কলেজ রোড এবং কয়েকজন যুবক

ঊনিশশো চুয়াত্তর সালের শেষ প্রান্তে
ভীরু চোখে, ক্ষীণস্বরে কান্নায় ধরিত্রিতে আসা,
এ ধরণীর নবীনতম সদস্য হিসেবে
হাঁটি হাঁটি পা পা করে গন্তব্যের দিকে পথচলা
এই তো সেদিন মাত্র!

পাঠ গ্রহণের শেষ অধ্যায় চুকিয়ে
সে-ই ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা থেকে কলেজ রোড
বৈষয়িক স্বার্থ নিমিত্তে জীবনযুদ্ধে শামিল হওয়া
এখনো বিহাল তবিয়তে নবাবজাদার ন্যায়
তাও এই তো সেদিন মাত্র!

নাগরিক ব্যস্ততায়, সীমাহীন বঞ্চনায় যাপনপ্রণালী
‘ক্লিন সিটি, গ্রিণ সিটি’ রূপরেখায়
মাঝে মাঝে বারুদের গন্ধ বাতাসে ছড়ায়
বুলেট বোমায় কেঁপে উঠে, পেশি শক্তির নগ্নোল্লাসে
নারী লোলুপতা, যৌবন জোয়ারে তারুণ্যশক্তি ক্ষয়িষ্ণু
সয়ে যাচ্ছি সামাজিক অবক্ষয়ের মাঝেও।
বাণিজ্য-বসতিতে চলে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা!
পেরেশানিতে চলে ঘাত-প্রতিঘাত বেয়ে।

আছি টিকে কোন মতে, না থাকারই মতো
নুুয়ে পড়া জীবন যুদ্ধে হার না মানলেও
বীরু কাপুরুষের ন্যায় অবনত যেন।
কলেজ রোড একটি সংগ্রামী নাম, ইতিহাস
না পরিপূর্ণ ব্যর্থতার বা সফলতার।
একদল তারুণ্যের প্রচ- ভালোবাসায়, উচ্ছ্বাসে বেঁচে থাকা
যে ভালোবাসার ঠিকানা শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত!
…………………………………………..

প্রিয় কিছু মানুষের চিরপ্রস্থানে

প্রিয় কিছু মানুষের চিরপ্রস্থানে
শোকাভিভুত, স্তম্ভিত বেদনাহত, কম্পিত, ভগ্নহৃদয়!
পিতৃব্যতুল্য আবদুল হাকিম, মুহাম্মদ রফিক
পিতৃমহতুল্য প্রবাস ফেরত আবু জাফর
ভ্রাতৃপ্রতীম কলম সৈনিক নজরুল ইসলাম
তোমরা আমাদের অগ্রজ গমনকারী
নিরন্তর অসীমের দিকে ধাবিত আমরাও
মিলিত হবো যেকোন দিন,
যেকোন সময়
যেকোন দিন।

স্মৃতিগুলো দরজায় কড়া নাড়ে
হাট-বাজার, পূর্বদিক দিয়ে মেঠো পথ চলে গেছে
যে পথে দেখা হতো নিত্যদিন
স্কুল-মাঠ, পুকুর পাড়, যেখানে বিচরণ ছিল অবাধ
কুশল বিনিময়, কেমন আছো দাদু, চাচ্চু?
এমন মধুর সম্ভাষণ আর শুনতে পাবো না!
তোমাদের চিরপ্রস্থানে আজ সর্বত্রই আর্তনাদ।
হে মুনিব-মওলা, এ প্রার্থনা কবুল করো
পূণ্যবানদের কাতারে তাদের শামিল করো
বিদেহি আত্মার মাগফেরাত চাই তোমার কাছে
শান্তি-সুখে ভরে দাও সেই অন্ধকার চিরআবাস!
…………………………………………..

দাবানল

কেনো বলতে পারছি না অপরাধী নই, কারো দাস নই
কেনো বলতে পারছি না, আমার হস্তদ্বয় রক্তে রঞ্জিত নয়?
দু’হাত রোজ প্রতিপালকের কাছে রাত্রিনিশীথে করে প্রার্থনা
এই হাত দু’টো কোনো পাপের কালিমাযুক্ত হতে পারে না
কেনো বলতে পারছি না, আমরা নই তোরাই পাপিষ্ঠ!

¬বুকের ভেতর চেপে রাখা ক্ষোভ ক্রমশ উদ্গীরণ হতে চায়
ফুজিয়ামা-ভিসুভিয়াসের চেয়েও প্রচ- বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে
দাবানল ছড়িয়ে ছারখার করে দেয়ার বাসনা কখনো
তুই আর কতকাল মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখবি?
জারিজুরি সব থলের বিড়ালের ন্যায় একদিন বেরুবেই!

দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একটি দানব সমগ্র বিশ্বলোকে
গিলে খাওয়ার অবিরত চেষ্টারত, কিন্তু পারছে কই?
সেই অশুভ শক্তি গিলতে না পারলেও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে
চিরতরে বিকলাঙ্গ করার জন্য পাকাপোক্ত ব্যবস্থারত
হতাশা ঝেড়ে ফেলে জাগো দাবানল জ্বালাবার মন্ত্রে।
…………………………………………..

ফেরা হয় না

জীবিকার তাগিদে একদা নাগরিক জীবনে প্রবেশ
সেই অনেক বছর পূর্বে, আমার মতো আরো অনেকে।
প্রতিনিয়ত জন¯্রােত নগরমুখি
নগরে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে
কখন যে শিকড়কে হারিয়ে ফেলেছে মানুষ!
তাগিদ আসে বারবার ঈদ-পার্বনে, নানা আয়োজনে।
দু:খ-বেদনা, জলাবদ্ধতা, যানজট, বেপরোয়া ত্রাস
পাহাড়ধ্বস, দ্রব্যমুল্য আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায়
টিকে থাকে তেলাপোকার ন্যায়।
দিশেহারা কঠিনতরো মানব জীবন-
তবুও আঁকড়ে ধরে যান্ত্রিক নগরজীবন।
শেকড়ের দিকে পা বাড়াতে জড়তা কাটে না
হয় না ফেরা সবুজের পানে
স্নিগ্ধ মমতায় ভরা, সবুজ প্রকৃতি ঘেরা
আমার সোনার বাংলার নরম পলি ভিটে মাটিতে।
…………………………………………..

পরিচয় দিতে লজ্জা পাই

ভাবতে অবাক লাগে! পরিচয় দিতে লজ্জা পাই!
আমি সেই সে প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেছিলাম একদা।
যে প্রতিষ্ঠানের সম্মান ও মর্যাদা সর্বত্রই ছিল,
কী স্বদেশ! কী আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে।
সুশিক্ষার সুষ্ঠু, সুন্দর পরিবেশ ছিল, ঈর্ষণীয় ফলাফল ছিল
ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে সুন্দর সদ্ভাব ছিল
শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে অলংকৃত ছিল,
ছিল সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার একদল শিক্ষার্থী।
সময়ের ব্যবধানে, কারো রক্তচক্ষুর কোপানলে
আজ নষ্টদের, ভ্রষ্টদের অধিকারে।
অবরুদ্ধ পরিবেশ, ভীতিকর পরিস্থিতি
মার মার, কাট কাট, ধর ধর-সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ
দেশিয় মারণাস্ত্রে সুসজ্জিত কীটগণ
শৃংখলা বাহিনির কর্তারা হুকুমের গোলাম
উপরের নির্দেশ ছাড়া ঝুঁকির প্রশ্নই উঠে না!

একদল অপর দলকে বিনাশ সাধন করতে পারলে
মনে হয় সমাধান, সব করায়ত্তে
বিরোধী মতের কাউকে করা হয় না সহ্য
আদম সন্তানের খুনোখুনি দেখে শয়তানও লাজে মরে!
চক্ষুষ্মানরা যেন চক্ষুহীন, বিবেকবানরা বিবেকহীন
মানবতাবোধ, সাম্য-স্বাধীনতা, সুবচন ফাঁকা বুলি।
কোথায় গেল তোমার এত ঐতিহ্য?
জ্ঞান, কর্ম আর সৃজনের অহংবোধ?
এভাবেই কী চলবে আমার প্রাণের শিক্ষাঙ্গন?
সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিতে লজ্জিত হই
অবাক লাগে তথায় শিক্ষার্থী ছিলাম আমিও একদা!