বৈরী পরিবেশের এক নিভৃতচারী, মিডিয়া এবং গোষ্ঠীসংক্রান্ত কবিদের দ্বারা আক্রান্ত কবি মৃধা আলাউদ্দিনের এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হলো দুটি কাব্যগ্রন্থ। ১. গামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে ও ২. প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো কোনো মাছ। বই দুটি প্রকাশ করেছেন দেশের খ্যাতমানা আর ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান স্টুডেন্ট ওয়েজের কর্ণধার, সাহিত্যপ্রেমী মোহাম্মদ লিয়াকত উল্লাহ কর্তৃক ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হলো। বইটির সুদৃশ্যময় নান্দনিক প্রচ্ছদচিত্র এঁকেছেন শিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। ৫৬টি সুনির্বাচিত কবিতা দিয়ে সাজানো চার ফর্মার এ বইটির মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ২০০ টাকা।
দার্শনিক অ্যারিস্টটলের যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কবিতাকে নির্মীয়মান শিল্পকলা হিসেবেই আমরা জানি। তবে এর পরিপূর্ণ নির্মিতিও কেউ কেউ দাবি করে থাকেন। কিন্তু কবিতা তো স্বকীয়তায় বেঁচে থাকবে। সবসময়ই নতুনত্বে এর সদ্গতি সুম্পন্ন হয়ে থাকে। একটা ভাবদর্শন আরেকটা ভাবচিন্তাকে জাগিয়ে তোলে। একটা ভাবাবেগ আরেকটা ভাবাবেগ থেকে পৃথকও হতে পারে না, সে কারণেই কবিতার বিগত স্রোতসিনীকে অস্বীকার না করে বরং তাকে যথাযথ সমীহ করেই একজন ধীমান কবি তার নতুন কবিতার কাব্যসুন্দরীকে এই কবি তার কবিতায় প্রাকৃতিক নৈঃসর্গ, ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গচেতনা, স্মৃতিকাতরতা, মোহময় প্রেম, জীবনও মৃত্যু ভাবনা, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক হীনমন্যতাসহ সকল কিছুই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এ সকল অনুষঙ্গ এসেছে তার সত্য সুন্দর পবিত্র প্রেম ও স্বপ্নকে ফুটিয়ে তোলার জন্য। যেমন কবি উচ্চারণ করেন-
ক.
নদী আর নারীর মাংস খেয়ে দেখি, আহা
প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো কোনো মাছ
ইলিশ, বেলে, বাইম… সমুদ্র-সাগর
এবঙ আপেলগুলো বদলে যায়-
নীল ঢেউ, পাখির গুঞ্জন- কাফকার আকাশ
এবঙ হরিণ হয় কোনো কোনো আপেল…
-[প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো কোনো মাছ, পৃষ্ঠা-০৯]
খ.
একদিন বৃষ্টির রসায়ণে আমরা ভিজেছিলাম।
জলজ আয়নায়- সমুদ্রে ভেসেছিল আমাদের শরীর
হলুদ-নীল, রঙিন প্রজাপতির গালিচার মতো
কোনো এক স্বপ্নের আনমনে- আবেশে।
-[জীবন অনেক মেঘ, পৃষ্ঠাÑ১১]
গ.
বর্ষার বৃষ্টিতে ফোটে ফুল
উল্লাসিত পাথর-পৃথিবী
ঝরে যায় প্রতারক প্রেম-জোছনা
অবিশ্রান্ত বৃষ্টির মেঘ-
অসীম বিশ্বাসে ছুটে আসে প্রজ¦লিত ঘোড়া
এক উদ্ভাসিত আলোর পৃথিবী।
-[আলোর বৃষ্টি, পৃষ্ঠা-১২]

মূলত সতত আলোর সন্ধানে পথচলা নিভৃত বিচরণশীল কবির নাম মৃধা আলাউদ্দিন। এই আলো যেন প্রেমময় মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারে, সৃষ্টি করতে সহনশীল হয় পৃথিবীর সকল সংসার। তাবৎ ঐশ^র্যকে। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই ‘প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো কোনো মাছ। বিমূত সৌন্দর্য্যরে লাবণ্যময় এই উচ্চারণ কবিকে এনে দেবে নিজেকে চিহ্নিতকরণের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পাটাতন। তার কাব্যভাষা সে কথারই ইংগিত বহন করে। কবিতার ইতিহাস বস্তুত কাব্যভাষারই ইতিহাস। শুধু অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়, প্রতিভার ম্যাজিকস্পর্শে মৃধা নতুনভাবে ভিন্নস্বরে বাজিয়েছে তার কবিতার মোহময় মোহনীয় সুর। যেমন- যখন তার কবিতায় উচ্চারিত হয়-
ক.
মনে হয় এখন আর নদী নেই
নীল ভরপুর পানি অন্ধের হৃদয়ে
তবে কি ফুল ফোটে- ব্রজবনের ফুল?
নাকি প্রশান্তির সেই গেলমান, গালিচা
আমার এ সমস্ত চোখে- না না অন্তরে সবার তুমি-
-[সন্দেহ, পৃষ্ঠা-১৩]

খ.
কখনো কখনো মনে হয় রাত্রি আমাকে
বড় বেশি ভালোবাসে; রাতের ভালোবাসা-
ফিরিয়ে দেয় নাইট গাউন- সুগন্ধি কনডম
অথচ দ্যাখো, মানুষ বরাবরই ভোরের, সিগ্ধ
ভোরের প্রত্যাশী।
-[নুনের স্বাদ, পৃষ্ঠা-১৫]

আলোকিত ভোরের প্রত্যাশী কবি মৃধা আলাউদ্দিন তথাকথিত কোনো ইজমের দাসানুদাস না হয়েও তিনি তার কাব্যবিশ্বাসে অটল-অনড়। কিংবা তার কবিতা নয় তত্ত্ব ও তথ্যের খামারবাড়ি। মূলত তার কবিতা হৃদয় সংবাদি এক আশ্চর্য ভালোলাগার শিল্পফুল হয়ে সুরভী ছড়াতে পারঙ্গম। তার কবিতার শব্দ সংযোজন, উপমা, চিত্রকল্পময়তায় নেই কোনো জটিলতা, নেই আরোপিত দার্শনিকতার চমমকি পাথর। বরং সহজ-সরল সাবলীল তার কাব্যবুনন যেন কবি জমীমউদদীনের সেই নকশী কাঁথারই নতুন নির্মাণ। যদিও কিচু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সচেতনতা পাঠকের চোখ এড়িয়ে যাবে না। মৃধা কবিতায় দুর্বোধ্যতা ঝেরে ফেলে তিনি উঠে আমেতে চেষ্টা করেছেন। সাবলীল ও সুন্দরের উজানে। মাটির ময়নায় ভিজিয়েছেন তিনি তার সমস্ত অবয়ব। নান্দনিকতা। যেমন-
চঞ্চলা হরিণীর মতো আমরা ভেসে গেলাম
সমুদ্র থেকে সমুদ্রে
পূর্ণিমার উদ্ভাসিত আলোয়- রোদ্দুরে…
অবশেষে নাচসহ এক জটিল রসায়নের মধ্য দিয়ে
শেষ করলাম আমাদের তাবৎ অনুষ্ঠান।
-[আমাদের অনুষ্ঠান, পৃষ্ঠা, ১৭]

আমাদের চলমান জীবনের অনুষ্ঠান সচরাচর জটিলই হয়ে থাকে। কিন্তু মৃধার অনুষ্ঠান দার্শনিকতায় পূর্ণ হয়েও জটিল-দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি। তার সহজিয়া শব্দপ্রণয়নের কারিশমা সত্যিই প্রশংসনীয়। মূলত সোডিয়াম তাড়িত নাগরিক কবি মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতার আলো-হাওয়া, সড়ক-মানচিত্র সবই বুঝি ‘কুসুম কুসুম ক্লেদাক্ত শহরের পাপ,’ কর্তৃক আচ্ছাদিত নষ্ট ভাগাড়রে উচ্ছিষ্ট। তাই তো তাকে এবং তার কবিতাকে নষ্ট মিডিয়া ও নষ্টগোষ্ঠী দ্বারা বারবার কাব্যহিংসার শিকার হতে হয়। কিন্তু পোড়খাওয়া, যন্ত্রণাকাতর এই কবি সবসময়ই সত্য-সুন্দরএবং আলোকিত জীবনের শুভ স্বপ্নের সঙ্গে ঘরগেরস্থালি করে চলছেন দ্বিধাহীন প্রত্যয় নিয়ে। ফলে তার পক্ষেরই এমন উচ্চারণ সম্ভব এবং সঙ্গত হয়ে ওঠে
‘এবঙ আমি আগুনে হাত রেখে দেখেছি
কিছুই পোড়ে না হৃদয় ছাড়া…
-[আগুনের ঢেউ, পৃষ্ঠা-৬০]

প্রযুক্তির কল্পনাতীত অগ্রগতিতে মানুষের হৃদয় আজ পুড়ে পুড়ে তছনছ। মানবিক ভাষা আজ বহুরৈখিক জটাজালে প্রশ্নবিদ্ধ। আকাশের উপরে আকাশের মতো- কথার উপরে আড়াল থাকে আরেক কথার। বাক্যের আবডালে গোপন থাকে আরেক বাক্য। সেই গোপন কথার খোঁজে, আবডালে লুকিয়ে থাকা বাক্যের মর্ম উদ্ধারে গলদঘর্ম হতে হয় সহজপাঠককে। ফলে কবিতাবিমুখ হন পাঠকসমাজ। দুর্বোধ্যতার গলায় ঝুলানো হয় ফাঁসির দড়ি। কিন্তু কবিতার বারোটা যে কখন বেজে যাচ্ছে তা কি কেউ ভাবছেন?
হ্যাঁ, ভাবনা তো আসে আর যায়- যায় আর আসে। এই আসা-যাওয়ার জাদুময় দৃশ্যায়ন- ভাষায়ণ কেউ কেউ হয়তো ধরে রাখতে সক্ষম হন কালে এবং মহাকালে। আমরা তাদের সম্মান করি। ভালোবাসি। তাদের কবিতা পাঠ করি বিমুগ্ধ ভালোবাসায়। আমাদের বিশ্বাস মধা আলাউদ্দিনের কবিতাও মুগ্ধপ্রেমে পঠিত হবে বাংলাদেশে এবং বাংলাভাষাভাষী তাবৎ বিশ্বে। তার কবিতা ও তার জন্য নিরন্তর শুভ কামনা করছি। অবশেষে আমি একটি কথাই বলবো- মৃধা এ কাব্যগ্রন্থ- প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো মাছ- আপনার সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।