মেধার জানাযা

মেধাকে ছেড়ে দেয়া হলো একটি পরিত্যক্ত ও অনুর্বর জমি চাষ করতে
মেধা বুদ্ধির বাড়ি গেলো হেঁটে হেঁটে
লব্ধজমিটি চাষাবাদের ধারণা আনতে
বুদ্ধি তখন রিহার্সেলে মগ্ন ছিলো স্ববুদ্ধির জোর বাড়াতে
পাশেই নতজানু হয়ে বসা যুক্তির কষ্টিপাথর
যুক্তির বক্ষ বরাবর একটা চেয়ার
তাতে কেউ বসা নেই, আবার খালিও না
মেধা ভাবলো, এই আহমকদের এখানে আমার লাভ নেই
চলে এলো মেধা
মগ্ন হলো সে আপন জমিচাষে

কিছুদিন পর জমির মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো কিছু কীট
ছড়িয়ে পড়লো তারা মেধার বাড়িসুদ্ধ এবং আশপাশে
মেধার কোনো হদিস নেই
খুঁজে দেখা গেলো মেধা পড়ে আছে একটা ময়লাডোবায়
বিক্ষত দেহ তার এবং নিস্তরঙ্গ সে

বুদ্ধি আর যুক্তি মিলে মেধার জানাযা পড়লো
ইমাম ছিলো চেয়ারে বসা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সেই ‘প্রজ্ঞা’
মেধার চোখে যা ধরা পড়েনি
…………………………………………..

মাটিগান

মাটির কি গাঢ় রহস্য
অবচেতন মনেই মাটিকে ভালোবাসিলাম
জগতের সব কিছুই তো মাটি
মাটি আর মাটি
খাঁটি চরম খাঁটি
চারদিকে মাটির অবারিত বন্দনা শুনি
জাগতিক নিয়মে যদি গেয়ে উঠি
গাইতেই হবে মাটিগান, সবি মাটি
জগতের সব কিছু
অতীতগামী যত নিঃশেষ
ভবিষ্যতের লক্ষ অনাগত, সবি
ডানেবামে আগেপিছে যত দৃশ্যমান সৃষ্টি
সবি তো মৃত্তিকাগুণের নির্যাস
মানুষের দেহবল্লরি, প্রাণি জগতের যত প্রকার-কিসিম
বৃক্ষ-তরু, লতা-উদ্ভিদ যত আছে
পাহাড়ি ফুলের সৌন্দর্য
মৌচাকে ঝুলন্ত মধুরস
শরীরের খাদ্য-পুষ্টি, নানাবিধ ফর্মূলা
ব্যবহার্য নব নব আবিস্কার, সবি
মাটি দিয়ে গড়া, মাটিই হবে শেষে
তাই তো ভালোবাসি, থাকতে মাটি ঘেঁষে

হে মাটি!
তুমিই তো একদিন ঘর হবে অবশেষে
…………………………………………..

হে আকাশের নীল

হে আকাশ
এতো নীল কেনো তুমি
নীলে নীলে ছেয়ে আছো উর্ধ্বজুড়ে
চেয়ে আছো ধরা পৃষ্ঠে
তোমার অনাবিল গাঢ় নীল
যেনো পরে আছো স্বচ্ছ দীঘল নীলাম্বরি
কতো গভীরভাবে টানে আমাকে
আমি ওড়ে যেতে চাই তোমার কাছে হে আকাশ
তোমার জনম জনম অধিকারের সন্নিকটে
এই সুনীল, বড় মায়ায় কাড়ে মন
কেড়ে নেয় চেতনার উছলানো মনোনিবেশ
আমার হৃদয়জগতেও ছেয়ে আছে একটি রঙিন আকাশ
বহুবর্ণিল, হাজাররঙা সেই আকাশ
ভালোমন্দের মিশ্র বুদ্বুদ ওঠে সেখানে
কখনোই স্থির থাকে না কোনো এক রঙ মেখে
যেমন করে তুমি আছো কেবলই নীলাভ দরিয়ায় ভেসে ভেসে
হে আকাশ
কী তোমার স্থৈর্য আর কী তোমার ধৈর্যের অনুভূতি
কী পেয়েছো তুমি এক নীল রঙের মাঝে
বলো বলো
কীভাবে কাটিয়ে দিলে তুমি লক্ষ-কোটি বছরের পরিসর
এক নীলের মাঝে থেকে
আমাদের হৃদয়জগতের রং বদলায়
প্রতিনিয়ত সে নতুনের লোভে কাতর
এই লোভাতুর মন নিয়েও ভাবি
পিতা আদম তোমাকে দেখেছিলো নীল
কতো হাজার বছর পরেও আমরা দেখি
তুমি সেই নীল ধারণ করেই বেঁচে আছো
বেঁচে থাকবে আরো এই নীলের স্রোতে মিশে থেকে
আমাদের হৃদয় আকাশ ক্ষণে ক্ষণে বদলায় তার রং
কখনো হিংসার আগুনে পোড়া রং
কখনো বিদ্বেষের অভিরুচি
কখনো লালসার কামুক রঙে মাখামাখি
কখনো জিঘাংসাবৃত্তির লালচে রঙের ছড়াছড়ি
হে আকাশ তোমার নীলসমুদ্র থেকে দাও
একফোঁটা অনুভূতি
…………………………………………..

নুড়ি পাথর

একটা নদী গিলে খেলো আরেকটা নদীকে
একটা সাগর হারিয়ে গেলো প্রমত্ত আরেক সাগরে
গিলে খাওয়া নদী ও হারিয়ে যাওয়া সাগরের খোঁজে
নেমে পড়লো ছোট মাথার কিছু ক্ষুদ্র মানুষ
কয়েক কোটি বছরের অনুসন্ধান শেষে
তারা উঠে আসলো কিছু নুড়ি পাথর সঙ্গে করে

উঠেই দেখলো তারা—
পৃথিবী রক্তের সাগর
আগুন নিয়ে খেলা
এরপরই তারা চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়লো আবার
প্রমত্ত সাগরের জলে
হারিয়ে গেলো জীবনের তরে
…………………………………………..

কৃচ্ছ্র সাধনা

সভ্যতা শেখাতে গেলেই অসভ্যতা জাঁকিয়ে বসে
করোটির ভেতর পূরোদস্তুর অসভ্যতা
গুরুদায়িত্ব তবে—
শেখাতেই হবে আপনাকে কোনো কিছু
যা কিছু ধরার বুকে সুনিপুন
তাকেই রপ্ত করতে হবে নির্জনে সুষমায়

মানুষ আসলে সভ্যতা শেখে না
সভ্যতাই আসে নিজ থেকে শেখাতে
সবার ভেতরেই আছে এক দণ্ডধারী দাহক
দাহক্রিয়া পূর্ণ করে সে অবলীলায়
কৃচ্ছ্র সাধনার যত প্রক্রিয়া
তারই হাতে হয় তার সূচনা
ভেতরের ক্রিমিগুলো এরপর
উচ্ছ্বসিত হয়ে মরে যায় খালি করে দিয়ে ভেতরের সত্তাকে
সভ্যতা মূলত নির্মিত হয় নিজে নিজে
…………………………………………..

তুমি আমি

একটা হুল্লোড়ে কাণ্ড ঘটিয়েই শান্ত হলে তুমি
ছাদের ওপরে, জোছনাস্নাত রাতের মধ্যপাটে
তোমার খোলা চুলের গাঢ় অন্ধকার
রাতের নিকষ কালোকেও উপেক্ষা করেছিলো সেদিন
সে কি মাতাল করা ঘ্রাণ নেমেছিলো তখন তোমার চুল বেয়ে
আমার সমস্ত সত্তাকে কাবু করে নিয়েছিলো তা
আমি হয়ে গিয়েছিলাম এক আরণ্যক মানব
বন্যবিথারি
অনন্তকালের বেহালাবাদক সদৃশ
অবিরাম নৃত্যগীতিকবি নিরঞ্জন
তোমার চোখের বিদ্যুৎবিভা, মুখের ঔজ্জ্বল্য
এবং তোমার রক্তাভ ঠোঁটের শোভন হাসি
দূর আকাশে তারার মেলায় ছড়িয়ে পড়েছিলো অবিরত
একরাশ বিহ্বলতা নিয়ে
দ্যোতিত মায়ায় খসে খসে পড়েছিলো সে হাসির রেণু
এই শান্তসমাহিত রাতকে তুমি জাগিয়ে দিলে অথৈ প্রেমস্পর্শে
আঁধার ফেঁড়ে উদয় ঘটালে আলো ঝিলমিল
স্বচ্ছ-অমলিন নিসর্গপাতাল
শুভ্র দন্তপাটির মোহন যূথবদ্ধতায়

আমার মনের কুঞ্জবনেও ফুটে উঠেছিলো হাজার ফুলেদের আবাস
জুঁই-কমল, পদ্ম-শতদল আরো কত কি
প্রজাপতির ওড়াউড়ি
পাখিদের গান, কলহাস্য
রংধনুর নানা রংয়ের চিত্রমুগ্ধতা
মিহি সুরের সুকণ্ঠী গায়িকাদাসী
ভালোলাগার নির্মল ছবিতা
বিচিত্র ভাবনার রঙিন আঁকজোঁক
আর ভালোবাসার তপ্ত উচ্ছ্বাসমালা

এখন এই কোরাসমুখর নির্জন শূন্যে
তুমি আর আমি উড়ি
ভেসে ভেসে, ভালো বেসে বেসে
হারাই দূরের অজানায়
তুমি পরী
আমি তোমার প্রেমের বংশীবাদক
এরপর তুমি শান্ত হও
আমার রোমশবুকে মাথা রেখে
প্রেমাকুল এই আমিও
চিবুক ঠেকিয়ে তোমার চুলের বিছানায়
নিস্পন্দ হয়ে রই সুদীর্ঘকালব্যাপী
প্রেমসাগরের মনোজ্ঞ যাত্রায়
…………………………………………..

প্রেমের প্রাণরস

ক’দিনের জন্য প্রেম গেছে ছুটিতে
বোধহয় অচেনা কোনো জলপ্রপাতের ধারে
কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে সুবাসিত দ্রাক্ষাকুঞ্জে
অথবা সমুদ্রগর্ভে জলজ উদ্ভিদের নাগপাশে
যেখানে তারও প্রণয়ালাপ হয় প্রেমিকের সাথে
প্রেমেরও তো প্রাণরস দরকার হয় নাকি
তাই তারে ছুটি দিয়ো মাঝে মাঝে

প্রেমের নাকি জ্বর হলো আজ ক’দিন
এখন তারও দরকার একটি কোমল হাতের ছোঁয়া
এক সপ্তাহ ছুটি
কে দেবে তাকে এই গোপন অভিসারের সুযোগ
অথচ বুভুক্ষু সব নালায়েক খুবলে নিয়ে গেছে তার কোমল দেহখানি
…………………………………………..

নবজন্ম

জন্মের আগেই আমি মরতে চাই
এখনো তো জন্মই হয়নি আমার
যা হয়েছে তা গঠনবৃদ্ধি ছাড়া আর কিছু নয়
নবজন্মের স্বাদ পেতে মৃত্যু এক বিকল্পহীন পথ্য
উন্মাদ মানুষের জন্ম-মৃত্যু সমানে সমান
আমি তো উন্মাদনার মাঝে বেঁচে থাকতে চাই না
এই মৃত্যুই কামনা এখন

শাশ্বত পথিকের নসিহতনামা
থৈ থৈ অসংখ্য আত্মার নহর

জরাজীর্ণ সময়ের আস্তরণ খসিয়ে ফেলবো
ধুলোয় উড়া স্বপ্নরা জমা হোক
নিভে যাক বেতাল কল্পলোক
ভিজে উঠুক চোখের আঙিনা
এসে পড়ুক নবনীত-কোমল স্পর্শের আঘাত
মৃত্যুই এখন সমাদৃত হবে পরম যত্নে
নবজন্মের স্বাদ তাতে বিজয়মধুর

একটা মৃত্যুই কাম্য এখন…
নিরুপম ছোঁয়া
…………………………………………..

রহস্য

রহস্যের মাঝে ডিগবাজি খেতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেলি
ওরে
সময়োচিৎ আন্দোলন করিস
কি বুঝিস প্রকৃতির
প্রকৃতিই তো দাস
দাস কি করে হয় হুকুমদাতা
বিজ্ঞানের অলীক বিশ্বাসেরা ঝরাপাতার হায়াত নিয়ে আসে
পতন পর্যন্তই জীবন তার
বাকিটা অসাড়
সব বিজ্ঞানই জ্ঞান নয়
বহুলাংশেই ক্রমোন্নত ভেলকিবাজি
…………………………………………..

জ্ঞানতত্ত্ববিদ

এক কাজ করি চলুন হে দার্শনিক!
প্রথমে আমরা পর্বতগুহায় আশ্রয় নেবো
সেখানে মাটি হবে আমাদের বিছানা
প্রস্তরখণ্ড হবে আমাদের বালিশ
সাপ-বিচ্ছু আর কীট-পতঙ্গেরা আমাদের কুটুম-খেশ
খাদ্য হবে তুষার
আলো আর গোসল হবে নির্মল চন্দ্রালোক

এভাবে আপনি একটি নতুন দর্শন লাভ করবেন

এরপর আমরা সমুদ্রে হারাবো
উত্তাল তরঙ্গদোলা ও ঢেউয়ের পাকে সখ্য গড়বো
সামুদ্রিক প্রাণি, নীলতিমি, হাঙড়ের গান শুনবো
রাতের তারাভরা আকাশ
সাগরের সীমানায় মিশে যেতে দেখবো
সূর্যের আলোকবিচ্ছুরণ সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে
নাকি সমুদ্রই আহ্বান করে সূর্যকে— অবলোকন করবো

এভাবেও আপনি একটি দর্শন লাভ করবেন

হে দার্শনিক
এরপর আমাদের যাত্রা গভীর অরণ্যে
হিংস্র প্রাণিদের দেশে
লাঠিয়াল বনমানুষ আর তীর-ধনুকের জংলিদের আবাসভূমে
ঝাঁকে ঝাঁকে সরীসৃপ
অচেনা বিহঙ্গদের অবাধ রাজত্ব
নাম না জানা অসংখ্য বৃক্ষলতার সারি
ভীতি আর ঝোঁকের বন্য অনুভূতি

সেখানেও আপনি পাবেন দর্শনের নতুনত্ব

এরপর থাকবে অবিরাম সফর
কি জলে কি স্থলে
প্রশ্ন নয় কোনো
শুধু চলা আর চলা
দেখা আর ভাবা
লোকালয়ে অরণ্যে সমুদ্রে
পাহাড়ের চূড়ায়ও

হয়তো বিপুল রহস্যের জটলায় সহসাই পেয়ে যাবো
জ্ঞানতত্ত্ববিদ খিজিরের সন্ধান
…………………………………………..

শাদা কাফনে মোড়া জীবন

প্রতিটি জীবনের আছে সুখ
প্রতিটি প্রাণের আছে মমতা
জন্মলগ্ন থেকেই প্রাণে প্রাণে ছিলো উচ্ছ্বাস
শৈশবে গালে থাকে মমতার চুমু
কপালে তিলক আঁকা
জীবনের শুরুটা এভাবেই রংচঙা

প্রহরের শেষে আসে এক ক্ষণ
হাসি-খুশি, রঙঢং হয় পদানত
মানুষের ভিড়, চোখে অশ্রুর জোয়ার
পালকিতে চড়ে যায় একটি জীবন
অথৈ সফরের নির্বাক বিদায়
শাদা কাফনের নেই কোনো দায়