ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে Pen is mightier than the sword মানে হলো কলম তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী। এই প্রবাদকে ইতিবাচকভাবেই দেখে আসছিলাম। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রবাদের অর্থ তলিয়ে দেখতে হচ্ছে। একজন সাংবাদিকের কলম দিয়ে যদি সত্যি কথা বের হয় তাহলে দুর্বৃত্ত দুর্নীতিবাজদের স্বার্থ কচুকাটা হয়। কিন্তু সেই কলম যদি এই দুর্বৃত্ত আর দুর্নীতিবাজদের পক্ষে কথা বলে, আর এদের স্বার্থ হাসিল করার কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে কচুকাটা হয় নিপীড়িতরাই। অস্বীকার করার উপায় নেই কলম আসলে একটি অস্ত্র, যে অস্ত্রটা নিপীড়ন-নির্যাতনের প্রতিবাদে ব্যবহার করা যায়। আবার বিপরীতেও দুর্বৃত্ত আর সন্ত্রাসীদের দ্বারাও কলম ব্যবহার হতে পারে, হচ্ছে।
আজকে সাংবাদিকদের ‘সাংঘাতিক’ বলে গালি দেয়া হচ্ছে। কেনো? সাংবাদিকরা যদি দুর্নীতিবাজদের দলবাজদের পকেটে ফেলা রাখা রুমাল হয়ে যান, আর প্রয়োজন পড়লে সেই দুর্নীতিবাজদের দলবাজের সর্দিগর্মি মুছে দিতে সদা প্রস্তুত থাকেন, তাহলে সেই সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা কেমন হবে পাঠক সেটা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন। কেউ মিডিয়া গড়ে তোলে সাংবাদিকতার নেশা থেকে আর কেউ গড়ে তোলে প্রোপাগান্ডার মেশিন হিসাবে। মিডিয়া সব ক্ষেত্রেই মিডিয়াম্যানদের কথায় চলে। অনেক মিডিয়া হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের নিপীড়নকে ন্যায্যতা দেয়ার হাতিয়ার। একটি দলের একটি মতের প্রচারযন্ত্র। গণমাধ্যম আর গণমাধ্যম নেই এটা এখন দলমাধ্যম, মতমাধ্যম।
এই দলের বা মতের বিপক্ষে গেলে মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। আমার দেশ পত্রিকার প্রেস অবৈধভাবে বন্ধ করেছে সরকার, কেননা এই পত্রিকা বিরোধীমতের খবর প্রকাশ করে। আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে হাস্যকর কিছু মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ৫ মে রাতের অন্ধকারে হেফাজতে ইসলামের উপর যখন ১০ হাজার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অস্ত্রধারীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই রাতেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল দুটি টিভিচ্যানেল। আজ পর্যন্ত যেগুলো খুলে দেয়া হয়নি। সবচেয়ে মজার হলো, একেকটি মিডিয়া নিহতদের সংখ্যা একেকরকম প্রকাশ করেছে। সরকারি হিসাবে বলা হয় ১১ জন আর সরকার দলের মন্ত্রীরা বলতে থাকেন কেউ নিহত হয়নি। এইসবই প্রমাণ করে সেখানে অবশ্যই মানুষ মরেছে। রাষ্ট্র সেই হত্যাকা- সংঘটিত করেছে। এই বিষয়ে রিপোর্ট প্রদান করলে মানবাধিকারকর্মী আদিলুর রহমান শুভ্রকে গ্রেফতারও করা হয়। এই যখন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা তখন রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়ে পড়ে কিছু প্রোপাগান্ডা মেশিন। বেশ কিছু মিডিয়া রাষ্ট্রের সেই চাহিদা পূরণ করছে বেশ ভালোভাবেই।
এটা পরিষ্কার নির্মূলের এই রাজনীতিতে অধিকাংশ মিডিয়া মদদ জোগাচ্ছে। রাষ্ট্রের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে কিছু মিডিয়া। সম্প্রতি কবি দার্শনিক ফরহাদ মজহার এক টকশোতে বলেছেন, ‘অনেকগুলো মিডিয়া দুর্বৃত্ত আর দুর্নীতিবাজদের তৈরি।’ কথাটি অপ্রিয় হলেও সত্য। আর এসব মিডিয়া দলবাজিতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে বিরোধীমতের টুটি চেপে ধরে। এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করেন ফরহাদ মজহার কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বলেন যে এটা কাম্য নয়। অথচ তার বিরুদ্ধে ‘সিন্ডিকেটেড মিডিয়া সন্ত্রাস’ শুরু করেছে একটি মহল। তার বক্তব্যকে কেটে ছেঁটে প্রচার করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমে হামলার উস্কানি দিচ্ছেন। তার নামে দুটি জিডিও করা হয়েছে। তিনি বারবার তার বক্তব্য নানান বিবৃতির মাধ্যমে গণমাধ্যমে হাজির করলেও তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে জনমত তৈরির কাজ করে যাচ্ছে এই মহল। এমনকি তার নামে বেনামি পোস্টারিং পর্যন্ত করা হয়েছে। এমন সন্ত্রাসী কে কবে দেখেছে আগে?
ড. সলিমুল্লাহ খান নামের একজন অধ্যাপক গত ৫ নভেম্বর একটি অনলাইনে লিখেছেন। বেশ কয়েকটা সেমিনারে আমি তার বক্তৃতা শুনেছি, তিনি যে বিষয়েই বক্তৃতা দিন না কেনো ফরহাদ মজহারকে নিয়ে কোনো বাজে কথা না বললে উনার বক্তৃতা সম্পূর্ণ হয় না। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার। যাই হোক, তার লেখা ধরে ধরে কথা বলা যায়। আমি সেদিকে যাব না, শুধু শেষের লাইনটা ধরছি।
ড. খান লিখেছেন, ‘বোমা মারার নৈতিকতাকে তিনি ইসলামের নামে জাহির করিয়া খোদ ইসলামেরই অমর্যাদা করিতেছেন।’ বুঝা গেলো ড. খান ইসলামের মর্যাদা নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত। বেশ ভালো। কিন্তু তিনি এখানে ফরহাদ মজহার সম্পর্কে বলছেন যে ফরহাদ বোমা মারার নৈতিকতা দিচ্ছেন তাও কীনা আবার ইসলামের নামে। এই কথার উৎস কী? তিনি আমেরিকা ফেরত ‘পিএইচডিধারী’ বলে কি যা ইচ্ছা তা প্রচার করার অধিকার রাখেন? এটা কেমন বুদ্ধিজীবীতা? রাস্তায় যে পোস্টারগুলো শোভা পাচ্ছে তার ভাষা ও মিথ্যাচারের সাথে ড. খানের ভাষার আশ্চর্যজনক মিল পাওয়া যায়। এদের উদ্দেশ্যও যে এক এই বিষয়েও কোনো সন্দেহ নাই।
পোস্টারের ভাষা ও ধরনই বলে দিচ্ছে সম্পূর্ণ হীনউদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই এর প্রচার। সেখানে বলা হচ্ছে ফরহাদ মজহারের উস্কানিতেই হরতালে গণমাধ্যমের উপর হামলা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো আলোচিত টকশোটি যেদিন অনুষ্ঠিত ও সরাসরি প্রচারিত হয়েছিল সেদিন ছিলো সারাদেশে হয়ে যাওয়া হরতালের প্রথমদিন। সেদিন ব্যাপকভাবে নানা গণমাধ্যমের উপরে হামলা হয়েছিল তারই প্রসঙ্গ ধরে জনাব ফিরোজ রশিদ গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। উপস্থাপক মনির হায়দার জনাব ফরহাদ মজহারের কাছে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতাহীনতা ও এই ধরনের হামলা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি ওই কথাগুলো বলেন যা নিয়ে আজকে এত হইচই। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, গণমাধ্যমের উপর হামলা অনেকদিন ধরে হয়ে আসছে, এবং ওইদিনও ঘটেছে। সেই হামলা নিয়েই আলোচনা হয়েছিল, অথচ এই অশোভন, কাপুরুষচিত বেনামি পোস্টারে বলা হচ্ছে ওইদিনের আলোচনার ফলেই এইসব হামলা হয়েছে!
গণমাধ্যমের উপর ব্যাপকহারে বোমা বা ককটেল বিস্ফোরণ হয় গত ২৬ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যায়। ওইদিন বেসরকারি তিনটি টেলিভিশন স্টেশন ৭১ টেলিভিশন, মাই টিভি ও দেশটিভির কার্যালয়ের গেটে বোমা হামলা হয়। আমার প্রশ্ন আর ২৬ তারিখে ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমে হামলা হলো, ২৮ তারিখে সেসব হামলা নিয়ে টকশোতে আলোচনা হলো, তাহলে হামলাগুলোর জন্য ফরহাদ মজহার বা ফিরোজ রশিদ দায়ী হন কী করে? বিষয়টা কি এমন হয়ে গেলো না যে ডাক্তার চিকিৎসার খাতিরে ছুরি হাতে নিলো আর আমরা সবাই ডাক্তারকেই খুনি বানিয়ে ছেড়ে দিলাম?
ওই একই টকশোতে জনাম আ স ম আব্দুর রব বলেন ‘আন্দোলন করলে ঘরে গিয়ে খুন করা হবে প্রধানমন্ত্রীর সামনে বলেছে…’ জনাব আব্দুর রব সম্ভবত মাননীয় পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর কথা বুঝাতে চেয়েছেন। কিছুদিন আগে মাননীয় পাটমন্ত্রী এক বক্তৃতায় বলেন, ‘আর কেউ হরতাল ডাকলে হরতালকারীকে বাড়িতে ঢুকে হত্যা করতে হবে।’ এটা স্পষ্টতই একটি নির্দেশমূলক বাক্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধীদল তাদের দাবি আদায়ের জন্য হরতাল ডেকে থাকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি হরতাল ডেকেছে। অথচ হরতালকারীদের বাড়িতে গিয়ে খুন করার আদেশ দেন মাননীয় মন্ত্রী। এইসব হরতালে পক্ষে-বিপক্ষের অনেকে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। রাজনৈতিক কারণে গত কয়েকমাসে ব্যাপক সহিংসতা আমরা দেখেছি। যা খুবই দুঃখজনক। সরকারের যেখানে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনার কথা সেখানে মন্ত্রীমহোদয় হত্যার নির্দেশ দিচ্ছেন। এই নির্দেশ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই, অথচ গণমাধ্যমের উপর কেনো হামলা হচ্ছে তা নিয়ে বিশ্লেষণমূলক আলোচনাকে হামলার উস্কানি হিসাবে প্রচার করা হচ্ছে।
এই পর্যায়ে নিশ্চয়ই বুঝা যাচ্ছে আমরা মিডিয়া টেরোরিজম’র শিকার। বোমাবাজি রাহাজানি ইত্যাদি যদি টেরোরিজম হয় তাহলে গণমাধ্যমের এই মতান্ধতা, আর এই মিথ্যাচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ন্যায্যতা দেয়ার আরেক নাম ‘মিডিয়া টেরোরিজম’। কান নিয়েছে চিলে বললেই আমাদের চিলের পিছনে ছুটলে প-শ্রমই হবে আর কিছুই না। তাই নিজেদের সচেতন তো হতেই হবে সেই সাথে এই মিডিয়া টেরোরিজম’র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আয়নার কারসাজি দিয়ে ম্যাজেশিয়ানরা নানা ধরনের ম্যাজিক দেখান এটা আমরা অনেকেই জানি। বিভিন্ন সাইজের আয়নাকে নানাভাবে বসিয়ে এমনকি মানুষকে দুভাগ করার ম্যাজিকও আমরা দেখেছি।
গণমাধ্যমকে তো সমাজের আয়না বলা হয়। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে আয়না বসানোয় কারসাজি হলে আয়নাতে ভুলভাবে প্রতিবিম্ব পড়তে পারে। আর এই ভুল প্রতিবিম্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমরা নিয়ে বসতে পারি ভুল সিদ্ধান্ত। তাই বলব, গণমাধ্যমের যে সকল কর্মী এই মিডিয়া টেরোরিজম’কে বুঝতে পারেন, তারা চুপ করে থাকবেন না। নিজেদের জায়গা থেকে একে প্রত্যাখ্যান করুন। ‘সাংবাদিক’ আর ‘সাংঘাতিকের’ পার্থক্য আপনাদেরকেই তৈরি করতে হবে। আর যারা পাঠক-দর্শক আছেন তারাও এই মিডিয়া-টেরোরিস্টদের বর্জন করুন, না হয় দেখা যাবে তাদের আয়নায় আপনিই দুই ভাগ হয়ে পড়ে আছেন। তারা যে ম্যাজিক জানে!