কালেমার ধ্বনি কানে বাজে আযানের সুর ভেসে আসে ঠিক ফজরের আগে । হিমেল বাতাসের পরশে ঘুম ভেঙে যায় সাদিকের। অদ্ভুত রকম ভালো লাগে এই অলৌকিক মুহুর্তের সতেজ হৃদয় বাগিচা। কেমন যেন সেই সোনালি যুগের অবিস্মরণীয় একটি প্রহর। মরুভূমির কাবা আর দূর মদিনার প্রেমে মাতোয়ারা মন আকুলে বিকুলে করে- ছুটে যায় মসজিদে নববীতে! সাদিকের স্বপ্নজুড়ে কাবার কাফেলা। সাহাবাদের সোহবতে ইসলামি খেলাফতের এক প্রাণবন্ত সময়ের সাক্ষী হতে চায় স্বপ্নচারী সাদিক। মসজিদের মিনার থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসতেই পুলকে ভরে ওঠে মনপ্রাণ। কি সুন্দর সমাজ! নেই মারামারি হানাহানি আর পাপাচারের সীমাহীন সয়লাব। কত না শান্তিতে বসবাস করে তাঁরা।

কৌটায় গম নেই, হাতে কাঁচা দিরহাম নেই আলমিরা ভর্তি কাপড় নেই নেই ঘরের সাজসজ্জা! কিন্তু তাতে কি হয়েছে; তাঁদের দিল সাফ ঈমানি দৌলত আছে। জানের চেয়ে সম্পদের চেয়ে দ্বীনকে আপন ভাবে। মহানবী স. এর আদর্শকে আঁকড়ে এক জীবন পার করে দেয় অনাহারে অত্যাচারে। তাতে কি এমন ক্ষতি? জীবনে যে মূল্যবান ধন চিনেছে তা কজনার ভাগ্যে জোটে! সাদিক ভাবতে ভাবতে আবু বকর উসমান উমর আলীকেই যেন আবিষ্কার করতে চান তাঁর সীরাতে সুরতে চিন্তায় চেতনায়, এমনকি তার সাড়ে তিন হাত মাটির কায়ায়। আর এই কল্পনার রাজ্যে জিন্দা হয় নবীজী স. এর মহাদর্শ ও মানবতাবাদী ইসলামের কল্যাণকর ব্যবস্থা। কিন্তু আফসোস ক্রমশ তার ভেতরের সত্তাকে কুঁকড়ে খাচ্ছে। কি হবে আগামীর দিনগুলি? সময় যে বদলে গেছে শুরু হয়েছে বিভাজন।

সুফিনগরের শান্তিপুর বিরাট গৃহস্থ বাড়ি বলে দশপাড়ায় খুব সুনাম আছে। একতার বন্ধনে সবাই বন্ধু। মিলমিশ আছে বলেই তারা ব্রিটিশ লাঠিয়াল বাহিনী ভয় করে না। বিপদে আপদে সবার পাশে সবাই দাঁড়ায়। হিংসা অহংকার লোভ লালসা এদের মাটির মনে আছর করে কখনো। কুখ্যাত ডাকাতও এ বাড়ির সীমানা মাড়াতো না। রেযার দিনে মাহাল্লুম জায়গীর রেখে ইবাদতে মন দিত, দোয়া- দুরুদ করাতো। মাছ ধরা মাটির হাঁড়ি পাতিল তৈরি আবাদি জমিতে ধান গম মরিচ চাষ করে এরা রাজার হালে দিন কাটাতো। সন্ধ্যের পর পুঁথিপাঠের আসর বসতো। কি সুন্দর মানুষ কি শান্তির গাও।

ফজরের আগেই রহমত আলি ডিঙা নায়ে পদ্মার পাড়ে পৌঁছেছে। গোন মত জাল না ফেললে তাজা ইলিশে নৌকার পাটাতন ভরবে না। বাড়ি ফিরে জিহ্বায় স্বাদ নিতেও পারবে না। তড়িঘড়ি করে বৈঠাখান হাতে নিয়ে জোয়ারে ভাসতে ভাসতে কিনারে নাও ভিড়ালো। গাঙের পাড়ে জাইল্যারা নাই জলে টইটম্বুর। দল বেঁধে তারা এভাবেই রুজিরোজগার করে দিনমান ভালো থাকে। কেউ নদীতে মাছ ধরে, কেউ জমিনে হালচাষ করে কেউবা আবার মাঝিগিরি করে। সোনার সংসারে তারা বড্ড সুখী। বারোমাস তরিতরকারি আছেই। এমন ঘর তো কমই আছে গোয়ালে গরু নেই, পাতিলে ইলিশ নেই, ঘাটপাড়ে নিজস্ব নৌকা নেই! সে দিন এখন গল্পের মত স্বপ্নের মত। তবু সাদিক জীবনের মানে খুঁজে নিবিড় আলোয়।

সাদিকের পা জিরোয় না। সে আযানের ধোয়া শোনে, রুপালি ইলিশের তালাশে হন্নে হয়ে ভাবনার তরী বেয়ে উঠোনের আমতলায় বসে। তার চোখে ভাসে হাজার বছর আগের অনিন্দ্য এক ভালেবাসার লোকালয়। কেবল শূন্যতা বুকে নিয়ে গোধূলির রাঙা চোখে চোখ রাখে। করিমে কথা মনে পড়ে, কান্নায় ভেঙে পড়ে।
করিম নেশায় মাতাল বিভ্রান্ত কেন? ও ভেবে পায় না জীবনের রঙ বদলায় নাকি হৃদয়ের। মাটি কামর কেন বাঁচে মানুষ?
তবে কি মাটি তার না…