ইলার ছোটবেলা থেকেই একটি অভ্যাস। তা হলো কোন ধরনের শব্দ না করেই মন ভরে কাঁদতে পারে। তবে কান্নাটা তাকে রাতের বেলা সারতে হয়। কান্নার শব্দ না হলেও চোখ দিয়ে তো পানি ঠিকই বের হয়। ইলার মা ইলার বাবাকে ডিভোর্স করে। বিদেশী সাদা চামড়ার লোকটার সাথে সংসার শুরু করে। তখন ইলা আলাদা ঘরে একা ঘুমাতো। ভয়ে দুঃখে ইলা ঘুম না আসা পর্যন্ত কাঁদতো। তবে এক ফোটা শব্দও করতো না। ইলাকে কেউ কখনো কাঁদতে দেখেনি। ইলার মা গর্বভরে অন্যদেরকে বলতো- দেখো, আমার মেয়ে একা অন্য ঘরে ঘুমায়। অথচ কখনো ভয় পায় না- কাঁদেনা, এমন কি স্কুল থেকেও একা একা আসে।
ইলা তার মায়ের ঐসব কথা শুনে মনে মনে হাসতো।
অন্ধকারের চাদর চেপে ইলা কাঁদছে। এমন না যে কান্নার কারণে তার শরীর কাঁপছে। অথচ ইলাকে আশ্চর্য করে খালা প্রশ্ন করে- কিরে ছেমরি কাঁনদোছ ক্যা?
ইলা হাসতে হাসতে জবাব দেয়- খালা কাঁদবো কেনো?
কে জানে ক্যান কাঁনদোছ, আমার তো মনে অয় তুই কানতে আছোছ। ঠিক আছে ইট্টু এদিহে আয়তো দেহি।
খালা ইলার চোখে হাত রেখে পানির অস্তিত্ব পেয়ে পুনরায় প্রশ্ন করে, কিরে ছেমরি, মিছা কতা কছক্যা?
এই প্রথম ইলার শরীর কেঁপে ওঠে। খালাকে জাপটে ধরে শব্দ করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। আবার পরমুহূর্তেই ইচ্ছেটা বদলে ফেলে। কি দরকার, সারা জীবনের একটা অভ্যাস পরিবর্তন করার। ইলা ঘুমিয়ে যাওয়ার ভান করে। মোবারকের মা বিষয়টা বুঝতে পারেন। দুঃখী মেয়েটাকে আর ঘাটান না। অন্ধকারের ভেতর ইলার মাথায় বিলি কাটেন। উকুন না ইলার দুঃখ খোঁজেন কে জানে। অদুরী বিলি কাটায় ইলা আরাম বোধ করে। আরামের øেহ কোমল মমতায় ইলা গভীর ঘুমে নিমজ্জিত হয়।
মোবারক গভীর রাত পর্যন্ত চিত্রনাট্য লেখে। লেখা শেষ করে পাঠ করতে গিয়ে তার আর ভালো লাগে না। চিত্রনাট্যটা কেমন যেন প্রচলিত ধাঁচের সিনেমা প্রভাবিত হয়ে গেছে। ঠিক যেমন চেয়েছিল তেমন হলো না। কাটাকাটি করেও কোন কাজ হবে বলে মনে হয় না। বিরক্ত হয়ে স্ক্রিপটা ছিঁড়ে ফেলে পুনরায় লেখা শুরু করে। একটি দৃশ্য লেখার পর মোবারকের ভাল লাগে। লেখাটা এগিয়ে নিতে পারলে ভালো একটা জিনিস দাঁড়াবে বোঝা যায়। গল্পটা কিছুদূর আগানোর পর মোবারক লক্ষ্য করে কেন্দ্রীয় চরিত্রের মুখটি ইলার। মেয়েটি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। ক্লাস ফাইভে পড়–য়া একটি মেয়ে। হঠাৎ করেই বুঝতে পারে, তার মা অন্য আরেকটি পুরুষকে বিয়ে করেছে। চট্ করেই একদিন তার মা নতুন সাদা রংয়ের বিদেশী লোকটাকে বাবা বলতে বলেন। অনিচ্ছা ব্যক্ত করার সাহস পায় না। কারণ সে দেখেছে, তার চোখের সামনে দিয়ে বাবা চলে গেছেন। যে বাবাকে সে দীর্ঘদিন চেনে, সে বাবাই প্রতিবাদ করতে পারে না, সেখানে সেতো আরো অসহায়। মার স্বেচ্ছাচারিতায় ফুফু, খালা, দাদা, নানা সব আÍীয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় হয় সে।
এভাবে বড় হওয়া একজন নারী ক্রমাগত নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে এক সময় লক্ষ্য করে তার পাশে কেউ নেই। এমন কি তার মাও। তার মা আদর্শ থেকেও তাকে দূরে রাখে। অর্থই শক্তি, ভোগই নিয়ম। এমন একটি চেতনায় মেয়েকে বড় করে। কিন্তু বড় হবার পর মেয়েটির ভেতরে আলাদা চিন্তার প্রতিফলন ঘটে, অর্থ আর ভোগের বাইরে আলাদা একটা মূল্যবোধ দেখতে পায়, মানুষকে ক্রমাগত মানুষ হওয়ার প্রচেষ্টা চালাতে হয়।
মোবারক অত্যন্ত খুশি হয়। এমন একটা মৌলিক গল্প সমৃদ্ধ চিত্রনাট্য থেকে ব্যয়বহুল পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণ করতে পারলে আন্তর্জাতিক অংগনে জায়গা পাবে এবং মানুষ সিনেমা থেকে জ্ঞানগতভাবেও উপকৃত হবে।
মোবারকের তর সইছে না। এই সংবাদটা এক্ষুণি প্রিয় কারো সাথে শেয়ার করার ইচ্ছা জাগে। ইলাকে একবার ডাকলে কেমন হয়। এতো রাতে ডাকলে কি মনে করে কে জানে।
মোবারক পা টিপে টিপে ঘরের সামনে আসে। এই পা টিপে টিপে আসার মানে সে বুঝতে পারে না। ঘরের সামনে এসে আরো অসহায় হয়ে ওঠে। দরজা ভেজানো, দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে কি বলবে। সেকি বলবে, ইলা তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠো। চিত্রনাট্য রেডি করেছি তোমাকে না শোনানো পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না। ইলা যেই চরিত্রের মেয়ে সে হয়ত বলে বসবে, মোবারক ভাই, এমন গভীর রাত্রে আমাকে একাকী আপনার ঘরে ডাকা ঠিক হয় নাই। আপনি কি জানেন, আপনার এবং আমার মাঝে ঐ খালি চেয়ারটায় একজন অত্যন্ত উঁচু দরের শয়তান বসে আছে। ইলাকে ডাকার সাহস পায় না। নিজের ঘরে চলে যাবে, ঠিক তখন মোবারকের মা ডেকে ওঠে।
কে বাইরে হাঁটাহাঁটি করে, মোবারক না, ও মোবারক?
মা, তুমি ঘুমাও নাই?
আমার কথা বাদ দে, তুই কি করোছ এতো রাইতে?
মা, একটা চিত্রনাট্য লেখা শেষ করলাম, খুব ভাল লাগছে।
কি নাট্য কইলি?
চিত্রনাট্য।
এইঢা আবার কি?
তুমি বুঝবে না মা, ইলাকে একটু ডাকো।
মাইয়াঢা ঘুমাইছে, এহন না ডাকলে অয় না?
এমন কথাবার্তার ভেতরে আয়েশী হাই তুলে ইলা। খালা কি হইছে।
আহারে তোর ঘুম ভাইংগা দিলাম, ওই যে মোবারক, ছিড়া নাট-না কি যেন কয় বুজিনা। তুই নাকি বুজবি। ওঠতে পারবি?
মোবারক গলা খাকারী দেয়। ইলা বিছানা ছেড়ে ওঠে। লাইট ধরায়। খালাআম্মা বাথরুমে যাবেন।
হ্যাঁ, অযু করা দরকার। নামায পড়তে অইবো।
এখন আবার কিসের নামায, গভীর রাতে।
গভীর রাইতেও নামায আছে।
মোবারক ভাই চা খাবেন। চায়ের গুণাগুণ তো আপনি ভালই জানেন।
তা খাওয়া যায়, কিন্তু এতো রাতে তুমি কষ্ট করবে।
তাতে কি, জনসেবা করলে কষ্ট তো একটু হবেই। আপনি রুমে গিয়ে বসুন। আমি চা নিয়ে আসছি।
ইলা চিত্রনাট্যটায় চোখ রাখে। গল্পটা তার খুবই পরিচিত মনে হচ্ছে। সত্যের এতো কাছাকাছি গল্প পড়তে ভালো লাগে না। ইলা প্রশ্ন করে মোবারক ভাই চা কেমন হয়েছে বললেন না।
চা খুবই ভালো হয়েছে। তবে এতো ভালো চা না খাওয়াই ভালো। তখন দেখা যাবে, অন্য কারো চা আর ভালোই লাগবে না। আর হোটেলের চা তো মুখেই দেয়া যাবে না।
ঠিক আছে, এখন থেকে আপনাকে আমি চা বানিয়ে খাওয়াবো, আর যখন বাইরে যাবেন ফ্লাক্স ভর্তি করে চা বানিয়ে দেব। সারাদিন চা খাবেন।
তুমি তো দুই দিন বাদে দুবাই চলে যাবে। যখন বাংলাদেশে ফেরত আসবে তখন হবে স্টার, স্টার পার্সনরা কি পাকের ঘরে চা বানায়?
হ্যাঁ, তাও তো ঠিক। আমি তো দুবাই যাচ্ছি। সেখানে ফ্যাশান শেষ, নাচ, গান, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবো। মাল্টিনেশনাল কোম্পানীর পণ্যের সাথে আমিও দামী পণ্য হিসেবে, নানান ধরনের বড়লোকদের বেড শয্যায় শোভাবর্ধন করবো। কি মজা…।
তুমি এভাবে বলছো কেনো?
শোনেন, কাউকে কাউকে বাধ্য হয়ে স্টার হতে হয়, বিশেষ জগতে তাকে ঢুকতে হয়। যেমন আমার কথাই চিন্তা করুন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে দুবাই যেতে হবে। মা কালও ফোন করে সুযোগ নষ্ট না করার নির্দেশ দিয়েছে। আপনিও চেষ্টা কম করছেন না।
কিন্তু তুমি অনিচ্ছা কেন করছো?
অন্ধকার দিকটা সম্ভবত একটু একটু করে বুঝতে পারছি। ফিগার টেস্টটা মোটেও ভালো লাগে না। কে জানে, কাল আবার কি ধরনের টেস্ট করবে। তা করুক এর পরও দুবাই যাওয়া জরুরি। এখানে থেকে কি লাভ?
তুমি না যেতে চাইলে খালাকে না করো।
লাভ নেই, মা বলছে এটা নাকি মহা সুযোগ।
মোবারক ইলা’র মনের অবস্থা বুঝতে পেরেও কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। কিভাবে দেবে, সে নিজেই আরেকজনের আশ্রয়ে। তার ওপর ভালো চাকরিও পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল ক্ষমতায় গেলে প্রতি পরিবারের একজনকে চাকরি দেয়া হবে। মোবারক ধরেই নিয়েছিল তার চাকরি অবশ্যই হবে। এই আশাবাদ বন্ধুমহলে প্রকাশ হওয়ায় সবাই মোবারককে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল। মোবারক তার বন্ধুমহলের কাউকে বোঝাতে সক্ষম হয় নাই। এখন সে বুঝতে পারছে বন্ধুরা সেদিন কেন হেসেছিল। আশ্রয়ের জায়গাটা নিয়েও যথেষ্ট চিন্তার কারণ ঘটছে। কদিন পরপরই ডেভেলপ কোম্পানীর লোকজন এসে মাপামাপি করে। মামাতো ভাই কোন কোম্পানীকে দিয়ে দিলেই ঢাকার ভেতর আর থাকার জায়গা থাকবে না। মোবারকের ভেতর একটা দিশেহারা ভাব। এই দিশেহারা ভাবটা মোবারক কাউকে বুঝতে দিতে চায় না। কয়েকদিনের ভেতর কানাডা থেকে মামাতো ভাই দেশে আসবে, এসে কি ব্যবস্থা নেয় কে জানে। ইলা’কে দেখেও রাগ হতে পারে। ভাইয়ের মুখটা খানিক সেলাইছাড়া। বলতে পারে ছেলে বন্ধুদের দিয়ে বাড়িটা নিলাম করতে পার নাই, এখন দূর সম্পর্কের বোন নিয়ে বাড়ি দখলের খেলা শুরু করছো? কোন ধরনের চালাকি করে লাভ নাই। বইপত্র, কাঁথা বালিশ যা আছে সব নিয়ে অতি দ্রুত রাস্তায় নামো। বাড়ি ভাড়া করার সময়ও দেয়া হবে না, স্রেফ গেটলস্ট…। মোবারক এমন একটি করুণ পরিণতির কথা চিন্তা করে ঘাবড়ে যায়। নিজের ভুলও দেখে, নিজেকে তিরস্কার করে। মাকে গ্রাম থেকে আনা মোটেও ঠিক হয় নাই। মাকে না আনলে ইলাও এভাবে থাকতো না।
এখন ইলা যদি সত্যি সত্যি দুবাই না যায়, কি একটা সমস্যায় পড়বে, চিন্তা করলে ঘুম আসে না। ঐ ঘরে ইলা এবং মা ঘুমাচ্ছে। মোবারক একটি অস্থিরতা নিয়ে তার নতুন চিত্রনাট্যে চোখ রাখে।
চিত্রনাট্যে পরিচিত মুখ। পরিচিত চারদিক। রাত গভীর। চিত্রনাট্য লেখতে গিয়ে ক্লান্ত হয়, বেদনার্ত হয় বুক। একটি বিরল কল্পনায় জেগে ওঠে সুখ।