শ্যামল বাংলার প্রকৃতি… উদ্বেলিত করে মন, ভালবাসি অন্তরে বাংলাকে। উড়ি উড়ি প্রজাপতিমন…পৃথিবীর আনাচে কানাচে নতুন পুরাতনে মেলাতে চাই… সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমাৃ নানান দেশের নানান রুপের বেশ। কত অপরুপ দেখি বাংলার ছয় ঋতুতে… এখনো দেখিনি কোথাও আমার মায়ের মত রুপের আবেশ।
জুন ২০১৯ এ বিশ্ব বাংলা সংগঠন “তিন বাংলা”(বাংলাদেশ-ভারত-প্রবাসী বাংলা) এর আহবান পেলাম… “২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস” বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব ও ইতিহাসের অতলস্পর্শী মুর্শিদাবাদে ‘তিন বাংলার’ প্রত্যয়দীপ্ত অনুষ্ঠানমালায় অংশগ্রহনের আমন্ত্রন… এই সংগঠনের গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট কবি ও কথাকার সালেম সুলেরীর পক্ষ থেকে। মহানন্দে সাড়া দিয়ে অংশগ্রহন করলাম ‘তিন বাংলা’ সফর দলের প্রস্তুতি আলোচনা অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশ টিমের সমন্বয়কারী রহিমা আখতার কল্পনা আমার দিক লক্ষ্য করেই প্রস্তাব করলেন..ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেনে গেলে কেমন হয় আপা? আমি ট্রেনে আগে কখনো ভারতে যাইনিৃ নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের আগ্রহে রাজী হয়ে গেলাম, আমি রাজী হওয়াতে বেশ ৭/৮’জন একমত হয়ে গেল, বাকিরা ফ্লাইটে যাবেন।
পাসপোর্ট ভিসা টিকিট বিষয়ক কাজ গুলি দ্রুত করতে হবে… দায়িত্ব বিভাজন করে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। আমার ভারত ভিসা ডিসেম্বর পযর্ন্তরয়েছে তাই আমার ভাবনা কিছুটা প্রশমিত হলেও টিকিট করার জন্য পাসপোর্ট আর টাকা সহ জামসেদ ভাইকে জমা দিতে হলো, উনি ট্রেনের টিকিটের দায়িত্বে আছেন।
যাত্রার নির্ধারিত তারিখের মধ্যে দু ’জন বাদে সবার ভিসা টিকিট হয়ে গেল, রিফাত নিগার শাপলা আপা আর কানিজের ভিসা সময় মত হলোনা।কাজী সুফিয়া আখতার শেলী আপার ভিসা টিকিট হওয়া সত্বেও হঠাতই জানালেন যাবেন না। একটু জটিলতা সৃষ্টি হল…সবমিলিয়ে কিছুটা হতাশ হলেও সিদ্ধান্তে অটল রইলাম আমরা। যাহোক যাত্রার সমস্ত প্রস্তুতি হয়ে গেল। যাত্রার আগের রাতে শেষ সময়ে কাজী সুফিয়া আখতার ’মত’ পাল্টে আমাদের সঙ্গী হলেন।
২১ জুন ২০১৯ সকাল ৭-০০ মি:এ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে ইমিগ্রেশনের কাজ সম্পন্ন করে ‘বাংলাদেশ- ভারত মৈত্রী’ এক্সপ্রেসে দু’টো কেবিন বাথে আমরা আটজন রওয়ানা হলাম।
কথা ছিল যারা ফ্লাইটে যাচ্ছেঅথবা যারা বিকেল ৪-০০মি: এর মধ্যে কলকাতা পৌঁছাতে পারবেন, তারা ‘শিল্পী মনের” অনুষ্ঠিতব্যসাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন। স্বাভাবিকভাবেই মৈত্রী এক্সপ্রেসে কলকাতায় গিয়ে সে অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া সম্ভব হয় নাই আমাদের।৫-৩০ মি: এ আমরা কলকাতার হাওড়া স্টেশনে পৌঁছালাম, বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে ঘাটে ঘাটে ৭বার চেকিং সমাপন হলো .. প্লাটফর্ম এর বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। আটকে রইলাম আমরা। বৃষ্টি কমে এলোৃ এরই মধ্যে সবার চেকিং শেষে একসাথে হলাম। স্টেশনে উবার কাউন্টারে উবার ডেকে দেবার সুব্যবস্থা আছে.. তাদের সহযোগীতায় ৬ -৪০ মি: এ দু’টো উবারে সরাসরি কবি ও অধ্যাপিকা নবনীতা দেব সেনের বাসায় উপস্থিতি। গড়িয়া হিন্দুস্থান পার্কের সন্নিকটে ‘ভালবাসা” বাড়িটি তাঁর। বিশ্ব সংগঠন তিনবাংলা, পশ্চিমবঙ্গ চ্যাপ্টারের সভাপতি তিনি। তার সাথে সাংগঠনিক বৈঠক ও মত বিনিময় হলো। পলাশী দিবস উদযাপন কর্মসূচী যৌথভাবে উদ্বোধন করবেন কবি নবনীতা দেবসেন ও কবি সালেম সুলেরী।
অমর্ত সেনের ১ম স্ত্রী ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক অধ্যাপক নবনীতা দেব সেন, তিন বাংলার সাহিত্য মোদি স্বজনদের সাথে সৌজন্য বিনিময়ে… ৮১ বছর বয়সের তরুনীর কর্মযজ্ঞে আমরা বিস্মিতৃ ক্যানসারের সাথে সহবাস করে নিয়মিত কেমোথেরাপির পাশাপাশি সপ্তাহে ১টি করে লেখা নিয়মিত পত্রিকায় প্রকাশনার কাজে তাঁর সজীব চাঞ্চল্য আমাদের প্রেরনার উৎস হয়ে উজ্জ্বিবিত করে যাবে। আন্তরিক আতিথেয়তায় পুরোনো দিনের সেই বাঙ্গালী ঐতিহ্য সতেজ রেখেছেন শারিরীক অক্ষমতা সত্বেও, ৫টি কেমো দিতে হবে আজ তৃতীয়টি দিয়েছেন। বুঝতে পাচ্ছি তাঁর বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে, তবু চোখে মুখে কি দৃঢ়তা! হুুইলচেয়ারসহ সিড়ির রেলিংএ চাকার রেল লাগিয়ে অভিনব কৌশলে তাঁকে নীচে বসার ঘরে নামানো হলো অনেক কষ্টে। তাঁর কাছে ভিড়তে নিষেধ করলেন সদ্য কেমো দেয়া হয়েছে.. শরীর এখনো স্থিত হয়নি।এসময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম থাকে। তাঁর বাড়ির লোকজনও অত্যন্ত অতিথি পরায়ন। আমরা দূরথেকে এসেছি তাই সৌজন্য দেখা করতে নেমেছেন অতি আন্তরিকতায়। অল্প সময়ে নানা প্রসঙ্গ আলাপে আমরা বিমুঢ় বিস্ময়ে তার দৃঢ় বক্তব্য আকন্ঠ ধারন করেছি। আল্লাাহ তাঁকে সুস্থতার সাথে দীর্ঘায়ু করুন । এরপর‘মহাবোধি সোসাইটি আশ্রমে’ আমাদের অবস্থানও রাত্রিযাপন।
২২ জুন ২০১৯ শনিবার, ভোর ৪-৩০ মি: এ শিয়ালদহ স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা… কলকাতা জঙ্গীপুর ট্রেনে। লালবাগ, মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে অভিযাত্রা। কবি জয়ন্ত বাগচীর নেতৃত্বে।
সকাল ১১টায় মুর্শিদাবাদে‘লালবাগ যুব আবাস হোটেলে’ অবস্থান ও বিশ্রাম। নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর নামানুসারে মুর্শিদাবাদ নগরীর নাম করন হয়। মধ্যাহ্ন ভোজের পর দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন। হাজার দুয়ারী,ইমামবাড়া, বড় কাটরা, মুর্শিদকুলী খাঁর সমাধী লালবাগ, কাশিম বাজার, লালগোলা মদিনা মসজিদ, মীরজাফর,মীর মদন, খ্যতিমানদের স্মৃতিকেন্দ্র পরিদর্শন। সন্ধ্যা ৬-০০মি; এ মিডিয়ার সঙ্গে বৈঠক,স্থান লালবাগ, বহরমপুর। অত:পর ‘ফ্রেন্ডস হোটেল’লালবাগে রাত্রিযাপন।
২৩ জুন বাংলার ইতিহাসেএকটি নির্মমতম দিন। পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতন দিবস। ইতিহাসের নির্মম কাহিনী। দেশীয় ইংরেজদের চক্রান্ত… এইসব ঐতিহাসিক স্থানে পা রাখলে হৃদয়ের ভিতরে অন্যরকম শিহরন অনুভূত হয়। নানা ঘটনার প্রতিধ্বনিতে শিউরে উঠে গা।
সকালে হোটেলে নাস্তা করে রওয়ানা হলাম… ৬জনের সুন্দর সুন্দর বাহন টুক টুক, /টমটম/ টোটো তে করে ভাগিরথীর তীরে এসে বাঁশের পাটাতনে নৌকা ফেরীতে ভাগিরথী পাড়ি দিতে হবে… আমাদের একজন জুনিয়র সহযাত্রী সঙ্গীত শিল্পী স্বপ্না পারুলের ছেলে সোয়াদকে নিয়ে আমরা পড়ে গেলাম বিপাকে ওর ভীষন নৌকা ভীতি… বেঁকে বসলো নৌকায় নদী পার হবেনা। শৈশবে একবার নৌকাডুবিতে বিপদে পড়েছিল… সে আতঙ্ক এখনও কাঁটিয়ে উঠতে পারেনি, সে বলে ফেললো মুর্শিদাবাদের নবাব’ উপাধী দিলেও সে নৌকায় নদী পার হবে না,একাই সে ফিরে যাবে। তার ফোবিয়া কাটাতে সবাইকে বেশ বেগ পেতে হলো । ফেরী নৌকা ঘাটে ভিড়লে যখন দেখলো মাঝারী আকারের বাশেঁর পাটাতনে প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেল, সাইকেল, টোটো, নৌকা ফেরীতেই অনায়াসেই পারাপার হচ্ছে, তখন সে খানিকটা ভয় কাটিয়েনৌকায় উঠতে সাহস পেলো… সবাই তাকে ঘিরে মাঝখানে বসিয়ে দেয়া হলো।পদ্মা গঙ্গায় মিশে যাওয়া ঐতিহাসিক নদীভাগিরথী, যে নদীতে ইতিহাসের স্রোত অনেক প্রলম্বিত.. ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজুদ্দৌলার রাজনৈতিক পরাজয় হয়- এই ভাগিরথী নদী পথেই পালিয়েছিলেন তিনি, ধরাও পড়েছিলেন ১৭৫৭ সালের ৩০ জুন। নিমর্মভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাঁকে ৩/৪ জুলাই তারিখে ভাগিরথী নদীর তীরে। খোশবাগে নবাবের স্বপরিবারে সমাধি হয়।বৃহত সমাধি উঠানে স্বপরিবারে শায়িত।সমাধি চত্বরে একযোগে ১৭টি কবর…নবাব সিরাজের সিরাজের অতি নিকট জনের। গাইডের তথ্য অনুযায়ী বিষ পানে তাদের হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিক ভাগিরথী নদীর মোহনা দ্বিখন্ডিত এলাকা,একদিকে স্মৃতি স্থাপত্য অপর পারে খোশবাগৃ চলে এলাম খোশবাগে।
আমরা বেলা ১০-৩০মি: এ যখন খোশবাগে নবাব সিরাজুদ্দৌলার সমাধী দর্শনের জন্য প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছাই সে সময় কলকাতা/ভারতের ‘আনন্দ বাজার’ ‘বর্তমান’ সহ বেশক’টি শীর্ষ পত্রিকার সাংবাদিক ফটকের সামনে অপেক্ষা করছিলেন, তিন বাংলার’ দর্শনার্থীদের জন্য… ওনারা আমাদের সঙ্গেই থাকলেন। তিনবাংলা পশ্চিমবঙ্গ চ্যাপটার এ আয়োজন করেছে। খোশবাগে প্রবেশ করে প্রথমে নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য দোয়া প্রার্থনা, নেতৃত্ব দেন কবি সালেম সুলেরী।
নবাব আলীবর্দী খাঁ নির্মান করেছিলেন খোশবাগ (গার্ডেন অফ হ্যাপিনেস)। তিনি কি জানতেন এই আনন্দ উদ্যানে সমাধিত করা হবে তাঁর পুরো পরিবার। মোট ৩৪ জনের কবর রয়েছে খোশবাগে। নবাব আলীবর্দী খাঁ ও নবাব সিরাজুদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফন্নেসা ছাড়া বাকি সবাইকে নিমর্ম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। নবাবের সমাধি খোশবাগ নামক বৃহত এই সমাধি উঠানে স্বপরিবারে শায়িত। মধ্যখানে দাদু আলীবর্দী খাঁ, নবাব সিরাজের পাশে এক আপন সহোদর, পায়ের কাছে একদিকে স্ত্রী লুৎফন্নেসা, অন্য দিকে চার বছরের শিশু কন্যা। সমাধি চত্বরে এক যোগে ১৭টি কবর রয়েছে গাইডের তথ্য অনুযায়ী এগুলো নবাব সিরাজের অতি নিকট জনের .. বিষ পানে তাদের হত্যা করা হয়। নবাব ধরাপড়ার পরপর তাদের খবর দেয়া হয়েছিল… নবাব সিরাজকে আবার মসনদে বসানো হবে… তোমরা তাড়াতাড়ি চলে এসো এবং বরন করার উদ্যোগ নাও। ষড়যন্ত্রকারীদের মিথ্যে আশ্বাসে এসে শোচনীয় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছিল নবাব পরিবারের সকলকে। কবর খানায় ঢুকতেই প্রথমে নবাবের নানীজান, তারপরই দুইজন আপন খালার সমাধি একজন কুখ্যাত ঘঁষেটি বেগম… কথিত আছে তিনি বুড়িগঙ্গায় ডুবে মরেছেন, গাইড জানিয়েছে কবরে ওনার শুধু হাত দু’টো আছেৃ নৌকায় ভাসিয়ে দেয়ার আগে ক্ষুব্ধ সৈনিক ও জনগনের ক্ষোভে হাত দু’টো কেটে নেয়া হয়েছিল। কথিত আছে পলাশী ষড়যন্ত্রের কুশীলবদের কারুরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয় নাই। নবাব সিরাজের পতনের নেপথ্য ষড়যন্ত্রের মধ্যে ছিলেন সিপাহ শালার মীরজাফর,নিকট আত্মীয়দের মধ্যে খালা ঘঁষেটি বেগম, এছাড়া রাজা রায় দূর্লভ, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ প্রমূখ, ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ক্ষমতা কেন্দ্রীভ’ত করেন.. তারপর শোষন শাসনের ইতিহাস বহুভাবে পরিচালিত হয়েছে। জানা যায় নবাব সিরাজের নবম বংশধরেরা ঢাকায় (বাংলাদেশে) বসবাসরত। মুর্শিদাবাদের প্রতিটি ইটের পরতে পরতে যেন ইতিহাসের প্রলেপ। পাঠের মাধ্যমে হয়তো অতীতের মূলসুর বা স্টোরী লাইন আমাদের জানা কিন্তু গাইডের ধারাভাষ্যে ও শিল্প কথন নিয়ে যায় আমাদের অচিন জগতে… এতো রাজ্য শাসনের এতো… অজানা বয়ান বিমুগ্ধতায় কেবল প্রলুদ্ধ করে। আপন বাঙলার ঐর্শয্য আলো শিহরন তোলে চেতনায়। প্রতিটি বাঙ্গালীর উচিৎ এটি অবলোকন ও ইতিহাসেঅবগাহন করা। এই নাভিমূল ইতিহাস ঐতিহ্য স্থাপত্যের মুখোমুখী হওয়া। …মুর্শিদাবাদ পরির্দশন করা।
ভাগিরথীর অপর পারে মুর্শিদাবাদের লালবাগ, বহরমপুর… রাজ ইতিহাসের কমকরে ২৫টি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য… হৃদয় মন চিন্তা চেতনাকে করে উদ্বুদ্ধৃ প্রনোদনায় অভিসিক্ত। হাজারদুয়ারী, ইমাম বাড়া,মতিঝিল লালগোলা, বড় কাটরা, মদিনা মসজিদ,আছে জগবন্ধু ধাম,জাহানকোবা কামান, চারবালা মন্দির, কাঠগোলা, নশিপুর রাজবাড়ি, ঘড়ি মিনার, সুবে বাংলার শেষ স্থাপত্য ঐতিহাসিক ওয়াসেফ মঞ্জিল। বহাল আছে রাজা জগৎশেঠের প্রাসাদতম রাজবাড়ি,আরও রয়েছে মীরজাফরের বিশাল কবর স্থান… একসঙ্গে ১১০০ সমাধির মেল বন্ধন। বিশাল মুর্শিদাবাদে মীরজাফরের পরিবারই লতায় পাতায় পল্লবিত। তাদের সাম্প্রতিক গবেষনায় মীরজাফর প্রতারক ছিলেন না। পরিস্থিতির ধিক্কার বলা হচ্ছেকিন্তু মানুষ নিচ্ছে না। ১১০০ সমাধির নির্ধারিত স্থানটিতে আর লাশ নামানোর সুযোগ নেই। সরকারের তদারকিতে সেটি এখন দর্শনীয় স্থান, টিকিট কেটে ঢুকতে হয়।
বৃটিশ তাড়িয়ে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালে, পাকিস্তানকে তাড়িয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৭১ সালে। মহান স্বাধীনতার কথা কবিতা গানে… এরপর সমাধি অঙ্গনের পাশে কৃষ্ণচুড়া বৃক্ষ তলে সবুজ ঘাসের গালিচায় আয়োজন শুরু হয় পলাশীর আলোচনা দিয়ে, কবিতা পাঠ ও শহীদদের উদ্দেশ্যে গান। নবাবের অন্যতম সহচর মোহনলাল পরিবারের একজন সদস্য সঙ্গীতা ব্যানার্জী আমাদের সাথে অংশ নিয়েছেন। তাঁকেই সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে সভা শুরূ করা হয়। ‘পলাশী স্বরনে’ সালেম সুলেরীর বিশেষ কবিতা দিয়েই উদ্বোধন হয়। এরপর বিভ’তি দাস, উদয় চক্রবর্তী, জয়ন্ত বাগচী, মনসুর আজিজ, কাজী সুফিয়া আখতার, মিনা মাশরাফী, অর্চনা দে বিশ্বাস, ওয়াহিদ রহমান,স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। কন্ঠ শিল্পীরা,স্বপ্নাপারুল,সোয়দ, মনসুর আজিজ,কাজল মেহমুদ, তৃপ্তি করের নেতৃত্বে পরিবেশন করেন.. মুক্তি যুদ্ধকালের গান… সালাম সালাম হাজার সালাম… শহীদ ভাইয়ের স্বরনে… একনদী রক্ত পেরিয়ে… বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা… আমরা তোমাদের ভ’লবো না…। উল্লেখ্য যে নবাব সিরাজুদ্দৌলার ৪০জন নিকট আত্মীয়েরসমাধি সেখানে, প্রথম বারের মত আত্মাদের কানে পৌঁছালো.. বাংলাদেশের হৃদয়স্পর্শী গান নিয়ে বিষয়টি নতুন রেকর্ড গড়েছে এবারই প্রথম।২০১৯ ও ২৩জুন ছিল নবাব সিরাজুদ্দৌলার ২৬২ তম পতন দিবসৃ ঐতিহাসিক পলাশী দিবস”এবার তা চির আবেদনময় হয়ে উঠেছে। কবিদের ছিল নিবেতি প্রান পঙতি মালা গান আবৃত্তিও ছিল ভরাট কন্ঠের। ১৫ জন কবি সাহিত্যিক শিল্পী ঢেলে দিয়েছিল দরদ। ইতিহাসের পাতায় লেখা হলো সৃষ্টিশীল নামগুলো রেকর্ড গড়া উপহার দিলো ‘তিন বাংলা’ বাংলাদেশ-ভারত-প্রবাস বাংলার সাহিত্য সাংস্কৃতি প্রধান বিশ্ব সংগঠন। এরপর রশ্মিবাগ, কাটরা,মদিনা মসজিদ, ইমাম বাড়া, হাজারদুয়ারী,চারবালা মন্দির, ইত্যাদি সফর করে দলটি।
সুজা উদ্দীন খাঁ’র সমাধিটিও খোশবাগ সংলগ্ন রশ্মিবাগে। এখানে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন মসজিদ… পাশেই প্রতিষ্ঠিত করেন আর্কষনীয় মন্দির… ওনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভাস্কর পন্ডিত সেখানে নিয়মিত পুঁজা করতেন। হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন ছিল রশ্মিবাগ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটির গুরুত্ব অপরিসীম। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষায় সুজা উদ্দিন খাঁ এক অমর ব্যক্তিত্ব।
সন্ধা ৭-৩০ মি: এ বহরমপুরে অনুষ্ঠিত হয় পলাশীর প্রেরনা শীর্ষক সেমিনার ও স্মৃতিতর্পন অনুষ্ঠান। ইন্সিটিউট অব এ্যাপ্লাইট সায়েন্সের সৌজন্যে আয়োজনটি ছিল রুচিসিদ্ধ। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন… তিন বাংলার গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট কবি ও কথাকার সালেম সুলেরী, সভাপতিত্ব করেন… বহরমপুরের বর্ষিয়ান কবি উৎপল কুমার গুপ্ত, স্বাগত বক্তব্য রাখেন… উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব জয়ন্ত বাগচী, সঞ্চালনায় কবি মনসুর আজিজ ও স্থানীয় উদ্যোক্তা অনিন্দিতা মোদক। সূচনাতেই ছিল পলাশীর প্রেরনা মুর্শিদাবাদ থেকে তিন বাংলা কার্যক্রমে নিবেদিত প্রান সংস্কৃতিসেবীদের… পলাশী সম্মাননা প্রদান পর্ব, অত:পর আলোচনা,কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উল্লেখ্য যে… এ অনুষ্ঠানে আমাকেও পলাশী সম্মাননায় ভ’ষিত করা হয়। সমাপ্তি পর্বে ধন্যবাদ জানান স্থানীয় উদ্যোক্তা কবি ও প্রশিক্ষক পার্থ রায়। রাত্রিযাপন ’ফ্রেন্ড হোটেল’হাজার দুয়ারী মুর্শিদাবাদ।
২৪ জুন ২০১৯ খ্রি: তিন বাংলার প্রতিনিধি দলের একাংশ শান্তি নিকেতন সফরে গেলাম আমরা… বিকালে ”শ্রীনিকেতন স্বরনী”র মিলনতীর্থে ছিল সাহিত্য অনুষ্ঠান ”নব কমল পত্রিকার রবীন্দ্র সংখ্যার উন্মোচন, কবিতা পাঠ, পলাশীর প্রেরনার আলোকে বক্তব্য রাখেন কবি সালেম সুলেরী। বাংলাদেশ থেকে কবিতা পাঠ ও আলোচনায় অংশ নিয়েছি মিনা মাশরাফী,কাজী সুফিয়া আখতার,সঙ্গীতে অংশ নেন তৃপ্তিকরও কাজল মেহমুদ, রবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীতে বিমুগ্ধতা ছড়িয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মন কাড়েন কাজল মেহমুদ। অনুষ্ঠান শেষে ভালবাসা বিনিময়ময় আপ্যায়ন ও ফটো সেশন। শান্তিনিকেতনে ‘হোটেল নিরালায়’ রাত্রিযাপন করলাম।
২৫জুন ২০১৯ খ্রি: শান্তিনিকেতনের ’বাংলাদেশভবন’এর লাইব্রেরীতে চলে মত বিনিময় ও লাইব্রেরীতে সংগ্রহের জন্য বই দেয়া। এরপর বিশ্ব ভারতীর চত্বর, ছাতনা তলা, ঘুরে দেখা,বিশ্ব ভারতির গ্রন্থাগার পরিদর্শন ও কোপাই নদীর তীরে ঘুরে আসা।
সন্ধায় ছিল, তিনবাংলার ভারত বাংলা কমিটির সভা, কলকাতার নন্দন চত্বরে সভাটি আয়োজিত হয়। সভাপতিত্ব করেন প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রখ্যাত পদাকার অভিক বসু প্রধান আলোচক ছিলেন, ’তিন বাংলার’ গ্লোবার প্রেসিডেন্ট কবি ও কথাকার সালেম সুলেরী।পরিচালনা করেন নবনির্বাচিত নির্বাহী সভাপতি চিত্রা লাহিড়ী। মুর্শিদাবাদ ভ্রমন বিষয়ে বিস্তারিত বলেন জয়ন্ত বাগচী, বিভ’তি দাস, অংশ নেন কবি দীপক লাহিড়ী, সাকিন আহমেদ, প্রদীপ্ত সামন্ত। ঐতিহাসিক কর্মসূচীর সফলতাউচ্ছসিত কন্ঠে সবার মাঝে ধ্বনিত হয় এদিনটিতে।
২৬ জুন ২০১৯ খ্রি: আমাদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি : ভ্রমন ব্যস্ততায় ট্রেনে/প্লেনের কেনটারই টিকেট কাটা হয় নাই। তাছাড়া সবার ফিরবার তাড়াও ভিন্নরকম, কেউ কলকাতায় আরও ক’দিন কাটাবে, কেউ বন্ধু স্বজনের সাথে দেখা করবে, কেউবা কেনা-কাটা করবে, কেউ ডাক্তারের এপয়েনমেন্ট করবে। যাহোক আমরা চারজন একমতে আছি… শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় এসে ট্রেনের টিকেট করবার সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে এলাম কলকাতায় ”ফেয়ারলি হাউসে” এসে ট্রেনের টিকিট করে নেব। কিন্তু বিধি হলো বাম… আমরা কাউন্টারে পৌঁছানোর দু’তিন মিনিট আগে ৫-৩০মি: এ টিকিট কাউন্টার বন্দ হয়ে গেছেৃ অগত্যা বাসের টিকিটের জন্য নিউমার্কেটের উদ্দেশ্যে ট্যাক্সি নিয়ে রওয়ানা। টিকিট হলো সোহাগ কোচে, আগামীকাল সকাল ৭-৩০ মি: এ বাস ছাড়বে। রাতে মহাবোধি সোসাইটিতে রাত্রিযাপনের জন্য যেতে হবে ৪/ এ বোংকিম চ্যাচার্জী স্ট্রীট,কলকাতা। তৃপ্তিদিদি গড়িয়া হাট যেতে চান কেনাকাটা করতে… কাজী সুফিয়া আখতারও সুর মেলালেন… এবং আমাকে সাথে থাকতে হবে। কাজল মেহমুদ রাজী হলেন না, তিনি মহাবোধি সোসাইটি চলে গেলেন। আমরা তিনজন গড়িয়ার হাট যাবো কিন্তু রাস্তাঘাট চিনিনা। বাস আসলেই যেযার গন্তব্যে যাচ্ছে .. আমি একটু এগিয়ে একজন দোকানদারকে বললাম গড়িয়াহাট যাওয়ার সহজ উপায় কি? বললেন পাতাল ট্রেনে কম খরচে সহজে যেতে পারবেন… সোজা গিয়ে হাতের বামে ৫মিনিট হাটলে পাতাল ট্রেনস্টেশন পাবেন। তৃপ্তি দি আর সুফিয়া আপা বললো… ওনাদের পাতালট্রেনের অভিজ্ঞতা নেই… বললাম…আমার আছে… নতুন অভিজ্ঞতা পেতে চলেন এগিয়ে যাই। একটু এগিয়ে পাতাল রেলস্টেশন গেট… সিড়ি দিয়ে নীচে নেমে টিকিট কেটে পাতাল রেলে উঠলাম…গড়িয়া হাটে স্টপেজ নেই,পরের স্টপেজে নেমে বাসে চলে এলাম গড়িয়া হাট। নতুন অভিজ্ঞতার আনন্দে শিহরিত তৃপ্তি দিদি ও সুফিয়া আপা আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। গড়িয়া হাট ঘুরে ফিরে, মনমত কেনাকাটা করে আমরা ট্যাক্সি নিয়ে মহাবোধি সোসাইটিতে চলে গেলাম। পরদিন ‘সোহাগ’কোচে বেনাপোল হয়ে বাংলাদেশের উদ্দেেেশ্য বিদায় ভারত…। সফরের ক’টা দিনআনন্দভ্রমনের পর…আপনঠিকানার উদ্দেশে পথের দু’ধারে প্রকৃতির হাতছানি উপভোগ করতে করতে চলে এলাম প্রিয় জন্মভ’মি বাংলাদেশ। ঘড়িতে তখন সন্ধা ৭-৩০মি: ।