকাশে মধ্যাকর্ষণের কোনো প্রভাব থাকে না, ওজন হয় শূন্য হয়ে যায়। তাই মানুষ মহাকাশে গেলে হাঁটতে পারে না। ভেসে থাকে। এটাই সাঁতারকাটা।

অ্যালেক্সি লিওনভ মহাশূন্যে গিয়েছিলেন ভক্সহড ২ নামের রকেটে চড়ে। ১৯৬৫ সালের ১৮ মার্চ তিনি রকেট থেকে নেমে ১২ মিনিট মহাশূন্যে ভেসেছিলেন। এ সময়ের মজার আর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “সেই মহাশূন্যে আমি পা রেখেছিলাম কিন্তু আমি পড়ে যাইনি। নক্ষত্রগুলোর কারণে আমি বেশ অভিভূত হয়েছিলাম। সেগুলো আমার চারপাশে সব জায়গাতে ছিল; ডান-বামে উপর-নিচে সবখানে। সেই নীরবতায় আমি এখনও আমার নিঃশ্বাস ও হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনতে পাই। ”

ছাত্ররা বেশ পুলকিত স্যারের এ গল্প শুনে। ওমর বলে, স্যার পৃথিবী যদি তখন অন্যদিকে সরে যেত, তাহলে তিনি কোন দিকে পড়ে যেতেন?

স্যার বলেন, বাহ দারুণ প্রশ্ন তো করলে? না, পৃথিবী বা কোনো গ্রহ হুট করেই সরে যেতে পারে না। সৌরজগতে প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের আকর্ষণ থাকায় সবাই নির্দিষ্ট গতিতে এবং শৃঙ্খলায় চলে। তোমরা তো জানো পৃথিবী সূর্যের চারদিকে, চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে কত সময়ে ঘুরে। একদম নির্দিষ্ট এসসব সময়।

সবাই চুপচাপ। স্যারের কথা শুনছে। তিনি আবার বলেন, মহাশূন্যে এই যে পরস্পর আকর্ণজনিত শূন্যাবস্থা এতেই মনে হয় আকাশ স্থির। এই মধ্যাকর্ষণ প্রকৃতির এক রহস্য, এক বিস্ময়। এই সৌরজগত মহান আল্লাহরও এক বিস্ময়কর সৃষ্টিজগত। তিনি কুরআনের সূরা আল-হাজ্জের পঁয়ষট্টি নম্বর আয়াতে আমাদের জানিয়েছেন, “তিনি আকাশ স্থির রাখেন, যাতে তাঁর আদেশ ছাড়া পৃথিবীর উপর পড়ে না যায়, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি করুণাশীল, পরম দয়ালু।” এমন আরো অনেকবার বলেছেন কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে।

-স্যার কুরআনেও আছে এসব!

-হাঁ। কুরআনও একটা বিজ্ঞান। আবার মধ্যাকর্ষণই বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অতি প্রয়োজনীয় শিক্ষা। তোমরা বিজ্ঞান বই থেকে এবার অল্প করে মধ্যাকর্ষণ সম্পর্কে শিখবে। তারপর যতই উপরের শ্রেণিতে উঠবে ততই এর বিস্তারিত তোমরা জানবে ও শিখবে।