(২২ জানুয়ারী মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের (জন্ম ১৯৪০ সালের ২২ জানুয়ারী; ইনতেকাল ১৮ আগস্ট ২০১৪) তিরাশিতম জন্ম দিন। বাংলাাদেশে প্রথম ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠি ও বন্ধু জাকিউদ্দীন আহমদ ১৯৬৩ সালে ‘জাকি-মোশাররফ গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তারা ‘ কনসেপ্ট অব পাকিস্তান’ নামে ইংরেজি সাময়িকী প্রকাশ শুরু করেন। সত্তুর দশকে ‘বর্ণালী এ্যাডভার্টাইজিং’ নামে বিজ্ঞাপনী সংস্থা কায়েম করেন। দ্বি-মাসিক বাংলা পত্রিকা ‘মৌসুম’, পূর্ব বাঙলায় ‘ডাইজেস্ট’ ধরনের প্রথম মাসিক ‘বাংলা ডাইজেস্ট’, জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘সচিত্র স্বদেশ’ প্রকাশ করেন। আশির দশকে মাসিক ‘কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’ প্রকাশ ছাড়াও রাজনীতি কেন্দ্রিক গতানুগতিকতার বাইরে ১৯৯৩ সালে অর্থ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ক ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি দু’টি ‘আর’-এর ওপর ভিত্তিশীল। রেমিট্যান্স ও রেডিমেইড গার্মেন্টস। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ছয় হাজার সাতাশি জন বাংলাদেশি কর্মী প্রথম বিদেশ যান। সেই সূচনালগ্নে জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় ১৯৭৭ সালে বেসরকারী মানবসম্পদ রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি ‘বে-ইস্টার্ন লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন। মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা)-এর সভাপতি হিসেবে মানবসম্পদ রপ্তানির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়ন ও নীতিমালা প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নয়নেও তারা ছিলেন অগ্রণী উদ্যোক্তা। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি হিসেবে দেশের পোষাক শিল্পের কার্যক্রমকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেন। এছাড়া শিক্ষা, টেলিযোগাযোগ, আমদানি-রফতানি, অটোমোবাইল, হাসপাতালে হাইটেক মেডিকেল সরঞ্জাম সংযোজন, রেস্টুরেন্ট ও ট্রাভেল এজেন্সি, রিয়েল এস্টেট প্রভৃতি খাতেও দুই বন্ধু নতুন নতুন উদ্যোগ আর নানা উদ্ভাবনার দ্বারা পূর্বসূরীদের পথকে উজ্জলতর আরো করেন এবং উত্তরসূরীদের জন্য নতুন পথ দেখান।
আশির দশকের শুরুতে দেশে ইসলামী ব্যাংকিং-এর নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় আবদুর রাজ্জাক লস্করের নেতৃত্বে শামিল হয়ে দেশে-বিদেশে মূলধন সংগ্রহ, প্রাথমিক পুঁজি গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন ও এর পদ্ধতিগত ও পরিচালনগত উন্নয়নে অবদান রাখেন। মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের কমার্শিয়াল অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রজেক্ট কমিটি ও ব্যাংকিং অপারেশন কমিটির সদস্য এবং ২০০০ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংক ১৯৮৪-৮৫ সালে ৮৫টি গার্মেন্টস কারখানায় বিনিয়োগ প্রদান করে সদ্য বিকাশমান তৈরি পোশাক খাত দ্রুত প্রসারে সহায়তা করে। এ ধরনের বিভিন্ন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নতুন ধারার এই ব্যাংকটিকে দ্রুত কোটি মানুষের আস্থার ব্যাংক হিসাবে দেশের শীর্ষ ব্যাক এবং ২০১২ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার ব্যাংকের অন্যতম হিসাবে দাঁড় করে।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ষাটের দশকে রাজনীতির সবক নেন। তিন যুগ পর ১৯৯৫ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ফেনী থেকে ১৯৯৬ সাল থেকে টানা ১৫ বছরে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বানিজ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মনন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক, নাগরিক, গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত ছিলেন। সাড়ে সাত দশকের জীবনে সাড়ে পাঁচ দশক ধরে জাকিউদ্দীন আহমদের সাথে মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের জীবন মিশন ভিত্তিক বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্ব অনুপম প্রবাদতুল্য নযির হয়ে আছে।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনকে প্রথম জানি ষাটের দশক থেকে। ঘনিষ্ট পরিচয় হয় সত্তুরের দশকের গোড়ার দিকে। আশির দশকে ইসলামী ব্যাংকে তিনি পরিচালক। আমি জনসংযোগ কর্মকর্তা। সেখানেও তাকে দেখেছি রুচিশীল স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের প্রাণবন্ত দরদী মিশনারী মানুষ। নানা কাজে তার পরামর্শ সহযোগিতা পেয়েছি। তার সাথে অন্য অনেকের মতোই আমার সম্পর্ক ছিল অচ্ছেদ্য। তার কণ্ঠস্বর আজো কানে বাজে।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের ইনতেকালের পর তার সম্পর্কে আমার একটি লেখা ‘ইসলামী ব্যাংক পরিক্রমা’র ২০১৫ সালের জানুয়ারী সংখ্যায় ছাপা হয়। পরে লেখাটি তার স্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক ফরিদা হোসেন-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘অবিনশ্বর’-এর বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হয়। মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের তিরাশিতম জন্ম দিনে সে লেখার দিকে তাকিয়ে আমার অনভূতি হলো: গত পঞ্চাশ-ষাট বছরে আমাদের জাতীয় আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পাটাতন নির্মাণের এই কর্মী পুরুষদের অবদান স্মরণ ও মূল্যায়ন আমাদের আগামির পথ চলার জন্য আজো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সে বিবেচনায় পুরনো লেখাটি সামান্য পরিবর্তন করে এখানে তুলে দিচ্ছি : -মোহাম্মদ আবদুল মান্নান)

উনিশশো চল্লিশ সাল। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক। পঁয়ত্রিশ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে সাইত্রিশ সালে নির্বাচন হয়। আবুল কাসেম ফজলুল হক হন বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী। পূর্ববাঙলার কৃষিজীবীরা তখন থেকে স্বশাসনের স্বাদ অনুভব করেন। তাদের স্বাধীনতার আকাংখা তীব্রতর হয়। সে ধারাবাহিকতায় চল্লিশ সালের লাহোর প্রস্তাব স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি নির্মাণ করে। এ পটভূমিতে চল্লিশের দশকে পূর্ব বাঙলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে নব জাগরণের উন্মেষ ঘটে। বাংলাদেশের জন-জীবনের এই নতুন প্রত্যাশা ও নব জাগরণের যুগ-সন্ধিক্ষণে ১৯৪০ সালে মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের (জন্ম ১৯৪০ সালের ২২ জানুয়ারী; ইনতেকাল ১৮ আগস্ট ২০১৪) জন্ম হয়।
সাতচল্লিশের স্বাধীনতা পূর্ববাঙলার বাঙালী মুসলমানদের জীবনে নতুন প্রাণাবেগ সৃষ্টে করে। পঞ্চাশের দশক থেকেই বাঙলার কৃষি জমির আইল বেয়ে উঠে আসা মানুষেরা নিজেদের মধ্যবিত্তের সংসার সাজাতে শুরু করেন। তাদের বাড়িতে বৈঠকখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। সে সময় সামাজিকভাবে কিছুটা অগ্রসর একটি পরিবারের ছেলে মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯৫৪), ফেনী কলেজ থেকে ১৯৫৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে কুটীর শিল্প সংস্থায় যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু সে নিস্তরঙ্গ ও চ্যালেঞ্জহীন চাকরি ছেড়ে এসে ক’মাস পর জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৬০ সালে বি কম পাস করেন। সে বছরের শেষ দিকে তিনি পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারায় আইন বিষয়ে পড়াশুনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় আঙিনায় তার সামনে সমাজ গঠনের বড় স্বপ্ন ও প্রেরণার দিগন্ত বিস্তৃত হয়। ফরমানউল্লাহ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান ছাত্রশক্তির সাথে যুক্ত হয়ে তিনি খোলাফায়ে রাশেদার শাসননীতি অনুসারে রাষ্ট্র ও সমাজ বদলের চিন্তায় আপ্লুত হন। সমাজ বদলের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিদের মাঝে একজন ভালো সাথি ও বন্ধুরূপে পেয়ে যান জাকিউদ্দীন আহমদকে। তারুণ্য থেকে যৌবনে এবং এরপর প্রৌঢ়ে বিস্তৃত দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশকের কর্মজীবনের ছোট-বড় সকল লক্ষ্য অর্জনে তারা একসাথে এক পথে হেঁটেছেন।
জাকি-মোশাররফের ‘কনসেপ্ট’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবন শেষ করে জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় আইন কিংবা অন্য কোন পেশার গন্ডিতে আবদ্ধ না হয়ে স্বাধীনভাবে মুক্তছন্দ সমাজব্রতী কর্মকান্ডে আত্মনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুই বন্ধু মিলে ১৯৬৩ সালে ‘জাকি-মোশাররফ গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই গ্রুপের প্রথম বড় উদ্যোগ ছিল ১৯৬৪ সাল থেকে ‘কনসেপ্ট অব পাকিস্তান’ নামে ইংরেজি সাময়িকীর প্রকাশনা। মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ছিলেন ‘কনসেপ্ট’-এর প্রকাশক আর জাকিউদ্দিন আহমেদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ড. মিজানুর রহমান শেলী ছিলেন সেই সাময়িকীর সম্পাদক। ‘দ্য কনসেপ্ট অব পাকিস্তান’ সাময়িকীর প্রথম সংখ্যাটি জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে উৎসর্গ করা হয়। ড. শেলী সিএসপি হয়ে সরকারী চাকরিতে যোগ দেয়ার পর মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জাকিউদ্দিন আহমদ সম্পাদক হন। দুই বন্ধু মিলে ‘কনসেপ্ট’-এর মাধ্যমে জীবন-যুদ্ধের সূচনা করেন। এর ভেতর দিয়েই প্রথম বড় পর্দায় উন্মুক্ত হন। তাদের জীবন-দৃষ্টি, মনন ও মানস এবং সমাজ-চেতনার গভীরতা উপলব্ধির জন্য তাই ‘কনসেপ্ট’ গুরুত্বপূর্ণ।
পূর্ব বাঙলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশেষ পটভূমিতে তথ্য ও জ্ঞান সমৃদ্ধ মধ্যবিত্ত সমাজ নির্মাণে ‘কনসেপ্ট’ তখনকার সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব সৃষ্টিতে সচেষ্ট হয়। আবুল মনসুর আহমেদ, বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ ও ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর মতো তখনকার শীর্ষ লেখক, চিন্তাবিদ ও শিক্ষকগণ এ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ড. মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী ছত্রিশ কিস্তিতে এ সাময়িকীতে প্রকাশিত ধারাবাহিক লেখাটি পরে ‘ইকোলোজি অব পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন’ নামে বই আকারে বের হয়।
‘কনসেপ্ট’ থেকেই একের পর এক নতুন উদ্যোগ ও উদ্ভাবনার পথে জাকি-মোশাররফের অভিযাত্রা পর্যায়ক্রমে বহু দিগন্তে বিস্তৃত হয়। তবে গণ-মাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দৃষ্টি সরেনি। সত্তুরের দশকে জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় ‘বর্ণালী এ্যাডভার্টাইজিং’ নামে বিজ্ঞাপনী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। আধুনিক মানের প্রকাশনা ও বিপণনের ধারণা বিস্তারে আর সদ্য বিকাশমান ব্যাংক-বীমাসহ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন ও বিজ্ঞাপন তৈরিতে সে সময়ের হাতে-গণা ক’টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘বর্ণালী’ ছিলো প্রাগ্রসর উদ্যোগ হিসাবে নতুন বর্ণচ্ছটার যোগান দেয়।
‘বর্ণালী’র পাশাপাশি জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় দ্বি-মাসিক বাংলা পত্রিকা ‘মৌসুম’, মাসিক ‘বাংলা ডাইজেস্ট’, সাপ্তাহিক ‘সচিত্র স্বদেশ’ এবং এরপর মাসিক ‘কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’ প্রকাশ করেন। ‘ডাইজেস্ট’ ধরনের পত্রিকা হিসাবে পূর্ব বাঙলায় ‘বাংলা ডাইজেস্ট’ পথিকৃত। ‘স্বচিত্র স্বদেশ’ও বেশ জনপ্রিয় হয়। আবদুল মান্নান সৈয়দ, রাহাত খান, হাসনাইন ইমতিয়াজ, আবদুল হাই শিকদার ও খন্দকার হাসনাত করিম সহ অনেক লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট এসব পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন।
বাংলাদেশের দৈনিক সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার রাজনীতি কেন্দ্রিক ধারার বাইরে এসে অর্থ-বাণিজ্যকে উপজীব্য করে সংবাদপত্র প্রকাশেও জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় অন্যতম পথিকৃত। তাদের শুরুটা আশির দশকে মাসিক ‘কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে হলেও ১৯৯৩ সালে ভিন্নধারার ইংরেজি পত্রিকা ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’ রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী খবরের চেয়ে অর্থ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয় বেশি গুরুত্ব দিয়ে শীর্ষস্থানীয় টেকসি সংবাদপত্র হিসাবে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়ে এ ধারার সাংবাদিকতায় আরো অনেককে প্রেরণা যোগায়। জাকিউদ্দীন আহমদ ‘ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন আজীবন পরিচালক ছিলেন। এ উদ্যোগের জন্যও জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় স্মরণীয় হবেন। মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন তার পারিবারিক বৃত্তে সাহিত্য পত্রিকা ‘অবিনশ্বর’ প্রকাশের সাথেও আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন। তার স্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক ফরিদা হোসেন ‘অবিনশ্বর’-এর সম্পাদক।
দুই ‘আর’-এর পথিকৃত
বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি দু’টি ‘আর’-এর ওপর ভিত্তিশীল। একটি রেমিট্যান্স, অন্যটি রেডিমেইড গার্মেন্টস। মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও জাকিউদ্দীন আহমদ এই দু’টি ‘আর’-এর প্রাণ-প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সত্তুরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তখনকার সবচে জনপ্রিয় সাময়িকী সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় ‘জনশক্তি রফতানী’ শিরোনামে একটি নতুন স্বাদের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মেধাবি ছাত্র আহমেদ আনিসুর রহমানের লেখা ‘মানুষ রফতানী’ বিষয়ক এ চমকপ্রদ প্রতিবেদন তখন আলোড়ন তোলে। এর কিছুদিন পর ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ছয় হাজার সাতাশিজন বাংলাদেশি কর্মী বৈদেশিক রেমিট্যান্স আহরণের জন্য প্রথম বিদেশ যাত্রা করেন। সেই থেকে বাংলাদেশের মানুষ ‘রফতানি’র সূচনা হলো। সেই সূচনালগ্নে ১৯৭৭ সালে ‘বে-ইস্টার্ন লিমিটেড’ নামে বেসরকারী মানবসম্পদ রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করে জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় বাণিজ্যিকভাবে মানবসম্পদ রফতানির ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বিদেশে বাংলাদেশি মানবসম্পদ রফতানীর বাজার সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করে এসব দেশে বাংলাদেশি জনশক্তির চাহিদা তৈরি করেন। তাদের পথ ধরে এ পথে অনেকে এগিয়ে আসেন। প্রতিবছর জনশক্তি রফতানি বাড়তে থাকে। ১৯৮১ সালে আধা লাখ, ১৯৮৯ সালে এক লাখ, ১৯৯৪ সালে দুই লাখ এবং ২০০৬ সালে জনশক্তি রফতানি তিন লাখ ছাড়িয়ে যায়। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যান। দেশের অর্থনীতি-ব্যবসা-বাণিজ্য-সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি-রাজনীতি এবং গ্রাম ও শহরের ঘর-বাড়ি-দোকান, খাদ্যাভ্যাস, প্রসাধন, সামাজিক আচার, ধর্মীয় আয়োজন সব কিছু প্রভাবিত হয় বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং প্রবাস-ফেরত লোকদের অভিজ্ঞতার দ্বারা। আমজাদ হোসেনরা জনপ্রিয় নাটক লিখেন। ঘরে ঘরে আওয়াজ ওঠে: ‘ট্যাকা দ্যান দুবাই যামু’। কিন্তু মানুষ রফতানির এই ব্যবসা সহজ কাজ নয়। এই ‘পণ্য কথা বলতে জানে। কোন ভুল হলে সে কথা এক মুখ থেকে শতমুখে চাউর হয়। এমন নাজুক ‘পণ্যে’র কারবারে দীর্ঘ সাইত্রিশ বছর সুনাম রক্ষা করে টিকে থেকেছেন জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয়। জাকিউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘প্রবাসিরা মোশাররফ হোসেনকে পীরের মতো শ্রদ্ধা করতেন। মানুষের কল্যাণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মনোভাব নিয়ে আমরা কাজ করেছি।’
বর্তমানে দুনিয়ার নানা দেশে কোটি বাংলাদেশী কাজ করছেন। পৃথিবীর বিচিত্র কর্মক্ষেত্রে তারা হাজিরা বাড়িয়ে চলেছেন। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তারা বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। দেশের আমদানি বিল পরিশোধ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করে তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করছেন। বাংলাদেশের ভ্রাম্যমান দূত হিসাবে তারা এই পাললিক বদ্বীপ বাংলাদেশকে বিশ্ব সভায় পরিচিত করছেন। এ ক্ষেত্রেও একজন পথিকৃত মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন।
১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা)-এর সভাপতি হিসেবে মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন মানবসম্পদ রপ্তানির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়ন এবং এ প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী ও সম্মানজনক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নীতিমালা প্রণয়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করেন। বহির্বিশ্বে জনশক্তি রফতানির ব্যাপারে যোগাযোগ বাড়াতেও তিনি জোরালো ভূমিকা পালন করেন। জনশক্তিকে অদক্ষ থেকে আধা দক্ষ এবং আধা দক্ষ থেকে দক্ষরূপে গড়ে তোলার নানা উদ্যোগেও তিনি অবদান রাখেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্বিতীয় শক্তিশালী ভিত্তি বা খুঁটি হলো রেডিমেইড গার্মেন্টস। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নয়নেও জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় অগ্রণী উদ্যোক্তারূপে ভূমিকা পালন করেন। সত্তুরের দশকের শেষের দিকে তারা ‘ইয়র্ক’ ও ‘এমজেড’ গার্মেন্টস সহ মোট চারটি তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের গার্মেন্টস খাতকে বিশ্ব পরিসরে ব্যাপকভাবে পরিচিত করতে এবং দেশের ভেতর এ খাতের মানোন্নয়নে ও সামর্থ বৃদ্ধিতেও তারা অগ্রণী অবদান রাখেন। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ছিলেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি। বিজিএমইএ-র নেতা হিসেবে তিনি বিজিএমইএ-কে মজবুত সাংগঠনিক পাটাতনের উপর দাঁড় করা, ফান্ড গঠন এবং এর জন্য নিজস্ব অফিস ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। দেশের পোষাক শিল্পের কার্যক্রমকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তার অবদান অবিস্মরনীয়।
জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয় তৈরী পোষাক শিল্প ও মানব সম্পদ রপ্তানীর পথিকৃত হিসাবে অবদান রেখেছেন। এ দু’টি ক্ষেত্রে তাদের নেতৃত্বের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, অর্থনীতি, ব্যাংকিং, রাজনীতি ও সমাজ বিনির্মাণে। রেমিট্যান্স ও রেডিমেইড গার্মেন্টস-এর পর দেশের অর্থনীতিতে আরেকটি নতুন গুরুত্বপূর্ণ ‘আর’ হলো রিয়েল এস্টেট। বাংলাদেশের এই নতুন উদ্ভাবনায় ইস্টার্ন হাউজিং-এর জহিরুল ইসলাম ছিলেন পথিকৃত। জাকি- মোশাররফ বন্ধুদ্বয়ও এক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসেন। নাগরিক আবাসন সমস্যার কথা চিন্তা করে তারা ১৯৮৯ সালে ‘কনফিডেন্স হাউজিং লিমিটেড’ নামে রিয়েল এস্টেট ও হাউজিং ব্যবসা শুরু করেন।
দেশের শিক্ষা খাত, টেলিযোগাযোগ, আমদানি-রফতানি, অটোমোবাইল, সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে হাইটেক মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহ, রেস্টুরেন্ট ও ট্রাভেল এজেন্সিসহ বিভিন্ন খাতে এই দুই বন্ধু মিলে নতুন নতুন উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পটভূমি ও প্রেক্ষিত বিবেচনায় এসব উদ্যোগ জনস্বার্থ, জনকল্যাণ ও জাতীয় উন্নয়নের নিরিখে বিচার্য। তারা নানা উদ্ভাবনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে পূর্বসূরীদের তৈরি পথকে আলোকিত করেছেন। নিজেরাও নতুন নতুন সড়ক তৈরি করে সে পথে অন্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা: ব্যাংকিং-এ নতুন ধারা নির্মাণ
ইসলামী ব্যাংকিং একটি নতুন ধারা। এই ধরনের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজন ব্যতিক্রমি সাহসি ও উদ্যমী নেতৃত্ব। মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও জাকিউদ্দীন আহমদ আশির দশকের শুরুতে এক্ষেত্রে নিজেরা উদ্যোক্তা হয়েছেন। এ উদ্যোগ সফল করতে দেশে-বিদেশে মূলধন সংগ্রহ, প্রাথমিক পুঁজি গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন ও এর পদ্ধতিগত ও পরিচালনগত উন্নয়নে অবদান রেখেছেন।
দেশে বেসরকারী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে শরীয়া মোতাবিক একটি ব্যাংক চালুর উদ্যোগ এ প্রচেষ্টা ছিলো সে সময়ের ব্যতিক্রমি ও অসম সাহসি পদক্ষেপ। ১৯৭৫ সালে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ১৯৭৪ সালে ওআইসি-র অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনে ২৮টি সদস্য দেশ আইডিবি সনদ স্বাক্ষর করে। প্রথম স্বাক্ষরকারী এই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অর্থমন্ত্রী ছিলেন তাজুদ্দীন আহমদ। এই সনদ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রসমূহ নিজ নিজ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে ইসলামী শরীয়া মোতাবেক পুনর্গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিকে পর্যায়ক্রমে ইসলামীকরণের জন্য একাধিক উদ্যোগ নেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে সকল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বৈঠকে প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির সকল শাখায় ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। লক্ষ্য ছিল ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে শক্তিশালী করে সুদভিত্তিক কার্যক্রমের ক্রমবিলোপ। এর পর সিদ্ধান্তটি পুনর্মূল্যায়ন করে প্রতিটি জেলা সদর ও পৌর এলাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির একটি করে ইসলামী ব্যাংকিং শাখা খোলার সিদ্ধান্ত হয়। সে উদ্যোগ বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই বেসরকারী খাতে ব্যাংক চালুর সিদ্ধান্ত হয়।
এ পটভূমিতে বেসরকারী দেশে বেসরকারী খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপে প্রথম প্রজন্মের অন্যতম বেসরকারী ব্যাংক হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগ নেয়া হয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় তখন ইসলামী ব্যাংকের কোন মডেল ছিলো না। মিসর, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ক’টি দেশে তখনো এ পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং-এ নতুন ধারা রচনার সে কঠিন পথে তখন ক’জন সাহসি উদ্যোক্তা এগিয়ে আসেন। মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও জাকিউদ্দিন আহমেদ তাদের অন্যতম।
বাংলাদেশে আধুনিক ছাপাখানার স্থপতি, ইস্টার্ন রিগাল ইন্ডাস্ট্রিজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জাতীয় ফুটবল দলের এক সময়ের নামি ক্রীড়াবিদ আবদুর রাজ্জাক লস্কর, ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক মফিজুর রহমান, জামিল গ্রুপের চেয়ারম্যান হাজি বশিরউদ্দিন, চট্টগ্রামের বায়তুশ শরফ-এর পীর সাহেব সমাজ সংস্কারক মাওলানা আবদুল জব্বার ও তরুণ সমাজকর্মী ও ব্যবসায়ী মুহাম্মদ ইউনুছ এ উদ্যোগের সূচনা করলে মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও জাকিউদ্দীন আহমদ এ উদ্যোগে সাড়া দেন এবং তা বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তাদের সাথে যোগ দেন ব্যারিস্টার তমিজুল হক, মোহাম্মদ সফিউদ্দিন দেওয়ান, মোহাম্মদ হোসেন, নাসিরউদ্দিন আহমদ, মুহাম্মদ মালেক মিনার, এম. এ. রশিদ চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার মুস্তাফা আনোয়ার, অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ, আবুল কাসেম, আলহাজ্জ সিরাজউদ্দৌলা, মুহাম্মদ নুরুযযমান, এ. কে. ফজলুল হক ও ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ দাউদ খান।
বাংলাদেশে বেসরকারী খাতে প্রথম ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক একেবারে শুরু থেকেই সব ধরনের সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ও পরে ওআইসির সহকারী মহাসচিব শেখ ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতীব অন্যতম বিদেশী উদ্যোক্তারূপে এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন। জাকি-মোশাররফ বন্ধুদ্বয়ের ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা হওয়ার পটভূমি সম্পর্কে জাকিউদ্দীন আহমদ লিখেছেন: ‘মূলত আবদুর রাজ্জাক লশকরের অনুরোধেই আমি ও মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ইসলামী ব্যাংকের স্পনসর হই। তিনি আমাদেরকে বললেন, ‘মনে করুন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য এ টাকা আপনারা আল্লাহর পথে দান করছেন। এটি সদকায়ে জারিয়া। সুদ ছাড়া ব্যাংক চলতে পারবে এটা তখনো অকল্পনীয়। ব্যাংক সফল না হলে পুরা টাকা হারিয়ে যাবে। তবু আমরা ভাবলাম একটা মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। এ টাকা সদকা হিসেবে আল্লাহর পথেই যাবে।’
আবদুর রাজ্জাক লস্করের নেতৃত্বে মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও ব্যাংকের আরো ক’জন উদ্যোক্তা নিজেদের ব্যক্তিগত খরচে সৌদি আরবসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরে ব্যাংকের জন্য স্পন্সর সংগ্রহের চেষ্টা করেন। সৌদি আরবের আল-রাজি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান শেখ সুলাইমান আল-রাজির সাথে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চুক্তির সময়ও আবদুর রাজ্জাক লস্করের সাথে জাকিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, মোহাম্মদ ইউনুস ও ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ দাউদ খান উপস্থিত ছিলেন। আল-রাজি গ্রুপ ত্রিশ শতাংশ শেয়ার নিয়ে এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কাজকে সহজসাধ্য করে। জাকিউদ্দীন আহমদ লিখেছেন, সৌদি আরবের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও জেদ্দার জামজুম গ্রুপের চেয়ারম্যান শেখ আহমদ সালাহ জামজুমের সাথে মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের ব্যক্তিগত পরিচয় ও ঘনিষ্টতা ছিলো। তার চেষ্টার ফলে শেখ সালাহ জামজুম ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা হতে সম্মত হন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর এম খালেদ ও সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের প্রিন্সিপাল এম আযীযুল হক ইসলামী ব্যাংকিং-এর জন্য আগে থেকেই ব্যাংকারদের মধ্যে কাজ করছিলেন। তারা ইসলামী ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল তৈরি ও প্রায়োগিক নীতি-পদ্ধতি রূপায়নে নেতৃত্ব দেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড নিবন্ধিত হয়ে ৩০ মার্চ থেকে কাজ শুরু করে।
ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পেছনে সে সময় কোন আর্থিক লাভের হাতছানি ছিলো না। এই উদ্যোগে পুরো মূলধন হারানোর ঝুঁকি ছিলো। এই ব্যাংক যে এক সময় এতোটা সফল ও এতো বড় হবে তখন সেটা ধারণায় আনাও সম্ভব ছিলো না। সুদমুক্ত, কল্যাণধর্মী, মানবিক একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও জনমুখী ব্যাংকরূপে ইসলামী ব্যাংক বন্টনমূলক সুবিচার কায়েমের একটি ছোট মডেলরূপে কাজ করবে– এ স্বপ্নটুকুই তারা তখন দেখেছেন।
ব্যাংকের সেবা বহুমুখী করে জাতীয় উন্নয়ন ও জনকল্যাণে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকাকে কার্যকর ও সার্থক করার জন্য ১৯৮৪ সালে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সমন্বয়ে বোর্ডের অধীনে ছয়টি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়। ব্যাংকের কাজের কয়েকটি প্রাথমিক অগ্রাধিকার নিরূপণ করে গঠিত হয় একেকটি কমিটি। সেই কমিটিগুলি হলো ঃ ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোজেক্ট কমিটি, কমার্শিয়াল অপারেশন্স কমিটি, রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট কমিটি, এগ্রিকালচারাল প্রোজেক্ট কমিটি, ফরেন রিসোর্সেস মবিলাইজেশন কমিটি ও ব্যাংকিং অপারেশন্স কমিটি। ব্যাংকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোজেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন হাজী বশিরউদ্দিন, কমার্শিয়াল অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, রিয়েল এস্টেট কমিটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ নূরুযযমান, এগ্রিকালচারাল প্রোজেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ, ফরেন রিসোর্সেস মবিলাইজেশন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন দুবাই ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম বিদেশী উদ্যোক্তা শেখ সায়ীদ আহমেদ লুথা, ব্যাংকিং অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এম.এ রশিদ চৌধুরী। ব্যাংকের একেবারে সূচনায় এসব কমিটি গঠনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা-পরিচালকগণ জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার ব্যাপারে দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। তখনকার সেই সব বড় পরিকল্পনা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে বর্তমান বিস্ময়কর সফলতার দিকে এগিয়ে দিয়েছে।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের কমার্শিয়াল অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান ছাড়াও ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রজেক্ট কমিটি ও ব্যাংকিং অপারেশন কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০০০ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও বিভিন্ন কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি ব্যাংকের নীতি প্রণয়ন এবং তখনকার দিনের বড় বড় সাহসি সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক দশকের বেশী সময় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। জাকিউদ্দীন আহমদও পরপর তিন মেয়াদে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে শেখ সালাহ জামজুমের বিকল্প পরিচালক হিসেবে পর পর তিন মেয়াদে তিনি পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিভিন্ন কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ইসলামী ব্যাংক ১৯৮৪-৮৫ সালে ৮৫টি গার্মেন্টস কারখানায় বিনিয়োগ প্রদান করে। তখনকার উদীয়মান গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশে ইসলামী ব্যাংকের এ সাহসী উদ্যোগ অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। গার্মেন্টস ব্যবসায়ে মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও জাকিউদ্দীন আহমদের অভিজ্ঞতালব্ধ দূরদৃষ্টি ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে। ইসলামী ব্যাংক তখনো খুব ছোট একটি ব্যংক। দেশের নতুন শিল্পোদ্যোগ এগিয়ে নিতে সে সময় এই ব্যাংক কত বড় ঝুঁকি নেয় তা বুঝানো সহজ নয়। তবে সে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাককে বিশ্ববাজারে দ্রুত পরিচিত করতে গুরুত্বপূ্র্ণ ভূমিকা রাখে।
দেশের মোট রেমিট্যান্সের এক চতুর্থাংশের বেশী এখন এককভাবে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসছে। এ ক্ষেত্রেও মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনসহ ব্যাংকের দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সে সময়ের নেতৃত্বের সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের সাহসি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ত্যাগী নেতৃত্ব দেশের প্রথম এই ইসলামী ব্যাংকটিকে দ্রুত কোটি মানুষের আস্থার ব্যাংক হিসাবে বড়, মাঝারি, ছোট ও ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সম্প্রসারণসহ সংকুলানমূলক ও বন্টনমূলক কল্যাণধর্মী সার্বজনীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দেশের শীর্ষ ব্যাংকের মর্যাদা এনে দেয়। ২০১২ সাল থেকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক হিসাবে বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে বিশ্ব ব্যাংকি-এ বাংলাদেশের জন্য একটি মাইল ফলক নির্মাণ করে। আর্থ সামাজিক উন্নয়নের একটি স্বতন্ত্র মডেল উপস্থাপন করেও ইসলামী ব্যাংক ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্ব ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও তার সাথিগণ বিশ শতকের আশির দশকের শুরুতে ইসলামী ব্যাংক নামে এই কল্যাণ বৃক্ষটির বীজ বপন ও পরিচর্যা করেছেন মৃত্যুর পরও এর সকল সুকৃতির সুফল তারা ভোগ করবেন। জাকিউদ্দীন আহমদ লিখেছেন: ‘সংশ্লিষ্ট সকলকে খেয়াল রাখতে হবে, ইসলামী ব্যাংক সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। আবদুর রাজ্জাক লশকর ইসলামী ব্যাংকের অনেক বড় স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। মফিজুর রহমান ছিলেন বিরাট প্রেরণাশক্তির অধিকারী। তাদের কথা শুনে শুনে আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছি। মোহাম্মদ ইউনুস ব্যাংকের জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তা যোগাড় করতে বড় অবদান রেখেছেন। এছাড়া মোহাম্মদ মালেক মিনার, মোহাম্মদ হোসেন, নূরুয্যামান, হাজী বশিরউদ্দীন, অধ্যাপক আবদুল্লাহ, ইঞ্জিনীয়ার মোস্তফা আনোয়ার, দাউদ খান, ফজলুল হকসহ সকলেই এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা ও অগ্রগতির জন্য পরিশ্রম করেছেন। আর্থিক লাভের আশায় নয়, ডিভিডেন্ড পাওয়ার লোভে নয়, দেশের মানুষকে সুদ থেকে রক্ষা করার জন্য তারা উদ্যোক্তা হয়েছেন। সুদ ছাড়া ব্যাংক চলতে পারে না, এ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তারা উজানস্রোতের যাত্রী হয়ে ইসলামী ব্যাংক কায়েম করেছেন। আমরা কেউ তখন কল্পনা করিনি যে মাত্র তিন দশকের মধ্যে এই ব্যাংক বিশ্বের এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় দেশের একমাত্র ব্যাংকরূপে নাম লেখাতে পারবে। ইসলামী ব্যাংকের স্বপ্নদ্রষ্টাদের অনেকে এই ব্যাংকের বিরাট অর্জন দেখে যেতে পারেন নি। তারা আগেই দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি যে, মোশাররফ ও আমি ইসলামী ব্যাংকের এই সাফল্য ও সমৃদ্ধি দেখেছি। এজন্য নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি।’
সত্তুর শতাংশ সমাজ সেবক
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ফেনী জেলার ঐতিহ্যবাহী ‘ডেপুটি বাড়ি’র উকিল পরিবারের সন্তান। তার এক দাদা মুন্সী আবদুল আজিজ ব্রিটিশ যুগে কুমিল্লার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সেই দাদার বড় ছেলে ব্যারিস্টার আমিন আহমদ পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ও ছোট ছেলে কে এম বাকের ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি। মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের দাদা মুন্সী ইসরাইল বহু বছর এলাকার চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বাবা এডভোকেট বেলায়েত হোসেন ছিলেন একটানা ছয় বার সোনাগাজীর আমিনাবাদ ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। সমাজসেবা ও জনপ্রতিনিধিত্বের পারিবারিক পুরনো ঐতিহ্যের অধিকারী মোশাররফ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে রাজনৈতিক দীক্ষা লাভ করেন। তার প্রায় তিন যুগ পর ১৯৯৫ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। এক্ষেত্রেও তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখে ফেনী থেকে তিনবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সাল থেকে একটানা ১৫ বছর তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি যতাক্রমেবানিজ্য মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবল শ্রম ও কর্মসংস্থান মনন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন এবংে দেশের আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণে ভূমিকা পালন করেন।
উন্নত সাংস্কৃতিক মননের অধিকারী মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন রাজনীতিতে সততা, পরমত সহিষ্ণুতা, ঔদার্য ও নমনীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে যতটা রাজনীতিক হিসেবে, তারচে বেশি একজন দরদি সমাজ সেবক হিসেবে দল ও রাজনৈতিক মতাদর্শের উর্ধে সকলের কাছে আস্থাভাজন ও সম্মানিত ছিলেন। তার সাড়ে পাঁচ দশকের সাথি ও বন্ধু জাকিউদ্দীন আহমদের মূল্যায়নে মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের জীবনের লক্ষ্য ছিল সমাজ ও মানুষের কল্যাণ এবং দেশের উন্নয়ন। তার ভাষায় তিনি ছিলেন, ‘সত্তুর শতাংশ সমাজ সেবক আর ত্রিশ শতাংশ ব্যবসায়ী’। বস্তুতঃ মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন আপাদমস্তক একজন সমাজসেবী। তার ব্যবসায়িক উদ্যোগ কিংবা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ– সব কিছুতে কল্যাণ, সেবা ও উন্নয়ন ছিল মূল বিবেচ্য বিষয়। তার ব্যবসায়িক উদ্যোগের পেছনেও প্রধান বিবেচ্য ছিল সমাজের কল্যাণ। তিনি রাজনীতিও করেছেন সমাজ সেবার জন্য। তার জীবন মিশনের কেন্দ্র বিন্দুতে ছিল সমাজ।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন এশিয়ান রিক্রুটমেন্ট কাউন্সিল কনভেনশনের বাংলাদেশ চ্যাপটারের সভাপতি, এশিয়ান বিজনেস ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অফ কমার্সের নির্বাহী সদস্য, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা আবাসিক মিশনের শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও উপদেষ্টা, হকি ক্লাব এজাক্স-এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি রাজধানীতে গুলশান সোসাইটি, গুলশান ক্লাব এবং গুলশান আজাদ মসজিদের ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত ছিলেন। বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতি ও ফেনী সমিতিসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। ফেনীর সোনাগাজী আনোয়ারা খাতুন গালর্স হাই স্কুল, বেলায়েত হোসেন স্কুল, মোয়াজ্জেম হোসেন স্কুল ও মোশাররফ হোসেন কলেজ প্রতিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা, চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন ও উন্নয়নে সহায়তা করেন। এ বহু রাস্তাঘাট, ব্রিজ, পুল, কালভার্ট নির্মাণে অবদান রাখেন।
উন্নত সংস্কৃতি ও রুচির অধিকারী বড় চিন্তার আধুনিক মানুষ মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকান্ডের নানা ব্যস্ততার মাঝেও অবসর বের করে সাহিত্য ও ইতিহাসসহ সৃজনশীল নানা ধরনের বই পড়তেন। পছন্দের বই বাজারে আসার সাথে সাথে তা সংগ্রহ করে পড়ার চেষ্টা করতেন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সমঝদার ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে টানা তেরো বছর তিনি ইন্টারন্যাশনাল পি.ই.এন (পয়েট এসেয়িস্ট এন্ড নভেলিস্ট) বাংলাদেশ সেন্টারের উপদেষ্টা ছিলেন। তার বাড়িতে দেশ-বিদেশের বরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও সংস্কৃত্যিপ্রেমীরা নিয়মিত মিলিত হতেন। লেখক, কবি, সাহিত্যক, সাহিত্যপ্রেমী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের তিনি কদর করতেন।
সাড়ে সাত দশকের জীবনে সাড়ে পাঁচ দশক ধরে মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও জাকিউদ্দীন আহমদের অনুপম বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্ব অনুপম প্রবাদতুল্য নযির হয়ে আছে। পারিবারিক পরিসরে একটি স্নিগ্ধ-মধুর বন্ধুত্বের শিখা জ্বালিয়ে সে তারা সুখী ও সফল ছিলেন।
মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের সাথে আমার সত্তুরের দশকের গোড়ার দিকে পরিচয় হয়। একজন রুচিশীল স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের প্রাণবন্ত দরদী মিশনারী মানুষ। তার সাথে সে সম্পর্ক ছিল অচ্ছেদ্য। তার কণ্ঠস্বর আজো কানে বাজে। এমন লোকের সংখ্যা কি আমাদের সমাজে খুব দ্রুত কমে যাচ্ছে?”