বাংলাদেশের রাজনীতিকে বুঝবার ক্ষেত্রে তথাকথিত মিডিয়া যে ভূমিকা নিয়েছে তা আমাদের ক্রমাগত পিছিয়ে দিচ্ছে। এ কথা জোর দিয়ে বলতে হবে যে, মিডিয়া পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর বাংলাদেশে এই পর্যালোচনার কাজে যে গাফিলতি রয়েছে তা পাহাড় প্রমাণ বললেও কম বলা হবে। অন্যদিকে বিশ্ব জুড়েই সন্ত্রাসের পক্ষে মিডিয়ার ভূমিকা জারি রয়েছে। বিশেষ করে গণতন্ত্র যে ব্যবস্থায় সরাসরি সন্ত্রাসবাদী শাসনব্যবস্থা প্রমোট করে, সেখানে মিডিয়া তার অর্থনীতি ও কালচারাল শ্রেণী চরিত্রের দিক থেকে গণবিরোধী হতে বাধ্য। মধ্যে থেকে কৌতুক হলো, এর নাম দেয়া হয়েছে ‘গণমাধ্যম’।
এটা গণমাধ্যম বটে, তবে গণবিনাশী। বাংলাদেশে গণতন্ত্র কথাটাই খোদ নির্যাতকদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর সাথে মধ্যবিত্তের কালচারাল ফ্যাসিজম যুক্ত হয়ে এটা গণহত্যার ভূমিকায় সামিল হয়েছে। তাই আমাদের আর গণতন্ত্রে চলছে না। বলতে হচ্ছে, গণক্ষমতার উত্থানের কথা। কিন্তু এই গণক্ষমতার জন্য যে মতাদর্শিক লড়াইটা জারি থাকা দরকার তা আমরা করতে পারছি না। এর জন্য সস্তা প্রচারপ্রিয় শিক্ষিত নামধারী মাস্টার, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও ফুর্তিবাজ প্রজন্ম মূলত দায়ী। এদের বিরুদ্ধে আমরা শুরু থেকেই লড়াকু ভূমিকায় হাজির আছি। এরা আমাদের জামাতের, বিএনপির বা জঙ্গি, রাজাকার ইত্যাদি বলছেন। এখন বলছেন, হেফাজতের বুদ্ধিজীবি। এগুলা সমস্যা না। বিপদ হলো, তারা যে প্রগতি চেতনার আফিমের ঘোরে আমাদের শত্রুজ্ঞান করছেন তার ফলে এরা নিজেরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগুনেই পেট্রোল ঢালছেন। এই দিকগুলা নিয়ে আগেই লিখেছি। এখানে মিডিয়ার পার্টটা নিয়ে কথা হবে।

১. যোগাযোগ, প্রচারযন্ত্র ও গণমাধ্যম মিথ
আমাদের যোগাযোগ : ইতিহাসের খোঁজে
যোগাযোগের আদি ইতিহাস নিয়া কথা বললে অনেক কথা বলতে হবে। মানুষ প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের প্রয়োজনে কী তরিকায় যোগাযোগ ব্যাপারটা রপ্ত করেছিলো, তার কোনো একরৈখিক ইতিহাস নাই। ইতিহাস বলে আবার একাট্টা কোনো কিছুও নাই। এর নানা অর্থ। বিভিন্ন প্রকরণ। এর মধ্যে যে ধারাটি ইতিহাস বলে হাজির হয়েছে, তা হলো ন্যারেটিং হিস্ট্রি। মনে রাখতে হবে, ডিসকার্সিভ ট্রেডিশনই এখকার ইতিহাসকে সম্ভব করে তুলেছে। এবং আধুনিক-উত্তর কালে সব মতাদর্শকেই ডিসকার্সিভ ট্রেডিশন আকারে দেখবার কায়দা তৈয়ার হয়েছে এবং এই ডিসকার্সিভ বা বয়ানযোগ্যতাই ন্যারেটিং হিস্ট্রিকে সম্ভব করে তুলেছে। ডিসকার্সিভের যুতসই বাংলা করা মুশকিল। ডিসকার্সিভ মানে হলো কোনোকিছুকে রিজনিং করে তোলা। একটা বয়ানকাঠামোর ভেতরে বিষয় বিন্যস্ত করাই হলো ডিসকার্সিভনেসের বৈশিষ্ট্য। এর আলোকে ইতিহাস বা কোনো ধারণাকে ব্যাখ্যার জন্য নানা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। সাধারণত যারা চলতি ইতিহাসের বয়ানের বাইরে অবস্থান করে তারা কিংবা নতুন করে কোনোকিছু হাজির করার জন্য আধুনিক-উত্তর কালে এই তরিকা প্রয়োগ করা হয়।
আমাদের মতো দেশে ইতিহাস মানে ন্যারেটিং হিস্ট্রি না। কেননা, বাংলার ধারাটা হলো ওরাল ধারা। এন্টি পেটেন্টিক বা কিতাববিরোধী ধারা। উনিশ শতকের বেঙ্গল ইতিহাসের ন্যারেশনটাই বাংলাদেশে হাইব্রিডের মতো চাষ করা হয়েছে। এইটা একদিকে যেমন ইউরোসেন্ট্রিক, অন্যদিকে উপনিবেশের খাসগোলামির ভাষ্যই বহন করে। এই ধারাকে তাই কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশকে এরা কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারেনি। বুঝতে চায়নি। পরে এইটাকে বুঝবার জন্য ‘ওরাল’ ট্রেডিশন বলে ক্যাটাগরি করল। বলাই বাহুল্য, পুরা ক্যাটাগরি বা বিষয় বিন্যাস পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারার আলোকে গড়ে উঠেছে। একইভাবে যোগাযোগ নিয়া আমাদের অধ্যয়নও নিদারুণভাবে পশ্চিমা জ্ঞানকা-ের বিকাশের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে বুঝবার এযাবৎ যে ধরন জারি হয়েছে আমরা তার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই। আমরা কি আমাদের ইতিহাসের ধারার মধ্যে যোগাযোগের পর্যালোচনার কথা চিন্তা করেছি? আরও গোড়ায় প্রশ্ন করি, আমরা কি আমাদের ইতিহাস নিয়া চিন্তা করি? নাকি লিনিয়ার হিস্ট্রি বলে যা জারি আছে তাকেই নিজেদের ইতিহাস বলে বা বিশেষ কতোগুলা ‘ইভেন্ট’ এর ওপর ভর করে ইতিহাসের কাজটা ফয়সালা করে ফেলেছি? তারপরে ফাঁকা জাতীয়তাবাদের জুলুমবাজি শাসনের শিকার হয়ে চলেছি। ফলে গোড়ার অনেকগুলা কাজ আমাদের সেরে তারপরে এই জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ নিয়া চিন্তা বা পর্যালোচনার অভিমুখ পরিষ্কারের জন্য মেহনত করতে হবে।
আমাদের ‘ওরাল’ ধারার মধ্যে যোগাযোগের প্রাথমিক পর্যায় ছিলো গল্পকথক। এই গল্প গদ্য বা পদ্যের বিভাজন রেখা মানতো না। ধারণা করা যায়, গদ্য বা পদ্য বিভাজনটা বর্ণনাভঙ্গিকে আকর্ষণীয় করতে যেয়েই তৈরি হয়েছে। এই গল্প কথকের ভূমিকা রাজদরবার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। এরপরে এদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে তথ্য সরবরাহকারী। এদেরকে আপনি আদি গোয়েন্দা বলতে পারেন। এরা রাজার কাছে তথ্য সরবরাহ করতো। আর গল্পকথক জনজমায়েতগুলোতে গল্পের ডালি নিয়ে বসত। এই ছিলো এখানকার যোগাযোগ প্রক্রিয়া। এটা গেলো আমাদের আদি সমাজিক দিক থেকে যোগাযোগের ধরন। অন্যদিকে এখানকার মানুষের কাছে জীবন ও মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা তা ঐতিহাসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে পশ্চিম থেকে আলাদা। কাজেই পশ্চিমা তরিকার মধ্যে যোগাযোগ বলে যে অধ্যয়ন-প্রক্রিয়া জারি হয়েছে তার নিরিখে যোগাযোগ বিদ্যা দিয়া এইখানে কাজ হবে না এটাই স্বাভাবিক।
পশ্চিমে যোগাযোগ অধ্যয়ন বেশ পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছে। যোগাযোগ ও মিডিয়া অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বাইবেলতুল্য বই মার্শাল ম্যাকলুহানের প্রস্তাবনার নাম, ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া : এক্সটেনশন অব ম্যান’। মিডিয়াকে পশ্চিমা সমাজ মানুষের ক্রমবিকাশের ধারার আলোকে বুঝতে চাইছে, বুঝেছে। আমাদের এখানেও কি এই তরিকাই চলবে? হুবহু চলবে না। কিন্তু কিছু বিষয় তো আমরা গ্লোবাল অবস্থায় থাকার কারণে নিতেই পারব। কিন্তু যা নেয়া যাবে না তার বিচার করবার জন্য যে গোড়ার কাজগুলো দরকার তা আমাদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায় করেছে বলে খবর পাইনি। যোগাযোগ ও মিডিয়া নিয়ে দুনিয়াব্যাপী চিন্তার যে বিকাশ ঘটেছে তার সাথে আমাদের জানা-শোনার পরিধি খুবই হতাশাজনক। কেননা এই বোঝাবুঝির মধ্যে নিজের জন্য আমরা কোনো পর্যালোচনার সংস্কৃতি তৈয়ার করতে পারিনি। এই বিষয়ে ব্যর্থতার প্রথম দায় নিতে হবে একাডেমিক পরিম-লে যারা এইগুলা নিয়ে করে-কেটে খান তাদের।
আমাদের ওরাল ধারা এখনও বজায় আছে। অক্ষর বা প্রিন্ট প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্তেও বিশাল জনগোষ্ঠী স্বতন্ত্র জীবনযাপন বজায় রেখেছে। আপনি এমন একজন কৃষকও পাবেন না যার সকালবেলার আরামদায়ক টয়লেটের সাথে পত্রিকার কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু শহরের অনেক লোকের এই সমস্যা দেখবেন। পত্রিকা ছাড়া টয়লেটে সমস্যা হয়। যেসকল লোক এই সব যোগাযোগ প্রক্রিয়ার ধার না ধরেও জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে মিডিয়া কোনো বাই এক্সটেনশন অব ম্যান না। এইটা তার কাছে কোনো বিষয়ই না। কিন্তু আপনি তো গোটা সমাজকে এই সিভিলাইজেশনের মধ্যে আনতে চান। এর বাইরে অন্য কোনো কন্ডিশন আপনার কাছে সিভিলাইজেশনের আওতার বাইরে। কিন্তু আপনার যে যোগাযোগের ধারণা-চর্চা, তার কোনো কিছুরই সে ধার-ধারে না। প্রকৃতি ও মানুষের সাথে তার সম্পর্কের এমন এক ধারা এখানে জারি আছে যার সম্পর্কে আপনি ধারণা করতে পারবেন না। কোনো খবর না দেখেই কৃষক বুঝতে পারে আবহাওয়ার কী অবস্থা হবে। সেই মোতাবেক সে চাষাবাদ করে। খনার জ্ঞানতত্ত্ব তো এই সভ্যতার যুক্তিবাদি জ্ঞান দিয়া আপনি বুঝতে পারবেন না। তখন আপনি তারে বলেন, ও হইলো সাবল্টার্ন। ও ‘ছোটলোক’। ওর ভাষা নাই। তখন আপনি গায়ত্রী স্পিভাক পড়েন! ‘ক্যান সাবল্টার্ন স্পিক?’।
ছোটলোক কি কথা কইতে পারে? ওর এপিস্টোমলজি/জ্ঞানতত্ত্ব যে আপনার বুঝবার মুরোদ নাই, সেদিকে আপনে মনযোগ দেন না। কারণ আপনার কাছে জীবনের অর্থ যা, ওর কাছে তা না। ফলে কমিউনিকেশন ক্যামনে হবে? যোগাযোগ ক্যামনে সম্ভব?
খুব হাল্কা চালে কথাটা তুললাম। জানি এখনই পরিষ্কার হবে না, তবে প্রশ্নটা তোলা থাকলো।
ফলে পশ্চিমের সভ্যতার যে ইতিহাস তার আলোকে মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা তার ভিত্তিতে সেই সমাজে যোগাযোগের তর্কটা হাজির হয়েছে। তাদের দেকার্তীয় যে রেনেসাঁবাহিত ইতিহাস ও যোগাযোগ প্রক্রিয়া বুঝবার ধরন তা আমাদের সমাজে প্রয়োগ করে যোগাযোগ অধ্যয়নের যে প্রচেষ্টা তা দেড়ইঞ্চি মুরগির পেটে তিন ইঞ্চি বাচ্চা জন্ম দেয়ার মতো ভয়াবহতায় নিপতিত করেছে। সেটা আমরা পরে আলোচনা করে পরিষ্কার করতে পারব আশা করি। আমাদের সমাজের বিকাশ ধারা তো আলাদা। এইটা মার্কসও স্বীকার করেছেন। আপনি যদি ধরেন, বৈদিক যুগ থেকে তো আমরা একটা সিভিলাইজেশনের মধ্যে ছিলাম। ফলে আমরাও বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যেই হাজির ছিলাম শুরু থেকে। অবশ্যই শাসিত ছিলাম। উপনিবেশের ভেতরে ছিলাম। ফলে আজকের সভ্যতা তো কায়মনোবাক্যে কলোনিয়াল (ধরন পাল্টেছে এই যা)। ফলে আমরাও সেই জ্ঞানকা-ের নিরিখে নিজেদের পাঠ করতে পারব। তাইলে আমি বলব আপনেরে ভূতে পাইছে। এর আগেও এখানে লোকজন ছিলো। জীবনযাপন পদ্ধতি ছিলো। মানুষ সম্পর্কে ধারণার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থা গড়ে ওঠার এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইশারা ছিলো। এইটা নানা কারণে নানা সময়ে ব্রেক হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি এদেরকে একটা জনগোষ্ঠী আকারে গড়ে তুলতে চান। বা তা না চাইলেও যদি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে চান, তাইলে আপনার এই ডিসকন্টিনিউটির হদিস করতে হবে। আপনার ইতিহাস খাড়া করা লাগবে।
আপনার বয়ান লাগবে। এরপরই যোগাযোগ সম্ভব হবে। নইলে আপনি পশ্চিমা যোগাযোগ বিদ্যায় হাফেজ হয়েও এই জনগোষ্ঠীর কোনো কাজে আসতে পারবেন না। আপনি শ্রেণীমাধ্যমের কাছে ধরা খেয়ে আটকে থাকবেন। এই অতি প্রাথমিক হুঁশটুকু মাথায় রাখা খুব জরুরি। পশ্চিমে মতাদর্শ, কালচার ও মানুষ সম্পর্কের ধারণার যে এনলাইটেন ক্রিটিক আছে তা গভীর অভিনিবেশ সহকারে পাঠের দরকার আছে। এর সাথে যোগাযোগের ধারণার পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাসের দিকে মনোযোগ ফেরাবার কাজটা অতি প্রাথমিক কাজ আকারেই হাজির হয়েছে।

মিডিয়ার কথা ও নয়া মিডিয়া
প্রিন্টিং প্রক্রিয়া শুধু মিডিয়ার সম্ভাবনাই পরিষ্কারভাবে হাজির করেনি, হাজির করেছে জাতীয়তাবাদের সম্ভাবনাও। আপনার দেশের ক্রিকেট টিম জিতে গেলে লাল টকটকা কালিতে পত্রিকার হেডিং হয় ‘বাঘের গর্জন শুনেছে বিশ্ব’। এর সাইকোলজিক্যাল ইমাজিনেশন ও ইমপেক্ট ভয়াবহ। যাহোক প্রিন্টিং টেকনলোজিই হাজির করেছে রাষ্ট্রের আধুনিক পরিগঠনের পসিবিলিটি। প্রিন্ট মিডিয়া/মাধ্যমকে বলা হয় জাতীয়তাবাদের আর্কাইভ।
গল্পকথকের জায়গায় হাজির হলো সাংবাদিক। এতো দিনে যেহেতু লিবারেল ভেলুজ পশ্চিমা সভ্যতার জোরে চাউর হয়েছে। তাই কিছু নীতি-নৈতিকতাও তৈরি হয়ে গেলো। লম্বা ফিরিস্তি না দিয়ে কোট করি।
‘নিরপেক্ষভাবে কাজ করার বৈশিষ্ট্য সাংবাকিদেরকে গুপ্তচর, প্রচারক ও প্রোপাগান্ডিস্টদের থেকে পৃথক করেছে। অসহনীয় বা অপ্রিয় সত্য বলতে পারার ক্ষমতা সাংবাদিকদের পৃথক করেছে বিনোদনকর্মী থেকে। নিজস্ব বিশ্বাসকে চাপা দিয়ে কোনো ঘটনা বা ইস্যুর বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দেয়ার ক্ষমতা সাংবাদিকদের পৃথক করেছে ধর্মবেত্তা বা রাজনীতিকদের থেকে। আর যথার্থতা ও জবাবদিহিতার গুণটি সাংবাদিকদের পৃথক করেছে গল্পকথকদের কাছ থেকে’ [সাংবাদিকতা, দ্বিতীয় পাঠ: আর রাজি]
সাধারণত মিডিয়ার কাছে আমরা যে নৈতিকতা আশা করি তা লিবারেল নৈতিকতা। এখন প্রশ্ন করতে হবে। পুঁজিবাদের এক নম্বর পেয়ারা জিনিস হলো লিবারেলিজম এবং পুঁজি নিজেকে আধুনিককালের ঈশ্বরে পরিণত করেছে। এখন এই ঈশ্বরও এই সব খেলনা নৈতিকতা মানতে যাবে কোন দুঃখে? ফলে আমাদের যেসকল বুদ্ধিজীবী একই সাথে পুঁজিবাদ বিরোধিতার বিপ্লবী ভূমিকাও দেখান, আবার লিবারেল নসিহতও পেশ করেন, তাদেরকে আপনি কিভাবে পাঠ করবেন? এইটা মিডিয়া থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে লিবারেল নসিহত কী জিনিস তা আর বিস্তারিত না বলি। তারা হয়তো বলবেন, ফ্যাসিবাদের কালে এতোটুকু লিবারেল আচরণই করুণ মরুতে একবদনা জলের মতো। তাদেরকে বলতে হবে, বাংলাদেশে লিবারেল বাড়াবাড়িই এই ফ্যাসিজম টাইপের অবস্থা তৈরি করেছে। এখানে ঐ অর্থে ফ্যাসিজম নাই যদিও। এইটাকে আমরা বলি, কালচারাল ফ্যাসিজম। যাক সেইটা অন্য তর্ক। লিবারেলিজমই যেখানে খোদ পাপের মধ্যে নিমজ্জিত, তাইলে স্বাধীন মিডিয়ার কথা চিন্তা করা ক্যামনে সম্ভব? এইটা অতি গুরুতর প্রশ্ন।
ঠিক এইখানেই এসে মার্ক্সিস্টদের ভূমিকার কথা বলতে হবে। ফাঁকে বলে নিই মিডিয়া আলোচনায় মার্ক্সিস্ট বুদ্ধিজীবিরা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মেহনত করেছেন। তিনারা যেহেতু এই লিবারেল ফাঁকি বোঝেন, তাই মিডিয়াকে সব আধিপত্য কায়েমের যন্ত্র আকারে হাজির হতে দেখে ঝাঁপায়া পড়েন। শ্রেণী, কর্পোরেট, সংস্কৃতি, হেজিমনি- নানা বিষয় যুক্ত করে মিডিয়ার তর্কটা হাজির করেন। তারা আমাদের জানান দেন, একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি যে, মিডিয়া হলো ‘মাধ্যম’, মানে প্রচার যন্ত্র। এইটা কোনোভাবেই গণমাধ্যম না। ‘গণ’ নিয়া গণবিতর্ক আছে। সেখানে নানা জনগোষ্ঠীর ‘গণ’ হয়ে হয়ে ওঠার রাজনীতি ও সংস্কৃতির যে পাঠ তা খুব নিষ্ঠার সাথে না করলে ‘গণ’ ব্যাপারটা রেটরিক বা মুখের কথাই থেকে যাবে। ফলে মিডিয়ার সরল বাংলা হলো প্রচারযন্ত্র।
আধুনিকতার বা মোটাদাগে বললে গ্রিকো-খ্রিস্টান সিভিলাইজেশনের ক্রিটিক না থাকায় তারা মিডিয়াকে গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য তত্ত্ব বাতলাতে থাকে। একের পর এক প্যারাডাইম নিয়া ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। শেষে মনে করে তাইলে ফেসবুক গণমাধ্যম। পরে যখন দেখে দুই দলের সাইবার যুদ্ধ কমিউনালিটি আরও বাড়ায়া তোলে। একদিকে শাহবাগ অন্য দিকে বাঁশেরকেল্লা। মাঝে শুরু হয়ে গেলো হত্যার রাজনীতি।
ফাঁকে নিউ মিডিয়া নিয়ে একটু বলে নেই। বিজ্ঞানের সাথে টেকনোলজির সম্পর্কটা আবার খতিয়ে দেখা দরকার। পশ্চিমা বিজ্ঞানের ভূমিকাটা ছিলো মেসিয়ানিক বা ত্রাণকর্তার। এর সাথে টেকনোলজির যোগটা একটা বিবাদ আকারে দাঁড়াল। বিশেষ করে টেকনোলজি যখন শুধুই ক্ষমতা ও পুঁজির অনুগামী হলো। এই টেকনোলজি সারা দুনিয়ায় বিজ্ঞানের আশির্বাদের মুখোশ নিয়ে হাজির হলো। কিন্তু এর মুখটা হলো ক্ষমতা ও পুঁজির দিকেই। ফলে সে অন্য দেশ ও জনগোষ্ঠীর কালচারাল অবস্থানের সংকট তৈয়ার করল। পশ্চিম, সমাজের অবস্থানের দিকে না তাকিয়ে টেকনোলজির আমোদে মেতে উঠলো। [আশিষ নন্দী: ট্রেডিশন অব টেকনোলজি]
নিউ মিডিয়ার মধ্যে ভাষা একটা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো। কম্পিউটারাইজড নয়া মিডিয়ার মধ্যদিয়ে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ হাজির হয় তা ভাষিক বিদ্রোহের বাইরে অন্য দেউড়ি পার হতে পারে না। চরম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মধ্যেই এর সাফল্য আটকে থাকে। মাঝে মাঝে এর যোগাযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নাগরিক আন্দোলন টাইপের কোনো কিছু গড়ে তোলা সম্ভব হলেও তা বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের বাইরে যেতে পারে না। একমাত্র আরব বিক্ষোভে আমরা দেখলাম মার্কিন আধিপত্যবাদীরা কিভাবে ফেসবুক/টুইট জেনারেশনকে দিয়ে গৃহপালিত একটা বিপ্লব করিয়ে নিতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। এর ফল হলো উল্টা। আলকায়েদা আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে নিলো আরববিশ্বে। নিউ মিডিয়া বা কম্পিউটারাইজড মিডিয়া খুব স্বাভাবিক কারণেই গ্লোবাল পণ্য ব্যবস্থাপনার অনুকূল কালচারই ধারণ করে। এর মৌল চৈতন্যে আছে নব্য উদারনীতিবাদের হাত ধরে যে পুঁজিতান্ত্রিক চরম অবস্থার বিস্তার লাভ করেছে তারই মতাদর্শিক রূপায়ণ। এখন নব্য উদারতাবাদ লোক দেখানো যে মানবতাবাদ, সম্পত্তির অধিকার ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার কথা বলে তার পুরা সুবিধা আসলে পুঁজি ব্যবস্থাপনার হাতেই আটকা পড়ে। কারণ পুঁজি একটা গ্লোবাল ফেনোমেনা। এটা জেনেও আমাদের এখানে উদারনীতিবাদের কথা মন্দের ভালো হিসেবে বলা হয় এবং নাগরিক বোধ ও তারুণ্যকে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু এই নিউ মিডিয়ার ফাঁপরে পড়ে জন্ম হয়েছে নার্সিসাস বা আত্মমগ্ন প্রজন্ম। এরা ফেসবুক বা টুইটের মতো মাধ্যমকে আত্মপ্রচার বা দ্রুত নিজেকে জনপ্রিয় করার জন্য এমন সব কাজ করে বসে, যার জন্য রক্তারক্তি পর্যন্ত ঘটে যায়। পণ্যবাদী উদারনীতিবাদ যেহেতু জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন বাদ দিতে পারে না। ফলে এই কনজ্যুমার জাতীয় চেতনার আন্ডারেই হাজির হয় ফেসবুক/টুইটার/ব্লগ ব্যবহারকারীরা। জনগণের এথিক্যাল ঐক্যের প্রতি কোনো বিবেচনা না রেখে দ্রুত জনপ্রিয় ও নিজেকে নিয়ে বিতর্ক উপভোগ করবার মানসিকতার অসুখে পেয়ে বসে নয়া মিডিয়া ব্যবহারকারী ভোক্তা প্রজন্মকে। জন্ম হয় ‘থাবা বাবা’র মতো ক্যারেক্টারের। ফলে যারা নিউ মিডিয়া নিয়া আশাবাদী তাদের আশার দৌড় শেষ হয় পুঁজির চরম মুনাফার খাতায়।
তাছাড়া টেকনোলজি নিয়া ইনডেপ্থ আলোচনা দরকার আছে। টেকনোলজি ও মানুষের জীবন, সম্পর্ক, যোগাযোগ ইত্যাদির যথেষ্ট পর্যালোচনা আমরা করিনি। সতর্কতার জন্য বলি, আমার এই লিবারেল সমালোচনা যার লেটেস্ট পশ্চিমা সংস্করণ নিউ লিবারেল বা নয়া উদারনীতিবাদ সমালোচনাকে কেউ যেনো বাড়াবাড়ি মনে না করেন। আমাদের জন্য পশ্চিমা সব বিকাশ বা আবিষ্কার হোলসেল মন্দ নয়। কিন্তু এই সব বিষয়কে আমরা যেহেতু যথেষ্ট বুঝবার আগেই ফ্যাসিবাদি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকারে পরিণত হয়েছি, তাই কৌশলগতভাবে লিবারেল অবস্থার কথা অনেকে বলে থাকেন। আমি তার সাথে দ্বিমত করি না। আমি দেখাইলাম যে, এইটার মধ্যে যে সমস্যাটা মূলশাঁস সমেত রয়ে গেছে তার দিকেও নজর রাখাটা জরুরি। তাইলেই আমরা নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর জন্য যুতসই তরিকা বা মতাদর্শ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নৈতিক অর্ডার নির্মাণ করতে পারব। এর জন্য নানা মতাদর্শকে বিচার করার উদাম পরিবেশটাকে অবশ্যই আমাদের স্বাগত জানাতে হবে। আপনি নিজে যদি রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপারে কনভিন্স হন তাইলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই আপনি এই ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন। এটাই স্পিরিট। এটাই জীবকে মানুষে উন্নীত করেছে। তখন আপনি এই সব ভোগবাদি ব্যবস্থার ফাঁক গলে নিজের কাজটা জারি রাখতে পারেন। তখন আপনি এই সব উম্মুক্ত মিডিয়াকে বৈপ্লবিক পরির্বতনের হাতিয়ার করে তুলতে পারেন। তার জন্য রাজনৈতিক-নৈতিক স্পিরিটটা থাকা চাই। এই সভ্যতার দাশ হলে ধংসের হাত থেকে রেহাই নাই।
যা হোক, নয়া উদারনীতিবাদ নিউ মিডিয়ার সম্ভাবনা এতো বেশি উৎসাহিত করার পরেও এগুলা গণচরিত্র পায় না। সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও সর্বোপরি মতাদর্শিক ভিন্নতা প্রকট আকারেই থেকে যায়। তখন মিডিয়া-চিন্তকরা অসহায় হয়ে পড়েন। গণমাধ্যম তৈরি হয় একটা মিথে। কোনো মিডিয়া আর গণমাধ্যম হয়া ওঠে না। এরা খালি জনগণের নামে নিজেদের প্রচারই জারি রাখে। প্রচারব্যবসার জন্য যতোটুকু দরকার ততোটুকু গণমাধ্যমসুলভ আচরণ তারা প্রায়ই করেন। সেটা পলিসিগতভাবে করেন, নীতিগতভাবে নয়। তারপরেও মিডিয়া পাঠে মার্ক্সিস্টদের কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি। মোটাদাগে পশ্চিমে আমরা যে মিডিয়া স্টাডিজ জারি দেখি তার বড় অংশই মার্ক্সিস্ট জ্ঞানকা-ের সিলসিলা ধরে বিকশিত। আমি মার্ক্সিস্ট বলে হোলসেল কোনো ধারার কথা বলছি না। এর মধ্যে নানা ভিন্নতা সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন। এর বাইরেও অনেকে মিডিয়া-বিদ্যায় যথেষ্ট কামালিয়াত দেখাইছেন। চমস্কির কথা তো সবাই জানেন।
মার্ক্সিয় ধারার মধ্যে দুইটা ধারা ছিলো। বিস্তারিত বলবো না। ষাট দশকের দিকে যে ধারাটা গড়ে উঠেছিলো তাকে খুব শক্তিশালী ধারা বলা যায়। এরা সনাতনী নানা বিবেচনায় ব্যাপক পরির্বতন আনেন এবং অবশ্যই এই চিন্তাধারার একক কোনো ঘরানা নাই। আমাদের দেশেও যারা মিডিয়া নিয়া আলোচনা করেন তারাও এই ঘরানার আলোকেই করেন। মোটা দাগে এইটাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এতে নানা নয়া ডিসকোর্স হাজির করা হয়। নানা ডাইমেনশন তৈয়ার হয়, এই যা।
এই ধারা গণমাধ্যমকে উৎপাদন, পুনরুৎপাদন আরও একটু যারা এডভান্স তারা হেজিমনির কথা বলেন। এদের বিশ্লেষণ পলিটিক্যাল ইকোনমির জায়গা থেকে আমাদের খুব কাজে লাগে। এদের মধ্যে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও বহুত্ববাদী ধারার তাত্ত্বিকরা মনে করেন, প্রতিনিধিত্ত্বমূলক ব্যবস্থায় মিডিয়ার পেশাজীবিরা প্রভাবশালী সংস্কৃতি ও রীতিনীতি আত্মস্থ করেন ও সেই সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কথা অতি খাঁটি সন্দেহ নাই। তাইলে এদের কাছেই যখন আপনি গণমাধ্যমের নৈতিকতা আশা করবেন, তাইলে ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে যায় না? বাদ দিলাম পুঁজির আলোচনা। মিডিয়া কালচার বলে যে ব্যাপারটা আছে তা তো মিডিয়াকে কোনো ভাবেই গণমাধ্যম হয়ে উঠতে
দিবে না।
যাহোক, মার্ক্সিস্টদের মিডিয়া আলোচনার মূল পয়েন্টটা সরাসরি মার্ক্স থেকেই নেয়া। আর আমাদের এখানে বুদ্ধিজীবি মানে মার্ক্সিস্ট। ফেকাহশাস্ত্র ভালো বুঝলে তারে বুদ্ধিমান তো দূরের কথা, এইটা যে একটা শিক্ষা তাও স্বীকার করা হয় না। ফলে আমাদের আসলে মার্ক্সিস্ট না হয়ে উপায় নাই। নইলে যে প্রগতিশীলতার ধর্মচ্যুতি ঘটে! আমাদের বিকাশের ক্ষেত্রে এইটা একটা বড় সমস্যা। মার্ক্স বলতেছেন, ‘যে শ্রেণী বস্তুগত উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে, সেই শ্রেণী একই কারণে মনোজাগতিক উৎপাদনের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, এই কারণেই সাধারণত যাদের মনোজাগতিক উৎপাদনের ওপর দখল নাই, তাদের ধ্যান-ধারণা শাসকশ্রেণীর ধ্যান-ধারণার অধীন হয়ে থাকে।’ [মার্কস ও এঙ্গেলস: জার্মান ইডিওলজি]
এইটা মার্ক্সের অল্প বয়সের লেখা। দেখেন এইখানে একটা দ্বান্দ্বিক ফ্যালাসি আছে। যে বস্তুগত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে সেই মনোজগতের ওপর প্রভাব রাখে। আবার যে শ্রেণীর মনোজগতের ওপর দখল নাই, তারা উৎপাদনের মালিক বা শাসকশ্রেণীর অধীন থাকে।
তার মানে মার্ক্স বলতেছেন, দুইটাই লাগবে। ধরে নিতেছেন বা প্রায়রিটিতে রাখছেন, বস্তুর ওপর দখলই চৈতন্য বা মনোজগতের ওপর দখল কায়েমে ভূমিকা নেবে। ফলে বস্তু-নিরপেক্ষ ডিভাইন পসিবিলিটিও যে মানুষের মনোজগতকে প্রভাবিত করতে পারে, শাসনক্ষমতা কায়েম করতে পারে সেই আলাপ মার্ক্সে নাই। ফলে এই নিখিল বস্তুময় বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করা ও পরির্বতনের কাজে মার্ক্স অনেকদূর এগিয়েও মূক হয়ে গেছেন। নতুন সিভিলাইজেশনের পসিবিলিটি দিন দিন মার্কসিজমের জন্য কষ্টকল্পনা হয়ে যাচ্ছে। যখন ডিভাইনটি রাজনৈতিক রুপে হাজির হয় তখন মার্ক্স কাজ করতে পারেন না। অন্যদিকে ইউরোসেন্ট্রিক আধুনিকতার সমস্যা মার্ক্সিজম (মার্ক্স না) শেষ পর্যন্ত ওরিয়েন্টালিস্টই করে রেখেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা বুঝবার ক্ষেত্রে মার্ক্সের চিন্তা ভিন্ন উপায় নাই। তথাপি এর নির্মোহ ক্রিটিক তো করতেই হবে।
ফলে গোড়ার গলদগুলা না মিটিয়ে মার্ক্সিজমের টেবলেট দিয়ে আমাদের অসুখ সারানোর চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়েছে। এই দেশের বামপন্থিরা হয়েছে সবচেয়ে জনবিচ্ছিন্ন। এইটা হলো সাংস্কৃতিক উৎপাদনের গোড়ার সমস্যাটা না বুঝার কারণে। এইটা মিডিয়ার দিকে তাকালে বুঝবেন। এই দেশের সবচেয়ে বড় বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বামপন্থিদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। সে সারাক্ষণ চর্চা করে ক্ষমতাশীল শ্রেণীর সংস্কৃতি আর শ্লোগান দেয় ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

গণমাধ্যম মিথ :
এই কালচারাইজেশন অব পলিটিক্সে মিডিয়া কিভাবে রাজনীতিকে খেয়ে ফেলে তার নজির হলো বাংলাদেশের বামপন্থা। মিডিয়াকে গণমাধ্যম মনে করার যে মিথ তা বাড়ানোর জন্য কিছু রিপোর্টিং করে মিডিয়া বা এই সব প্রচারযন্ত্র টিকে থাকে। গণতন্ত্র যেমন ভোটের নামে টিকে থাকে। আর শোষণের দাঁতে শান দেয়। মিডিয়াও তেমনি গণমাধ্যম ও নিরপেক্ষতার মিথ জারি রেখে মিডিয়ার ভোক্তাশ্রেণীর মধ্যে যেনো কোনো বিপ্লবী শক্তির উদয় না ঘটে তার এক মধুর খেলা জারি রাখে। এর জন্য গড়ে তোলে কিছু সিভিল বুদ্ধিজীবি। এইটাকে ‘হমি কে’ ভাবা বলছেন সিলি সিভিলিটি। এই সিলি সিভিলরা মিডিয়ায় ইস্যুভিত্তিক আলাপে ব্যস্ত থাকে। বিভিন্ন ইস্যুর টেনশন মিনিমাইজ করাই হলো এদের কাজ। এরা তাই জন্মগতভাবেই গণবিরোধী। আর সাংবাদিক ভাইরা এতো স্মার্ট হওয়ার পরেও যা ধরতে পারেন না তা হলো, ‘মিডিয়ায় যে এলিট-আধিপত্য গড়ে ওঠে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের এমনভাবে কোণঠাসা করে দেয়া হয়, আর তা এতো স্বাভাবিকভাবে ঘটে যে, মিডিয়ার সাংবাদিকেরা (যারা প্রায়শ পূর্ণ সংহতি ও সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করেন) কতোগুলো পেশাগত সংবাদমূল্যের ভিত্তিতে ‘বস্তুনিষ্ঠভাবে’ কাজ করেন বলে নিজেদের বোঝাতে সক্ষম হন। কিন্তু বাধাগুলা এতোটা শক্তিশালী, এমন মৌলিকভাবে সিস্টেমের মধ্য থেকে গড়ে-ওঠা যে, সংবাদ-পছন্দের বিকল্প ভিত্তির কথা কল্পনা করাও কঠিন।’ [হারমেন ও চমস্কি: সেলিম রেজা নিউটনের অনুবাদ: মিডিয়া পরিবীক্ষণের সহজ পুস্তক; বাংলা একাডেমি]
মিডিয়া প-িত মার্শাল ম্যাকলুহান ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া’ বইয়ে মিডিয়ার নানা খুঁটিনাটি দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথম অধ্যায়েই তিনি বলছেন, ‘মিডিয়াম ইজ দ্যা মেসেজ’। এইখানে আমি একাডেমিক কোনো আলোচনা করবো না। মাধ্যমই সংবাদ। কথাটা বুঝলে অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়ে যাবো। আমরা সাধারণত মনে করি মিডিয়া হবে সত্য প্রকাশের হাতিয়ার। ন্যায় আর বিবেকের পরাকাষ্ঠা হবে মিডিয়া। নির্মম হলেও সত্য নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মিডিয়া বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব পৃথিবীতে নাই। মিডিয়া নিজেই একটা চরিত্র ধারণ করে বসে। তারপরে সে তাঁর চরিত্রের বাজারজাত করে। কালচারাইজ করে তার চরিত্রকে। এটা বাজারের স্বার্থে না করে রাজনীতি সংস্কৃতি ও অন্য নানা কারণে করতে পারে। ফলে মিডিয়াকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাববার আর কোনো সুযোগ নাই। ঘটনা সংবাদ হতে যে কারণে পৃথক ঠিক একই কারণে প্রচারযন্ত্র সার্বজনীন সত্য থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য। মিডিয়ার কাছে ডিজিটাল মিথটা সত্য বা মিথ্যাও নয় কিন্তু মিডিয়া এইটা এসেনসিয়ালাইজ করে এটার ভ্যালুকে সে এমনভাবে হাজির করে, সমাজে নয়া কালচারাল মেরুকরণ তৈয়ার হয়।
কাজেই এরা একটা প্রপাগান্ডা মেশিনারির চাকুরে কিন্তু নিজেদের মনে করেন জাতির বিবেক। এইটা গোটা মিডিয়াবিদ্যার দিক থেকে বলা হলো। বাংলাদেশে ব্যাপারটা কি রকম! বাংলাদেশে ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ ব্যাপারটা কিভাবে হাজির আছে তার আলোচনা না করে মিডিয়াকে বোঝা যাবে না। বাংলাদেশে তথাকথিত সেকুলার আধুনিক যে সাংস্কৃতিক আধিপত্য জারি রয়েছে। আর আওয়ামী জবরদস্তির যে রাজনীতি তা এই সাংস্কৃতিক আদর্শের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। ফলে খুব সহজেই মিডিয়া কালচার আর আওয়ামী কালচার এর একটা যোগসূত্র তৈয়ার হয়েছে। সমাজের এই দিকটি বিশদভাবে না বুঝলে আমরা এখনকার মিডিয়া কিভাবে গোলামির গুন্ডায় পরিণত হলো তা ধরতে পারব না।
আমাদের প্রতিটি মিডিয়া-প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবসার স্বার্থে জড়িত। সাধারণত বড় বড় ব্যবসায়ীর কাছে মিডিয়া হলো অন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারে কিছুটা নিজের ব্যবসার অনুকূলে রাখতে একটা মিডিয়া-প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার চাঁদা সেভ করে দিতে পারে। সরকারও সহজেই এদের বাধ্য করে ফেলতে পারে, নগ্ন প্রোপাগান্ডায় নেমে যেতে। আর বাড়াবাড়ি করলে সহজেই বন্ধ করে দেয়া হয়। এর জন্য কিছু আইন রেডিমেট তৈয়ার করে রাখা আছে। আমাদের প্রতিটি সম্পাদক বা মিডিয়াকর্তা আসলে মালিকপক্ষের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করে। ফলে খুব সহজেই সাংবাদিকতা এখানে পরিণত হয় কতিপয় মানুষের ভাবমূর্তি নির্মাণ ও কতিপয় মানুষের ভাবমূর্তি বিনাশের একটা উলঙ্গ খেলায়। এর মধ্যে যাদেরকে আপনারা মনে করেন ‘মানসম্পন্ন’ মিডিয়া। এরা বাংলাদেশে দাতা সংস্থাদের গোলাম ছাড়া আর কিছুই না। এরা মূলত ডেভলপমেন্ট ডেমোক্রেসি বা ভিক্ষার গণতন্ত্র পয়দার আঁতুড়ঘরের ভূমিকা পালন করে। এটা করতে যেয়ে তারা যে কালচারাল রাজনীতি প্রমোট করে তার কর্পোরেট জাতীয়তাবাদী চেহারার সাথে আপনারা পরিচিত। এর আবেগী প্রোপাগান্ডা ফ্যাসিবাদি সংস্কৃতির দোসর। তাঁর চরিত্র হলো উপনিবেশী সংস্কৃতির কিন্তু দায়িত্ব হলো পশ্চিমা দাতাসংস্থা বা কতিপয় এম্বাসির বক্তব্যকে সাংবাদিকতার মোড়কে হাজির করা। এটা ডিজিটাল, প্রযুক্তি, প্রগতি, চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদির এমন এক মনমাতানো প্রচারণা ও আবেগঘন কণ্ঠস্বর নিয়ে হাজির হয় মধ্যবিত্ত এর সাথে দ্রুত নিজের নাড়ির যোগ ঘটিয়ে ফেলে ‘জাতে’ উঠে যায়। যে মধ্যবিত্ত বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রের গণহত্যাকে রাজনৈতিক বিজয় মনে করে। কিছু শিশুতোষ লোক হাজির হয় বুদ্ধিজীবি হিসেবে। কিছু লেখক, চলচ্চিত্র কর্মী, অভিনয়তারকা, শিল্পীকে এরা শামিল করে নিজেদের প্রোপাগান্ডা মেশিনে। এইটা হয়ে ওঠে মেইনইস্ট্রিম। অন্য মিডিয়াগুলাও এর ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে গণমাধ্যমের শক্তি ঠাওরে এই দিকেই যাত্রা শুরু করে।
আধুনিকতার মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে মিডিয়া তারই মুরুব্বি হিসেবে নিজেরে হাজির করে। সে ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে চলতি মতাদর্শের নিয়মতান্ত্রিক মত-দ্বিমতের ভিতরে থেকে অভিভাবকের মতো আচরণ করে। ফলে রাজনৈতিক পসিবিলিটি বলে যেটা বিরাজ করে তা সবসময়ই মিডিয়া পরিম-লের বাইরে থাকে। যখন কোনো কমিউনিটি হাজির হয় (হেফাজতের আগমনে সময় আমরা যা দেখেছি) তখন প্রচারযন্ত্র কেবল হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাদেরকে কেন্দ্র করে সমাজে যে উত্তেজক অবস্থার সৃষ্টি হয় মিডিয়া তখন তার চরিত্রের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিরপেক্ষতার ভণিতা করে। এইটা সংবাদ ব্যবসার মধ্যে থাকলে করতে হয়। কিন্তু পারসেপশনের বেলায় প্রচারযন্ত্রের গোমরটা ফাঁস হয়ে যায়। মিডিয়ার পারসেপশন আর জনসমাজের পারসেপশনের মধ্যে যে ফারাক তা অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মিডিয়ার হাজির করা বাস্তবতা প্রায়ই শিক্ষিত বা বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিত্তকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক বিকাশ হয় খুব নিম্নশ্রেণীর।
অন্যদিকে এর বাইরেও যে বিশাল জনগোষ্ঠী তাঁরা আধুনিকতার এই যোগাযোগ জালের বাইরেও নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম। এর কারণ হলো মতাদর্শিক বিকাশ প্রচার যন্ত্রের প্রোপাগান্ডা দিয়া প্রভাবিত করা যায় না। ফলে সমাজের বিভাজন সামাজিক স্তরে থেকেই যায়। খেয়াল করে দেখুন, কাভারিং শাহবাগ আর কাভারিং হেফাজতের মধ্যে মিডিয়ার ভূমিকাটা কি ছিলো। শাহবাগের কাভারেজে মিডিয়া যে মনোভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে মনে হয়েছে এটা যেনো ঠিক তাঁদের নিজেদের যুদ্ধ। অন্য দিকে হেফাজত কাভারিং বুঝতে হলে এতো কথার দরকার নাই। এডওয়ার্ড সাইদ কাভারিং ইসলাম নিয়ে যে পারসেপশন দিয়েছেন তা দিয়েই বুঝা যাবে। ইসলামকে পশ্চিমের মতো আমাদের মিডিয়াও একটা ওরিয়েন্টাল ব্যাপার মনে করে। ফলে মেইনস্ট্রিম প্রোপাগান্ডা মেশিনারি সাংস্কৃতিক ভাবে, মতাদর্শিক ভাবে এন্টি ইসলামি। হেফাজতকে কোনো ভাবেই তাঁরা নাগরিক আন্দোলনের মর্যাদা দিতে পারে না। এই কমিউনিটি মিডিয়ার কাছে ‘অপর’ হিসেবে ধরা দেয়। তাঁর কাছে নাগরিক আন্দোলন হলো এনজিও বুদ্ধিজীবিতা। ফলে ধর্মযুদ্ধের কালে মিডিয়ার ভূমিকা কি হবে তা আর ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।
কাজে কাজেই বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের জন্য এক নম্বর কৃতিত্ব হলো মিডিয়া বা এইসব প্রচারযন্ত্রের। এখন এগুলোকে সহজেই বাগে এনে ক্ষমতার রাজনীতির যে গণবিচ্ছিন্নতা তা আড়াল করে জবরদস্তির শাসন টিকিয়ে রাখাটা খুবই সহজ কাজ। ফলে মিডিয়ার সহযোগে এই ক্ষমতার বিকার হয়ে উঠবে পাগলা কুত্তার মতো।

২. ক্ষমতার বিকার :
এতোক্ষণের আলোচনা আমাদের অনেক ভাবনার খোরাক জোগাল। এইবার আমরা ক্ষমতা প্রশ্নটি বোঝার চেষ্টা করব। মিডিয়া তাত্ত্বিকদের অগ্রসর অংশ মনে করেন। হেজিমনি তৈরি করতে মিডিয়া শাসকশ্রেণীর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়। হেজিমনি নিয়া দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান তাত্ত্বিক গ্রামসির লাই ধরেই এই সব আলোচনা হয়ে থাকে। গ্রামসির সাথে দ্বিমতের লোকের অভাব নাই। তথাপি হেজিমনির কথাটা একটা লেবেলে সত্য বলে কম বেশি সবাই মেনে নিয়েছে। কিন্তু হেজিমনি বললেই সব ব্যাপার পরিষ্কার বুঝা যায় না। কারণ গ্রামসি শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন না। এই আধিপত্য কোথায় অবস্থান করে? রাষ্ট্রে না সিভিল সমাজে? কারণ গ্রামসি পুরানা ক্লাসের জায়গা থেকে ব্যাপারটাকে দেখেছেন। যা এখন কর্পোরেট জমানায় গ্লোবাল ফেনোমেনা আকারে পুঁজির চরম অবস্থার মধ্যে ক্লাসের আলোচনাও আগের জায়গায় নাই। তবে গ্রামসিউত্তর চিন্তকরা মনে করেন এই হেজিমনি বা আধিপত্য অবস্থান করে সিভিল সমাজেই।
মোট কথা গ্রামসির লেখায় আধিপত্য ধারণার আমদানি হলেও এটা নিয়ে বিস্তারিত কোনো আলোচনা গ্রামসিতে নাই। ফলে পরবর্তী সময়ে এই ধারায় নানা বিষয়ের আলোচনা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। সাবল্টার্ন বিদ্যার ধারাও গড়ে উঠেছে এই পথ ধরেই। এটা নিয়ে এখানে কথা বলব না। ক্ষমতা প্রসঙ্গেই সীমিত থাকবো।
‘ক্ষমতার বিকার’ কথাটা অনেক সময় রেটরিক অর্থে ব্যবহার করা হয়। কথাটা নিয়ে অনেক অস্বচ্ছতাও আছে। যেখানে রাজনীতি কথাটা ক্ষমতার প্রশ্ন ছাড়া কোনো অর্থই তৈয়ার করে না সেখানে ক্ষমতার বিকার কথাটা যে অস্বচ্ছতা তৈয়ার করে তা আগেই পরিষ্কার করা জরুরি।
ক্ষমতার দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য -এই দুই রূপই আছে। সব ক্ষমতাকে আমরা দৃশ্যমান ভাবে বিরাজ করতে দেখি না। যেমন জ্ঞান যে ক্ষমতা, এইটা আমরা কি সব সময় দৃশ্যমানভাবে দেখি? না দেখি না। মার্ক্সের পরে এই জ্ঞানের একটা ব্যবহারিক বা বলা যায় চর্চার জায়গা পরিষ্কার হয়েছে। ফলে জ্ঞানের ভূমিকায় একটা চর্চা বা প্রাকটিসমূলক ব্যাপার হাজির হয়েছে। এর সাথে সাথে আমরা ক্ষমতার বিকার কথাটা কিভাবে বুঝব তাইলে? মুশকিল কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।
ক্ষমতার সর্বব্যাপী বিস্তারের দিশাটা সহজে বুঝা যায়। এই সর্বত্রবিচারী ক্ষমতার সাথে শাসনপদ্ধতির যে যোগ তার নিরিখে ক্ষমতার বিকার কথাটা ভালোভাবে বুঝা সম্ভব হবে মনে হয়। এর সাথে জীবন যাপন, অর্থব্যবস্থা, সংস্কৃতি, উৎপাদন ও ইতিহাসের আলোচনাও চলতে পারে। ফলে ক্ষমতার বিকার কথাটা একটা নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে আলোচনা করা হয়। তারপরেও শুধুমাত্র তথাকথিত গণতান্ত্রিক বিচ্যুতির মধ্যে ক্ষমতার বিকার আবিষ্কার করার পপুলার ফ্যাশন সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। খোদ ক্ষমতা কি জিনিস তার আলোচনা বহু বিস্তৃত। কিন্তু বিকারটা আমরা নানা কিছুর সাপেক্ষে দ্রুতই ধরে ফেলতে পারি। রাষ্ট্র, আইন, আদালত এমনকি ইতিহাসের বয়ানের মধ্যেও এই বিকার বিরাজ করতে পারে। এইটা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন কিছু না।
কিন্তু ক্ষমতা কি কারণে ক্ষমতা? এই আলোচনা অনেক পরিসর দাবি করে। এইটা অন্যখানে হবে।
ক্ষমতার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মিশেল ফুকো। ফুকো আমাদের দেখান ক্ষমতা কিভাবে সর্বত্রগামী হয়। পাগলা গারদ থেকে যৌনবিধান সবজায়গায় ক্ষমতা কিভাবে হাজির থাকে। খুব মাইক্রো লেভেলে ফুকো এগুলা নিয়ে কথা বলেন। আধুনিক-উত্তর কালে ক্ষমতা কেবল আর রাষ্ট্র বা কতিপয় শ্রেণীর আধিপত্য ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষমতা সামাজিক, ব্যক্তিগত এমনকি দৈনন্দিন নানা খুঁটিনাটির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। পরিবার, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, সংবাদপত্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এইসবের ভেতর দিয়েও ক্ষমতা জনগণের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। ফুকোর কথাটা হচ্ছে আধুনিক ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা বা সার্বভোমত্বেও সনাতনী ছকে চলে না। তা চলে অনুসাশন বা ডিসিপ্লিনের ছকে। ফুকো মজার একটি শব্দ হাজির করেছেন। তিনি বলছেন ‘গভর্নমেন্টালিটি’। আমি এতো কথা বলছি এইখানটায় আসার জন্যই। এই গভর্নমেন্টালিটির সাথে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ফ্যাসিজমের শিকারে পরিণত হওয়ার বিষয়টি মিলিয়ে নিতে চাই।
এই অনুশাসন প্রীতি বা গভর্নমেন্টালিটিই সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রকে সম্ভব করে তুলেছে। আমরা আর খুঁজতে যাই না আদৌ ক্ষমতায় কেউ আছে কি না? আমরা বুঝতে পারি না ক্ষমতা কোথায়? সার্বভৌম ক্ষমতা খুব মূর্ত বিষয়। কিন্তু গভর্নমেন্টালিটি আর কোন মূর্ত বিষয়ের ধার ধারে না। সে এতোই নিয়মের দাসে পরিণত হয় যে ক্ষমতায় কে আছে সে ভুলে যায়। ভারতীয় বাহিনী নামল না বাংলাদেশের র‌্যাব গুলি করে মারলো তাতে কিছু আসে যায় না। সে নিয়মের গোলামে পরিণত হয়। এই নিয়মই গণজম আকারে হাজির হয়ে গোটা জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দেয় আধুনিকতার জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধে। আমাদের এখানে ব্যাপারটা পশ্চিমের মতো করে ঘটে না। আমাদের শাসন কাঠোমো পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত উপনিবেশি। শুরুতে হমি কে. ভাবা থেকে একটা কোট করেছি।
ইম্পায়ার এর সাথে ন্যাশনের সম্পর্কটা বোঝা দরকার। আমাদের মতো দেশ যে কারণে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে না তার হদিস করাটা অতি জরুরি। আমাদের এখানে থাকে রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট। এর কিছু পোষ্য সিভিল ক্যাডার থাকে। এরা করে কি, এই পরগাছা সরকারের স্বাধীনতাকে পরিগঠন করে ইম্পায়ারের নীতির আলোকে। ফলে এই সব সরকার যতো বেশি জাতীয় চেতনার কথা বলে ততোই গণবিচ্ছিন্নতা বাড়ে। বাংলাদেশের এই অবস্থাকে বলা যায় কলোনিয়ালিস্ট গভর্নমেন্টালিটি। আর এটাই আমাদের মাঝে গেড়ে বসেছে। হমি কে. ভাবা বলছেন, ‘উনিশ শতকের প্রতিনিধিত্বকারী (উপনিবেশী) লিবারেল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী বয়ান যখন চিন্তার সংঙ্কটে পড়ে স্বাভাবিকভাবেই এটা তার রাজনৈতিক ভাষ্যের যোগ্যতা হারায় এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের রাজনৈতিকতাকেও বিনাশ করে। তখন সে ভৌতিক গণতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি করে। খোদ গণতন্ত্রই যখন রহস্যময়, তখন একটি দেশ শাসিত হয় অন্য আর একটি দেশের স্বার্থের আলোকে। গণতন্ত্রের পোশাকে আসে স্বৈরতন্ত্র।’
ভয়াবহ ব্যাপার হলো এই কলোনিয়াল মেন্টালিটির সামাজিকীকরণ করা হয় উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের নামে। আর এর প্রধান হাতিয়ার হলো মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্র। এই সামাজিকীকরণই ফ্যাসিজমকে সম্ভব করে তোলে। এই ফ্যাসিজম ইম্পায়ারের সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নিজ দেশে শুরু করে দেয় ধর্মযুদ্ধ। বাংলাদেশ এগিয়ে যায় ওয়ার অন টেররের প্রকল্পের পথে। ফলে ক্ষমতার বিকার এর সাথে মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্রের সম্পর্কটা বুঝতে পারা খুব কাজের কাজ হবে বলে মনে করি। এই প্রসঙ্গে ফিরে লেখা শেষ করব।

বুদ্ধিজীবীতা ও মিডিয়ার ভূমিকা :
মিডিয়ার বর্তমান ভূমিকাটা নিয়া জনমনে ক্ষোভ আছে। সেটা অন্যায় কিছু না। কিন্তু সমাজের বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হলো মিডিয়া কেনো এই ভূমিকায় উপনীত হলো। বাংলাদেশের মিডিয়ার চরিত্র এমন কেনো? মিডিয়া কিভাবে বাধ্য হলো এই অবস্থায় হাজির হতে তা খুলে খুলে দেখিয়ে দেয়া। কিভাবে তার প্রজেক্টের মধ্যেই গণবিরোধিতা হাজির থাকে তা ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখানো। এই কাজও নিদারুণভাবে অনুপস্থিত। মিডিয়া যে লাইনে সংবাদ প্রচার করে তার সাথে আমাদের এই মুহূর্তেও সঙ্কটের ফারাকটা আকাশ আর পাতাল। কথাটা খুলে বলি।
অনেক মানুষের জন্য অবস্থাটা এ রকম যে, কোনো ইস্যু মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত সেটা আর ইস্যুই মনে করছে না। আমরা দেখছি মিডিয়া মিথ্যা বলছে তারপরেও আমরা সেই খবরই পড়ছি। এর মধ্যেই রাজনীতির কর্তব্য কর্ম খুঁজছি। চমস্কি যেমন বলেন, যেসব দেশে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট আমলাতন্ত্র থাকে সেই সব দেশে মিডিয়া আধিপত্যশীল এলিটদের হয়ে কাজ করে। মানে মিডিয়া প্রচারযন্ত্র হিসেবে উলঙ্গ প্রতিযোগিতায় নামে। বিনোদন ও কিছু ব্যালেন্সিং রিপোর্ট করে গণমাধ্যম মিথটাও জারি রাখে। যাতে জনগণের সাথে প্রতারণাটা ধারাবাহিকভাবে করা যায় এবং লসপ্রজেক্ট না হয়। পাবলিক মুখ ফিরিয়ে নিলে তো আমছালা সবই যাবে। ফলে প্রচারযন্ত্রগুলা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যমূলক প্রচারের দায়িত্ব পালন করে। আর সত্য প্রচারের ধূয়া তুলে ব্যবসা করে যায়। মিডিয়া হলো প্রতারণামূলক সত্যের ব্যবসা। এখানে গণতন্ত্রের সাথে মিডিয়ার মিল শতভাগ।
এই সত্যের ব্যবসায় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সঙ এর মতো। কিছু প্রচারযন্ত্র নির্দিষ্ট কিছু লোকদের জাতির বিবেক হিসেবে হাজির করে। এই বিবেক আবার দুই পক্ষের একটা আওয়ামী বিবেক আর একটা বিএনপি বিবেক। এই দুই দলের মধ্যে আবার ঝগড়াও লাগে। সেটা আবার মিডিয়া ব্যাপক কাভারেজ দেয়। সরকার সব মিডিয়া নিজেদের দখলে নিয়ে নিলো। যেগুলা দখলে মানে অনুগত্যের বাইরে চলে গেল সেগুলা সব বন্ধ করে দেয়া হলো। বিরোধীদলের লোকজন চিৎকার করে বললেন, সরকার গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছে।
সরকার আসলে যা করছে তা হলো নিজেদের প্রচারযন্ত্র রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। আইন, সংবিধান শুধু নয় ইতিহাস, চেতনা সব আপনি নিজের স্বার্থ আর দেশের স্বার্থকে একাকার করে সাজালেন। সেখানে কিছু বিরোধী মিডিয়া রাখার তো আর দরকার নাই। ছদ্মবেশী গণতন্ত্রের মোড়কটা খুলে ফেললে এখন আর সমস্যা নেই। উপরের আলোচনা থেকে দেখছি মিডিয়া কালচার আর আওয়ামী কালচার কতো গভীর ঐক্যের মধ্যে বিরাজ করে। বিএনপি তো উপরে উপরে মিডিয়া করেছে। নিজেদের জন্য দরকারি সাংবাদিকও তৈরি করেছে। কিন্তু মিডিয়া কালচারটা আওয়ামীই রয়ে গেছে। এটা এখন ন্যাশনাল কালচার! ফলে এখন মিডিয়ার দ্বারা ফ্যাসিবাদের বয়ানটা পাকাপোক্ত করা সবচেয়ে মামুলি কাজ। সাংবাদিকরা কাগুজে বাঘের মতো কিছুদিন তড়পাবে পরে চাকুরি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থ, সব মিলে মানিয়ে নেবে।
একজন বললেন, গণমাধ্যমে তো বোমা মারা উচিৎ! কারণ কী? কারণ, আপনারা বিরোধী গণমাধ্যম বন্ধের সময় প্রতিবাদ করেননি। সরকার পক্ষের বুদ্ধিজীবী বললেন, যিনি বোমা মারার কথা বলেছেন তিনি পাগলও নন শিশুও নন। এই বক্তব্যকে তিনি বিপদজনক মনে করে সরকারকে ডাক দেন ব্যবস্থা নিতে।
মিডিয়ার হাজির করা বাস্তবতার সাথে বিশাল জনগোষ্ঠী যখন কোনো মিল খুঁজে পায় না এবং সে জনগোষ্ঠী যদি আন্দোলনের মাঠে থাকে তাইলে মিডিয়াকে তারা নিরপেক্ষ বলে মাফ করে দেয় না। বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার ঘটনা তখন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপি-জামাত কি সেই গণশক্তি? উত্তর হলো না। এরা কি গণস্বার্থের শাসন কায়েম করতে আন্দোলন করছে? দেশের বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন গণমাধ্যমে বোমা মারা উচিৎ তখন একটা মুশকিল তৈয়ার হয়। প্রথম কথা হলো কে কাকে বোমা মারছে? গণমাধ্যম তো গণশর্ত পূরণ করে নাই। আমাদের দেশের দুই দলের রাজনৈতিক এজেন্ডার মধ্যে প্রচারযন্ত্রের স্বাধীনতার তর্কটা তো শুরুই হয় নাই। তাইলে বোমার কথা কেমনে বলবো? সরকার তার বিরুদ্ধের মিডিয়া বন্ধ করে দিছে। সব মিডিয়ায় বিটিভির চরিত্র আছর করে বসেছে। এই অবস্থা তো নতুন কিছু না।
বিএনপি কী করেছে? তাদের দলীয় লোকদের মিডিয়া মোগল বানিয়ে দিয়েছে। প্রচারের রাজনীতির একচ্ছত্র দখলদারি যে কোনো কাজে আসে না তা কোনো দলই আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না। গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য নিদেনপক্ষে মিডিয়ার জন্য একটা নীতিগত জায়গা আমাদের লাগবে। প্রচারযন্ত্রের আওয়ামী ভূমিকা আর বিএনপি ভূমিকার মধ্যে কোন ফারাক নাই। আমাদের তর্ক তুলতে হবে মিডিয়াকে কেমনে সম্ভব করে তোলায় যায় সেই দিকগুলা নিয়া। বাংলাদেশ গণমাধ্যমের সঙ্কটে নিপতিত হয়েছে। প্রচারযন্ত্রের সন্ত্রাস গণমাধ্যমের সম্ভাবনাকে মিথে পরিণত করেছে। আমার দেশ যেমন একটা প্রচারযন্ত্র একাত্তর টিভি বা জনকণ্ঠও প্রচারযন্ত্র। এখন আপনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে একজন দাঁড়ালেন আমার দেশের ছায়াতলে অন্যজন ৭১ এর পতাকাতলে! আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা গণমাধ্যম মিথের শিকার হয়ে গণবিরোধী রাজনৈতিক দলের মেরুকরণে পড়ে গেছেন।
বাংলাদেশে বিদ্যমান দলগুলো গণতন্ত্রের রহস্যময়তার জন্য টিকে আছে। কিন্তু জনগণের কাছে গণতন্ত্র, জাতীয় চেতনা এগুলার আবেদন ফুরিয়েছে। মিডিয়ার সংবাদও আর মানুষকে প্রভাবিত করে না। তবুও খবর দেখা অভ্যাসবশত জারি থাকবে। নতুন নতুন বিতর্ক ও মোড় উপভোগ করবে মানুষ। বিরোধী প্রচারযন্ত্র সবই বন্ধ করা হয়েছে। দেরিতে হলেও ইনকিলাব বন্ধ করা হয়েছে। তথাকথিত গণতান্ত্রিক সৌজন্যতাও আর থাকছে না। দ্বিদলীয় প্রচারণার পরিবর্তে একদলীয় প্রচারণাই ন্যায় আকারে জারি করা হলো। সমাজে এর প্রতিক্রিয়া এতো ক্ষুদ্র হয়েছে যে নিজেদের রাজনৈতিক চরিত্রের ফাঁপা রূপটি মধ্যবিত্ত আর লুকাতে পারলো না। ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন, ঐতিহাসিক নির্বাচন এই সবই মিডিয়ার অবদানে সম্ভব হয়েছে। ফলে এখনকার ক্ষমতার বিকারটা বহন করছে মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্র।

গণমাধ্যম ও গণক্ষমতা
লেখা শেষ করি, ক্ষমতার বিকার কথাটা বুঝলে ক্ষমতার আকার বা পাল্টা ক্ষমতাও বুঝতে পারব। উদাহরণ দিয়ে বলি, গত ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক নির্বাচন হয়েছে। শুধু মিডিয়াতে এই নির্বাচনের প্রোপাগান্ডা জারি ছিলো। পাবলিক (আ.লীগের বাইরে) রেসপন্স করে নাই। কিন্তু ২৪ জানুয়ারি প্রথম আলো ‘গণতন্ত্র কোন খেলা নয়’ নামে হাসান ফেরদৌসের একটা সম্পাদকীয় নিবন্ধ ছেপেছে। এতে বলা হচ্ছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে নাকি গণতন্ত্র রক্ষা হয়েছে। বলা হয়েছে, শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখার কৃতিত্ব সরকারকে দিতে হবে। বোঝেন অবস্থা! এই হলো ভোটবাদি গণতান্ত্রিক ক্ষমতার বিকার। মিডিয়া এটা পোক্ত করছে। এখন পাল্টা গণক্ষমতার কথা তো আমরা বলি সেটা কোন জায়গা থেকে বলি?
আমরা বলি, গণক্ষমতা হলো সেই ক্ষমতা যা বাংলাদেশের জনগণের নৈতিক মূল্যবোধের ভেতর থেকে উঠে আসবে এবং এই নৈতিক এজেন্সিই ক্ষমতার অধিকারী হয়ে সে যেই নৈতিকতার কারণে ‘গণ’ সেই ন্যায়কে ক্ষমতা চর্চার ধারাবাহিকতার মধ্যেও ধরে রাখবে। বলাই বাহুল্য, এটাই বিপ্লবী রাজনীতির কর্তব্য। এখন এটা পশ্চিমা গণতন্ত্রের নামে না ইসলামের নামে হবে সেটা আগাম বলার কিছু নাই। যে নামেই হোক গণক্ষমতাকে নৈতিক এজেন্ট আকারেই হাজির হতে হবে। কাজেই পাবলিক এথিকসকে ধারণ করে ক্ষমতা যখন ইনসাফের প্রতীক আকারে দাঁড়াবে তখনই তা গণক্ষমতা হয়ে উঠবে। এভাবেই আমরা রুখে দিতে পারি ক্ষমতার বিকার।
আর গণক্ষমতার উত্থান ছাড়া গণমাধ্যম কথাটা মিথ ছাড়া আর কিছু না। প্রথম আলো যেমন এই ফ্যাসিবাদি জুলুমবাজি ক্ষমতার বিকারকে গণতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র রক্ষার মহান অর্জন বলে সাফাই গাইছে। তেমনি মুষ্টিমেয় কিছু লোকের স্বার্থের দিক থেকে পরিচালিত প্রচারযন্ত্রকে গণমাধ্যম বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতার বিকারকে রক্ষা করছে এই সব প্রচারযন্ত্র। কাজেই গণক্ষমতার কাজ হলো পাবলিক মোরালিটিকে মাথায় রেখে পাল্টা ন্যায় বা ইনসাফ ভিত্তিক ক্ষমতা তৈয়ার করে ক্ষমতার বিকারকে বিনাশ করা ও গণমাধ্যমের সম্ভাবনার পথকে পরিষ্কার করা।
মনে রাখতে হবে, সরকার যখন নিজেকে মিথ্যা প্রচারণার প্রতিযোগিতায় সামিল করবে, তখনই সে বিপদগ্রস্ত হবে। শাসক যখন মনে করে সে বিরোধী প্রচারণা বন্ধ করে নিজেদের পক্ষে বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য যে কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারে। তখন বেপরোয়া অবস্থার সৃষ্টি হয়।
আনন্দের কথা হলো, এই প্রচারণা কোনো দিনও বিপ্লবী কোনো সংঘ বা মতাদর্শকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না। ফলে এই সব ‘ফসকা গেরো’ আমরা দ্রুত খুলে ফেলতে পারবো, যদি মিডিয়ামুগ্ধতা বা প্রচারমুগ্ধতা কাটিয়ে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মতাদর্শিক সংগ্রামে নিজেদের শামিল করতে পারি। এই কাজগুলো দ্রুত করতে পারলেই দেখব মিডিয়া নিজেই দিন দিন ক্ষমতার বিকারকে এতো প্রকটভাবে মানুষের সামনে হাজির করছে যে, মানুষের আলস্য ভেঙ্গে যাচ্ছে। একতরফা প্রচারসন্ত্রাস ধৈর্যের বাঁধটা আলগা করে দেয়। এভাবেই ফ্যাসিবাদ ও ক্ষমতার বিকার নিজের ধ্বংস তরান্বিত করে গণক্ষমতার সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রয়োজন আকারে হাজির হতে বাধ্য করে।