বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস

আমার নিরব বাড়ি
শান্ত জানালায় কাকেরাও বসে না
এক কাপ চা’এ চলছে জীবন
কাপের সংখ্যা কখনও বাড়ছে না
দীর্ঘশ্বাসে, দীর্ঘশ্বাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড
বেড়েই চলছে
অক্সিজেন তো কম’ই আসে
মাঝেমধ্যে গেয়ে উঠি ‘সময় যেন কাটেনা বড়…
তারপর হঠাৎ মনে পড়ে আমার সময় তো এমন’ই
শরৎ, রবীন্দ্রনাথ আর হুমায়ুন পড়তে পড়তে
চোখের শক্তি বুঝি গেলো কমে
শেষমেশ তাহলে চশমা’ই সঙ্গী হবে।

একদিন পাশের জানালায় চোখ রাখতেই দেখি
কেউ একজন নিকোটিনের ধোঁয়া ছাড়ছে
আগেতো এ বাড়িতে কাউকে দেখিনি
তারপর থেকে প্রায়ই দেখি তাকে
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে টবে পানি দিচ্ছে
ও বাড়িটাও এতদিন আমার মতো
নিঃসঙ্গ ছিলো
নিরব বাড়িটা আজ টব, গাছ আর ফুলে সরব হয়ে জেগেছে
মনেই হয় না এ বাড়িটা কয়দিন আগেও
ভুতের বাড়ি ভেবে ভয় পেতুম।

কফির মগে মুখ ডুবিয়ে উপন্যাসের পাতায়
বুঁদ হওয়াটাই আমার চরিত্র
হঠাৎ কানে এলো,
“এই যে শুনছেন! কেমন আছেন?”
তাকাতেই পাশের জানালায় হাস্যোজ্জল মুখটি বলে উঠলো, “নতুন এসেছি আপনাদের শহরে, কাউকেই তেমন চেনা হয়নি।”

জানালা থেকে জানালার দূরত্ব খুব-ই কম
কেন যেন উত্তর দিতে খুব মন চাইলো
‘জ্বী ভালো! আপনি?’
-আমিও। খুব বই পড়েন বুঝি?
চশমাটা খুলতে খুলতে উত্তর দিলাম
‘এখানেইতো আছে জীবন লুকিয়ে’
‘বাহ্ দারুণ কথা বলেন দেখছি।’
হেসেই ফেললাম ‘অতটা নয়! এই একটু আধটু’

‘আমার ধৈর্য্য খুব কম—
ওসব উপন্যাস গল্প আমাকে দিয়ে হয় না।’
‘গাছ ভালোবাসেন?’
-‘হ্যাঁ বাসি।’
-‘তবে উপন্যাসের থেকে কম, তাই তো?’
আমার এবারের হাসিটা চোখে মুখে ছুঁয়ে গিয়ে
তার কথার সত্যতা প্রমাণ করলো।

‘আপনাকে কিছু গাছ উপহার দিবো
যত্ন নিবেন, বড় হবে, ফুল ফুটবে দেখবেন—
উপন্যাসের বাহিরেও জীবন লুকিয়ে আছে।’

এই মানুষটা এসেই এত সহজে আমাকে বুঝে ফেললো
অবাক করার বিষয় হলেও অবাক হচ্ছি না
কেননা পুরো মানুষটাই অবাক করার মতো।

তারপর আমার বেলকনিতেও বেশ কিছু গাছ জমেছে
রোজ সকালে পানি দেওয়া আমার গুরুতর দায়িত্ব এখন
বেলকনিটা’ই এখন বেশি ভালো লাগে
গাছের সাথেও গল্প করা যায়
আগে জানতাম না
উপহারে একদিন একটা সাদা খাঁচায়
দু’টি ছোট্ট সবুজ পাখি এলো
বেলকনিতে এখন গাছের সাথে পাখির বসবাস
পাখির খাবার দেওয়া, যত্ন নেওয়া-
আমার অবসর ক্রমশ কমছে
আর ও-বাড়ির মানুষটার সাথে ক্রমশ আলাপ বাড়ছে
এই একাকীত্বের জীবনে এলো আরেক একাকিত্বের সঙ্গ
চলছে সময় এবাড়ির দীর্ঘশ্বাসে আর ওবাড়ির নিকোটিনে।

একদিন আলাপে প্রশ্ন ছুড়লাম
‘খুব সিগারেট খাওয়া হয়?’
উত্তর এলো ‘আপনার গল্প উপন্যাসের মতো’
আমি প্রতুত্তর খুঁজি
কিন্তু পাই না
সাদা কালো জীবনটায় একগুচ্ছ আবিরের ছড়াছড়ি
কি রঙে রাঙাবো আমি এই অস্তিত্ব!

‘নিকোটিনে আমার কষ্ট হয় নিঃশ্বাস নিতে।’
-‘আপনার দীর্ঘশ্বাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডে আমারও সমস্যা আছে।’
‘আচ্ছা তাহলে অক্সিজেন আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমান’ই থাকবে।’
‘কথা দিলাম আপনিও বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নিতে পারবেন।’
…………………………………………..

এ তুমি নও কেন সে তুমি

ভরা পূর্ণিমায় জোৎস্নার ছড়াছড়ি সারা বাড়ি
ব্যস্ত শহরের কোনো এক বেলকনিতে দাঁড়িয়ে তুমি আমি
ধোঁয়া উড়া দুই কাপ চায়ে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে শুরু খুনশুটি
হাসি-ঠাট্টা, গল্পে আড্ডায় জমছে ভালোবাসা বাসি
এমনও হাজার স্বপ্নে এগুচ্ছে দিন আমাদের
দু’চোখ ভরা প্রতীক্ষা একসঙ্গে বসবাসের।

কত কথা দেওয়া ছিলো
কত স্বপ্ন আঁকা ছিলো
অভ্যাসের তুমিতে কতটা ডুবেছিলাম আমি
স্বপ্নের গন্ডি পেরিয়ে অভ্যাসের নিয়ম ভেঙ্গে
অনাকাঙ্খিত তোমার চলে যাওয়া
স্বপ্নগুলোকে ওখানটাতেই থামিয়ে দেওয়া।

একাকিত্বের কবলে অভ্যস্ত আমি
ভরা পূর্ণিমার জোৎস্নায় শূন্যতার হাতছানি
ধোঁয়া উড়া চায়ের কাপে এখন নিজেকে খুঁজি
দূরের অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছো তুমি
তবুও সময়ের সাথে বহমান জীবন-
কেটে গেছে কয়েকশত ভরা পূর্ণিমা।

অতঃপর এমনও এক ভরা পূর্ণিমা
জোৎস্নায় মুখরিত এ বাড়ি সে বাড়ি
বাদ পড়েনি ব্যস্ত শহরের আমার বেলকনি
ধোঁয়া উড়া দুই কাপ চায়ের সাথে পাশে থাকা একজন তুমি
ডুবিয়ে দিয়েছি দু’ঠোঁট আর হয়েছে শুরু কথোপকথন
নতুন গল্পের মাঝে খুঁজি অপূর্ণ সে গল্পের কাহিনী
কাপের ধোঁয়ার সাথে উড়ছে ভেতরে থাকা চাপা দীর্ঘশ্বাসগুলি!

মস্তিষ্ক জুড়ে প্রশ্ন আমার ‘এ তুমি নও কেন সে তুমি?’
অথচ কথা ছিলো ‘আলাদা নয়
একসঙ্গেই থাকবো ভালো— তুমি আমি।’
…………………………………………..

ভালোবাসা

ভালোবাসি কি সবসময় বলতেই হয় ?
তোমার প্রতিটি সকাল শুভ হওয়ার কামনায়
শুরু হওয়া আমার প্রতিটি সকাল,
এটাই যে আমার অভ্যেস
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি সবসময় বলেই বোঝাতে হয়
তোমার মন খারাপ থাকলে আমি যে
পাগলের মতো বকেই যাই
তোমাকে একটু হাসানোর জন্য
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি সবসময় মুখে বলে প্রকাশ হয়
তোমার ঠান্ডা লেগে যাবার ভয়ে
বৃষ্টি দেখলেই ভিজতে বারণ দেই
কঠিনভাবে উচ্চারণ করি ‘না’ শব্দটা
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি আসলে বলেই প্রকাশিত হয়
খাওয়ার আগে কিংবা গলা পর্যন্ত খেয়ে যখন
তোমার না খেয়ে থাকার কথা শুনি
তখন যে ভেতরের তাড়না থেকে-
তোমাকে খেয়ে নেওয়ার তাড়া দেই
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি বললেই বোঝানো হয়
তোমার শরীর খারাপ হলে
আমার ভেতরে শুরু হয় যে ছটফটানি
আর তোমাকে সুস্থ হওয়ার
নিয়মের যে তাগেদা দেই
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি উচ্চারণেই বুঝতে হয়
তুমি রাগ করলে আমি যে নানা বাহানা খুঁজি
একটু আশকারার জন্য
অপরাধীর মতো সব দোষ মেনে নেই
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি কেবলই বলতে হয়
একবার দেখার জন্য নানা ছুতোয় যে
কত অনুরোধের আসর খুলি
গ্যালারিতে জমানো ছবিগুলো জুম করে দেখি
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি শুধু বলেই জানাতে হয়
মন খারাপ হলে একটু সুখের জন্য
অন্য কোথায়ও নয়-
তোমার কাছেই যে ঠাই খুঁজি
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি সবসময় বলেই দেখাতে হয়
এত ঝগড়া-ঝাটি, রাগ-অভিমান, অভিযোগ
আর সব নোনা জলের পরেও
তোমাকে যে একইভাবে পাশে চাই
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কি সবসময়ই বলতে হয়
সব দুঃখ-কষ্ট ঝেড়ে মুছে
ভালো স্মৃতিগুলো সাথে নিয়ে
সম্পর্কটাকে অটুট রেখে
আরও একটা দিন শুরু হয়
সেটা কি ভালোবাসা নয়?

ভালোবাসি কথাটা কখনো কখনো
একটা না বলা শব্দ
উচ্চারণে বহিঃপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে
ভালোবাসা কথাটা কখনো কখনো
অনুভূতিতে বুঝতে হয়
মাঝে মাঝে পাশের মানুষটার ভেতরটা
খুঁজতে হয়
হ্যাঁ, ভালোবাসাটা ওভাবেও বেঁচে রয়।
…………………………………………..

প্রিয়তম

আজ হঠাৎ—
তোমায় খুব চিঠি লিখতে ইচ্ছে করছে
দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি
রাত সাড়ে বারোটা
ডায়েরিটা বের করে একটা জলছাপ কাগজ
ছিঁড়ে নিলাম।

একটা হলুদ খাম—
আমার কাছে আগেই জোগাড় ছিল
মোটা ফ্রেমের চশমাটা চোখে এঁটে
বলপেনের মুখটা খুলতেই লোডশেডিং
মফস্বল এলাকার বিদ্যুৎ কোনো রকমের
সিগনাল ছাড়াই যখন তখন গায়েব
ইট পাথরের এই অন্ধকার বাড়িটা
এখন যেন আমায় গ্রাস করছে
তাড়াতাড়ি মোমবাতিটা জ্বালিয়ে নিলাম
মোমবাতির লালচে আলোয় আমি লিখে চলছি
প্রথম শব্দটা হলো ‘প্রিয়তম’।

স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে
আ’কার ই’কার সহ বাকিগুলোও
আছে ঠিকঠাক,
গোটা গোটা অক্ষর বসিয়ে আমি লিখলাম
তোমাকে একটা চিঠি
বলপেনের কালির সাথে মিশিয়ে দিলাম
আমার সকল অনুভূতি
লিখে চললাম আঁকড়ে থাকা
তোমার শত সহস্র স্মৃতি।

তোমাকে না বলা আমার যত সব লুকোনো কথা
তোমার জন্য জমে থাকা এক রাজ্যের মায়া
তোমাকে হারানোয় আমার ভেতরের নিশ্চুপ শূণ্যতা
তোমার সাথে বসবাসের আমার নীরব অপেক্ষা
একটার পর একটা লাইন জুড়ে যাচ্ছে
প্রতিটা শব্দ জানান দেয় ভালোবাসি কথাটা,
এপাশ ওপাশ পুরো পৃষ্ঠা অক্ষরে অক্ষরে ভরপুর।

হলুদ খামের উপরে—
এবার ঠিকানা লেখার পালা
প্রেরকের স্থানে সব লেখা শেষ করতেই
মনে পড়লো
প্রাপকের নাম ছাড়া তো আমার কিছুই নেই লেখার।
তোমার ঠিকানায় কি করে পাঠাই বলো চিঠিটা?
তোমার কাছে কোনো ডাকপিয়নও যে পৌঁছাবে না
ডাকবাক্সের কোণেই হয়তো চিঠিটা পড়ে থাকবে আজীবন
কিন্তু তোমার কাছে চিঠিটা পৌঁছানো যে খুব প্রয়োজন।

ঘুচে যাওয়া চামড়ার মুখটা—
মোমবাতির আলোয় লালচে লাগছে
খাটের পাশের ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা
বারবার মনে করিয়ে দেয় সময় ফুরোচ্ছে
তোমার সাথে আমার দেখা হবে হয়তো শিঘ্রই
তখন না হয় মেলে ধরবো আমার একা থাকার যন্ত্রণা
তখন তোমায় বলবো কীভাবে লালন করা
মানুষগুলো একলা ফেলে ভালো থাকে
তখন তোমায় গল্প দিব-
একটা বাড়ি ও একটা মানুষের কথা।

প্রিয়তম আজ চব্বিশ বছর হলো
তুমি ছাড়া আমি একা
আর আট বছর ধরে তোমরা ছাড়া আমি একা
মোমবাতিটা নিভে গেলেই পুরো বাড়িটা অন্ধকারে তলিয়ে যাবে
আর কলমটা রেখে দিলেই প্রিয়তম
আমি একাকিত্বে তলিয়ে যাবো।
…………………………………………..

আঙিনা

স্বপ্নগুলো চৌকাঠ পেরুবার আগেই
দরজায় খিল
ঝলমলে এ আঙিনার শুন্যতার সাথেই
আমার যত মিল।

হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াই
কে যেন পিছন ডাকে
ফিরে তাকাই
খুঁজে ফিরি-
অন্ধকার
ধূসর অন্ধকার!

সাদা মেঘ ভেসে চলা শুভ্র আকাশটা নীল
আমার আঙিনায় নিঃশব্দে ধরা দেয়—
ক্লান্ত নিঃসঙ্গ গাঙচিল।

গুঁড়ি গুঁড়ি স্বপ্নরা সামনে পা বাড়ায়
আবার অচিরেই ডানা গুটায়
এ মায়ার ভুবন—
দেখতে সহজ
ভিতর কঠিন
খুব কঠিন।
…………………………………………..

ইচ্ছের স্বপ্ন

বদ্ধ দুয়ার
একলা আমি
আবছা খেয়াল
ভাবছি আমি।

কালো এ অন্ধকার খুঁজছে কি জানো?
আমার জমানো স্বপ্নগুলো।

ইচ্ছে যত
স্বপ্ন তত-
স্বপ্ন দেখা’ই স্বপ্ন ভাঙ্গে
ইচ্ছেগুলো ভীষণ টানে!

অপূর্ণ ইচ্ছেরা কোথায় থাকে জানো?
আমার দু’চোখেরই কোণে সবার চোখের আড়ালে।

বাক্সবন্দি স্বপ্নগুলো
বাক্সতেই বন্ধি
এ যেন সত্যিই তার
বাক্সতেই সন্ধি!

উড়তে চাওয়া স্বপ্নগুলো বদ্ধ কেন জানো?
ডানা জোড়া যে অকেজো।

ইচ্ছেরা মুক্তি চায়,
উড়তে চায়
শেষ সীমানা ছুঁতে চায়
ভেদ করতে চায় নিকশ কালো
আনতে চায় এক রাজ্য ধবধবে আলো।

বাঁধা কোথায় জানো?
চোখ মেলে একবার তাকিয়ে দেখো—

স্বপ্নেরা সীমাহীন
আমার গুলো গোধূলি
সূর্যাস্তেই আঁটকে থাকা
সমুদ্র পাড়ের গুড়েবালি
চিকচিক করতেই ভিজিয়ে দেয় সমুদ্রের পানি
শেষ রাত্রিরে ডানা ঝাঁপটায়
দরজায় গিয়ে ডানা আটকায়।

স্বপ্ন ছোঁয়া এত কঠিন কেন জানো?
আমায় আমার মতো কেউ বোঝেনা
তুমি মানো আর নাইবা মানো।
…………………………………………..

একদিন

একদিন খুব বৃষ্টি হোক
ভিজিয়ে দিক উত্তপ্ত শহর আর তোমায় আমায়,
ধুয়েমুছে যাক রাস্তার ধুলোময়লা
আর যত অভিমান-অভিযোগ
দৃষ্টির কোণ ঘেঁষে জমে থাকা জলকণাগুলো
গড়িয়ে পড়ুক ঐ বর্ষায়।

জানালার ফাঁকের এক ঝটকা পানি আসুক
উদাসীন ভাবনার ছেদ কাটুক
আমিও না হয় ছুঁয়ে দেখলাম বৃষ্টির ফোটাগুলো
নাইবা মুছলাম কপলের জলগুলো
বদ্ধ ঘরে আটকে থাকা ইচ্ছেগুলো
পরখ করে নিলাম নাহয় একটাবার।

যোগ বিয়োগের সব হিসেব অমিলই থাক
যে হিসেব দূরত্ব বাড়ায়-
সে হিসেব মিলাতে নেই
কিছু হিসেব বেহিসাবিই ভালো
তাতে যদি বাড়ে ভালোবাসা আরও।
…………………………………………..

প্রতিজ্ঞা

অভিমানে অভিমানে
কেটে গেলো অনেকগুলো বেলা
অভিযোগগুলো করবো করেও করা হলো না
তবুও প্রতিক্ষার শেষ হয় না
এই বুঝি এলো চিঠি
ভেঙ্গে গেলো ব্যথার দেয়াল।

বারান্দায় জোৎস্নাদের ছড়াছড়ি
ঘুরে বেড়ায় জোনাকিরা
প্রতিযোগিতা তারা গণনার
ধোঁয়া উড়া দুই কাপ চা
শুরু হলো স্বপ্ন দেখার।

আক্ষেপগুলোর রূপান্তর আকাঙ্ক্ষায়
নতুন করে খুঁজে পাওয়া হারানো সব
একই পথে পথ চলা শুরু আবার
দীর্ঘশ্বাসগুলো মাড়িয়ে দিলো নিঃশ্বাস
প্রতিজ্ঞা এবার ভালো থাকার।
…………………………………………..

একদিন

একদিন আকাশে খুব মেঘ করুক
সূর্যটাকে ঢেকে দিক
তারপর—
ঝমঝমিয়ে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি হোক
সারা শহর তলিয়ে যাক
বিদ্যুৎ চমকালে চমকাক-
শো, শো শব্দ করে বাতাস আসুক
গাছের সব শুকনো পাতাগুলো ঝরোক
রাস্তাঘাট জন শূণ্য হোক
দোকানগুলোয় তালা ঝুলুক
ঘন অন্ধকার নেমে আসুক
নাইবা কদম ফুটুক
কৃষ্ণচূড়া গাছ ফুল ছাড়াই থাকুক।

সেদিন আমার মন খারাপ হোক
বেজায় মন খারাপ হোক
বাহিরের বৃষ্টির সাথে—
ভেতরের সব দুঃখটুকু ঝরোক
সেদিন বাতাসের সঙ্গে-
আমার দীর্ঘশ্বাসগুলো উড়ুক
ঝরা পাতার সাথে আমার ক্রন্দনও বাড়ুক
কপল বেয়ে চোখের জল পড়ুক
পুরাতন যত স্মৃতিরা দুমড়ে মুচড়ে দিক
সমস্ত শূন্যতারা হাহাকার করুক
জমানো আক্ষেপ আমায় ভাঙচুর করুক।

সেদিন আমার মুক্তি হোক
জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা থেকে
আমার মুক্তি হোক
বৃষ্টির ফোঁটা জানালার গ্রিল ভেদ করে
আমায় ভিজিয়ে দিক
বাহিরের দমকা বাতাস আমার পুষে রাখা একাকিত্ব ঘুচিয়ে দিক
হ্যাঁ, সেদিন আমার মুক্তি মিলুক।

তারপর রোদ নামুক
আমার সারা বাড়ি-
ঝলমলে আলোয় ভরে উঠুক
পাখিরা ডাকুক—
শহর থেকে সব ধুলোবালি মুছে যাক
নিঃশব্দে বাতাস প্রবাহ হোক
রাস্তার মোড়ে, মোড়ে লোকেদের গল্প জমুক
লোকজন সস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ুক
নীলাকাশে ঘুড়ি উড়ুক
লাটিম হাতে ছোট্ট ছেলেটা মাঠেই থাকুক
প্রেয়সীর অপেক্ষায় ছেলেটা-
কলেজ গেটে দাঁড়াক
লজ্জা জড়ানো চোখে প্রেয়সী-
ছেলেটির দিকে তাকাক
সুযোগ বুঝে কেউ একজন-
হাতটা শক্ত করে চেপে ধরুক
কানের কাছে ফিসফিস করে
ভালোবাসি শব্দটি উচ্চারণ করুক
প্রকৃতি জুড়ে প্রশান্তি নেমে আসুক
পৃথিবীতে স্নিগ্ধতা বাড়ুক।

এবং আমার ভালো থাকা শুরু হোক
মন খারাপেরা স্পর্শের বাহিরেই থাক।
…………………………………………..

দূরত্ব

গাঢ় অন্ধকারে তুমি এক মুঠো
জোছোনা হয়ে এলে
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতেই আর নেই
ফাগুনের গুনাগুন মাড়িয়ে
চৈত্রের দগ্ধতায় গেলে পুড়িয়ে
কাল বৈশাখি ঝড়ের এটাই বুঝি পূর্বাভাস!

এসেছিলে তুমি আসি আসি বর্ষায়
ঢেকে দিয়ে গেলে শীতের কুয়াশায়
ভালোবাসাগুলো শিশিরের সঙ্গে ঝরে
ফোঁটায়, ফোঁটায়
বসন্তের দক্ষিণা বাতাস জানালায় কড়া নাড়ে,
ফুলের ঘ্রান নিয়ে নয়-
শোকের বার্তায়
নির্বাক তুমি-
আমি নিরুপায়

হিসেবের খাতায় বাকি ছাড়া কিছু নেই
আমার আর্তনাদে তুমি অসহায়
মেলার পথেই যত অমিলের জড়তা
হাত বাড়িয়ে ছুয়ে দেখি সব শুন্যতা
ইচ্ছেগুলোর আজ বিলিনের পথে যাত্রা !

কদম হাতে একসঙ্গে মিলে বৃষ্টি ভেজা বাকি
বাকি আছে বিজলির শব্দে—
তোমাকে জাপটে ধরার অনুভুতি
হৃদকম্পন শোনার কথা ছিলো
পাহাড়ের চূড়ায় আর ওঠা না হলো
কুয়াশাচ্ছন্ন সকালটা রইলো ধোয়াশে
হাঁটা আর হলো না শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে
জন্মালো না নিম গাছটা-
সাথে বাড়তি সদস্য
গুটি, গুটি সব স্বপ্নগুলো অপূর্ণতার যাতাকলে পিষ্ট!

কথা রাখা হলো না
বাকি পড়ে রইলো সব
জমে থাকা সব কথোপকথন
নাড়া দেয় বরাবর
পালিয়ে আর কতক্ষন
হাঁটি, হাঁটি সময়গুলো পিছু ছাড়ে না একদম
ভালো থাকা আর কই হলো
চেষ্টাগুলো বৃথাই গেলো
আমার জগতেই বন্দী আমি
আমার শুন্যতায় একলা তুমি!

চোখ জোড়া ভিজুক অন্ধকারে
গড়ে ওঠা স্মৃতিগুলো থাকুক যতনে
দুরত্বতায় ঘিরে আছে সকল চাওয়া পাওয়া
আমি দারুণ খরায়
বৃষ্টিগুলো ভিজিয়ে দিক তোমায়!