জিলহজ্ব হিজরি বর্ষের সমাপনী মাস। এ মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আযহা। এ মাস কুরবানির পশু কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের মাস এবং সামর্থ্যবানদের জন্য হজ্বের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে সমর্পিত হয়ে গুনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার অপূর্ব সুযোগের মাস। পুরো মাসটাই ইবাদত-বন্দেগি করে কাটাবার অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বরকত এবং নিয়ামতে পরিপূর্ণ মাস।

পবিত্র হজ্বের মাস জিলহজ্ব:
এ মাসেই প্রতি বৎসর তাওহিদবাদীদের ঐতিহাসিক মিলনমেলা পবিত্র হজ্ব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে মক্কা, মিনা, আরাফা এবং মুজদালিফা প্রান্তর জুড়ে। ইসলামের অন্যতম গুরূত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল হজ্ব। এই মাসের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৩ ব্যাপী হজ্বের অনুষ্ঠানাদি চলে। হাজিরা সমবেত কন্ঠে “লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনি তুলে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য ঘোষণার মাধ্যমে মুখরিত করে তোলেন। হজ্ব সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন, “বায়তুল্লাহ হজ্ব করা সেই মানুষের উপর আল্লাহর হক, যার সামর্থ্য আছে সেই পর্যন্ত পৌঁছার। আর এটা যে অস্বীকার করে তার জানা উচিত, আল্লাহ সারা বিশ্বের মানুষের কোনো পরওয়া করেন না।” (সুরা আলে ইমরান-৯৭) হজ্বের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বনবি (সা)এর অনেক হাদিস রয়েছে। তিনি বলেছেন, “আল্লাহর ঘর পর্যন্ত পৌঁছার জন্য যার পাথেয় ও বাহন আছে, সে যদি হজ্ব না করে এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তার মৃত্যু ইয়াহুদী ও নাসারাদের মৃত্যুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।” আরেক হাদিসে আছে, “তোমরা হজ্ব কর, কেননা হজ্ব এমনভাবে আমলনামা থেকে গুনাহ দূর করে দেয়, যেমনিভাবে পানি দ্বারা ধৌত করলে ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়।” (তিবরানী)

হজ্বের দিনগুলির মধ্যে “আরাফাতের দিন” খুবই গুরূত্বপূর্ণ। রাসূল (সা) বলেন, “আল্লাহতায়ালার নিকট আরাফাতের দিন সকল দিনের চেয়ে উত্তম। এদিন আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের সামনে হাজি বান্দাদের জন্য গৌরব প্রকাশ করে বলেন, তোমরা দেখ, আমার বান্দারা প্রচণ্ড রোদে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা বহুদুর থেকে আমার রহমতের আশায় এখানে উপস্থিত হয়েছে। বস্তুতঃ তারা আমার আজাব দেখেনি। অতঃপর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন”। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত, রাসূল (সা)বলেছেন, “আরাফাতের দিন আল্লাহপাক এক লোককে ক্ষমা করেন যে, তৎপরিমাণ লোককে আর কোনোদিন ক্ষমা করেন না। এরপর তিনি ফেরেশতাদের লক্ষ্য করে বলেন, হে ফেরেশতারা! তোমরা সাক্ষী থেকো, আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” (ইবনে হাব্বান)

আরাফাতের দিনের রোজা রাখা খুবই ফজিলতের। হযরত কাতাদা ইবনে নোমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবি করিম (সা)কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি আরাফাতের দিন রোজা রাখবে, তার পূর্ববর্তী বৎসরের এবং পরবর্তী বৎসরের গুনাহসমূহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।” (ইবনে মাযা) “আরাফাতের দিন রোজা রাখা এক হাজার দিন রোজা রাখার সমান।” (বায়হাকী) তবে আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, আরাফাতের দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন রাসূল (সা)। হাদিসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম বলেন, আরাফাতের দিন হাজিদের জন্য রোজা না রাখা উত্তম। আর অন্যদের রোজা উত্তম।

জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমল সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) এরশাদ করেছেন, “জিলহজ্বের প্রথম দশদিনের যে কোনো নেক আমল আল্লাহপাকের নিকট যতটুকু প্রিয়, তার চেয়ে অধিক নেক আমলও অন্য কোনোদিন ততটুকু প্রিয় নয়।” সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল(সা), জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহও কি এ দিনসমূহের চেয়ে অধিক ফজিলত পূর্ণ নয়। তবে কেউ তার জীবন ও সম্পদ নিয়ে ফেরত না আসে, তাহলে ভিন্ন কথা।” (মিশকাত) হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল(সা) এরশাদ করেছেন, “জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশদিন রোজা রাখলে প্রত্যেক রোজার বিনিময়ে এক বৎসরের রোজার সমতুল্য সওয়াব পাওয়া যাবে।” (তিরমিযী, ইবনে মাযা) উলামায়ে কেরাম বলেছেন, রমজানের শেষ দশকের রাতসমূহ অধিক ফজিলতপূর্ণ, এতে লাইলাতুল কদর রয়েছে এবং জিলহজ্বের প্রথম দশকও অধিক ফজিলতপূর্ণ, কারণ এতে আরাফাতের দিন রয়েছে।

ঈদ-উল-আযহা ও কুরবানির মাস জিলহজ্ব:
ঈদ-উল-আযহা মুসলমানদের দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় উৎসব। একে কুরবানির ঈদও বলা হয়। ১০ই জিলহজ্ব ঈদ-উল-আযহা সালাত অন্তে পশু কুরবানি দিতে হয়। আগে দিলে কুরবানি হবে না। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে,“ তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ পড় এবং কুরবানি দাও।” (সূরা কাউসার-২) সাহাবাগণ কুরবানী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূল (সা) জবাবে বলেন, “তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের সুন্নত।” (ইবনে মাযা) কুরআনে অন্যত্র আরো এরশাদ হয়েছে, “আপনি বলুন আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণ বিশ্বজাহানের রব আল্লাহরই জন্য।” (সূরা আনয়াম-১৬২) বস্তুতঃ কুরবানি ইব্রাহীম (আ)এর মাধ্যমেই প্রচলন হয়। রাসূল (সা) কখনোই কুরবানি ত্যাগ করেন নি। প্রত্যেক সচ্ছল মুসলমানের জন্য তা ওয়াজিব। হজ্বের অন্যতম আমল কুরবানি। যারা হজ্ব করতে যান তারা মীনার অদূরে কুরবানি দেন অথবা ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধের মাধ্যমে কুরবানি দেন। কুরবানির দিন পশু জবাইয়ের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করা হয় বলে ঐ দিনকে ‘ইয়াওম আন্নহর’ বা নহরের দিনও বলা হয়। রাসূল (সা)বলেছেন, “কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়।”
কুরবানির ফজিলত সম্পর্কে আরো অনেক হাদিস রয়েছে। নবি (সা) বলেছেন, “যার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।” (জামউল ফাওয়ায়েদ) তিনি অন্য হাদিসে আরো বলেছেন, “নহরের দিন অর্থাৎ জিলহজ্বের ১০ তারিখ কুরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করা থেকে ভালো কাজ আল্লাহর কাছে আর নেই। কিয়ামতের দিন পশু তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ হাজির হবে। কুরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা কবুল হয়ে যায়। অতএব মনে আগ্রহ ও সন্তুষ্টি সহকারে কুরবানি কর।” (তিরমিযী, ইবনে মাযা) হযরত ইবনে বুরায়দা (রা) তার পিতার বরাত দিয়ে বলেন, “নবি (সা) ঈদ-উল-আযহার দিন নামাজের আগে কিছু খেতেন না। নামাজ শেষে কুরবানি করে তার কলিজা খেতেন।” (তিরমিযী) কুরবানির পুরস্কার সম্পর্কে রাসূল (সা) এর হাদিসে আছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) হযরত ফাতেমা (রা)কে বললেন, “ফাতেমা! তোমার কুরবানির পশুর নিকটে এসে দাঁড়াও। এ কারণে যে, কুরবানির পশুর যে রক্ত মাটিতে পড়বে তার বদলে আল্লাহ তোমার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন। একথা শুনার পর হযরত ফাতেমা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, এ সুসংবাদ কি শুধু আহলে বায়াতের জন্য না সকল উম্মতের জন্য? জবাবে রাসূল (সা) বললেন, আহলে বায়াত ও সকল উম্মতের জন্য।”

ঈদ-উল-আযহার দিনগুলিতে অর্থাৎ ৯ই জিলহজ্ব ফজর নামাজের ওয়াক্ত থেকে ১৩ই জিলহজ্ব আছর ওয়াক্ত পর্যন্ত ফরজ নামাজ শেষে “তাকবিরে তাশরিক” পড়া ওয়াজিব। “তাকবিরে তাশরিক” হল, “আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর ওয়ালিল্লাহিল হামদ।” ফরজ নামাজের সালাম ফিরানোর সাথে সাথে কমপক্ষে একবার পড়তে হয়। ঈদ-উল-আযহার দিনগুলিতে রোজা রাখা হারাম (১০, ১১ ও ১২ই জিলহজ্ব) এ দিনগুলো জিকির-আযকার এবং ইবাদতে মশগুল থাকার দিন। হযরত উকবা ইবনে আমের (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন,“আরাফাতের দিন (হাজিদের জন্য) কুরবানির দিন ও তাশরিকের দিনগুলো হচ্ছে আমাদের মুসলিম উম্মাহর ঈদের দিন এবং পানাহারের দিন।” (আবু দাউদ ও নাসায়ী) রাসূল (সা) আবদুল্লাহ ইবনে হুজাইফাকে মীনায় প্রেরণ করেছেন যাতে চক্কর দিয়ে একথা বলে যেন, “তোমরা এ তিনদিন রোজা রাখবে না। কারণ এ দিনগুলো হল পানাহারের দিন এবং আল্লাহর জিকিরের দিন।” (আহমদ) জিলহজ্ব হিজরি সনের অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ একটি মাস। যে মাসে নাজাত লাভের অপূর্ব সুযোগ রয়েছে। ইসলামের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হজ্ব যদি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় বিনিময়ে জান্নাত লাভ হবে। রাসূল (সা) বলেছেন, “ মকবুল হজ্বের বিনিময় জান্নাত ব্যতীত আর কিছু নয়।” খাঁটি নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কুরবানির মাধ্যমে অশেষ কল্যাণ হাসিল করা যায়। আসুন কুরবানির মাধ্যমে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হই।