ইলা তার খালাকে নিয়ে আই আর মন্ডলের অফিসে। মন্ডল অনেকক্ষণ পর ইলাকে তার খাস কামড়ায় ডেকে পাঠায়।
ইলা তুমি কি তোমার প্রোবক্স গাড়ি নিয়ে এসেছো?
হ্যাঁ।
তা হলে এক কাজ করো, তোমার খালাকে বাসায় রেখে আসো। অথবা অফিস পিয়নকে দিয়ে একটি সিএনজি’তে করে বাসায় পাঠাও।
কেন, খালা কি সমস্যা করছে। আমি খালাকে নিয়ে এসেছি সে বাসায় একা থাকবে এ জন্য।
তুমি দুবাই গেলে তখন কি একা একা থাকবে না?
দুবাই যখন চলে যাবো, তখন সে কথা আলাদা, এখন তো দেশে আছি। একদিন আমরা সবাই মরে যাবো এবং কবরে যাবো এ জন্য কি আগেই কবরে গিয়ে বসে থাকবো?
তোমার কথা অপ্রসঙ্গে চলে গেছে। ইলা তুমি বুঝতে পারছো না। আমি তোমাকে নিয়ে গুলশান যাবো। জরুরি কিছু কাজ আছে এবং কিছু কাগজপত্রে সই করতে হবে। তোমার সাথে চুক্তিপত্র হবে বোঝার চেষ্টা করো।
খালা গাড়িতে বসবে অথবা ওয়েটিং রুমে বসবে কোন সমস্যা হবে না।
তুমি তো বড়ো একগুঁয়ে মেয়ে। এতো জেদ করো কেন? আচ্ছা ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি করো, এক্ষুণি গুলশান যেতে হবে। ওখানে আমাদের আরেকটা অফিস আছে। গ্লাসে স্যাম্পেইন আছে, খেয়ে নাও, মাথা হালকা লাগবে।
আমি তো কখনো ওইসব খাইনি।
না খেলে তো চলবে না। শোন কিছু মনে করো না। প্রচলিত একটা কথা নাচতে এসে ঘোমটা দিয়ে লাভ নেই। এই জগতের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হবে। এতো আÍকেন্দ্রিক থেকো না। তুমি কি খেয়াল করছো, তোমার মাথায় স্কার্ফ কি বেমানান লাগছে। আজ বাদে কাল তুমি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার নায়িকা হবা। সেরা মডেল হবা। গ্লাসটা খালি করো।
ইলা আবারো খাওয়ার অভ্যাস নেই বলে বিনীতভাবে জানায়। সে মদ খাবে না। মন্ডল ততটাই আগ্রহী এবং অস্থির হয়ে ওঠে। ড্রয়ার থেকে ইলার পাসপোর্ট বের করে দেখায়, পাসপোর্টে ভিসা লাগানো। এমিরেটস এয়ার লাইন্সের আসা যাওয়ার টিকিট। মন্ডল মনপ্রাণ উজাড় করে ইলাকে মোটিভেশন করে। ইলা চোখ বন্ধ করে ইলার ভেতরের ইলার সাথে কথা কয়।
শোন ইলা মনি, এতো চিন্তা-ভাবনা করে কিছু হবে না। তুমি দ্রুত চিন্তা করো। চেনাজানা জগতে থাকবা, নাকি রঙিন জগতে প্রবেশ করবা। চেনাজানা জগতই তোমার জন্য ভালো, তুমি রাস্তাঘাট ভালো মতো চিনতে পারবে।
মন্ডল কখন চেয়ার ছেড়ে ইলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ইলা চোখ বন্ধ থাকার কারণে বুঝতে পারেনি। মন্ডল ইলার মাথায় হাত বুলায়।
ইলা তোমার কি শরীর খারাপ। মাথা মেসেজ করে দিই। অনুমতির তোয়াক্কা না করে মন্ডল মাথা মেসেজ করে। ইলা বিরক্ত হওয়ার পরও মধ্যবুড়ো আই আর মন্ডল নিভৃত হয় না। ইলা হঠাৎ লক্ষ্য করে, মন্ডলের হাত পিঠে ব্রুর হুকের কাছে আটকে আছে। অসৎ উদ্দেশ্য বোঝাই যায়। ইলা হঠাৎ করেই ঝটকা দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ইলা’র এমন ঝটিকা দণ্ডায়মানে মন্ডল ভড়কে যায়। ইলার মায়াবী চোখজোড়ায় দপ করে দুই নদী অগ্নিলাভা জ্বলে ওঠে।
মন্ডল ভয়ে এবং শংকায় পাথর হওয়ার উপক্রম। দ্রুত নিজের রিভলিং চেয়ারে বসে পড়ে।
ইলা, দুবাই ফাইভ স্টার হোটেল, নিজের পরিণতি কল্পনা করে আঁতকে ওঠে। আই আর মন্ডল তাকে নায়িকা বানানোর নামে যে দামী পতিতা বানাবে তা বোঝাই যায়। ইলা টেবিলে রাখা পাসপোর্ট এবং এয়ারলাইন্সের টিকেট ছিঁড়ে ফেলে। আই আর মন্ডল একটি কথাও বলার সাহস পায় না। ইলা রাগ সামলে সূরা নাস পাঠ করতে করতে অফিস থেকে বের হয়ে আসে। কুল আউজুবি রাব্বিন নাস, মালিকিন নাস, ইলাহিন নাস, মিংসাররিল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস…
খালা, সারাদিন নামায রোযা করেন, বলেন তো খান্নাছ মানে কি?
কইতে পারলে কি দিবি?
যা চাইবেন।
খান্নাছ মানে হইলো বদ মানুষ, শয়তান টাইপের খারাপ।
খালা তো ভালো তরজমা করলেন। আমি মনে করছিলাম পারবেন না। কৈ শিখছেন এইসব?
ছোটবেলায় মাদরাসায়। ঐসব বাদ দে এহন আমি যা চাইমু তা দেওনের কতা মনে আছে তো?
হ্যাঁ বলেন।
তুই আমার একটা কথা হুনবি ব্যাস।
কি কথা খালা।
তুই আইজই মোবারকের সাথে বিয়া ববি। মোবারক ভালো চরিত্রের পোলা, সৎ। নারী জীবনে সৎ সোয়ামী বড় সম্পদ।
আপনার ছেলে তো আমারে পছন্দ করে না।
ওর পছন্দ কিছু দরকার নাই। তুই রাজি অইলে বাকি ব্যবস্থা আমার।
খালা আমার ইচ্ছা নাই।
কিন্তু তুই তো কইছিলি যা চামু, তুই তা দিবি।
খালা ওয়াদার বড় খেলাপ করলাম। আমিও ইনসান এতো ভালো না। খান্নাসের কাছাকাছি।
ইলা লক্ষ্য করে, এই প্রথম মাটির মানুষ, তার দূরসম্পর্কের খালার মুখে এক খণ্ড মেঘ জমে উঠেছে।
খালা মন খারাপ করছেন, আপনার ছেলেকে বিয়ে করছি না বলে। আমার দিকটা একটু দেখবেন না।
তোর দিক চিন্তা করেই আমার মন খারাপ। তুই ওই দূর দ্যাশে যাবি বদ লোকদের সাথে। এই ভাবনায় আর ভালো ঠেকে না। খুব ব্যথা লাগে। খালার দুইটি ভাসাভাসা চোখ থেকে পানি বেরোয়। সেই পানি যেন ইলা দেখতে না পায়, খালা চোখ লুকিয়ে ফেলে।
খালা, আমি বিদেশে যাবো না। পাসপোর্ট টিকিট ছিঁড়ে ফেলছি। কি ব্যাপার খালা খুশি হন নাই।
হ্যাঁ খুশি অইছি।
তা হলে অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন কেনো? আমার দিকে ভালো মতো তাকান। আর আমার জন্য দোয়া করেন, সূতা স্কুলে আমার যেন চাকরি হয়ে যায়।
মোবারকের কতাঢা এটটু চিন্তা করিস মা।
খালা কাল নাকি আপনার ভাইয়ের ছেলে কানাডা থেকে আসবে। সে এসে যদি বাড়ি ছেড়ে দিতে বলে, শোনলাম বাড়ি নাকি এপার্টমেন্ট কোম্পানিকে দিয়ে দিবে?
আগে আহুক। ও যহন বিদেশ যায় আমার সব সোনা-গয়না বেইচা ওরে টাহা দিছি। এতো বছর কি করলো হিসাব নিমু না। ওর মা ছোটবেলায় মারা গেছে। আমি ওরে কোলেপিটে কইরা মানুষ করছি।
খালা আজকের জন্য রান্না বান্না বাদ, চলেন হোটেলে খেয়ে বাসায় যাবো।
কিন্তু মোবারক।
তার জন্য নিয়ে যাবো।
কিন্তু পর-পুরুষের সামনে বইয়া খাইতে শরম করবো না।
না খালা, আলাদা জায়গায় বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।
ঠিক আছে তাইলে চল।
কিরে ইলা অন্ধেকার ক্যা?
চায়নিজ হোটেল একটু অন্ধকারই হয় খালা।
খালা কিছুই খেতে পারলো না। সব কিছুতেই নাকি রংয়ের গন্ধ। খালার এমন কথায় ইলা হেসে কুটিকুটি। তৃপ্তির সাথে ইলা খেলো এবং মোবারকের জন্য ফ্রাইড রাইস, চিকেন রেজালা এক বাটি স্যুপ নিলো। খালা চলেন এবার যাই।
চায়নিজ থেকে বের হবার কিছুক্ষণ পরই ইলার মা ফোন করে। ইলা লাইন কেটে দেয়। মা জিজ্ঞেস করবে ফ্লাইট কবে। যখন জানবে বিদেশ যাচ্ছি না। মা খুব রাগ করবে। খালা আপনার কাছে কোন সোনার আংটি আছে।
হ্যাঁ আছেই তো।
এক কাজ করেন, আংটিটা আমার হাতে পরিয়ে দেন।
ক্যান?
চিন্তা করলাম ওয়াদা বরখেলাপ করা ঠিক হবে না, মোবারক ভাইকে খবর দেন।
আচ্ছা আমিই ফোন করি।
খালা ইলার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চিন্তার চেয়েও মেয়েটা অনেক মহান। এই পুঁজি নিয়ন্ত্রিত যুগে মোবারকের মতো একটি ছেলেকে সুন্দরী ইলা বিয়ে করছে। মোবারক ভাই আপনি কখন আসবেন বাসায়?
কেন বলতো। তোমার কি জরুরি ফ্লাইট হবে?
হ্যাঁ জরুরি ফ্লাইট। এ জন্য জরুরিভাবে বিয়ে করছি।
কি বলো কাকে বিয়ে করছো।
মোবারকের কথাগুলো হাহাকারের মতো শোনায়।
কেনো অন্য কেউ বিয়ে না করলে কি আপনি করতেন?
না, আমি চাচ্ছিলাম তোমাকে নিয়ে একটা সিনেমা নির্মাণ করবো।
তাতে সমস্যা কি? বিয়ে করার পর সিনেমায় অভিনয় করা কি নিষেধ আছে। আমি চিন্তা করছি, স্বামীকে নিয়ে এক সাথে অভিনয় করবো। এটা কি খুব খারাপ চিন্তা করলাম?
না ঠিক আছে।
তা হলে এক কাজ করুন। কাটাবন মার্কেট থেকে কিছু ফুল নিয়ে আসুন। আমার বিয়ের ঘরটা আপনি সাজিয়ে দিবেন, কি পারবেন না?
হ্যাঁ তা পারবো। আচ্ছা ছেলেটা কে বলো তো।
আপনি তাকে দেখলে অবশ্যই চিনবেন। এই জন্য আগে নাম বলতে চাচ্ছি না। কিন্তু তুমি যে একদিন বললে, তোমার কোন পছন্দের পুরুষ নাই, বন্ধু নাই।
আহা মোবারক ভাই। আপনি আমার সব কথা এভাবে মনে রাখছেন কেন? মানুষ কি এতোটা উন্নত হতে পেরেছে যে, সে সব কথা সত্য বলবে। এখন আর কথা বাড়াবেন না প্লিজ, বুঝতে চেষ্টা করুন, একটি বিয়ে। বিয়ের কন্যাকে এতো ঘাটাঘাটি করতে নেই।
মোবারক ফুল নিয়ে যখন সাইন্স ল্যাবের ওভারব্রিজে উঠলো। তখন বর্তমান মোবারক কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি ছেলে মোবাইল নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মোবারক কতক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মোবাইলটা তেমন দামি না, বেশ পুরাতন, এরপরও মন খারাপ হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ নাম্বার ছিলো।
পাশের বাসার মুক্তি এসেছিল মোবারকের সাথে দেখা করার জন্য। মুক্তির মা মুক্তিকে বলে কয়ে পাঠিয়েছে। আসার পরই শুনে, এ বাড়িতে বিয়ে। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, বিয়ের কন্যা নিজেই ব্যস্ত হয়ে রান্না বান্না করছে।
ইলা, নিমিষেই মুক্তিকে আপন করে নেয়। মুক্তি নিজেও মহাধুমধামে কাজে হাত দেয়। সে তার মাকে খবর দিয়ে আনে। মুক্তির মা ইলাকে জোর করে রান্না ঘর থেকে বের করে এনে, নিজে রান্নার দায়িত্ব নেন। মুক্তি এবং মুক্তির দু’বোন মিলে ইলাকে সাজিয়ে তোলে। ইলা মোবারকের দেরি দেখে ফোন করে। ফোন ধরে অচেনা লোক।
কারে চান।
যার মোবাইল তাকে দিন।
ম্যাডাম তারে তো দেওয়া যাবে না।
কেনো দেয়া যাবে না?
স্যার কোন মহিলার সাথে কথা বলে না।
ইলা কিছুটা থমকে যায়। একটু বোঝার চেষ্টা করে। একবার মনে হয় মোবারকের পরিচিত বন্ধুবান্ধব। আবার মনে হয় না! ইলা কিছুটা বিরক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে- আপনারা কারা?
আমরা কারা, একটু অপেক্ষা করুন। এই আমরা কারা রে? বলেই ছেলেগুলো হাসাহাসি করে। আর ঠিক তখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ইলা কথা বলতে বলতে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। মোবারক ফুল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তার দুই হাতই প্রায় আটকা। বাজারের সব ফুল সম্ভবত সে কিনে নিয়ে এসেছে। ইলা’র তর সয় না। সে মোবারককে প্রশ্ন করে।
আপনার ফোন কার কাছে মোবারক ভাই?
আর বলো না। ছিনতাই হয়ে গেছে।
বলেন কি, ওরা আপনার কোন ক্ষতি করেনি।
না করেনি। খুবই ভালো মানের হাইজ্যাকার। শুধু মোবাইল নিয়েই কেটে পড়লো। অথচ আমার পকেটে টাকা ছিল। অনায়াসে নিতে পারতো। আমি কোন বাধা দিতে পারতাম না। দুটি হাতই আমার আটকা ছিল।
মোবারক হাসে। হাইজ্যাক হওয়ায় সে যেন খুশি। মোবারকের খুশি হওয়াটা ইলার ভালো ঠেকে না।
শোনেন মোবারক ভাই, হাইজ্যাকার তো হাইজ্যাকার। তার আবার ভালো মন্দ কি?
আছে, সব ব্যাপারেই ভালো মন্দ আছে। যাক ওসব কথা বাদ দাও এখন বলো তুমি হঠাৎ করেই বিয়ে করছো কেনো, অথচ আজ বাদে কাল তোমার ফ্লাইট। কিছু বুঝতে পারছি না?
শোনেন মোবারক ভাই, আপনি কিন্তু শুভ কাজে বাধা সৃষ্টি করছেন। ফ্লাইট হলে কি বিয়ে করা নিষেধ?
না, আমি বলছিলাম তুমি যেহেতু দুবাই যাচ্ছো। দেশে আসার পর বিয়ে করলে হতো না।
আচ্ছা দেশে এসে যদি দেখি আমার পছন্দের লোকটা অন্য কাউকে বিয়ে করেছে তখন কি আপনি আমাকে বিয়ে করবেন?
তুমি কি বলছো ইলা।
যা সত্যি তাই বলছি।
মোবারক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ইলা মোবাইলে কথা বলছে। কথা বলছে তার মা’র সাথে। সে তার বিয়ের কথা নিদ্বির্ধায় বলছে। মা, তোমাকে আরো আগেই জানানো উচিত ছিল। কিন্তু কি কারণে যেন জানাতে পারিনি। শোন আজ আমার বিয়ে। এই কারণে খুবই ব্যস্ত। মা আমার সাথে রাগারাগি করে লাভ নেই। তোমার মতো আমি তো আর এতো বুদ্ধিমতী না। তাই দেশের একটি ছেলেকেই বিয়ে করবো। ওর তেমন কোন টাকা-পয়সা নাই। আমার মতোই প্রায় ভাসমান টাইপের। তবে লোক হিসেবে খুবই ভালো। ভালো চরিত্রের। মা তুমি এতো রাগ করছো কেনো, এতো রাগ করলে তো কথা বলা যাবে না। রাখলাম মা।
ইলা লাইন কেটে মোবারককে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে বলে। সে মনে হয় খুবই ব্যস্ত। সাজগোছ করায় ইলাকে খুবই সুন্দর লাগছে। ইতোমধ্যে মুক্তির বাবাও এসেছে। সাত আটজন লোকের সমাগমই বাড়িটিকে কেমন আনন্দমুখর করে তুলছে। ইলা আরেকবার এসে মোবারককে পাঞ্জাবী পরার তাগাদা দেয়। পাঞ্জাবীটা নতুন, ঝকমকে। এমন ঝকমকে পাঞ্জাবী মোবারক কখনই পরেনি।
মুক্তির বাবা অল্প কিছুদিন হয় মুখে দাড়ি রেখেছে। দাড়িতে মেহেদি লাগানো। এ বছরেই হজ্বে যাবেন। চাচা তাগাদা দেয়, মোবারক তাড়াতাড়ি করো। আমি কাজী সাবকে ডেকে নিয়ে আসি। মোবারক আশ্চর্য হয়, এখনো নতুন জামাই আসছে না কেন?
ইলা আবারো এসে মোবারককে পাঞ্জাবী না পরতে দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়। কি ব্যাপার মোবারক ভাই। এখনো পাঞ্জাবী পরেন নাই কেনো। তাড়াতাড়ি পরেন। মনে হয় একটু সমস্যা হচ্ছে। ছেলেটা সম্ভবত আসবে না। না আসলে বিয়ে তো আর বন্ধ রাখা যাবে না।
তার মানে কি?
মানেটা খুবই সোজা। আপনাকে বিয়ে করবো।
ইলার পেছনে মুক্তি এবং মুক্তির আরো দু’বোন দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবার মুখে রহস্যময় হাসি। মোবারক লক্ষ্য করে তার মাও হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
কিরে মোবারক তাড়াতাড়ি কর।
মোবারক পাঞ্জাবী পরে, কিছুটা লজ্জানুভব করে। তাকে জামাই জামাই লাগছে এই বিষয়টায় সে বিব্রত।
মুক্তির বাবা, কাজী নিয়ে চলে এসেছে। মুক্তি মোবারকের হাতে পাগড়িযুক্ত, জড়ি লাগানো টুপি পরতে বলে। মোবারক অবাক, মোবারকের অবাক হওয়া দেখে মুক্তি এবং মুক্তির অন্য দু’বোন লতা এবং পাতা খুবই মজা পাচ্ছে।
মোবারক এমন নাটকীয়তার মধ্যে বিয়ে করবে কল্পনাও করেনি। মাত্র পাঁচ সাত মিনিটের ব্যবধানে ইলা এখন তার স্ত্রী। ইলার দিকে তাকাতে তার খুবই লজ্জা লাগছে। এই কতক্ষণ আগেও ইলার দিকে তাকালে গোনাহ হতো। আর এখন তাকালে গোনাহ হবে না, অথচ এখন তাকাতে লজ্জা লাগছে। এই লজ্জাটা গরিব এবং বেকার থাকার কারণে। নাকি ইলা অনেক বেশি সুন্দরী হওয়ার কারণে মোবারক বুঝে উঠতে পারে না।
ইলা হঠাৎ করেই কথা বলে ওঠায় মোবারক চমকে ওঠে। মোবারক ভাই, আপনি স্বামীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অতএব আদর এবং আদরের সাথে আমার ঘোমটা খুলে দিন। আমি নতুন বধূ, ইচ্ছে করলেই তো আমি আমার ঘোমটা খুলতে পারবো না। তাড়াতাড়ি করেন। নতুন কাপড়ের ঘোমটায় আমার দম বন্ধের উপক্রম। আহা এতো দ্বিধা করছেন কেন। আমি আপনার বিবাহিত স্ত্রী।
ইলা আমাকে একটু সয়ে নিতে দাও। তোমরা সবাই মিলে এতো বড় একটা সারপ্রাইজ করছো যে, আমি হজম করে নিতে পারছি না।
সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু ঘোমটা খুলে আমাকে শ্বাস নিতে দিন। মুক্তি বলেছে, স্বামী ছাড়া নতুন বধূর ঘোমটা খোলার নিয়ম নেই। আমি নিয়মটা মানতে চাই।
মোবারক ইলার ঘোমটা খুলে আশ্চর্য হয়ে যায়। তার ঘরে সত্যি সত্যি একটি হুরপরি এসে বসে আছে। সে কি এমন ভালো কাজ করেছে যে, এমন একটি জীবন্ত উপহার আল্লাহ তাকে দান করলেন। আল্লাহকে এমন একটি প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। বরং দুই রাকাআত নামায পড়ে নেয়া উচিত।
ইলা, তুমি একটু বসো আমি দুই রাকাআত শুকরিয়া নামায পড়ে নেই।
নামায শেষ করে ইলাকে প্রশ্ন করে ইলা তুমি কাঁদছো কেনো?
আমি কাঁদছি, আপনাকে কে বললো। এই দেখুন আমি হাসছি। ইলা সত্যি সত্যি হেসে ওঠে। হাসি টপকে, ইলার চোখ থেকে পানি পড়ে। চেষ্টা করেও ইলা চোখের পানি আটকাতে পারে না। তবে হাসিটা খুবই প্রাণবন্ত অভিনয়।
ইলা, তুমি শব্দ করে খুব সুন্দরভাবে হাসলেও আসলে তুমি কাঁদছো। আমার সাথে তুমি তোমার দুঃখ শেয়ার করো। মনটা হালকা লাগবে। আমি কিছুই করতে পারবো না, এমন ধারণা নিয়ে একাই সব কষ্ট ভোগ করো না। আমি তোমার স্বামী।
কেন বন্ধু হতে পারেন না।
না ইলা, বন্ধুর চেয়েও স্বামী সম্পর্কটা অধিক পবিত্র এবং শক্তিশালী। তাছাড়া প্রকৃত সম্পর্কটাকেই আমাদের মহিমানি¦ত করা উচিত। যেমন ধরো, অনেকে বাবাকেও বন্ধু বলার চেষ্টা করে। চেষ্টাটা করা অনুচিত। বাবা তো বাবাই সে বন্ধু হবে কেনো? তেমনি মা মা-ই, বোন- বোনই। বন্ধু হচ্ছে অনাÍীয়ের সাথে সামাজিক সুন্দর সম্পর্ক। তবে এখানেও কথা আছে। বন্ধু বাছাই করার ক্ষেত্রে নারীকে বেছে নিতে হবে নারী, পুরুষকে বেছে নিতে হবে পুরুষ এর সাথে ভালো গুণ এবং নৈতিক মান থাকা জরুরি।
কথাগুলো শুনে খুবই ভাল লাগলো। কথাগুলো কোন বইয়ের নাকি, আপনার চিন্তা?
কোন বইয়ের কিনা জানি না। তবে আমি দাবি করছি এগুলো আমার চিন্তাবোধ। এর বাইরেও মতামত থাকতে পারে। এখন বলো, তুমি এমন হুট করে বিয়ে করলে কেনো। এবং কাঁদছো কেনো?
কাঁদছি বাবার কথা মনে করে। মানুষটা রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। আচ্ছা হুট করে বিয়ে করার কারণে আপনি কি অপ্রস্তুত, কষ্ট পেয়েছেন?
না ইলা, তোমাকে বিয়ে করার সামাজিক যোগ্যতা আমার নেই। তুমি খুব সহজেই টাকা পয়সাওয়ালা কাউকে বিয়ে করতে পারতে। ইদানীং সমাজে ইসলামী চিন্তাধারার ব্যক্তিরাও টাকা পয়সাকে সামাজিক যোগ্যতা হিসেবে গণ্য করে। শুধুমাত্র সৎ এবং ইসলামের অনুসারী হলেই একজন যুবক বিবাহযোগ্য হয় না। আর্থিক ও অন্যান্য যোগ্যতাও প্রয়োজন।
মোবারক ভাই, আমরা একটা প্রতিজ্ঞা করি। আল্লাহ আমাদের যে পুত্র কন্যা দান করবেন আমরা সে পুত্র-কন্যাদেরকে লেখাপড়া এবং ব্যক্তি জীবনে ইসলামের চর্চাকে গুরুত্ব দিয়েই বিয়ে দিবো।
ইলা আমরা তো কোন ইসলামী ব্যক্তিত্ব নই।
আমরা ওমন একটি জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করবো।
আমি তো মিডিয়া জগতে কাজ করতে চাই।
আমি আপনার সাথে কাজ করবো এবং ঐ জগতের অন্ধকারটাকে আলোকিত পূত-পবিত্র করার চেষ্টা করবো।
ইলা আমি ঠিক করেছি লেখাপড়ার সাথে অভিনয়ও করবো।
তাহলে তো খুবই ভালো হয়। আমি আপনার বিপরীতে নায়িকার অভিনয় করবো।
যাও কেমন দেখাবে, তুমি তো অনেক বেশি সুন্দরী।
আপনি কি সুন্দরকেই বেশি গুরুত্ব দিতে চাচ্ছেন?
মোবারক জবাব দেবার মুহূর্তে বিদ্যুৎ চলে গেলো। এখন রাত ১টা। শ্রাবণের গরমে মোবারক ঘেমে নেয়ে ওঠে। ঝমমকা জরিযুক্ত পাঞ্জাবীর উষ্ণতাটা আর সয্যের সীমায় থাকেনা। মোবারক ছটফট করে। ইলা বিষয়টা বুঝতে পেরে তালপাতার পাখায় বাতাস করে। মোবারক বাধা দেয়, থাক দরকার নেই। মোবারকের এই কথাটা ইলা শোনে না, সে বাতাস করে।
ইলা এবং মোবারকের বিয়ের সৌজন্যেই মনে হয় আকাশ ভরা মেঘের পুঞ্জগুলো খসে খসে পড়তে থাকে। বৃষ্টি-বাতাস, এবং বিয়ের প্রশান্তিতে দুজনেই ঘুমের গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যায়।