‘হিরা আমার সাথে একটু গাঙ্গিনার পাড় যাবে?’
‘মায়াদি, কাল না আপনার পরীক্ষা, এই বিকেলে আবার ওখানে যাবেন কেন?’
‘মনে হয় এবার আর পরীক্ষা দেওয়া হবে না।’
কি আবোল-তাবোল কথা বলছেন?
এই তিন দিনের গ্যাপে আমার কিছুই পড়া হয়নি।” বলে মায়াদি প্রায় কান্না করে ফেলল।

মায়া আর হিরা একই হলে পাশাপাশি রুমে থাকে। হিরা মায়ার থেকে দুই ইয়ার জুনিয়র হলেও ওদের মধ্যে বেশ ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। হিরা মেয়েটা বেশ ঝবহংরনষব. সবার ভালো চায়। ভালো পরামর্শ দেয়। তাই হলের বেশিরভাগ মেয়েই ওর সাথে বিভিন্ন বিষয় শেয়ার করে।

মায়ার এমন আচরণে বেশ অবাক হলো হিরা। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। দুটো পরীক্ষা হয়ে গেছে। হঠাৎ কি সর্বনাশা কথা বলছে সে।

হিরা মায়ার হাত ধরে বিছানায় বসালো। আর ভাবলো যাই ঘটুক না কেন, ওনার পরীক্ষা যেন কোনোভাবে মিস না হয়।

কী হয়েছে আপনার? আমাকে সব খুলে বলুন। দেখি কোনো সমাধানে আসতে পারি কি না। মায়াদিকে কথাগুলো খুব আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করলো হিরা।

আমি মোটেই পড়তে পারছি না। সারাক্ষণ দেবার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এছাড়া আগে যা কিছু পড়েছিলাম তাও আর মনে করতে পারছি না।

পুরো ব্যাপারটা হিরা এবার বুঝতে পারলো। এই দেবার কথা হলের প্রায় সবাই জানে। এ ব্যাপারে মায়াদিকে অনেক বুঝানো হয়েছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

এত সুন্দর আর এত ভালো একটা মেয়ে যে এমন অনাকাক্সিক্ষত কষ্ট পাবে তা কে জানতো।

মায়া ময়মনসিংহ শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বোটানিতে অনার্স করছে। সহজ সরল হাসি-খুশিতে প্রাণোচ্ছল ছিল সে। ফার্স্ট ইয়ারে কিছুদিন যাওয়ার পর একটি ছেলে, বন্ধুর সাথে মায়ার ডিপার্টমেন্টে ঘুরতে আসে। মায়াদি ক্লাস শেষে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল গ্রিল ধরে । হঠাৎ সুদর্শন একটি ছেলেকে তার এক ক্লাসমেটের সাথে দেখলো। মায়া দূর থেকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেটির দিকে। দেবাশীষও এক নজর খেয়াল করে। কিন্তু না দেখার ভান করে চলে যায়। মায়ার মনে হয় এত সুন্দর পুরুষ হয়তো সে জীবনে আর কোনদিনও দেখেনি। ভীষণ ভালো লেগে যায় ছেলেটিকে অথচ মায়া তাকে চেনে না, জানে না। তাছাড়া সে কলেজে তাকে আর কখনো দেখেনি। মায়ার মনে সারাক্ষণ ছেলেটির মুখ ভেসে উঠতে লাগলো। কিন্তু লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারেনি। এভাবে মনের কথা অব্যক্তই রয়ে যায়। ঠিক সতেরো দিন পর আবার ছেলেটি কলেজে আসে এবং সরাসরি মায়ার সামনে এসে বলে-
আমি দেবাশীষ, আপনি নিশ্চই মায়া।

মায়া মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলে। বুকের ভেতর কেমন যেন ঢেউ খেলে যায়। অজানাকে জানতে ইচ্ছে করে। এ কয়দিন তো এর কথাই ভেবেছে মায়া। তাই কী বলবে ঠিকমত গুছিয়ে উঠতে পারে না। শব্দগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মুখ থেকে শুধু বের হলো-
কেন, কী হয়েছে?
দেবাশীষ একটু ইতস্তত করে বললো-

আমি প্রায়ই এখানে বেড়াতে আসি। এখানে আমার অনেক বন্ধু রয়েছে। ঐদিন আপনাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আপনার কোনো বন্ধু নেই?
“আশ্চর্য আপনাকে আমি চিনি না, জানি না। তবে এত কথা বলার কি আছে।”
“চেনেন না বলেই তো আজ এসেছি শুধু আপনার সাথে পরিচিত হতে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে মায়ার ক্লাসমেট সুজন এসে বললো-
মায়া এ আমার ফ্রেন্ড। খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। বুয়েটে পড়ে। ওর বাসা এই শহরেই। ছুটিতে এসেছে।

দেবাশীষ তখন বললো-“আমি আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই।” তারপর একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বললো-
এই আমার ঠিকানা। পারলে চিঠি দেবেন। খুব ভালো লাগবে যদি আমার বন্ধু হন। অপেক্ষায় থাকব।”

তখন মোবাইল ফোনের ব্যবহার খুবই কম ছিল। হাতে গোনা কয়েকজনের হাতে ফোন ছিল। সবাই চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমেই যোগাযোগ রাখতো।

মায়া চিরকুটটি নিয়ে বললো-
“ঠিক আছে দেখা যাবে।”

ক্লাস শেষে হলে ফিরে মায়ার সেকি আনন্দ। অন্য মেয়েরা বুঝতে পারে কিছু একটা ঘটেছে। তা না হলে, কয়দিন তো তার মন খুব ভারি ছিল। হঠাৎ এত উৎফুল্ল হয়ে উঠলো কেন। কাজল নামে এক ইয়ারমেট মায়াকে এই পরিবর্তনের কারণ জিজ্ঞেস করলো। মায়া হাসতে হাসতে রুমে চলে গেল।

শেরপুর জেলার এক মফস্বল এলাকা থেকে আসা সহজ সরল মায়া তো আর বুঝতে পারে না তার জন্যে কী কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এ কয়দিন দেবাশীষের কথা একটানা ভাবতে ভাবতে তা মনের মধ্যে গাঁথা হয়ে গেছে। মনে মনে অনেক প্রার্থনা করেছে যেন তার সাথে আবার দেখা হয়। কিন্তু মায়া তো চাওয়ার থেকে অনেক বেশি পেয়েছে।

প্রায় দুই মাস পার হয়ে গেল। দেবাশীষ কলেজে আসলো না। তবে কি মায়া চিঠি দেয়নি বলে রাগ করেছে। প্রতিদিন ঠিকানা একবার করে দেখতে দেখতে মুখস্থ হয়ে গেছে। মায়া মনে মনে দেবাশীষকে দেবা বলে ডাকে। বার বার দেবাকে ডাকার পরেও না আসায় তাকে দেখার জন্য মায়ার মন অস্থির হয়ে ওঠে। সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে গভীর রাতে উঠে দেবাকে চিঠি লেখে। যার মূল কথা, দেবা যেন কলেজে আসে।

দেবা চিঠি পেয়েই কলেজে আসে মায়ার সাথে দেখা করতে। এসেই বলে-
“চিঠি না লিখলে আমি আর কখনো এখানে আসতাম না।”
“কেন আপনার বন্ধুর কাছেও না।”
“আমি তো আপনাকেই বন্ধু মেনেছি। যদি সাড়া না পেতাম তবে কেন আসব।”

সেদিন কলেজ ক্যাম্পাসে বসে দুজনে অনেক গল্প করল। ক্যাম্পাসে বসে দুই পরিবারের খবরও তাদের জানা হয়ে গেল।

ধীরে ধীরে দুজনের মাঝে চিঠি দেয়া-নেয়া বাড়তে থাকে। মায়ার ধারণা, দেবা যদি তাকে পছন্দই না করে তবে এত আগ্রহ দেখাবে কেন। মায়া দেবাকে মনের গভীরে ঠাঁই দেয়। প্রচ-ভাবে ভালোবেসে ফেলে। দেবাও মায়াকে নানা বিষয়ে উৎসাহ দেয়। মেধাবী ছেলের কথার মারপ্যাচ বুঝতে পারে না মায়া। তাই সরল মনে শুধুই ভালবেসে যায়।

মায়ার মনের কথা আর মনে রইল না। মুখ ফুটে বের হয়ে গেল। এক এক করে তার ফ্লোরে সব মেয়েরাই দেবার কথা জেনে গেল। সবাই তার পছন্দের প্রশংসা করে উৎসাহ দিতে লাগলো।

মায়ার একটা গুণ আছে। সে কাউকে অল্প কিছুক্ষণ দেখলেই তার পোর্ট্রটে করতে পারে। হলের মেয়েরা যখন দেবা দেখতে কেমন জানতে চাইলো মায়া সাথে সাথে দেবার একটা পোর্টেট করে দেখালো। এতে করে সবাই বুঝলো মায়া দেবাকে কতটা ভালোবাসে। এ ভালোবাসা যেন চিরন্তন।

প্রতি সপ্তাহে মায়া দেবাকে দুটো করে চিঠি পাঠাচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিসে। আর দেবাও মাসে দুটো। চিঠিগুলো দুজনের ভালোলাগা-মন্দলাগা সব অনুভূতি প্রকাশ করে। দেবার মায়াকে এই গুরুত্ব দেওয়ার ফলে মায়ার ভালোবাসা গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগলো। মায়ার ধ্যান-জ্ঞান সবই যেন ঐ এক দেবা।

পূজার ছুটি ঘনিয়ে এসেছে। অনেক দিন যাবত দেবার সাথে মায়ার দেখা হয় না। হলের কিছু পড়–য়া ছাত্রী বাদে বাকি সবাই বাড়ি চলে গেল। মায়ার বাবা-মা বার বার খবর দেওয়ার পরও সে বাড়ি গেল না। উদ্দেশ্য একটাই। ছুটিতে দেবা আসবে আর তার সাথে দেখা হওয়াটাই মায়ার একমাত্র চাওয়া। চিঠিতে মায়া সে কথাই জানিয়ে দিল দেবাকে।

মায়া ছুটির দিনগুলোতে কলেজ ক্যাম্পাসে সারাদিন দেবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু দেবার আসার কোনো নাম নেই। মায়ার ভেতরে কষ্ট জমাট বাঁধতে আরম্ভ করে। এদিকে ছুটি প্রায় শেষ হয়ে আসছে। এক দিন পরেই দশমী। দেবা কেন আসলো না। নাকি চিঠি পায়নি! এসব ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে উঠলো মায়ার মন। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। দশমীর আগের দিন সকাল সাতটার দিকে মায়া দেবার বাসায় গেল যাতে তার সাথে দেখা হয়। দেবার মা দরজা খুলে দেয়। মায়া দেবার বান্ধবী জানার পর তার মা মায়াকে বেশ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে। দেবা তো মায়াকে দেখে অবাক।
“মায়া বাসা চিনলে কীভাবে?”
“সুজনের কাছ থেকে জেনেছি।”
“হঠাৎ বাসায়, কোনো জরুরি ব্যাপার আছে নাকি?”
“তুমি আমার চিঠি পাওনি?”
“হ্যাঁ পেয়েছি। তাতে কি হয়েছে।”
“তুমি জানো আমি পূজাতে বাড়ি যাইনি।”
“যাওনি কেন?”
“আমি এই কয়দিন সারাদিন কলেজ ক্যাম্পাসে তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।”
“কেন? আমি কি তোমাকে থাকতে বলেছি?”
“দেবা তুমি এভাবে কথা বলছো কেন?”
“কীভাবে বলছি।”
“তুমি আমাকে এভাবে অবহেলা করতে পার না।”
“আশ্চর্য তুমি আমার অপেক্ষায় ছিলে সেটা তোমার ব্যাপার। আমার বন্ধুদের নিয়ে এ কয়দিন আমি বেশ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছি। তোমার কথা আমার খেয়ালই ছিল না।”
“আমি তোমার বন্ধু নই।”
“হ্যাঁ, অবশ্যই।”
“তাহলে, দেখা করার প্রয়োজন বোধ করলে না।”
“তোমার মতো আরও অনেক বন্ধু আছে আমার। সবাইকে তো আর সময় দেওয়া সম্ভব নয়।”
“আমি তোমার কাছে অন্যদের মতোই।”
“তা নয়তো কি।”
“ও আচ্ছা, তাহলে বোধহয় আমিই ভুল ভেবেছিলাম।”
“তুমি কি ভেবেছ সেটা তোমার ব্যাপার। কিন্তু আমি তোমাকে স্রেফ বন্ধু হিসেবেই জানি।”

মায়া কিছুক্ষণের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গেল দেবার এসব কথা শুনে। মায়ার মনে হচ্ছে হেঁয়ালী মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। এ কি হলো তার। সে তো দেবাকে ভালোবাসে মনেপ্রাণে। তবে কি তার ভালোবাসা একতরফা। দুজনই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। একসময় মায়া বললো-
“দেবা, তুমি কি আমায় কেয়ার করোনা?”
“হ্যাঁ করি, but not specially.
“কিন্তু চিঠির ভাষাগুলো তো তা বুঝায় না।”
“দেখো মায়া আমার অন্যান্য বন্ধুদেরও আমি চিঠি লিখি, যেমন তোমায় লিখি। বন্ধুকে তো সব কথাই লেখা যায়।”
“ঠিক আছে। ভালো থেকো। আমি যাই।” বলে মায়া দেবার বাসা থেকে চলে আসলো। হলে ফিরে কান্নাকাটি করলো। সারাদিন আর কিছু খেতে পারলো না। সারাক্ষণ শুধু একটি কথাই কানে বাজতে থাকলো-“আমি তোমাকে স্রেফ বন্ধু হিসেবেই জানি।” কাউকে কিছু বলতেও পারছে না যে মনটা একটু হালকা হবে। বিকেলে একাই নদীর পাড়ে পার্কে গেল। ছুটিতে পার্কে কত লোক বেড়াতে এসেছে কিন্তু মায়া শুধুই একা। প্রচণ্ড হতাশা এসে গ্রাস করেছে। তাই জীবনের সব রং, রূপ, গন্ধ, স্বাদ সব ধূসর হয়ে আসছে। এত জলে চোখের কয়েক ফোঁটা জল মেশাতে পারলে হয়তো ভালো লাগতো-এই ভেবে একটা নৌকায় উঠে মাঝিকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীর মাঝেই থাকতে বললো। মনের যত দুঃখ তা চোখের জলে নদীর জলের সাথে একাকার হয়ে গেল। মাঝি মায়াকে অনেকক্ষণ খেয়াল করে বললো-
“দিদি আপনার কি হইছে?”
“আমার চোখে জল জমেছে।” বলে-
মায়া হলে চলে আসলো। রাতেও আর খাওয়া হলো না।

পূজার ছুটি শেষে মেয়েরা হলে ফিরে আসলো। এ কয়দিনে মায়ার শরীরের খারাপ অবস্থা দেখে রুমমেট রিয়া খুব অবাক হলো। দেবার সাথে দেখা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলো। মায়া প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। আগের মতো আর প্রাণচাঞ্চল্য নেই। কারো সাথে খুব একটা মিশতে পারছে না। নিজেকে এক রকম গুটিয়ে নিয়েছে। হলের মেয়েরা কয়েকদিন ঘাঁটাঘাঁটি করে যার যার কাজে মন দিল। তবে সবাই বুঝতে পারলো এই ছুটিতে দেবার সাথে কিছু একটা হয়েছে যা তাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। কেউ একজন তো বলেই ফেলল-“বড় কিছু আশা করলে এমনই হয়।” বান্ধবীর কাছ থেকে এমন মন্তব্য যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতে করে বাজলো।”

অনেকদিন হয়ে গেল দেবা আর কোনো চিঠি দেয়নি মায়াকে। কিন্তু মায়াতো একটি মুহূর্তের জন্যও দেবাকে ভুলতে পারছে না। এভাবে এক বছর কেটে গেল। মায়ার ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসলো। তাই সে পড়াশুনায় মন দিল। পরীক্ষাও বেশ ভালো হলো।

পরীক্ষার ২ মাস পর একদিন মায়া রিকশা করে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটি কণ্ঠ মায়া, মায়া বলে ডেকে উঠলো। কণ্ঠটা শুনে ওর শরীর কেঁপে উঠলো। হাত-পা সব ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। রিকশা থামালো। দেবা রিকশার হুট খুলে সোজা রিকশায় উঠে বসে রিকশাওয়ালাকে পার্কে যেতে বললো। মায়া না করতে পারলো না। রিকশায় কোন কথা হলো না দুজনের।

পার্কে এসে দেবা বললো-
“কি ব্যাপার মায়া এই এক বছর দুই মাসে আমি তোমার কোনো চিঠি পাইনি কেন?”

মায়া কিছুক্ষণ কোনো কথা বললো না। একদৃষ্টে দেবার দিকে তাকিয়ে আছে। দেবা আবার বললো-
“তুমি কি আমার সাথে বন্ধুত্ব রাখতে চাও না?”
“এই একই প্রশ্ন যদি আমি তোমাকে করি, তুমি কী উত্তর দেবে?
দেবা ঝটপট বললো-
“ঐদিন বাসায় কী সব উল্টাপাল্টা কথা বলে চলে গেলে। তারপর আর কোন খবর নাই।”
“কেন, খবর নেওয়ার কোনো চেষ্টা করেছ নাকি। আমি তো আর এই শহর ছেড়ে চলে যাইনি।”
“না ভাবলাম, তুমি আবার কী না কি ভাবো।”
“আচ্ছা! তাহলে তুমি অন্যের ভাবনার কথাও ভাবো।”
“বুঝেছি তুমি অনেক রেগে আছো।”
“কেন, কার ওপর?”
“আমার ওপর। এতদিন যোগাযোগ করিনি তো তাই।”
“তাহলে আজ এত কথা কেন?”
“কারণ আমি তোমার সাথে বন্ধুত্ব নষ্ট করতে চাই না, তাই।”
“বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে বন্ধুকে গুরুত্ব দিতে হয়।”
“শোন মায়া, সম্পর্ক এমন একটা ব্যাপার যেটা শুরুতেই গভীর হয় না। এর গাঁথুনি ধীরে ধীরে শক্ত হয়। ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি হবেই। এতে করে সব ছেড়ে দেওয়া ঠিক না। বুঝে শুনে মানিয়ে চলতে হয়। তবেই না সম্পর্ক টিকে থাকে।”

এবার মায়া একটু নরম হলো। তাছাড়া দেবার প্রতি ওর ভালোবাসার তো একটুও কমতি হয়নি। তাই বললো-
“ঠিক আছে, কবে এসেছ।”
“এসেছি তিন দিন হলো। কাল চলে যাব।”
“এই হলো মোবাইল নম্বর। ফোন দিও আর আমাকে মনে রেখো।”

দেবা চলে গেলে মায়া হলে ফিরলো। মায়া আবারও ভুল বুঝলো দেবার বন্ধুত্ব নিয়ে। সে রিয়ার সাথে পুরো ঘটনাটা শেয়ার করলো। রিয়া সব শুনে একটা কথাই বললো-“ভালো না বাসলে কোনো ছেলে এরকম করতে পারে না। তাই সময় থাকতে তুই তোর মনের কথা দেবাকে জানিয়ে দে। এতে করে সম্পর্কটা স্থায়ী হবে।” মায়ার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল।

কয়েকদিন পর মায়া ফোনের দোকান থেকে দেবাকে ফোন দিল। দেবা বেশ আন্তরিকভাবে কথা বললো। মায়া ঘন ঘন দেবাকে ফোন দিতে লাগলো। দেবার সাথে কথা না বললে শরীর যেন আর চলেই না। মোবাইলের বাড়তি খরচ যোগাতে বাড়ি থেকে আগের থেকে আরও বেশি টাকা আনতে থাকে। মায়া প্রায় প্রতি মাসে একটা করে ড্রেস কিনতো। সেটাও বন্ধ করে দিয়েছে।

মাস্টার্সে পড়–য়া মায়ার অন্য রুমমেট ঝুমা মায়ার এসব অপরিণামদর্শী কার্যকলাপ মোটেও পছন্দ করতো না। একদিন মায়াকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল-
“দেবাশীষের সাথে কি তোমার প্রেমের সম্পর্ক আছে? নাকি সে তোমায় কোনো কমিটমেন্ট দিয়েছে?”
“না ঝুমা আপু, আমি ঠিক জানি না এটা প্রেমের সম্পর্ক কিনা।”
“তবে তুমি কীসের ভিত্তিতে এভাবে টাকা-পয়সা নষ্ট করছো?”
“আমরা দুজন দুজনকে ভববষ করি, ভালোবাসি।”
“দেবাশীষ কি কখনো বলেছে যে তোমাকে ভালোবাসে।”
“না সরাসরি বলেনি, তবে পরোক্ষভাবে বুঝিয়েছে।”
“মায়া, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তুমি যা করছো, তা ঠিক না। এভাবে একটা ছেলের পরোক্ষ কথার ওপর অনুমান করে তুমি নিজের ক্ষতি করতে পারো না।”
“আমার যথেষ্ট বুঝার বয়স হয়েছে। এই যে আমাকে প্রতিদিন ফোনে সময় দেয়া, কথা বলা এতে কি আমি কিছুই বুঝতে পারি না?”
“সে কি তোমাকে কখনো ফোন দেয়?”
“আমার তো ফোন নেই।”
“না সে তো তোমার কল কেটে দিয়ে দোকানের ফোনেও ফোন দিতে পারে। তুমিই তো সময় সময় কল দাও।”
“আপু ঢ়ষবধংব আমাকে কনফিউজড করবেন না। আমি ওর ব্যাপারে কারো সাথে আপোস করতে পারবো না।”
“আচ্ছা তোমার যা ইচ্ছে তাই করো। তবে বড় আপু হিসেবে তোমাকে একটা সৎ পরামর্শ দিচ্ছি, তুমি দেবাশীষের সাথে তোমাদের সম্পর্কটা নিয়ে স্পষ্ট হও। এতে তোমার ভালো হবে।”
“ঠিক আছে আপু আমাকে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। বরং নিজেকে নিয়ে ভাবুন।”

এরপর থেকে মায়া তার ঝুমা আপুর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো। দেবার সাথে সম্পর্ক নিয়ে কেউ নেগেটিভ কথা বললে মায়া তাকে ভালভাবে নিতে পারে না।

এভাবে দিন দিন মায়া দেবাকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতে লাগলো। দেবার প্রতি মায়ার এই পবিত্র অনুভূতি আস্তে আস্তে ডিপার্টমেন্টের বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লো। সুজন এ ব্যাপারে দেবাকে জিজ্ঞেস করলে দেবা সরাসরি বললো-“আমার রুচি কি এতই খারাপ নাকি যে একটা গ্রাম্য খ্যাত্ টাইপের মেয়ের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলবো। মায়াই তো সময় সময় ফোন দেয়। Just কথা বলি এটুকুই, ব্যস। বলতে পারিস টাইম পাস, মজা নেওয়া এই আর কি। আর মায়া যদি একতরফাভাবে আমাকে চায় সেটা তার ব্যাপার। আমি তো তাকে কখনো ভালোবাসার কথা বা প্রেমের কথা বলিনি। প্রেম করার জন্য ঢাকা শহরে মায়ার চেয়েও অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন মেয়ে আছে।

সুজন কথাগুলো শুনে একটু কষ্টই পেল। দেবা তার বন্ধু হলেও মায়া তো তার ক্লাসমেট। মায়াকে তো সে জানে। সহজ-সরল সুন্দর একটা মেয়ে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যে জটিলতা বিরাজমান তা বুঝার মতো মানসিকতা তার নেই। আর মায়া যে নরম স্বভাবের মেয়ে এতে করে দেবার মানসিকতা যদি জানতে পারে তবে সহ্য করাটা বেশ কঠিনই হবে। কিন্তু তারপরও সুজন মায়াকে দ্রুত সব জানানোর সিদ্ধান্ত নিল।

একদিন ক্লাস শেষে সুজন মায়ার সাথে জরুরী কথা আছে বলে ডাক দিলো। মায়া বুঝতে পেরে একটু লজ্জা পেল। সুজন বললো-
“এমন আনইজি ফিল করছিস কেন? মনে হচ্ছে আমি কি বলবো তা তুই আগে থেকেই জানিস।”
মায়া বললো-“কী আর, তোর বন্ধুর ব্যাপারেই বলবি তো। আসলে তোকে অনেক আগেই বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু লজ্জায় বলতে পারিনি।
“কী বলতে চেয়েছিলি?”
“দেবার সাথে আমার সম্পর্কের কথা।”
“কী সম্পর্ক তোর দেবার সাথে?”
“সম্পর্ক আবার কীসের হয়। এই স্টেজ-এ এসে কী সম্পর্ক হয় তুই বুঝিস না?”
“দেবার মনে কী আছে তা কি তুই জানিস?”
“আশ্চর্য ওর সাথে তো আমার প্রায়ই কথা হয়। দেখা হয়। দেবা আমার খুব পধৎব নেয়। সব সময় উৎসাহ দেয়। মন থেকে না চাইলে কি কেউ এমন করে?”
“দেবা কি কখনো তোকে বলেছে যে সে তোকে ভালোবাসে?”
“এটা কি মুখে বলতে হয় নাকি। আচরণেই তো বুঝা যায়।”

সুজন কিছুক্ষণ চুপ থেকে মায়াকে বললো-
“মায়া আমি জানি, তুই খুব ভালো মেয়ে। আর এজন্যেই আমি চাই না তোর কোনো ক্ষতি হোক, কিংবা তুই খুব কষ্ট পাস। দেবার মতো ছেলেদের তোর মতো অনেক মেয়ে বন্ধু আছে। ও শুধু মজা নেয় সবার থেকে কিন্তু কাউকে ভালোবাসে না। ওর কাছে কেউ বিশেষ না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তুই ভুল করছিস।”

“ব্যস অনেক হয়েছে। আসলে আমার প্রতি দেবার ভালোবাস তোদের কারোরই সহ্য হচ্ছে না। আসলে আমার ব্যাপারে তোরা জেলাস করছিস। তাই আমাকে বিভিন্নভাবে পড়হভঁংবফ করার চেষ্টা করছিস। কিন্তু একটা কথা, দেবার কাছ থেকে আমাকে আলাদা করা কখনই সম্ভব না। মরে গেলেও না।”

মায়ার কাছ থেকে এসব শুনে সুজন বুঝতে পারলো, মায়াকে বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে ও যা ভালো মনে করে করুক। তারপর সুজন আর কিছু না বলে চলে গেল।

এরপর মায়া একটু ভাবনায় পড়ে গেল। কি ব্যাপার! সবাই আমাকে দ্বন্দ্বে ফেলছে কেন? দেবা কি সুজনকে কিছু বলেছে নাকি। তাই আর দেরি না করে দেবা আর ওর সম্পর্ক নিয়ে যাতে কেউ সন্দেহ না করে, তাই দেবাকে সবার সামনে প্রেজেন্ট করার সিদ্ধান্ত নিল।

সেদিনই ফোন দিয়ে দেবাকে বললো-
“দেবা, আমি তোমার আর আমার ব্যাপারটা সবার কাছে প্রকাশ করতে চাই।”
“কোন ব্যাপারটা”?
“কেন আমাদের সম্পর্ক। জানো, সুজন আমাকে অনেক কথা শুনিয়েছে।”
“কী বলেছে?”
“তুমি নাকি আমাকে ভালোবাসো না। শুধু মজা নাও।”

দেবা বুঝতে পারলো মায়া একটা চরম ঘোরের মধ্যে আছে। এখনই সুযোগ ওকে সব পরিষ্কার করে দেয়া। পরে আরো ঝামেলা হতে পারে। তাই বললো-
“সুজন তো ঠিকই বলেছে। আমি কি কখনো তোমাকে ভালোবাসার কথা বলেছি?”

একথা শুনে মায়ার শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগলো। বুঝতে পারছে না এরপর আর কি বলবে সে। অনেক কষ্টে প্রায় গলাভেজা কণ্ঠে শুধু বললো-
“তাহলে এতদিন যে এত কথা তা কীসের জন্যে? আর ঐদিন পার্কে নিয়ে…’

“আশ্চর্য তুমি ফোন দিয়েছ আর আমি কথা বলেছি এটুকুই তো, ব্যস।”
“আর কিছু না?”
“আমার দিক থেকে আমি পষবধৎ. তুমি কি ভাবছো সেটা তোমার ব্যাপার। এজন্য আমাকে দোষ দিতে পারো না। এইসব প্রেম-ভালোবাসা আমার কাছে খুবই ফালতু লাগে। আমি বন্ধুত্বে বিশ্বাসী। কেউ যদি এটাকে অন্যভাবে চিন্তা করে তার দায় আমি কেন নিতে যাবো। আর তাছাড়া আমার ক্যারিয়ারই আমার কাছে সব। এখানে এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে ভাববার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

মায়া আর কোনো কথা না বলে ফোনটা রেখে দিল। হলে এসে চিৎকার করে অনেকক্ষণ কাঁদলো। কয়েকদিন ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারলো না। ফলে দুর্বলতার জন্য অসুস্থ হয়ে গেল। মায়ার বাবা-মাকে হলের মেয়েরা অসুস্থতার কথা জানানোর পর তারা এসে মায়াকে বাড়ি নিয়ে গেল। বাড়ি গিয়ে মায়া মাকে সব বলে দিলো। তার মা কী বুঝতে পেরে মেয়েকে সবরকম মানসিক সাপোর্ট দিয়ে প্রায় মাস খানেকের মধ্যে সুস্থ করে তুললো।

প্রায় দুই মাস পর মায়া হলে ফিরে পড়াশুনা আরম্ভ করে দিল। হলের সবাই বিষয়টা নিয়ে আর ঘাটাঘাটি করেনি। সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল শেষ হলো। মায়ার পরীক্ষাও বেশ ভালো হলো। এতকিছুর পরও দেবাকে সে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেনি। যখন প্রচ- কষ্ট হয় তখন বাথরুমের শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে চিৎকার করে কাঁদে। দিন দিন কেমন যেন আসক্ত হয়ে যাচ্ছে সে দেবার প্রতি। এই আসক্তি বেড়েই চলছে। এখান থেকে মুক্তি পাওয়া মায়ার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা সামনে। গত দুই ইয়ারে তার রেজাল্ট ফার্স্ট ক্লাস এসেছে। তাই এবারও সে পড়াশুনায় অনেক জোর দিয়েছে। ১ম ২টা পরীক্ষা বেশ ভালোই হয়েছে। ৩য় পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। পরীক্ষার আগের দিন পড়াশুনা বাদ দিয়ে সে দেবার একটা পোর্ট্রেট এঁকে ফেললো। অনেক বড় একটা চিঠিও লিখলো। তারপর বিকেল বেলা এগুলো দেবার ঠিকানায় পাঠানোর স্থির সিদ্ধান্ত নিল।

হিরা মায়াকে অনেক বোঝালো। বললো-
“মায়াদি প্লিজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন। পরীক্ষা না দিলে আপনার বাবা-মা ভীষণ কষ্ট পাবে।”
“না হিরা আমার আর কিছু করার নেই। পরীক্ষা দিলেও ফেল করবো। তার থেকে না দেওয়াই ভালো।”

হিরা বুঝলো এখন বুঝিয়ে লাভ নেই। বরং সে যা চায় তাই করুক। “ঠিক আছে মায়াদি চলুন।”

দুজনে একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে দেবার পোর্ট্রেটটি আরো ভালোভাবে ফিনিশিং দিয়ে সেটা লেমিনেট করলো। তারপর চিঠিসহ সেটা কুরিয়ার সার্ভিসে দেবার কাছে পাঠিয়ে দিলো। হলে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন মায়া সকালে বেরিয়ে গেলো। হিরা ভেবেছে হয়তো পরীক্ষা দিতে গেছে-এই ভেবে মনে একটু স্বস্তি পেলো। কিন্তু মায়া ১১টার দিকে ফিরে এলো। হিরা মায়াকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। বললো-
“মায়াদি এত তাড়াতাড়ি চলো আসলেন যে। পরীক্ষা তো ১টায় শেষ হয়।”
“আমি পরীক্ষা দেইনি। দেবাকে ফোন করতে গিয়েছিলাম।”
“কথা হয়েছে”
“হয়েছে। হিরা আমি বাড়ি যাচ্ছি। আর ফিরবো কিনা জানি না। আমার খুব খারাপ লাগছে।”
এই বলে ব্যাগ গুছিয়ে মায়া বাড়ি চলে গেল।

মায়ার এই আচরণে হলের মেয়েরাও বেশ মর্মাহত হলো। এরপর প্রায় এক বছর সে কারো সাথে যোগাযোগ রাখেনি।

এক বছর পর মায়া তার মাকে নিয়ে আবার হলে ফিরে আসলো। অনার্স ফাইনালের রেজিস্ট্রেশন চলছে। রেজিস্ট্রেশন শেষ হলে বাড়ি চলে গেলো। এক মাস পর পরীক্ষা শুরুর আগে মাকেসহ মায়া হলে এসে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে আবার বাড়ি গেল। হলের সবাই ভেবেছে মায়া দেবার কথা ভুলে গেছে। আসলে মায়ার মধ্যে যে হতাশা জন্ম নিয়েছে সেটা থেকে মুক্তি পাবার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। রেজাল্ট বের হলো। মায়া অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেল। মাস্টার্স ভর্তি হওয়ার জন্য সে একেবারে হলে চলে আসলো। এবার তার মা বেশ ভরসা পেল তাই আর আসলো না। কিন্তু মায়ার ভেতরের শূন্যতা তো আর ভালো রেজাল্টে পূরণ হবে না। তার জন্য প্রয়োজন প্রচ- ভালোবাসা।

মায়াকে আগের থেকে ইদানিং অনেক বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়। পড়াশুনাও নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই সেই সকালে বেরিয়ে যায় আসে রাত ৮টা ৯টার দিকে। হলের সবাই অবাক। মায়াতো কখনো রাত করে হলে ফেরেনি। হঠাৎ এমন করছে কেন। মায়ার মোবাইল ছিল না। নতুন মোবাইল সেট হাতে, দামি দামি গিফট। একি পরিবর্তন মায়ার! একদিন হিরা জিজ্ঞেস করেই ফেলল-
“মায়াদি আপনাকে হাসি-খুশি, আনন্দে থাকতে দেখে আমাদের খুব ভালো লাগছে। কিন্তু আপনি মনে হয় কিছু গোপন করছেন। আপনার আনন্দে ভরা জীবন আমরাও শেয়ার করি।”

মায়া তখন বললো- আমি ভালোবাসার স্বাদ পেয়েছি। সাইমের প্রচ- ভালোবাসা আমার ভেতরকার শূন্যতাকে পূরণ করে দিয়েছে। আমি এখন অনেক সুখী।

“সাইম ভাই নামটাতো আপনার ধর্মের না মনে হচ্ছে। আর উনি কে?”
“হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। সাইম মুসলমান। আমার এলাকাতেই বাড়ি। সেই ক্লাস নাইন থেকে সে আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আমি সেটাকে সবসময় উপেক্ষা করেছি। কিন্তু এখন আমার মনে হয় সাইমই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। ও আমার সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। আমি ওর সাথে সারাটা জীবন কাটাতে চাই।”

“কিন্তু আপনার বাবা-মা শুনলে তো ভীষণ কষ্ট পাবে। তাছাড়া ছোট দুই বোনের ভবিষ্যতও নষ্ট হয়ে যাবে।”
“আমার কিসে সুখ সেটাও তো সবার দেখা উচিত। সাইম খুব ভালো মনের মানুষ।”

হিরা বুঝলো মায়া একটা ঘোরের মধ্যে আছে। তাই আর কিছু বলা হলো না।

এদিকে মায়া হলের মেয়েদের কাছে কীভাবে নামাজ পড়তে হয় জানতে চায়। সাইম বিশ্বনবী নামে একটা বই কিনে দিয়েছে। সেটা খুব মন দিয়ে পড়ছে। হলের সবাই তা দেখে যাচ্ছে। একদিন মায়ার এক রুমমেট, সারা জিজ্ঞেস করল- “মায়াদি, সাইম ভাইয়ের সাথে বিয়ে হলে কি আপনি মুসলমান হবেন।”
“তা তো হতেই হবে। তা না হলে আমরা একসাথে সারাজীবন থাকবো কীভাবে।”

এরপর থেকে হলের আর কেউ মায়ার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। সাইম ভাই একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে এ পড়াশুনা শেষ করে প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করছে। প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে মায়ার সাথে দেখা করতে আসে। এভাবে প্রায় চার মাস গেল। একদিন মায়ার মা এসে কোনো কথা না বলে সোজা মায়াকে হল থেকে বাড়িতে নিয়ে গেল। মায়ার এলাকার কয়েকজন ছেলে সাইম আর মায়ার এই মেলামেশার ব্যাপারটা মায়ার বাবা-মাকে জানিয়ে দেয়।

মায়া আর ফিরে আসেনি হলে। মাস্টার্স পরীক্ষাও দেয়া হয়নি। সাইমের সাথে মায়ার সব রকম যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল তার বাবা-মা। ২৪ ঘণ্টাই ওকে মায়ের চোখের ওপর থাকতে হতো। অনেক কাকুতি-মিনতি করেও কোনো লাভ হয়নি। এভাবে প্রায় দুই বছর চলে যায়। দেবার কাছ থেকে ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণা আর সাইমের থেকে প্রচ- ভালোবাসা পেয়ে হারানোর দুঃখ একত্রিত হয়ে মায়ার মধ্যে এক ধরণের মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। ফলস্বরূপ একদিন শোনা যায়, মায়া আত্মহত্যা করেছে।