মুহম্মদ মতিউর রহমান Muhammad Matiur Rahman শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক। ৩রা পৌষ, সোমবার ১৩৪৪ (১৮ ডিসেম্বর, ১৯৩৭) সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্গত শাহজাদপুর থানার চর নরিনা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস উক্ত একই থানার চর বেলতৈল গ্রামে। তার বাবা নাম আবু মুহম্মদ গোলাম রব্বানী ছিলেন শিক্ষাবিদ ও মা মোছাম্মৎ আছুদা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। দাদা মুনশী ওয়াহেদ আলী পণ্ডিত, দাদী মোছাম্মৎ রমিছা খাতুন, দাদার পিতা মুনশী আবু হানিফ। তারা ছিলেন ৩ ভাই ও ৯ বোন। তারা হলেন: উম্মে শিরী, দ্বিতীয় বোন জন্মের অল্প কিছুকাল পরেই সে ইন্তেকাল করে), মোছাম্মৎ আখতার মহল, মোছাম্মৎ মমতাজ মহল, মোছাম্মৎ কোহিনুর বেগম, মুহম্মদ মতিউর রহমান, মুহম্মদ আব্দুর রাজ্জাক ফেরদৌসী, মোছাম্মৎ নূর মহল, আব্দুল্লাহ মুহম্মদ, মোছাম্মৎ লুৎফুন নাহার, মেছাম্মৎ জান্নাত মহল ও মোছাম্মৎ ফাতেমা খাতুন।

গ্রামের স্কুলে পিতার তত্ত্বাবধানে মুহম্মদ মতিউর রহমান প্রাথমিক শিক্ষা শুরু ১৯৫৬ সনে পোতাজিয়া হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত একই সনে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আই.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৫৮ সনে আই.এ. ও ১৯৬০ সনে বি.এ. পাশ করে উক্ত একই সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৬২ সনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাতে এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে মুহম্মদ মতিউর রহমান দুই পুত্র ও দুই কন্যার জনক। তাঁর স্ত্রীর নাম বেগম খালেদা রহমান। পুত্র-আহমাদুর রহমান (আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষা লাভের পর বর্তমানে দুবাইতে কর্মরত) ও আবিদুর রহমান (আমেরিকায় অধ্যয়ন শেষে বর্তমানে সেখানেই কর্মরত) এবং কন্যা-সুমাইয়া রহমান (আমেরিকার নাগরিকত্ব পেয়ে সেখানে একটি স্কুলে শিক্ষাকতা পেশায় নিয়োজিত) ও আফিয়া রহমান (ঢাকায় অবস্থিত, স্বামী বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লীডার মঈনুল হক)।

মুহম্মদ মতিউর রহমান ১৯৬২ সনে ২৬ নভেম্বর ঢাকাস্থ সিদ্ধেশ্বরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। উক্ত কলেজে তিনি ১৯৭৭ সনের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যথাক্রমে অধ্যাপক, ভাইস-প্রিন্সিপ্যাল ও সর্বশেষে ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালন করেন। ইতঃমধ্যে ১৯৬৫ সনে তিনি মাত্র চার মাসের জন্য করটিয়া সা’দৎ কলেজে যোগদান করেন। ১৯৬৩-৬৯ সন পর্যন্ত প্রায় সাত বছর ঢাকাস্থ আমেরিকান প্রকাশনা সংস্থা ‘ফ্রাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামস’-এর নিয়মিত বিভাগে সহকারী সম্পাদক ও প্রথম বাংলা বিশ্বকোষ প্রকল্পের অন্যতম সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সনের জানুয়ারিতে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ সাহিত্য-সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন।

১৯৭৭ সনে তিনি দুবাই চলে যান। ১ মে, ১৯৭৮ সন থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৯৬ পর্যন্ত তিনি ‘দুবাই চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’তে প্রকাশনা বিভাগে সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুহম্মদ মতিউর রহমান ছাত্র জীবন থেকেই বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১. সাধারণ সম্পাদক, ‘পাবনা জেলা সাহিত্য পরিষদ’ (১৯৫৮-৬০), ২. সম্পাদনা পরিষদের সেক্রেটারী ‘আমাদের দেশ’ মাসিক পত্রিকা, পাবনা (১৯৫৮-৬০), ৩. সম্পাদক, ‘ফজলুল হক হল বার্ষিকী’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬১-৬২), ৪. প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, ‘পাক সাহিত্য সংঘ’, ঢাকা (১৯৬১-১৯৭১), ৫. যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, ‘পাকিস্তান তামদ্দুনিক আন্দোলন’ (১৯৬৬), ৬. কেন্দ্রীয় শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা, ‘পাকিস্তান শাহীন ফৌজ’ (১৯৬৩-৬৭), ৭. কেন্দ্রীয় সভাপতি, ‘পাকিস্তান শাহিন ফৌজ’ (১৯৬৭-১৯৭১), ৮. প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ‘স্বদেশ সংস্কৃতি সংসদ’, ঢাকা (১৯৭৩-১৯৭৭), ৯. প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল’, দুবাই (১৯৮১-১৯৯৬), ১০. সভাপতি, ’ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’, দুবাই (১৯৮৩), ১১. কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, আবুধাবী, সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৯৮৩-৯৬), ১২. সভাপতি-বাংলাদেশ সাহিত্য সম্মেলন, দুবাই (১৯৯০-১৯৯৬), ১৩. প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ, সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৯৯৩-৯৬), ১৪. সভাপতি, স্বদেশ সংস্কৃতি সংসদ, ঢাকা (১৯৯৭-২০০২), ১৫. প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ফররুখ একাডেমি (বর্তমান নাম ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন), ঢাকা (১৯৯৯-২০২১), ১৬. প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, শাহজাদপুর ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ, সিরজগঞ্জ, ১৭. উপদেষ্টা, হিলফুল ফুজুল (সমাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান), সিরাজগঞ্জ, ১৮. প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আহম্মদ নগর ইসলামী পাঠাগার ও সমাজকল্যাণ পরিষদ, ঢাকা (১৯৯৯-২০০৬) প্রভৃতি। এছাড়া, তিনি কয়েকটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠান কায়েম করেন। ১. ‘মসজিদে আবু বকর সিদ্দিক (রা)’, দ্বারিয়াপুর, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ- প্রতিষ্ঠাতা ও মুতাওয়াল্লী। ২. ‘মসজিদে ওমর ফারুক (রা)’, তেলকুপি, সিরাজগঞ্জÑপ্রতিষ্ঠাতা ও মুতাওয়াল্লী, ৩. ‘আবু মুহম্মদ গোলাম রব্বানী ও মোছাম্মৎ আছুদা খাতুন হাফিজিয়া ফোরকানিয়া মাদরাসা’, চর বেলতৈল, সিরাজগঞ্জ-প্রতিষ্ঠাতা। ৪. ‘মুনশী ওয়াহেদ আলী ও মোছাম্মৎ রমিছা খাতুন স্মৃতি পাঠাগার’, চর বেলতৈল, সিরাজগঞ্জ-প্রতিষ্ঠাতা।

পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে মুহম্মদ মতিউর রহমান কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ: ১. ‘সাহিত্য কথা’ (১৯৭০), ২. ‘ভাষা ও সাহিত্য’ (১৯৭০), ৩. ‘সমাজ সাহিত্য সংস্কৃতি’ (১৯৭১), ৪. ‘মহৎ যাদের জীবন কথা’ (১৯৮৯), ৫. ‘ইবাদতের মূলভিত্তি ও তার তাৎপর্য’ (১৯৯০), ৬. ‘ফররুখ প্রতিভা’ (১৯৯১), ৭. ‘বাংলা সাহিত্যের ধারা’ (১৯৯১), ৮. ‘বাংলা ভাষা ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন’ (১৯৯২), ৯. ‘ইবাদত’ (১৯৯৩), ১০. ‘মহানবী (স)’ (১৯৯৪), ১১. ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি’ (১৯৯৫), ১২. ‘মহানবীর (স) আদর্শ সমাজ’ (১৯৯৭), ১৩. ‘ছোটদের গল্প’ (১৯৯৭), ১৪. ‘ঋৎববফড়স ড়ভ ডৎরঃবৎ’ (১৯৯৭), ১৫. ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য’ (২০০২), ১৬. ‘মানবাধিকার ও ইসলাম’ (২০০২), ১৭. ‘ইসলামে নারীর মর্যাদা’ (২০০৪), ১৮. ‘রবীন্দ্রনাথ’ (২০০৪), ১৯. ‘স্মৃতির সৈকতে’ (২০০৪), ২০. ‘মানবতার সর্বোত্তম আদর্শ মহানবী (স)’ (২০০৫), ২১. ‘ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার’ (২০০৫), ২২. ‘মাতা-পিতা ও সন্তানের হক’ (২০০৬), ২৩. বাংলাদেশের সাহিত্য (২০০৬), ২৪. ফররুখ প্রতিভা (পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০৮), ২৫. ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার (২০০৮), ২৬. সংস্কৃতি (২০০৮), ২৭. বাংলাদেশের সাহিত্য (২০০৮), ‘সাহিত্যচিন্তা’ (২০০৯)। ২৮. ‘সমকালীন বাংলা সাহিত্য’, ২৯. ‘কিশোর গল্প’, ৩০. ‘আরব উপসাগরের তীরে’, ৩১. ‘বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন’, ৩২. ‘মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রত্ন: জীবন ও সাহিত্য’, ৩৩. ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম’, ৩৪.‘আশির দশকের কবি ও কবিতা’ প্রভৃতি। অনূদিত গ্রন্থ: ১. ইরান (১৯৬৯), ২. ইরাক (১৯৬৯), ৩. আমার সাক্ষ্য (১৯৭১)। সম্পাদনা করেন ১. প্রবাসী কবিকণ্ঠ (১৯৯৩), ২. প্রবাসকণ্ঠ (১৯৯৪), ৩. ভাষা সৈনিক সংবর্ধনা স্মারক (২০০০), ৪. স্বদেশ সংস্কৃতি (সাময়িক পত্রিকা-১৯৯৮), ৫. ব্যারীস্টার কোরবান আলী স্মারক পত্রিকা (২০০৭), ৬. ফররুখ একাডেমি পত্রিকা (১৯৯৮-২০২১)

শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ মুহম্মদ মতিউর রহমান ১৯৯৬ সনে ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল’, দুবাই কর্তৃক স্বর্ণপদক (১৯৯৬) প্রাপ্ত। ‘বাংলাদেশ আধ্যাত্মিক কবিতা পরিষদ’, ঢাকা প্রদত্ত পদক-২০০৪। ‘ফররুখ পদক’ (২০১৫), ‘ফররুখ সম্মাননা পদক’ (২০১৫), ‘নবাব আব্দুল লতিফ পদক’ (২০১৫), ‘কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), নর্থ আমেরিকা রাইটার্স ফোরাম পদকসহ (নিউইয়র্ক ২০১৯) অনেকগুলো সম্মাননায় ভূষিত হন।

পবিত্র হজ্জব্রত পালন উপলক্ষে দু’বার সৌদি আরব গমনসহ মুহম্মদ মতিউর রহমান বিভিন্ন সময় এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার ২৮টি দেশ সফর করেন।

মুহম্মদ মতিউর রহমান ৮ এপ্রিল ২০২১ দুপুরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ৮৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। শুক্রবার বাদ জুমা নামাজে জানাজা শেষে তাকে বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।