বদলের বদলে যাওয়া

দেয়াল বদলে যায়
বদলায় দেয়ালের পীঠ; ষোড়শীর মুখচ্ছবি, স্বাপ্নিক চোখ
ষড়ঋতু, বহতা নদীর মতো

চেয়ার বদলে যায়
বদলায় চালক; চালকের আইন, আইনের মন
শুক্লপক্ষ, দিন রাত্রি বদলের মতো

সড়ক বদলে যায়
বদলায় কিষাণের মাঠ; ফসলের পেলবতা, রঙিন আকাশ
পদ্মা, ঝিনুক শামুকের মতো

মানুষ বদলে যায়
বদলায় মানুষের মনন; মননের আত্মা, সাগরের নীল
ইটপাথর, শুভ্র মোমের মতো

বদলের ভীড়ে বদল বদলায়
বদলায় বদলের রূপ-লাবন্যময়তা, হরিণি চোখ
চাঁদ, কেওড়া বনের মতো

বদলাতে দাও, চলুক বদলে যাওয়া
বদল বদলের বাদল ধারায় বয়ে যাক
আত্মশুদ্ধির মৌসুমী হাওয়া।
…………………………………………..

মুক্তির হেমন্ত দিন

কুয়াশার মায়াবী ছোঁয়ায় ফিকে হয়ে ওঠে হৈমন্তিক ঊষা
শিশিরের দাপটে এলিয়ে দেয় কাঁচাপাকা পোয়াতি ধান
সবুজের মাঠে বৃষ্টিস্নাত হয় নানা বয়সী ঘাস
বনে বনে সিক্ততার উন্মীলন

হাজামজা ডোবাতেও কান্না ঝরায় কচুরীপানা
পানির আকাশে মাছেরাও দেখে সফেদ সাগর- নিষিদ্ধ কানন
শাদা আলোয়ানে গিলে খায় সাহসী বৃক্ষ- বাঁশঝাড়
পাখিরাও আটকা পড়ে শুভ্রতার অশনি মায়ায়

বুঝি বেলা আর হাসবেনা, আসবে না বুঝি দিন
চোখ মেলে তাকাবে না আলোকিত ভোর
টুটবে না কখনো মানুষের ঘুম, খুলবে না চোখের পাতা
স্বপ্নীল বাসরে সাহারার বালি; হাসিমাখা কারফিউ
লাশ হয়ে ধুলায় লুটাবে সাহসের শুভক্ষণ
কারাবাস চারপাশ; নিশ্চুপ ঘুমঘরে আমার রূপসী বাংলাদেশ

পিনপতন নীরবতা-মুচকি হেসে যায় মেঘ, অশনির ছায়া
পৃথিবীও ছেড়ে দেয় আলোকের মায়া
তবু স্বপ্নচোখে আলো খোঁজে ভোর ডাকা পাখি
ভেজাপাতায়ও টুপ্টাপ শব্দে হেঁটে যায় ক্লান্ত সময়
বিচলিত মনে অপেক্ষার মিছিল; কাফনের সাজসজ্জা, বিরুদ্ধ বাতাস
বিদ্যুৎ নয়;
মেঘের পাঁজরে ওড়ে রক্তের ফিনকি
বক্ষদীর্ণ করে হেসে ওঠে মনন
উঠে আসে বিজয়ের সূর্য; মুক্তির হেমন্ত দিন।
…………………………………………..

গোলাপধোয়া প্রেম

কবিতার শব্দবুননে থমকে দাঁড়ায় কাব্যতাঁতি
চাঁদের মায়াবী আলোয় নিজেকে দ্যাখে বারবার
হেমন্তের স্নিগ্ধ কুয়াশায় খেলে স্নানকেলি
আকাশের নরম বুকে মুখ ঘষে বারুদের ঠোঁটে
তবুও আসেনা শব্দ
আসেনা কবিতা রূপসী

সাগরের নোনা জলে ভিজে যান কবি
সাইক্লোন, সিডর কিংবা হ্যারিকেনে উত্তাল হৃদয়সাগর
তবুও চৈতালী খরা, রোদের ঝাঁঝালো উত্তাপ
মগজপাতালে খেলে স্বপ্নের ডুব সাঁতার
দুহাত উঁচু হয় মালিকের দ্বারে

সহসা পাল্টে যায় আকাশের দৃশ্যপট
ঝিরিঝিরি হিমেল বাতাসে
মায়াবী হাসিতে নেমে আসে শব্দ
টসটসে যৌবনা কবিতা ষোড়শী

বারুদের ঠোঁটেও নামে গোলাপধোয়া সুবাসিত প্রেম।
…………………………………………..

স্বাধীনতার গল্প

স্বাধীনতার গল্পটা ভীষণ রঙ বদলায় ইদানিং
ফসলের মাঠের মতো সবুজ দেখতে দেখতে
রক্তিম হয়ে ওঠে শিমুল পলাশ কিংবা রক্তচূড়ার মতো

শাপলা পদ্মের সুঘ্রাণ নিতে গিয়ে দেখি
গোবরে পোকারা কিলবিল করছে মহানন্দে
মিঠে পানির সুস্বাদু ঘ্রাণের বদলে নাকের ছিদ্রে ধাক্কা লাগে
শহুরে ড্রেনের, পঁচা নর্দমার উৎকট দুর্গন্ধ

দোয়েল শিসের আমেজে কান পেতে শুনি
বখাটের শিস, নাবালিকার আত্মহত্যা, উধাও ষোড়শী
লজ্জায় মুখ লুকায় আইনের বই, চিহ্নিত পোষাক
অজানা শংকায় আব্বা-মার কালক্ষেপণ

কোকিলের গান ভেবে মনরশি ফেলতেই
বুকফাটা কান্নায় কেঁপে ওঠে খোদার আরশ
পাকুর পাতার তালে বেজে ওঠে অশনির ঘণ্টাধ্বনি

মায়ের শাড়ির আঁচলে শ্বাস নিয়ে দেখি
ঝাঁঝালো বারুদ আর রক্তের ঘ্রাণ
জিহ্বার আগায় ঠেকতেই নোনা অশ্র“র স্বাদ
কণ্ঠনালীকে করে তোলে হতবিহ্বল
চোখের দিকে তাকাতেই জিজ্ঞাসার রক্তচক্ষু
‘আর কত খুন ঝরলে আসবে গণতন্ত্র, জীবনের স্বাধীনতা!’

তবু স্বাধীনতা এগিয়ে যাচ্ছে
এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বপ্নকল্পনা
তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের মুক্তিনিশান, আমাদের স্বাধীনতা।
…………………………………………..

অস্তিত্ব

স্নায়ুফাংগাসে নিমগ্ন জোছনা শাদা কুয়াশার ফসিলে স্নান করে প্রতিনিয়ত
পাখির পালকে উড়ে স্বপ্নফানুস; ক্লান্ত পথিক এক
বনেদি রাজকন্যা জলকেলি করে, সখিরা হাসে বত্রিশ দাঁতে
সাইবেরীয় অতিথি পাখির ঝাঁকে টিপ্পুনি কাটে বালিহাঁস
আবারো ঘুরে দাঁড়ায় নতুন পলাশী, ঘষেটির লকলকে জিহ্বা নাচে
চারপাশ ঘিরে ঘনকঙ্কাল, হাজার ডুবুরী

থইথই জলে প্রেমের আশ্বাস
তবুও আগুনে পুড়ে যায় হৃদয়ের চিলেকোঠা

সহসা ডানা মেলে স্বপ্নিল প্রজাপতি
গর্ভবতী মেঘ প্রসব করে, হলদে ঘাসের চাহনিতে সবুজের ঘ্রাণ
ফেলে আসা দিন, নতুন তুলির টানে শিল্পিত মন হাঁটে
মিটিমিটি জলে ঝিরিশামুকের রঙিন মেলা
মলা ঢেলা দাড়ক্যা পুটির চঞ্চল প্রাণে শান্তিপরশ
দূর মঞ্জিলে হেঁটে হেঁটে চলে শামুক-কচুরিপানা

সহসা উঠে আসে যেন এক শান্তি সকাল।
…………………………………………..

বোশেখের হালখাতা

ভুলগুলো ঝুলে আছে থরে থরে কাদিভরা ডাবের মতোন
সরিষার ভূঁই খুঁড়ে খুটে আনি সাহসের সওয়াব দানা
কোকিলের গান সুরে মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে বেয়াড়া হৃদয়
বোশেখের হালখাতা কালো নাকি ধলো তা হলো না জানা

পদ্মার বুকে আজ হাহাকার মরু
গোলাপী বিকেল ঝরে ফিকে কান্নায়
টিপাই টিপাই ওড়ে চিলের ডানায়
রক্তপরশ মাখে তসবী দানায়

আইনের ঘরে ঘরে ঘুণপোকা করে উল্লাস
ময়নার বেশ ধরে হায়নার সাথে যেন শকুনের বাস
পতাকায় ঢাকা পড়ে লাখো লাখো শয়তান, দাঁতাল শুয়ার
নবীজীর নাম নিয়ে লুকোচুরি খেলা, তবু রুদ্ধ দুয়ার

কলমের নিব হোক লাঙলের ক্ষুরধার ফলার সারি
শাওনের মেঘগুলো গলে গলে নেমে যাক অঝোর ধারায়
জীবনের মাঠে বুনি ঢেউ তোলা মনকাড়া সবুজ স্বপন
সাহসের রঙধনু খুশি হয়ে নেচে যেন হাতটা বাড়ায়

হতাশার পাতাগুলো উড়ে যাক এক গানে, একতার সুরে
আলোকিত হোক সবে, সবুজের উৎসবে সত্যের নূরে।
…………………………………………..

সাহসের সবুজ সকাল

চাঁদের ভেতরে কোমল কান্না খেলা করে প্রতিদিন
হৃদয়ের চিলেকোঠায় এখন আঁধারের মেলা বসে
তারাদের ভিড়ে জোনাকির ডুবসাঁতারের লুকোচুরি
হায় সেলুকাস!
জীবন মানেই মিথ্যার সাথে পাঞ্জালড়াই

হঠাৎ করেই কেঁপে ওঠে উহুদ পাহাড়
বদরের কোলে হাসে হাজারো শহীদ
বেলালের সুর কাঁদে পাথরের কণায় কণায়
চির হরিতের বাংলায় ওড়ে অশ্র“ভেজানো লালসবুজের পতাকা
সাহসের কথা শুনাতে শুনাতে সন্ধ্যা নামে উঠোনের কোলে

হনুমান লেজ নাড়ে পাকুরের গাছে
ঘুঘুদের বাসা আজ ধুধু মরুভূমিতে কিংবা স’মিলের বিধ্বস্ত কাঠে
নীলখামে উড়ে আসে রক্তের চিঠি
হেরার পাহাড় জুড়ে ক্ষোভের কাঁপন
জেলগেট নড়ে ওঠে আযাবের ভয়ে
শাদা বক উড়ে যায় ঠিকানার খোঁজে
মড়াৎ কড়াৎ আওয়াজ তুলে উঠে আসে নতুনের গান
বৈশাখ তুলে আনে সাহসের সবুজ সকাল।
…………………………………………..

প্রেমের খামার

চলন বিলের বুকে মুখ ডুবে জেগে থাকা
আউশের এলোমেলো বনটা জুড়ে
শাপলার সুরতালে ঝিলের সুবাস মেখে
তুমি আছো স্বপনের মনটা জুড়ে

মায়াময় হরিণীর ঝলোমলো চোখে চোখে
চিত্রল প্রজাপতির ডানায় ডানায়
মেঘ বালিকার গানে নীলাভ খামের চিঠি
মিটিমিটি স্রোত বেয়ে ভেসে আসে কচুরীপানায়

তোমার কপোল ছুঁয়ে নেচে নেচে উড়ে আসে
সরলা গোলাপ মাখা উদোম হাওয়া
মনের নদীতে ভাসা বজরার গলুইয়ে
জেগে থাকা স্বপনেই তোমাকে পাওয়া

ভালোবাসি তবু বলি ফিসফিসে কানে
তুমি জানো আমি জানি বোশেখের গানে

তোমার মনের ওই দীঘল আকাশ জানি শুধুই আমার
হৃদয়ের মাঠ জুড়ে তিলে তিলে বানিয়েছি প্রেমের খামার।
…………………………………………..

আরাকানের কান্না

কবি আলাওল! তোমার রোহাঙ নগরী; আষাঢ়ে আকাশে শাওন তরঙ্গ
সুরেলা বাতাসে রিমিঝিমি গান, বেদনাময়তা- ছন্দচ্ছেদ
শুস্ক ঝরনা চোখের কোণায়, রেটিনার কোলে খেয়ালী ধুলোর মিছিল
বুকের গহীনে মেঘের বিজলী, থৈ থৈ জলে কান্না বিলাপ
শুভ্র সকালে গোধুলির শাড়ি, বেদনাগোলাপ

হায় আকিয়াব!
পাড়ায় পাড়ায় আগুনের শিখা পোড়া মানুষের উৎকট গন্ধ; রক্তের ঋণ
পাখিদের ডানা সোনাঝরা মাঠ পুকুরের জলে বিষের আঁচড়;
নাফ নদীটাও নিজেকে রাঙায় আলতার রঙে
প্রহসনের নীলবাতি জ্বলে পড়শি ফটকে, সীমান্ত প্রহরীর নিষ্ঠুর বাঁশি
আধমরা নূরী আকাশ ফাটায়, একটু অষুধ, নিরিবিলি ঘুম
জঙ্গলে মরে মদীনা বেওয়া, বুকের উপরে এগারো মাসের অবুঝ মাংসপিণ্ড
শুকনো স্তনে দুধের লড়াই, সাপের চোখেও বেদনার জল
আশি বছরের শমসের দ্যাখে ছেলেদের লাশ, ফ্যাকাশে আকাশ
হাজার যুবতী দস্যুর হাতে, লজ্জা জীবন; দাঁতাল শুয়োর হাসে
সারি সারি চলা নায়ের মতোন অথৈ নদীতে ভেসে চলে লাশ
গাঙচিল কাঁদে, কাঁদে বরষার ছুটে চলা ঢেউ নাফের সরলা মন
কাঁদেনা পাষাণ, বুদ্ধ দাবীতে যারা গেয়ে যায় মহা শান্তির গান!

ও জাতিসংঘ! কোথায় তোমার মানবতাবোধ;
ওরা মুসলিম, তাই বলে নিজভূমে অধিকার নেই মাথা গোঁজাবার!
হায় আমেরিকা, কোথায় তোমার দয়াদ্র হাত!
বাপের ভিটেতে পরবাসী করে, এ ক্যামন নীতি! এটা কি বুদ্ধাচার!
হায়রে নেত্রী, নোবেলের সুরে তুমিও নিখোঁজ!
কোথায় তোমার গণতন্ত্রের অতন্দ্র সুর!
ওআইসি! তুমি বসে আঙ্গুল চোষো আর বলো; ও.. আই সি..কণ্ঠে নতুন সুর
ভাসুক দুনিয়া, আমি আছি জেগে, যাবে আর কতদূর?

হে প্রভূ! এবার তোমার দুয়ার খোলো
বুকে টেনে নাও পাপে ঢেকে থাকা অসহায় বণি আদম
দোহাই তোমার, নিঠুর হয়োনা মালিক; অভিমানটুকু ভোলো
এবার তোমার দুয়ার খোলো।
এবং কবি সুকান্ত

রূপালি জোসনা অথবা তারার মিছিলে যাবার ইচ্ছে জাগেনা এখন
পলাশ ফুলের লালিমা কিংবা শিমুলের ডালে যে কান্নার সুর
তা আমাকে রোজ বিচলিত করে; দেখার জন্যে সামনে এগুতে বলে

আমিও ভাবতে থাকি
সবুজের মাঝে যে লাল বৃত্ত সেদিকেও দেখি অপলক
নতুন চরের মতো আচানক জেগে ওঠে লাখো শহীদের মুখ
রক্তে ভেজানো শরীর কিংবা সাহসের পতাকা

সামনে যাবার আশায় স্বপ্ন আঁকতে গেলেই
ভেসে আসে ভুখা মানুষের মুখ, দাবী আদায়ের মিছিল
পুলিশের বুট লাঠির আঘাত এবং বন্দি জীবনের ঘানি
তাইতো কবিকে আজ মিছিলের সাথেই মানায়

আজ আর ফুল পাখিদের নিয়ে কবিতা আসেনা
চোখ বুজলেও সামনে দাঁড়ায় আজদাহা
পদ্মা তিস্তা কিংবা মেঘনা নদীর ডাক
আঙ্গরপোতা বেরুবাড়ি আর দহগ্রাম কাঁদে
মরিচ পেঁয়াজ আর কাপড়ের হাটেও লুটেরা
দাউ দাউ দাউ আগুনের শিখা হৃদয় উঠোনে

সময়ের সাথে ডাক দিয়ে যাই
আবার আসুন কবি সুকান্ত, লিখে যান আজ নতুন শব্দে
‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’
মুক্তির সুর পেলে ওগো, তোমার সাথেই আমাদেরও ছুটি।