কবি মুজতাহিদ ফারুকী একজন মেধাবী লেখক। তার ঝলমলে কবিতায় অফুরন্ত হিউমার আর ভাবনার পরিপক্বতায় মুগ্ধ হতে হয়। নিপুন সত্যসন্ধানী এই লেখক খানিকটা ব্যতিক্রম এবং স্বকীয়। তিনি দৈনিক নয়াদিগন্তের সহকারী সম্পাদক ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সদস্য। চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর ও প্রজ্ঞাবান। কবিতার মত উপসম্পাদীয় কলামেও নিজস্ব শব্দ ও বাক্য ব্যবহারে সফল। কবিতার ছন্দগুলো তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব শক্তির আলোকিত পথে।

মুজতাহিদ ফারুকীর কাব্যে ভাষার বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। নদী পারের শব্দ সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ তার কবিতার শরির। কতখানি নিখুঁত শব্দমালা সাজালে কবিতা হয়, তা দেখতে চান এই কবি। এফবিতে আমি তা বেশ আগে থেকেই অবলোকন করছি। প্রতিদিন কবিতায় তার কসরত আমাকে আপ্লুত করে। সাম্প্রতিক কয়েকটি কবিতা এখানে উল্লেখ করা যায়।

নিসর্গ যাপন মুজতাহিদ ফারুকীর একটি দুর্দান্ত কবিতা। এতে মধ্যবিত্ত সমাজের চিত্র এবং আবেগ-অনুভূতি খুব সহজ কথা ও ছন্দে উঠে এসেছে।

’ঝিঁঝিঁরা শিখেছে পাথরের ভাষা, পাতারা ঘুমের শিশু, / পাল তোলা রাতে আকাশ নেমেছে নাটকের মেহফিলে / আধখানা চাঁদ একাকী দেখনদার। / সোনালি রূপালি চকমকি ঝরে শিশিরের দোলনায় / খোলা ছাদ থেকে; চোখের আড়ালে ফোটে শত ফুল। / যারা সেজেছিল রাজা রাণী, চাকর বাকর, রঙিলা, বিবেক / ফিরে গেছে ঘরে- / হয়তো নিজের পার্ট নিয়ে খাটে উদোম হয়েছে। / যাকগে সে যাক, যে মরার সে মরুক, আমি শুয়ে আছি / উপকূলে, মাতাল সবুজে, চারপাশে অরণ্য বিধুর, / চোরা করাতের টানে ভূপাতিত / মেহগনি শালের বিজনে সুর খেলে আহ্লাদী হাওয়া / মলিন পায়ের ধুলি মুছে, মৃদু হেসে / বিচূর্ণ লাস্যে যায় পার্বতীর মেয়ে এঁকেবেঁকে। / থর থর নিথর সময়ে।’

নদী নির্ভর জনপদের প্রকৃতিকে চেনা সহজ ব্যাপার নয়। অনেক পরিশ্রম ও জ্ঞানান্বেষণ থাকতে হয়। মুজতাহিদ ফারুকী চেতনায় বিশ্বজনীন হলেও বিষয়ে প্রচণ্ডমাত্রায় দেশজ হতে পেরেছেন । তার কবিতায় গ্রামীণ দৃশ্যপট গভীরভাবে ধারণ করেন। চমৎকার মুনশিয়ানার ছাপ রেখে পাঠককে জ্ঞানের গভীরে নিয়ে যান। ফলে পাঠক মহলে চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছেন।

‘এই তো কেবলই এলে, কেন যাবে, কেন এত তাড়া? / একটু রিল্যাক্স করো, বোসো এই নরোম সোফায়,/ শরীর জুড়াবে দ্রুত কুলারের কৃত্রিম শীতল হাওয়ায়। / মনের কথা তো বলি, নিরিবিলি, এই শান্ত গোধূলি বেলায়!’

মুজতাহিদ ফারুকীর সাহিত্য-বিবেক বুঝতে হবে তার লেখার ভিতর দিয়ে, ভাষা ও ভাবনার মাধ্যমে। চমৎকার সব চিত্রকল্প কবির বিভিন্ন কবিতায় নানা কাহিনিতে বিধৃত। চেনা দৃশ্যের ওপর কল্পনার মিশেলে চিন্তা ও বোধের দৃশ্যপট রচনা করেন তিনি। যেখানে যে-কোনও বয়সের পাঠকই পেয়ে যাবেন তার পরিচিত কাহিনী আর ভাবনার ব্যাপক সাদৃশ্য।

ফারুকীর ‘চোখ কাঁদে না মন কাঁদে’ কবিতায় মিলে অন্যরকম নান্দনিকতার ছোঁয়া। ‘চোখের জলে ভাসছি যখন ভাবছো বুঝি চোখ কাঁদে? / চোখ কাঁদে না, মন কাঁদে রোজ প্রেম বিহ্বল নীল ফাঁদে। / আনাড়ি মন কাঁদতে জানে, নেই জানা তার অশ্রুপাত, / কাঁদবে বলে ধার নিয়েছে দুই নয়নের জল প্রপাত। / কেউ বোঝে না হৃদয়-মনের সঙ্গে চোখের খুনসুটি / কান্না বুকের রক্তক্ষরণ অশ্রু ধারায় নেয় ছুটি। / মনের নেকাব সরাও যদি আকাশ পারে দাও পাড়ি / অশ্রুতে মন ছোঁয়াও মেয়ে বুঝবে হৃদয় কেন ভারি।’

মুজতাহিদ ফারুকীর কয়েকটি কবিতা পড়লেই তাকে স্বরুপে আবিষ্কার করা সহজ। প্রাত্যহিক জীবনাচার সম্পর্কিত বিষয় তার লেখায় রয়েছে নিঃশঙ্ক চিত্তে। যা ব্যবহৃত হয় সারা বাংলার ঘরে ঘরে সবুজ পাড়ের জমিনে।

ফারুকীর নান্দনিক উচ্চারণ- ‘লিখি কিছু এলেবেলে ধান, / চিনি গুঁড়া, কালিজিরা, বেগুন বিচি ও দুধশাইল; / আর লিখি কিছু তেতো দেশি পাটপাতা, / সুষনির শাক / শুকনো মরিচ পোড়া, দেশি পেঁয়াজের কুচি, কিছুটা রসুন…/ আমাদের তোষাগারে আর কোনও জহরত নাই।’

শীতের প্রস্তুতি কবিতায় কবির শিল্পীমনের স্পর্শ পাওয়া যায়। ‘শীত আসছে। আলোয়ান কিনতে যাইনি সুপার শপে, নিউ মার্কেটে। / ফুটপাতে, গুলিস্তানে খুঁজে নিই ওমঠাঁসা ভাষার পুরান। / গরীবের নিজস্ব বাগান, আহা, ঠিকরানো জহর নিলামে, / দেরাজের এক কোণে উলেন জাম্পার ঠেলে দেয় যথাশব্দ, আশ্বাস, সাহস, / আমার কী ভয় শীতে! মার মুখে স্রোতস্বীনী ভোরের কালাম / রেখেছি দু’ কানে, পুরানের পথে হেঁটে কবিতায় বাজাই তুফান।’

মুজতাহিদ ফারুকীর লেখায় আজ এবং আগামীকে সঞ্চালিত করার অসীম ক্ষমতা বিদ্যমান। তিনি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে এক বিশাল সম্ভাবনাময় রত্নভাণ্ডার। তার টুকরো আকাশ কবিতায় নতুন কাব্যভাষা প্রস্ফুটিত হয়েছে। রূপকল্প ও কাব্যময়তার অনাবিল ভুবনে লেখকের উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় মিলে।

‘ফচকে মেঘের ফাঁকে চলে গেলে পলাতক চাঁদ / সবুজ পাহাড় বোঝে, বুকজুড়ে নচনচে ঘাসের যৌবন / ডেকে আনে দুর্বিনীত দুর্মর গুরুস্কন্ধ গয়ালসকল / ফিনফিনে রেশম-আঁধার বিহ্বল অবশ সম্মোহনে / চেতনা ছিনিয়ে নিলে সব ভুলে গাছেরাও ছায়ামূর্তি ধরে / স্তব্ধ মূঢ় সময়ের বল্কলে মেলে না গাছপাথর / খুব বেশি স্পর্শকাতর নাসারন্ধ্রে মেহনের ঘ্রাণ থৈ থৈ / কারা যেন গান্ধর্ব তাপনে তনুমনে ঢেলে দেয় / সুনিপুণ প্রাণের আরক / আরণ্যক নিরালোকে প্রেম প্রেম, ঢেউ ঢেউ গোষ্ঠলীলা খেলে। / দুষ্টু চাঁদ ছোবলায় গভীর সলিলে, তাকে বলি ভাবের কটাল / বাতাসে কেন যে ভাসে মানুষের অস্ফুট ভাষার ফিসফিস!’

মুজতাহিদ ফারুকীর ফেরা কবিতাটি বেশ ব্যতিক্রমী, বিচিত্র এবং বর্ণাঢ্য। ‘অবশেষে ফেরা হলো / সময় পেরিয়ে গেছে ঢের, / দরজায় লোহার তালাটি, গায়ে তার গাঢ় অভিমান / বহুদিন ভুলেছে সে অভ্যর্থনার গান / মরিচার টানে। / যতই ঘোরাই চাবি মোচরানো সার। / ভুল চাবি ঢুকিয়েছি এমত সংশয়ে / ভয়ে ভয়ে নিজের মুখেই রাখি ব্যর্থ আঙুল / সেই নাক, সেই গাল, কাঁচাপাকা চুল / সব ঠিকঠাক আছে শুধু নেই যৌবনের সাড়।’

মুজতাহিদ ফারুকী কবিতায় আঞ্চলিক ভাষাকে ব্যাপক ভাবে উপস্থাপন করেছেন। আগাম মেরাজ বা কৈফিয়ত কবিতায় তা লক্ষ্য করা যায়। ‘জেবন অ্যাবাও ক্যারে? ম্যাড়ম্যাড়া, বুজি না তো খেল্ তার / হুদাই গেসুর পাড়ে, গসটায়, নাই বুজি অ্যাজ্লা নিস্তার / য্যান্ চরো আটকিসে যার্তী ভরা গুদারার নাও / যতই গলুই ঠেলো, আইত দিন যতই ক্যান্ না লগি বাও / নাও আরও বালুত্ হামায়, ভিজা লগি খালি পিছলায় / হুগনা গাঙ্গের পানি হে-ও কান্দে মনিষ্যির দুষ্কে ডাক ছাড়ি। / কারে ম্যান্ জিগামু গুমর, কেডা জানে জিন্দেগির সার / ক্যান্ নদী ভাঙ্গে গড়ে, ক্যান্ ভাঙ্গে হাজাইন্যা সংসার? / আবার অঙিলা দিনো চোক্ষে ক্যান্ নাগে নেশা ঘুর / আওলা বাতাসে মুন্ ক্যান্ অয় উৎলা সমুদ্দুর? / যুদিল না থাহে সুখ কুনুদিন পুড়া ই কফালো উগো সাঁই / কিসেরে দিলেন কন্ অবুঝ পরানো মুহব্বতের রুশনাই?’

দক্ষিণ জামালপুরের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা কবিতায় ব্যবহৃত শব্দার্থও তিনি দিয়েছেন। জেবন>জীবন; অ্যাবাও>এমন; ক্যারে>কেন; ম্যাড়ম্যাড়া>মলিন, অনুজ্জ্বল; বুজি না>বুঝি না; খেল্>খেলা; হুদাই>শুধু শুধু; গেসুর পাড়ে>ঘেষড়ে চলে; গসটায়>ঘষটায়; অ্যাজলা>একটু; য্যান>যেন; চরো>চরে; আটকিসে>আটকে গেছে; যারতী>যাত্রী, গুদারার নাও>খেয়া নৌকা; লগি>লম্বা বাঁশ, যা দিয়ে নৌকা বাওয়া যায়; বালুত্>বালুতে; হামায়>ঢোকে, প্রবেশ করে; হুগনা>শুকনা; হে-ও>সে-ও; দুষ্কে>দুঃখে; জিগামু>জিজ্ঞাসা করবো; গুমর>গুঢ় বা গোপন রহস্য; কেঠা>কে; হাজাইন্যা>সাজানো; নাগে>লাগে; ঘুর>ঘোর; কফালো>কপালে; কিসেরে>কী জন্যে; রুশনাই>রোশনাই, আলো, জ্যোতি।

মুজতাহিদ ফারুকী একেবারে শৈশব থেকে লেখালেখি শুরু করলেও পরিকল্পিত ভাবে লিখেছেন বলে মনে হয়নি। কলেজ জীবনে রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার অর্জন ছিলো উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পরে সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে নাম প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক জাহানে নও পত্রিকার কিশোরদের পাতায়।

ঢাকায় সম্ভবত ৮১/৮২ সালে কবি আমিনুল হক সম্পাদিত সাময়িকী সাপ্তাহিক বিপ্লবে প্রকাশিত হয় পিকাসোর চিত্রকর্ম বিষয়ে তার প্রথম অনূদিত ফিচার। তারপর থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় কমবেশি লেখা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু কোনওটাই নিয়মিত নয় বলে জানা যায়।

মুজতাহিদ ফারুকী প্রেম-বিরহকে অবলম্বন করে জন মানুষের হৃদয়ের উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে তুলেছেন। এক সময় গল্প লিখে বিতর্কের ঝড় সৃষ্টি করেছিলেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সফল অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর সম্পাদনায় নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক ছোটগল্প নানা কারণে আলোচিত হয়। ১৯৮৬/৮৭ সালের দিকে সাত ধোয়া শাড়ি অথবা নারী শিরোনামের একটি গল্পের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে।

দীর্ঘ ছয় মাস ধরে এ নিয়ে সম্পাদক বরাবর পাঠকের তীব্র প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে। সম্পাদক আনোয়ার হেসেইন মঞ্জু পর পর ছয়টি সংখ্যায় পাঠকের প্রতিবাদী চিঠি ছাপান। পরে লেখক ও সম্পাদকের ব্যাখ্যামূলক চিঠি ছাপার মাধ্যমে সেই পর্বের ইতি ঘটে। ওই সময় লেখক হিসাবে মুজতাহিদ ফারুকী অনেকটাই পরিচিতি অর্জন করেন। ওই ঘটনার প্রায় ৪০ বছর পর এখনও কোনও কোন পাঠকের সঙ্গে পরিচয় ঘটলে তারা ওই গল্পের কথা স্মরণ করেন। লেখক হিসাবে এটি এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা বটে।

পরে ১৯৯৫ সালে নতুন ঢাকা ডাইজেস্টে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় উপন্যাস ‘স্বপ্নের দেশে যতো যাই’। সেই প্রথম অনুষ্ঠানের ওপর দৈনিক বাংলায় ফিচার লিখেছিলেন তখনকারে সেরা ফিচার রাইটার হেদায়েত হোসেন মোরশেদ। ফিচারটি তিনি শুরু করেছিলেন প্রথম পুরস্কার পাওয়া নবীন লেখক মুজতাহিদ ফারুকীর গল্পের সূচনা অংশ দিয়ে।

৮০-র দশকের শেষ দিকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তরুণ লেখকদের নিয়ে গল্পপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেই প্রতিযোগিতায় দু’বার অংশ নিয়ে প্রথমবার প্রথম এবং দ্বিতীয়বার দ্বিতীয় পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৯৯ সালে দৈনিক যুগান্তরে যোগ দেয়ার পর থেকে পরবর্তী ২০ বছর সৃজনশীল লেখালেখি প্রায় বন্ধ ছিলো। এটিকে বলা যায় সাহিত্য থেকে তার স্বেচ্ছা নির্বাসনের কাল।

২০১৯ সালের শেষদিকে আবার নতুন করে লেখালেখি শুরু করেন। এখন পর্যন্ত মূলত কবিতা এবং উপসম্পাদকীয় লিখছেন। গল্প বা উপন্যাস রচনায় হাত দিয়েছেন বলে চোখে পড়েনি। পত্র-পত্রিকায় লেখা পাঠানোর ব্যাপারে এক ধরণের অনীহা তার মধ্যে কাজ করে। তাই প্রচারণা থেকে তিনি পিছিয়ে। তবে গত দুই বছরে এফবিতে মুজতাহিদ ফারুকীর কবিতা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

আমার কবিতা, গল্প এবং ভ্রমনকাহিনীর কিছু অগ্রসর পাঠক ও সমালোচক রয়েছেন। যারা প্রায় নিয়মিত লেখাগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েন এবং মূল্যবান অভিমত ব্যক্ত করেন। কেউ কেউ টেলিফোনেও বিশ্লেষণ করেন। এমন একজন আবার মুজতাহিদ ফারুকীর কবিতার ভাল পাঠক।

ফারুকীর কবিতা পড়তে-পড়তে মনে হবে জনমানুষের হৃদয়ে পোষিত মনভাবনাকে সরাসরি তুলে এনেছেন। লেখার শৈলী বেশ সরস, সুন্দর। আমাদের সাহিত্যে এই রকম লেখা হবে, সেই আশায় অনেকের লেখা পড়েছি। সেটা সার্থক হয়েছে এত দিনে। আমার মত অন্য কেউ যদি তার কবিতার গভীরে যেতে চান, মুক্তা কুড়াতে পারেন। এত সুন্দর, এত নিখুঁত পঙক্তিমালা হৃদয়ে শিহরণ জাগায়, অন্তর আলোড়িত হয়।

২০১৯-২০ সালে ব্রেক্সিট নিয়ে কয়েকশত রিপোর্ট করেছি। জাতীয় দৈনিক মানব জমিনেই অর্ধশত হবে। তখন ব্রেক্সিট বিষয়ে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভনডার লেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রধান সমন্বয়ক মিশেল বার্ণিয়ার এবং তার যুক্তরাজ্যের প্রতিপক্ষ লর্ড ডেভিড ফ্রস্টের মধ্যে ব্রাসেলসে বা বৃটেনে যে আলোচনা হয় তা নিয়ে বিশেষ করে অমীমাংসিত বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে। শেষের দিকে বৃটেনের জল সীমায় ফিশিং অধিকার এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তথা যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়ীরা যাতে ন্যায্য সুবিধা পায় সে সম্পর্কে প্রায় প্রতি সপ্তাহে লিখেছি। সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলোর সাথে নিয়মিত কথাও বলেছি।

একদিন দৈনিক নয়াদিগন্তে মুজতাহিদ ফারুকীর ‘ব্রেক্সিট : ইংরেজের অহমিকা রক্ষার মরিয়া চেষ্টা!’ শীর্ষক কলাম দেখে সাথে সাথে পড়ে নেই। লন্ডনে বসবাসকারী হিসেবে এই লেখার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হতে পারিনি। তবে ভাষার শৈলী ও তথ্যের সমাহারে লেখাটি যথার্থ মানোত্তীর্ণ ছিল। ২০০০ সালের জুলাই মাসে অন্য দিগন্তে ‘মুরাকামি ও প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন’ শিরোনামে আরেকটি লেখা আমাকে আকৃষ্ট করে। এরপর নয়াদিগন্তে আসামের ‘মিঞা কবিতা’ প্রতিরোধের নতুন আগুন, জলবায়ু সম্মেলন বিশ্বনেতাদের বার্ষিক পিকনিক! ইত্যাদি লেখা পড়ে চমৎকৃত হই। ফলে প্রায়ই তার লেখা পড়তে চেষ্টা করি। নয়াদিগন্তে প্রতি বুধবার উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। অসাধারণ তার সব কলাম। চলতি বছর সাহিত্য নিয়ে অনৈতিক বাণিজ্য শীরোনামের লেখাটি পড়ে তাকে নিয়ে লেখার আগ্রহ জাগে।

এখানে মুজতাহিদ ফাররুকীর কয়েকটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ তারিখ সহ উল্লেখ করলাম। আগ্রহী পাঠকেরা নয়াদিগন্তের আরকাইভ থেকে পড়ে নিতে পারেন। পর্যটন নিয়ে ঢনঢন (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১), নতুন দল আসছে, কী আছে আশা করার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১), একটি গান পাল্টে দিচ্ছে পুরো দৃশ্যপট (০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১), তাদের ‘দায়মুক্তি’ দেয়াই উচিত (৩১ আগস্ট ২০২১), ফের ‘মুক্ত-স্বাধীন’ আফগানিস্তান! (১৭ আগস্ট ২০২১), রোবোটিক্স ও প্রযুক্তির নতুন বিপ্লব (১৩ জুলাই ২০২১), বিশ্বজুড়ে ইসলামী সঙ্গীত এবং আমরা (০৬ জুলাই ২০২১), রোহিঙ্গা ইস্যু ও মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকার (২৯ জুন ২০২১), করোনা-সতর্কতা কেন জরুরি (১১ মে ২০২১), খাদ্যাভাবে পড়বে না তো দেশ? (২০ এপ্রিল ২০২১), মার্কিন বিদেশনীতির অগ্রাধিকার ইরান (০২ মার্চ ২০২১), ধনীরা পালিয়ে যাক মঙ্গলে, পৃথিবী বাঁচুক (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১), সাহিত্য নিয়ে অনৈতিক বাণিজ্য (০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১), মুরাকামি ও প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন (০৭ জুলাই ২০২০), কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠা সহজ হবে না (১৬ জুন ২০২০), অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ (০২ জুন ২০২০), সর্বস্তরে বাংলার আশা ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়! (১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০), বৈশ্বিক পরিচিতির জন্য অনুবাদের বিকল্প নেই (০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০), এক কিশোরী ও অশীতিপর নারীর যুগলবন্দী (২৪ ডিসেম্বর ২০১৯), জলবায়ু সম্মেলন বিশ্বনেতাদের বার্ষিক পিকনিক! (১৭ ডিসেম্বর ২০১৯), উইঘুর জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন (১৯ নভেম্বর ২০১৯), সামাজিক নর্মস শিখুন, স্মার্ট হোন (০১ অক্টোবর ২০১৯), সরল বিশ্বাস’ নিয়ে অস্বচ্ছতা, কিছু কথা (২৩ জুলাই ২০১৯), আসামের ‘মিঞা কবিতা’ প্রতিরোধের নতুন আগুন (১৬ জুলাই ২০১৯), ব্রেক্সিট : ইংরেজের অহমিকা রক্ষার মরিয়া চেষ্টা! (১৮ জুন ২০১৯)

মুজতাহিদ ফাররুকীর প্রকাশিত বই:
১. কখনও ব্যর্থতাকে (কাব্য): প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭। প্রকাশক: সাহিত্যের অন্যতম সেরা লিটল ম্যাগাজিন ঊষালোকে খ্যাত সম্পাদক মোহাম্মদ শাকেরউল্লাহ, অভিজন প্রকাশন, ৫৮, পশ্চিম মালীবাগ, ঢাকা-১৭। প্রচ্ছদ: হামিদুল ইসলাম। চার ফর্মার এই বইতে কবির প্রথম জীবনের মোট ৩৮টি কবিতা স্থান পায়।

২. ঝুলে আছে (গল্পগ্রন্থ): প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮। প্রকাশক: মজিবর রহমান খোকা, বিদ্যাপ্রকাশ, ৩৮/২-খ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। প্রচ্ছদ: ওয়াকিল আহমদ। বইটির কোনও কপি নিজের কাছে সংরক্ষিত নেই। এতে কয়টি গল্প ছিলো এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

৩. ২৫ বসন্তের হাওয়া: বাংলাদেশের ছোটগল্প সম্পাদনা (বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫তম বর্ষে দেশের গল্পকারদের গল্পের সংকলন); প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭। প্রকাশক: চৌধুরী আবদুস সালাম। অবগাহন প্রকাশনী, ৬৬, আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা। এ বইতে ষোল জন গল্পকারের গল্প সংকলিত হয়। ক্রমানুসারে আতা সরকার- ল্যাম্পপোস্টের শেয়াল, হুমায়ূন আহমেদÑ আনন্দ-বেদনার কাব্য, হরিপদ দত্ত- কুকুর ও আকাশের চাঁদ, মঞ্জু সরকার- পুণ্যভূমি, সুশান্ত মজুমদার- রক্তমাংস, ইমদাদুল হক মিলন- নিরন্নের কাল, মঈনুল আহসান সাবের- ভুল বিকাশ, রেজোয়ান সিদ্দিকী- আড়াল, মাখরাজ খান- মানব, মুজতাহিদ ফারুকী- জীয়নখোলার জীবন-মৃত্যু অথবা দুধমাতা, তমিজউদ্দিন লোদী- প্রজন্মের দোলা, মোশাররফ হোসেন খান- ডুব সাঁতার, বুলবুল সরওয়ারÑ হিটলারের লাশ, সাবিনা মল্লিক- ফিরে চল সীমান্তে, নাজিব ওয়াদুদ- কারফিউ, ফকরুল চৌধুরী- শূন্যলোক।

৪. স্বপ্নের দেশে যতো যাই (প্রেমের উপন্যাস); প্রকাশকাল: ২০০৪। প্রকাশক: মজিবর রহমান খোকা। বিদ্যাপ্রকাশ, ৩৮/২-খ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। প্রচ্ছদ: সমর মজুমদার। লেখকের ভূমিকা থেকে- ‘মিষ্টি একটি প্রেমের গল্প লিখতে চেয়েছি। হয়ে উঠেছে ত্রিভূজ প্রেমের নিরন্তর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে পীড়িত হৃদয়ের বেদনামথিত করুণ আর্তনাদ। দু চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে যাদের পথচলার শুরু বিরূপ পারিপার্শ্বিকতার চাপেতারা পিষ্ট, ক্লিষ্ট, পীড়িত। তবুও লালন করে দুর্মর স্বপ্ন। একটি সুন্দর সমৃদ্ধ দেশ, একটি স্বপ্নময় জীবনের অঙ্গীকার, একটি সংবেদনশীল হৃদয়ে নিশ্চিত আশ্রয়ের অন্বেষণ তাদের এগিয়ে নেয়। সংগ্রামে-সংগঠনে, উজ্জীবনে-অনুপ্রেরণায় স্বপ্নই প্রকৃত পঙ্খীরাজ। মাটির পৃথিবীর কাদাজলের পটভূমিতে কালস্রোতের যেসব অমোচনীয় চিহ্ন আঁকা হয়ে যায় তারও খন্ডিত স্থিরচিত্র মুদ্রিত হয় স্বপ্নেরপরতে পরতে। স্বপ্নের দেশে যতো যাই- সেই স্বপ্নিল ভালোবাসার চিরন্তন গল্প।

৫. নৈরাজ্যে একা (মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক উপন্যাস); প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০০৮। প্রকাশক: মজিবর রহমান খোকা। বিদ্যাপ্রকাশ, ৩৮/২-খ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। গ্রামের মোটামুটি স্বচ্ছল একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যায় একাত্তর সালে। বাবা-মার মৃত্যুর পর তাদের কিশোর সন্তান কিসমতের কাছ থেকে গায়ের জোরে সম্পত্তি দখল করে নেয় গ্রামের মাতব্বর। নিঃসঙ্গ ও ভাগ্যবঞ্চিত কিসমত ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে চলে আসে। এই কিশোর কিসমতের জবানিতে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের নানা টুকরো ঘটনার চিত্র। মুক্তিযোদ্ধা ও আলবদর রাজাকার উভয় পক্ষেরই বেশ কাছাকাছি এসেছে কিসমত। তাদের কর্মকান্ড চাক্ষুস করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির মত কিছু সাহসী ভূমিকাও পালন করেছে। কিন্তু সব হারিয়ে যেদিন শহরে আসে কিসমত তখন সে তিনদিনের উপোসী। শরীর হাড় জিরজিরে। পেটে ভীষণ ব্যথা। এক মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বাইরে কয়েকজন তরুণকে দেখে সে সাহায্যের হাত পাতে। কিন্তু তরুণরা তাকে ভিক্ষা দেবে না। তারা কাজ করে খাবার পরামর্শ দেয়।

এক তরুণ নিছক মজা করার ছলে কিসমতকে একটি কাজ দেয়। কাজটি হলো, দৌড়ে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে আবার দৌড়ে ফিরে আসতে হবে। যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় দৌড়ের ওপরেই থাকতে হবে। থামলে চলবে না। এভাবে ২০টি ফুল এনে দিতে পারলে এর বিনিময় হিসাবে তাকে ২০০ টাকা দেয়া হবে। ক্ষুধার্ত, পেটে ব্যথা, জীর্ণ ভঙ্গুর শরীরে কিসমত তখন নড়ার অবস্থায়ও নেই। তবু সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। সে সম্মানজনক ভাবেই বাঁচতে চায়।

দৌড় শুরু হলে অনেকের কাছে একটি কৌতুককর দৃশ্যের অবতারণা হয়। রাস্তায় লোক দাঁড়িয়ে যায়। এই যে ভাতের জন্য ফুলের পেছনে ছোটা- এ এক প্রতীক হয়ে এসেছে উপন্যাসে। দৌড়ে ২০টি ফুল কিসমত ঠিকই নিয়ে আসে কিন্তু তখনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তরুণেরা টাকা না দিয়েই পালিয়ে যায়। কিসমতের কিসমত থেকে দুর্ভাগ্যের মেঘ আর কাটে না। উপন্যাসে ফুলের জন্য কিসমতের দৌড়ের মধ্যে আধা চেতন, আধা অচেতন এক ঘোরের মধ্যে উঠে আসে একাত্তুরের ঘটনা-দুর্ঘটনা, চুয়াত্তুর সালের বিপর্যয়কর দুর্ভিক্ষ, এক মুঠো খাবারের জন্য সরকারি লঙ্গরখানায় মানুষের প্রাণপণ লড়াই, পথেঘাটে মৃত্যুর দৃশ্যাবলী।

মুজতাহিদ ফারুকী ১৯৫৯ সালের ২৭ মে জামালপুর জেলার সদর থানার তিতপল্লা ইউনিয়নের পশ্চিম পাড় দিঘুলী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পুরো নাম মুজতাহিদ বিল্লাহ ফারুকী। তবে লেখক নাম মুজতাহিদ ফারুকী হিসেবেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।

বাবা প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকী। একজন ভাষা সৈনিক। ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার তমুদ্দুন মজলিসের অন্যতম নেতা এবং সংগঠনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিকের অন্যতম লেখক হিসেবে ভাষা আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে নিরলস ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তান সরকারের তথ্য বিভাগের প্রথম শ্রেণির চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুধুই বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি তমুদ্দুন মজলিসের সভাপতি প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমের সঙ্গে ঢাকার মিরপুরে বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন। কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্বে থেকে মূলত তিনিই সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টায় কলেজটি গড়ে তোলেন।

আশরাফ ফারুকী ৫২-র ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুনো যে মিছিলে পুলিশ গুলি চালায় সেই মিছিলে শরিক ছিলেন। তার কানের পাশ দিয়ে গুরি চলে যায় বলে স্মৃতিচারণ তিনি করেছেন বহুবার। সে সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসাবে যে ক’জন ব্যক্তিকে স্বীকৃতি দেয়া হয় তিনি তাদের অন্যতম।

ভাষা আন্দোলনের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসাবে তিনি বাংলা একাডেমির প্রস্তাবক ও প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর উপর্যুপরি তিন বার একাডেমির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ঢাকার মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত মিরপুর বাংলা কলেজেরও তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি জামালপুরের সরিষাবাড়ি কলেজসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

আশরাফ ফারুকী একজন সুলেখক হিসাবেও সুনাম ছিলো। তিনি দক্ষ অনুবাদকও বটে। লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফীর সবুজ বিপ্লব খ্যাত রাজনৈতিক দর্শনের ওপর তিনি বই লিখেছেন। তার অনূদিত কয়েকটি গ্রন্থের মধ্যে, মার্কিন গবেষক মেরী ও লরেন্স কে. ফ্রাঙ্ক-এর রচিত শিক্ষাপদ্ধতি বিষয়ক গ্রন্থ স্কুলে তারা মানুষ হোক (১৯৬৬), এবং ফরাসী ঐতিহাসিক চরিত্র জোয়ান অব আর্ক-এর জীবনী ভিত্তিক শিশুতোষ গ্রন্থ বীর কন্যে জোয়ান উল্লেখযোগ্য।

মুজতাহিদ ফারুকীর মাতা বেগম সুরাইয়া ফারুকী। জামালপুর জেলার অন্যতম জয়িতা, রতœগর্ভা মা হিসাবে সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। তার ভাইবোন হলেন ১. নাসরিন জাহান (অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা) ২. মুজতাহিদ বিল্লাহ ফারুকী ৩. মুয়াহ্হিদ বিল্লাহ ফারুকী (এনজিওকর্মী) ৪. মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী (প্রিন্সিপাল, সরকারী আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর) ৫. মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী (অতিরিক্ত সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) ৬. ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী (কমিশনার অব ট্যাক্সেস, এনবিআর, এবং ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, ২০২১-২০২২)। ৭. মুশাহিদ বিল্লাহ ফারুকী (অকালমৃত) ৮. মাজকুরা নাজনীন (ব্যাংকার) ৯. মুস্তানজিদ বিল্লাহ ফারুকী (ব্যবসায়ী)

মুজতাহিদ ফারুকীর স্ত্রী মাহমুদা আখতার অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা। একমাত্র সন্তান মুস্তায়ান আবরার ফারুকী বেসরকারি খাতের আহছানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বস্ত্র প্রকৌশল বিষয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশের অন্যতম গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি হামিম গ্রুপে কর্মরত।

মুজতাহিদ ফারুকীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু মিরপুর ন্যাশনাল বাংলা স্কুলে। পরে জামালপুরের সরিষাবাড়ি থানায় আরামনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন। মাধ্যমিক শিক্ষা আরামনগর হাইস্কুল, কামালখান হাট হাইস্কুল এবং দিঘপাইত ধরণীকান্ত হাইস্কুলে। দিঘপাইত ধরণীকান্ত হাইস্কুল থেকে ১৯৭৫ সালে এসএসসি, ১৯৭৮ সালে দেওয়ানগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ মাস্টার্স পাশ করেন ১৯৮৩ সালে।

কর্মজীবনে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় লেখালেখির অভ্যাস বশে ১৯৮১ সালে সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দিলে ১৯৮৩ সালে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৯৯ সালে সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে দৈনিক যুগান্তরে ও ২০০৪ সালে দৈনিক নয়াদিগন্তে ফিচার এডিটর পদে যোগদেন। ২০০৬ সালে বৈশাখী টেলিভিশনের মাধ্যমে ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ায় পদার্পণ করেন। একই বছর চ্যানেল ওয়ানে নিউজ এডিটর হিসাবে যোগদান এবং কিছুদিন পরে দৈনিক আমার দেশ ও পরবর্তীতে দিগন্ত টেলিভিশনে দায়িত্ব পালন। বর্তমানে দৈনিক নয়াদিগন্তে সহকারী সম্পাদক ও সম্পাদকীয় বিভাগের নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছেন।

মুজতাহিদ ফারুকীর কাব্যে ভাষা বৈচিত্র্য নিয়ে অন্যসময় বর্ধিত কলেবরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা আছে। তবে সেটি বুঝতে হলে তার কবিতা পড়তে হবে। নির্লোভ ও সাদাসিধে জীবন যাপণে অভ্যস্ত লেখক মুজতাহিদ ফারুকীর জীবনবোধ ভীষণ গভীর। মানুষের জন্য তার মমত্ববোধ অসাধারণ। তাকে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত রাখতে অনুরোধ করি। তার লেখা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাতে ছড়িয়ে পড়ে, সে ব্যাপারেও মনযোগ দিতে হবে। আমি প্রিয় কবি মুজতাহিদ ফারুকীর শতায়ু কামনা করি।