প্রতিদিনের তুলনায় আজ একটু আগেই অফিস খুললো মণ্ডলের এপিএস দিনেশ। দিনেশের আসল নাম দানেশ। চলচ্চিত্র জগতে এসে নামটা একটু সংস্কার করেছে। চলচ্চিত্র জগতে সেকেলে এবং অরিজিনাল নামের দুই পয়সার মূল্য নাই। কি সাবানা, কি ববিতা, সবারই নকল নাম। এই জগতে নকল নাম থাকাই হলো নিয়ম। অতএব নিয়ম মানার কারণেই দানেশের নাম হলো দিনেশ যেমন আই আর মন্ডলের। মন্ডলের পুরো নামও বিশেষভাবে রহস্যের কিং খাবে রাখা। কারণ ইব্রাহীম মন্ডল নাম নিয়ে পরিচালক জগতে প্রভাব বিস্তার করা হতো খুবই দুরূহ।
দানেশ ওরফে দিনেশ, খুবই ব্যস্ত। তার মোবাইল বারবার বেজে ওঠে। ইলোরা ফোন করছে। মেয়েটা নায়িকা হবার জন্য উন্মাদ হয়ে আছে। বসের অনুমতি ছাড়া কোন ধরনের টিপসও দেয়া যাবে না। দিনেশ লাইন কেটে দেয়। লাইন কেটে দেয়ায় ইলোরা দ্বিগুণ উদ্বেল হয়ে পড়ে। বুকের ভেতর খলখলিয়ে একটা হতাশার বায়ু প্রবাহিত হয়। পুনরায় আই আর মন্ডলের এপিএস দিনেশকে ফোন করতে ভয় লাগে। কে জানে হয়ত রেগে যাবে, বারবার ফোন করার কারণে। ইলোরা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় ভেঙে পড়ে। সুন্দর কমনীয় চোয়াল যুগলে জেদের হিংসা ফুঁসে ওঠে। বেশ শক্ত হয়ে ওঠে চোয়াল পেশী। যে করেই হোক দুবাই যেতেই হবে। বান্ধবীরা সবাই জানে, আমি দুবাই যাচ্ছি। শুধু বান্ধবীরা হলেও কথা ছিল। এখন তো আÍীয়-অনাÍীয় রেড ক্যাসেল বাড়ির সব ফ্লাটের লোকরাই জানে দুবাই যাবার ব্যাপার। কিন্তু এখন না যেতে পারলে সবাই ভাববে কি?
ইলোরা দ্রুত মাকে ফোন করে। ইলোরার মা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রধান। ইলোরা লেখাপড়ায় মায়ের মতো মেধাবী না। ইলোরা দুরন্তপনা নাচ গানেই অধিক আগ্রহী সে ছোট বেলা থেকেই। কিন্তু ইলোরা বড় হবার সাথে সাথে নাচ গানের ব্যাপারে কিছুটা উদাসিনতা দেখালেও ওর মা ক্রমাগত খুবই আগ্রহী হয়ে ওঠে। নাচ গান অভিনয় মডেলিং এইসব কিছুতেই মেয়ের ভবিষ্যত দেখতে পান। সাথে তার সম্মানটাও উঁচুতে ঠেকবে। সেলিব্রেটির মা বলে কথা। মাল্টিনেশনাল কোম্পানীর লোকজনরা বাসায় এসে দিনের পর দিন ধরনা দেবে, তাদের কোম্পানীর মডেল হবার জন্য। তুচ্ছ জ্ঞান করে তাদের বলতে হবে, পরে যোগাযোগ করুন। এমন একটি মোহনীয় মেয়েকে নাচ, গান, নৃত্য, ফিগার ইস্কিটিং আবৃত্তি শেখানো হয়েছে। গোনে গোনে এক লাখ পাঁচ হাজার মেয়ের ভেতর তার মেয়ে ইলোরাই হবে সেরা সুন্দরী। ইলোরার গায়ের রং যেমন উজ্জ্বল তামাটে, তেমনি স্টেট চুলের লাফিয়ে পড়াও মুগ্ধকর। হালকা ব্রাউন রং চুলে এমনভাবে বিন্যাস করা, কেউ বুঝতেই পারবে না যে চুলে আর্টিফিসিয়াল প্রিন্ট করা হয়েছে। রংটার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অধিক আলোতে একটি জাদুকরী কারবার ঘটে। মনে হবে ঝাফলং সংলগ্ন কোন পাহাড় থেকে ঝর্ণা লাফিয়ে পড়ছে। মেয়ের উচ্চতাও হিংসে করার মতো, পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। কোমরের দৃশ্যমান হলো মৃত পদ্মা নদীর গভীর পাক খাওয়া ক্ষাড়ি। বুকের মানিক জোড়া সারাক্ষণ গর্বভরে তাকিয়ে থাকে। সব মিলিয়ে অপস্মরী বললে ভুল হয় না। এমন মেয়ের মা হয়ে অহংকার না করলে পাপ হবে। ইলোরার মা তাই মেয়েকে নিয়ে গর্ব করে।
মেয়ের ভবিষ্যত বিষয়টা নিয়ে। সারাক্ষণ তাকে উদ্বেগে থাকতে হয়। হ্যাঁ মাম্মি বলো।
আমি ফোন করেছিলাম, কিন্তু আই আর মন্ডলের পিএস দিনেশ তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। এখন কি করবো মা? আমার কিন্তু মোটেও ভালো ঠেকছে না মা।
আ-হা-মাম্মি, তুমি এতো উতলা হয়ো না, আমি সব দেখছি। ব্যাটারা কি চায় আমি দেখবো না। শোন, কুকুর কি চায়?
হাড্ডি।
ওরা যা চায়, আমি তাই দেবো। তুমি কোন চিন্তা করো না মাই গোল্ড।
মা, আমি কি আরেক বার ফোন করবো?
অবশ্যই করবে। প্রয়োজন হলে ফিজিক্যালি প্রেজেন্ট হবে মন্ডলের অফিসে। শোন মামমি, উপরে উঠতে হলে সামান্য কষ্ট তো করতে হবে। ত্যাগ করলেই সাফল্য তোমার সুন্দর দুটি পায়ের তলায় লাফালাফি করবে। আমাকে দেখো, তোমার বাবার গৃহবধূ থাকলে, এখন আমাকে রান্না-বান্নাই করতে হতো। লোকটাকে ত্যাগ করার কারণে তোমার মা এখন অধ্যাপিকা। বুঝলে মাই গোল্ড… মাই চাইল্ড।
আচ্ছা মা, আমি তা হলে এখন সরাসরি অফিসেই যাই।
হ্যাঁ যাও, তবে একটা কাজ করো। ওয়ার ড্রপের নিচের ড্রয়ার থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে যাও। ছোকরাটাকে দিবে। দিয়ে বলবে আমি চা খাওয়ার জন্য দিয়েছি।
আচ্ছা মা, তা হলে আমি যাই।
এসো মাই গোল্ড।
ইলোরা ওয়ার ড্রপ থেকে টাকা নেয়ার পর আবার ফোন করে মন্ডলের এপিএস দিনেশ কে। দিনেশ ইতোমধ্যে বসের থেকে অনুমতি নিয়েছে ক্লায়েন্ট হবু নায়িকা ইলোরার সাথে কথা বলার।
কথা বলায় বেশ কৌশলি দিনেশ। দিনেশের কথা শুনলে মনে হবে, দুবাই কে যাবে না যাবে সব দায়িত্ব যেন দিনেশের। কথা বলার সময় তাড়াহুড়ো একটা ভাবও স্পষ্ট। এই তাড়াহুড়ো ভাবটাও একটা কৌশল। ক্লায়েন্টরা যেন কোন কিছু বুঝে উঠতে না পারে। চিত্রজগতের ব্যবসা হলো কৌশলের খেলা। এই কৌশল ঠিক মতো প্রয়োগ করে টিকে থাকতে হয়। আই আর মন্ডল সে কৌশলটা খুবই চমৎকারভাবে আয়ত্ত করেছে। আর এপিএস দিনেশও যোগ্যতার বলে টিকে আছে। মন্ডল গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড দিনেশের সাথে পরামর্শ করেন।
ইলোরা অধৈর্য হয়ে ওঠে। দিনেশ ফোন ধরছে না কেনো? দিনেশ অত্যন্ত আয়েশী এবং ভাবগম্ভিরতায় কথা বলে।
হ্যাঁ বলুন।
স্যালেমেলেকুম…।
ওলাইকুম…।
জ্বি, আমি ইলোরা বলছিলাম। আমার মায়ের নাম অধ্যাপিকা সেতারা বেগম, উত্তরা, কবি জসিমউদ্দীন রোড।
হ্যাঁ, হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আপনার বায়োডাটায় বেশ কিছু ভুল আছে। ভুলগুলো আপনাকে বলছি, আপনি একটু নোট করুন।
ভুল-১ বাবার নাম লিখেননি। ভুল-২ আপনার ভাইটাল স্টাটিসটিক্স লিখেননি। ভুল-৩ আপনার জন্ম তারিখ লেখেননি। ভুল-৪ মায়ের পেশা লিখেছেন, কিন্তু বাবার পেশা…।
দিনেশ ভাই, আমি আসলে অন্য একটা ব্যাপারে ফোন করেছি
অন্য কি ব্যাপার, খুলে বলুন। আমি একটু ব্যস্ত আছি।
মা আপনাকে চা খাওয়ার জন্য সামান্য কিছু টাকা মানে দশ হাজার টাকা দিয়ে গেছে। আমি চাচ্ছিলাম টাকাটা আপনাকে আমি নিজ হাতে দিব।
হঠাৎই দিনেশের ব্যবহার বদলে যায়। ক্যালানো একটা হাসির ফ্যাস ফ্যাসে শব্দও হয়। দশ হাজার টাকার সামনে মেজাজি আÍমুডটা দিনেশের মিলিয়ে যায়। স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত দিনেশ তোতলাতে থাকে। জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর হার্টবিট মুড়িভাজে বুকের বাম পাশে।
জ্বি ম্যাডাম… ইলোরা ম্যাডাম। আসলে দশ হাজার টাকার তো কোন দরকার ছিল না।
খুব কম হলে, আরো দেব। কোন চিন্তা করবেন না। আমার মা ভালো বেতন পান জানেন তো?
না, ইলোরা ম্যাডাম। আমি বলছিলাম টাকার আবার কি দরকার?
ও আচ্ছা, টাকাই নিতে চাচ্ছে না। ঠিক আছে টাকা ছাড়াই আমি আপনার অফিসে আসছি। ঝটপট ফোনের লাইন কেটে দেয় ইলোরা।
দিনেশের বুকের ভেতর হাহাকার ঘূর্ণিবায়ুতে ছেয়ে যায়। প্রবল বিরক্ত হয় নিজের ওপর। টাকা দরকার নেই এমন কথাটা বলার কি দরকার ছিল। অথচ এ মুহূর্তে টাকাটা খুবই দরকার ছিল। নিজের গালে, নিজেই থাপ্পর মারে। অন্যায় প্রশ্রয় দেয়া মানে বারবার অন্যায়কে আস্কারা দেয়া। ফুরফুরে মুডটা নোংড়া হয়ে ওঠে। কাজে আর মন বসে না। রাগটা গিয়ে পড়ে সিগারেটের ওপর। জোরে জোরে সিগারেট টানার কারণে সিগারেটের মাথায় পটপট আওয়াজ হয়। দ্রুত শেষ হওয়ায় আরেকটা সিগারেট ধরায়। আর ঠিক তখন অফিস পিয়ন মোস্তাক প্রবেশ করে। লোকটার বয়স ষাটের কাছাকাছি। শ্বাস কষ্টের সমস্যা আছে। বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে। যৌবনে যাত্রা দলের বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করতেন। তুখোর অভিনয় করতেন। এক সময় যাত্রা দলের প্রায় বিলুপ্তি ঘটে। উপায়ন্তর না দেখে বহু চেষ্টা তদ্বির করে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করে। কিন্তু সত্তর দশকের পরে সিনেমায় বিবেকের চরিত্র বিলুপ্ত হওয়ায় মোস্তাক আর টিকে থাকতে পারে না। বেকার অবস্থায় ঘুরাফেরার এক পর্যায়ে আই আর মন্ডলের সাথে পরিচয় হয়। প্রথম প্রথম মোস্তাককে প্রয়োজনীয় ভালো কাজ দেয়ার চেষ্টা থাকলেও পরে আর তা হয়ে ওঠে না। এক পর্যায়ে মোস্তাকের ডেজিগনেশন হয়ে পড়ে অফিসের পিয়ন। এখন অফিসের সবাই মোস্তাক বলে ডাকাডাকি করে। যারা মোস্তাক মোস্তাক বলে ডাকে, তাদের অনেকের বয়স মোস্তাকের বয়সের অর্ধেক। মোস্তাকের বিবেকে লাগে, খুব খারাপ লাগে। কিন্তু উপায় কি? একটি পেট আছে, একটি আশাও আছে। আই আর মন্ডল বলেছে, একটি বিশাল বাজেটের সিনেমা নির্মাণ হবে। সে সিনেমায় বিবেকের চরিত্র থাকবে এবং বড় কথা হলো ওই বিবেকের ক্যারেক্টারটাই হবে প্রধান চরিত্র। সে চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মোস্তাককে বলে রেখেছে আই আর মন্ডল। সে আশায় প্রায় দুই যুগ অপেক্ষা করে আছে মোস্তাক। প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পাওয়া মোস্তাক এখন মন্ডল প্রডাকশনের অফিস পিওন। মাঝে মধ্যে খুব বকাও খান। আজও সে রকম ঘটবে এমনটা ভাবেননি মোস্তাক। গালির ধরনে মনে হচ্ছে বড় অন্যায় করেছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও মোস্তাক বুঝতে পারে না। তার অন্যায়টা আসলে কী? অথচ মন্ডলের সহকারী দিনেশ আবারো বকাঝকা করছে। ভাতা খুবই নিুমানের বিবেকবর্জিত।
এই মোস্তাক, বানচোত তরে না কইলাম চা দিতে। পাছায় তৈল জমছে না। বুইড়া তোমারে এমন বাদাম দিমু। সব তৈল খল খল কইরা পড়বো। ঐ বদ এমুন কইরা কি দেখোছ? তরে না কইলাম চা দিতে।
মোস্তাকের বিবেক উত্তপ্ত জ্বলে ওঠে। খুব ঠাণ্ডাভাবে উত্তর দেয়। দিনেশ সাহেব, আপনি কি ভুলে গেছেন, বয়সে আমি আপনার কত বড়। এই অফিসে আমি যতদিন ধরে আছি। আপনার বয়সও ততদিন না।
দিনেশ এ কথায় আরো তেতে ওঠে।
এই বুড়ো, তোর চাকরি আজ থেকে শেষ। বের হ।
মোস্তাক বেশ শব্দ করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। এমন হাসির সামনে দিনেশ খুব খুব চুপসে যায়। ভয়ে কণ্ঠনালী শুকিয়ে যায়। হাসির শব্দ এতোটা ভয়ংকর হতে পারে দিনেশ কখনো কল্পনাও করেনি।
হঠাৎ ঝলকে ওঠা হাসি। হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে যাবার মতো থমকে যায়।
দিনেশ, তুমি দুই পা বিশিষ্ট মানব আকৃতি হলেও তুমি আসলে আচরণে পশু। তুমি কি মনে করেছো তোমার মতো বিবেকশূন্য পশুর সাথে সহাবস্থানে আমি আর থাকবো, পেটের ইবাদত করবো? তোমার জন্য আমার একটি দোয়া। তুমি যদি বিবেকপূর্ণ না হতে পারো, তবে জাহান্নামে যাও। তোমার জাহান্নামে যাওয়া উচিত। কারণ তুমি বিবেকশূন্য।
মোস্তাক দ্রুত চলে যায়। দিনেশের মনে হলো তার বুক থেকে কয়েক টন ওজনের পাহাড় নামলো। আশ্চর্য লাগে তার কাছে। মোস্তাকের এমন সাধারণ কথা ও হাসির সামনে এমন ভয় লাগলো কেনো। দিনেশ নিজেই গ্লাসে পানি ঢেলে পর পর দুই গ্লাস পানি খান। তারপরও মনে হয় তার তৃষ্ণা মেটে না। এমন ছটফট করা মুহূর্তেই ইলোরা প্রবেশ করে। ইলোরার পোশাক পরিচ্ছদ জমকালো। ডিজাইন কাটিং এমন যে, শরীরের অসমতলগুলো অধিক স্পষ্ট হয়ে হাসাহাসি করছে। যে দৃশ্যে চোখ আপনাআপনি থমকে যায়। ইলোরাকে দেখে দিনেশ মুখটা সামান্য হাসি হাসি করার চেষ্টা করে। যদিও দশ হাজার টাকা হাতছাড়া হওয়ার কষ্ট এবং মোস্তাকের হাসি থেকে অপমান এবং ভয়ের রেশ শিরদাড়ায় ছুটোছুটি করছে এখনো।
ইলোরা ব্যাপারটা সামান্য আঁচ করতে পেরেই প্রথমে দশ হাজার টাকার প্যাকেটটা দিনেশের টেবিলে রাখে। কথা বলে চট্পট্। দিনেশ ভাই, টাকাটা আগে গ্রহণ করুন। মা আমাকে ধমকে দিয়েছে। বলেছে টাকাটা যেন আপনার হাতে তুলে দেই। আপনি নিতে চাননি এই কথা মাকে বলায় মা আমাকে ধমক লাগালো, এখন আপনি বলেন, আপনার জন্য যে আমি ধমক খেলাম, এ ব্যাপারে কি ব্যবস্থা নেয়া উচিত?
ইলোরা ইচ্ছে করেই মিথ্যে গল্পটা তৈরি করে। এমন গল্প তৈরি করা ইলোরার অভ্যাস। ভালো কাজও আদায় হয় এতে। এমন গল্পে দিনেশ অপ্রস্তুত।
দিনেশ কি বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
না না দিনেশ ভাই। চুপ থাকলে তো চলবে না। বলুন কি ব্যবস্থা নেয়া যায়?
ইলোরা মেডাম, আপনাকে আমি উপকার করতে পারি, তা হলো দুবাই যাবার ব্যাপারটা, আপনার জন্য আমি সিয়োর করে দিতে পারি। তবে আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে। তা হলো শাহরিয়ার সাহেবের সাথে যোগাযোগ করবেন। খুব ক্ষমতাবান প্রযোজক। টাকার ট্রাক বলতে পারেন। তাও যেই সেই ট্রাক না। হাজার টন বলতে পারেন। তবে খুব বেশি টাকা পয়সার মালিক তো, এক আধটু দুষ্টমী করার বাতিক আছে। বুঝেন তো চলচ্চিত্র জগতে ওইসব আমলে নিলে চলে না।
ইলোরার চোখে খুশির ঝিলিক। এবার তা হলে দুবাই যাওয়া এবং মাল্টিনেশনাল কোম্পানির মডেল হওয়া আর ঠেকবে না।
আচ্ছা দিনেশ ভাই, ওনাকে পাবো কোথায়। তা ছাড়া পাসপোর্টের ব্যাপারটাও তো ঝুলে আছে।
আমি পাসপোর্টের ব্যাপারটা দেখবো। আপনি শুধু আপনার ছবিগুলো দিয়ে যান। আর ভুলক্রমে বাবার নাম লেখেননি ওই ব্যাপারটাও একটু সংশোধন করে দিন। ইলোরা খানিক আহলাদি ভঙিমায় দিনেশকে অনুরোধ করে। এই আহলাদি ভাবটা হলো মেয়েদের দুধারী তলোয়ার, যে কাউকেই মুহূর্তে খণ্ড বিখণ্ড করে দেয়া। অবশ্য সবাই হয় না। তবে বিখণ্ড হওয়াদের মধ্যে দিনেশ।
দিনেশ বিগলিত হাসিতে, আবদুলি ভঙিমায় প্রশ্ন করে।
কিন্তু ম্যাডাম, আপনার সম্মানীত পিতার নাম তো আমি জানি না।
আহা… কি বলছেন আপনি। মাকে ফোন করবেন। ফোন
করার জন্য আপনাকে আমি তিনশো টাকার একটি কার্ড দিচ্ছি এই নিন।
কার্ড কোথায় পেলেন?
আমি সবসময় আমার ব্যাগে ফোনকার্ড রিজার্ভ রাখি। এই দেখুন আরো চারটা কার্ড আছে। দোকান থেকে ফ্লেক্সি করি না। ফোনের দোকানের ছেলেগুলো নাম্বার পাচার করে দেয়, তখন উটকো ফোনের ঝামেলায় অবস্থা কাহিল, তাই এই ব্যবস্থা।
খুব ভালো ব্যবস্থা তো।
এবার বলুন। শাহরিয়ার সাহেবের অফিসটা কোথায়?
গুলশান-১ মেট্রোটাওয়ার ব্লিডিংয়ের এগারো তলা। একশো চার নাম্বার স্যূট।
আপনি যান, আমি শাহরিয়ার স্যারকে সব বলে দিচ্ছি। তবে মেডাম আগেই বলে দিচ্ছি, স্যার অনেক বড়লোক তো একটু আধটু দুষ্টমী করার অভ্যাস আছে। আপনি মেডাম আধুনিকা মেয়ে। আশা করি সব বুঝতেই পারছেন। ম্যানেজ করে নিবেন প্লিজ।
ইলোরা আধুনিকা। প্রবল আÍবিশ্বাসী, ড্যামকেয়ার একটি চেতনাও কাজ করে। শাহরিয়ার সাহেব এজ্ এ মানুষ তো। অতএব ওনাকে অন্যভাবে নেবার কি আছে। একটু আধটু দুষ্টমীতো মেনে নিয়েই মিডিয়ায় কাজ করতে হবে। এমন একটি ত্যাগী মনোভাব নিয়ে ইলোরা গুলশান এক’র উদ্দেশে বের হয়। কারণ শাহরিয়ার সাহেবের ওপর নির্ভর করছে ইলোরার দুবাই যাওয়া এবং স্টেজ প্রোগ্রামের পর একটি বিদেশী কোম্পানীর মডেল হবার সম্ভাবনাও আছে। ইলোরার খুশিতে চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। রাস্তায় অপরিচিত লোকের ভিড় না থাকলেও এক্ষুণি একটা চিৎকার দেয়া যেত। ইচ্ছে করলে এখনো দেয়া যায়। কিন্তু যানজটে আটকে থাকে ক্লান্ত লোকদেরকে হঠাৎ চমকে দেয়ার কি দরকার।
ইলোর সিএনজিতে বসে ছটফট করে। তারাহুড়ো এবং আশপাশের গাড়ির বনেট থেকে গরম এসে অস্থির করে তোলে। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আয়না বের করে টিস্যু পেপারে মুখের ঘাম মোছে। ঠেলেঠুলে নক্সা আঁকা ঠোঁটদুটো আরো ধারালো এবং তীক্ষè করে তোলে। গর্বিত বুকের দিকে তাকিয়ে, আÍতৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করে। কামিজটা টেনেটুনে একটু নিচে নামায়। গোপন বর্ণগুলোকে আর একটু দৃষ্টিসীমায় নিয়ে আসে। ভেতরে ভেতরে একটি প্রতিযোগিতাও কাজ করে। শাহরিয়ার সাবকে এফোঁড়-ওফোঁর করে দিতে হবে। জাদুর ছোঁয়ায় কাজ উদ্ধার করতে হবে।
জ্যাম কিছু হালকা হতে গাড়ি সামান্য আগায়, আবার দপ্ করেই গাড়ি থেমে যায়। ওর মা ফোন করে। ইলোরাকে আদোর করে মামিম সম্বোধন করে।
মামিম তুমি কোথায়?
আমি সিএনজিতে মা, গুলশান যাচ্ছি, শাহরিয়ার সাহেবের অফিসে। উনার ওপর নির্ভর করছে দুবাই যাওয়া।
আচ্ছা যাও, কোন চিন্তা করবে না। সফলতার জন্য কষ্ট করতে হয়। আর শোন, সঙ্গে আবার কাউকে নাওনি তো?
না মা।
বেশ করেছো। শোন প্রযোজক শ্রেণীর লোকেরা বিবাহিত নারী এবং প্রেমিক থাকা মেয়ে দু’চোখে দেখতে পারে না। অতএব কখনই ছেলে বন্ধুদের সাথে নিয়ে যাবে না এবং তোমার আদৌ কোন বন্ধু আছে সে কথাও স্বীকার করবে না, বুঝতে পারছো মাম্মি?
হ্যাঁ মা বুঝতে পারছি। এখন রাখি- বাই।