কী পড়ছে বলো তো আকাশ থেকে ? কেমন যেন স্বাদ। মা হঠাৎ বললো, সন্ধেবেলা, বাংলার ক্লাসিক সন্ধে, তখন চারদিকে টিভি চলছে, মা এটা বলামাত্রই বুঝলাম আবার সোডিয়াম কমে গেছে, অদ্ভুত সব কথা বলবে কিছুক্ষণ, কিন্তু আজ বুঝি যে হয়তো পুরোটাই সোডিয়ামজনিত নয়, দর্শন তো হতে পারে। কিন্তু আজ আর সেটা বলার জন্য কেউ নেই। অনেক পাগলাটে, নানান বয়সের, এঁরা আছেন, তাদের রাডারযন্ত্রে আমাকে রাখেন, সবারই প্রায় ধাতুজনিত, অথবা হিস্টিরিয়া, কখনো যুগলেও, আমি এদের নানা ফরমাস খাটি। জলের জার রে, ছোট মাছ, তো ধুপকাঠি, মশার ধুপ, কখনও শুষনি শাক, শুধু বাজারে একজন আছে, প্রায় আমার মার ই বয়স হবে, অন্তত সাতটা সব্জির দোকান উনি ঝুড়িতে ঝুড়িতে সাজিয়ে দেয়, রোজ, খদ্দের এসে ঝকঝকে দোকান পায়। এঁর ও কি সোডিয়ামের সমস্যা হয় ভুলভাল বকেন ? কে ওষুধ দেয় -কিন্তু যদ্দুর জানি একাই থাকেন, বাজারের পেছনে, একটা ঘুপচিতে। হয়তো নিজেই একটু নুন ঘষে নিয়ে মুখে, কাজে চলে যান। মাথাও টাল খায় হয়তো। আজও দেখলাম, আলু পেঁয়াজের গুদামে বসে, আলু তুলছেন কোনও দোকানের ঝুড়ি সাজানোর জন্য, চারপাশে গোলাপী পেঁয়াজের খোলা আর রসুনের সাদা খোলাগুলো শিউলির মত জ্বলছে। গতকাল সন্ধেশেষের বাতাস যেন এখনও পাক দিচ্ছে দোকানগুলোর ফাঁকে ফাঁকে।

রাস্তার মোড়ে বিরিয়ানির দোকানটাও দেখতে দেখতে দশক পার করে ফেললো। বাঙালির এই বিরিয়ানি প্রীতি ও তদ্রূপ, প্রকৃত বিরিয়ানি যে কী, বা কোনটা এবং কোথায়ই বা সেটি মাংস-ভাত থেকে আলাদা, এ খুব কম বাঙালি জানেন বলেই আমার ধারণা, আমিও জানি না, কিন্তু পায়ে পায়ে বিরিয়ানি দোকান, গোগ্রাসে বিক্রী, তো এই দোকানের আসলাম ও দশ বছর পার করে ফেললো এখানে। আমরা দেখা হলেই কথা বলি, যদিও আসলাম জানে আমি তো বিরিয়ানি খাই না, তবু। একদিন রাত দশটায়, পান খেতে বেরিয়েছি , দেখি আসলাম, পরিষ্কার জামাকাপড়, চুল কেয়ারি করা, ফ্রুটি কিনছে, দেখতে পেয়েই একগাল হাসি, দাদা আমার মেয়েদুটোর জন্যে, হাওড়া যেতে তো ধরেন বারোটা মত বাজবে, ওরা ঘুমিয়ে থাকে, মেরা আওয়াজ সুনকে উঠ যাতি হ্যায় দোনো, ইয়ে অরেঞ্জ দেখকে হাসতি হ্যায়… হাতটা চেপে ধরে আমার। মেয়ের বাবাদের একটা ভাষা আছে, যা অধিকাংশ মেয়ের বাবারাই বোঝে। পান খাবে আসলাম? না দাদা, কাল, বলে ছুট দেয় আসলাম। আমিও, কী মনে হতে, মাস্টার ডিগ্রী পাঠরতা মেয়ের জন্য একটা অরেঞ্জ কিনি। সঙ্গে স্ট্র। আসলামের বাচ্চু মেয়েদের মত করে না হলেও, অন্যরকম হেসেছিলো আমার বাসার মেয়েটি। আহা রে জীবন।

উলটে যাচ্ছে গলির গালিচা কেমন, প্রাতঃভ্রমণ করা মুখগুলোও বদলে যাচ্ছে। কিছু পুরাতন মুখ আর হাঁটতে আসে না, যেমন মাছের মেজদা। প্রায় দিন, মাছ কেনার পর, একটা বাড়তি টুকরো, নয় একটা মোটা চিংড়ি প্যাকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বলতেন, ওটা আমার মাইয়ারে দিবা, মাইয়ার বয়স তখন পাঁচ, সেই থেকে চলছে। একটা স্ট্রোক হবার পর থেকে আর ছেলেরা আসতে দেয় না। মাছের বাজারে এলেই মেজদার দোকানটার দিকে তাকাই, ওখানে এখন অন্য ছেলে বসে, সীম বেগুনের বাজার এদিকে, অনেকেই আঁশগন্ধ বাদ দিয়ে বাঁচতে কুমড়ো কালোজিরের দিকে গেলেন দেখলাম । বাজার মানে রেলবাজারের পেছনটা আবার তুলাপট্টি, যত লেপ তোষক বালিশ, পেটাপিটি। তুলোবীজের গলিগুলো, রোদে জ্যালজেলে, নড়ছে ট্রেণের বাতাসে ও ব্যাথায়। লেডিজের চাপা রাগে, হজমিগুলির মত চোখগুলো নড়ছে কৌটোর ভেতর। ডালিমের হজমি সেই ছেলেটা আসে না অনেকদিন গো, হ্যাঁ বলে অনেকেই কিন্তু হদিস দিতে পারে না। গলির গালিচা উলটে যাচ্ছে রোজ।

রাস্তায় তাকাতে ভয় করে, যে লোকালয় টা সামনে দেখছি, স্পষ্ট দেখি, এর নীচে একটা পাচারের জনপদ রমরম করছে। আড়কাঠি রা সতেজ , তারা ফুসলিয়ে বা অজ্ঞান করে মেয়েদের ঠিক নিয়ে তুলছে কমার্শিয়াল বিছানায়, সরকার ও রক্ষক সমূহ এতে জড়িয়ে, ওপরের দৃশ্যমান জনপদের তারা ফুল চাদরের নিচেই তা, অনেকেই অনুভব করছেন কিন্তু। কিন্তু। স্বপ্না চিকেন সেন্টারের মালিক, অবলা মুরগি পাচারের সোনা, ওর গলায়। ওর ছেলেদের গলায়। এই ফুলেল বসতির নীচে, পাচার হয়ে যাচ্ছে চৌদ্দ ভূবন, ছিঁড়েখুড়ে যাচ্ছে রাস্তা হারানো কাগজপত্র, যাতে আমাদের আসল পরিচয় লিখে রেখে গেছে তেরো বছরের নেপালি মেয়েটি, গোলাপি দেয়ালের হোটেলে। আজ কি বুধবার ?